Sunday, January 28, 2007

আমাদের ওয়াহিদ ভাই

ওয়াহিদ ভাই অনেকের থেকেই আলাদা ছিলেন। যারা সাংবাদিকতা, ঢাকা ইউনিভার্সিটির টিএসসি কেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক আন্দোলন অথবা রবীন্দ্র সঙীতের সাথে কোন ভাবে যুক্ত তারা অবশ্যই ওয়াহিদ ভাইয়ের নাম শুনেছেন বা তার সংস্পর্শে এসেছেন। ১৮ বছরের তরুন কিংবা ৬০ বছরের প্রৌঢ় সবার কাছেই তিনি ওয়াহিদ ভাই। অত্যন্ত মৃদুভাষী ছিলেন তিনি। তার বাংলা কিংবা ইংরেজী ভাষার উপর দখল ছিল অসাধারন। বনেদী পরিবারে জন্ম (বাবা সাংসদ ছিলেন) তার। প্রচুর ভ্রমন করেছেন তিনি দেশে ও দেশের বাইরে। তার সামর্থ অনুযায়ী তিনি দেশের একজন ক্ষমতাধারী ব্যক্তিত্ব হতে পারতেন । কিন্তু তিনি সারা জীবন অত্যন্ত সাধারন জীবন যাপন করেছেন। নিজের নাম নয় নিজেকেই সম্প্র্রসারিত করেছেন তিনি দেশের আনাচে কানাচে। তাকে সবসময় দেখেছি পানজাবী পাজামা ও শান্তিনিকেতনী ঝোলা কাঁধে।

তার সবচেয়ে বড় গুণ ছিল যে মানুষকে ভালো কাজে উদ্বুদ্ধ করতে পারতেন। অত্যন্ত ট্যালেন্টেড মানুষ ছিলেন তিনি। একজন ভালো সাংবাদিকের যা থাকা দরকার - সংস্কৃতি থেকে রাজনীতি বা ভাষা সব বিষয়েই ভালো দখল ছিল তার। তিনি সহধর্মিনী অধ্যাপিকা সনজিদা খাতুনকে নিয়ে ১৯৬২ সালে ছায়ানট প্রতিষ্ঠা করেন। পাকিস্তানি স্বৈরাচারী সরকার প্রচার মাধ্যমে 'রবীন্দ্রনাথ' নিষিদ্ধ করলে উনি ছায়ানটের মাধ্যমে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু করেন। ১৯৬৫ সাল থেকে ছায়ানট রমনার বটমূলে পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে গানের আসর শুরু করে মূলত রবীন্দ্র সংগীত এর মাধ্যমে। ১৯৭২ সালের পর এটি জাতীয় অনুষ্ঠানে রুপান্তরিত হয়।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় ওয়াহিদ ভাই তার টিম নিয়ে বাঙালী শরনার্থীদের সাথে কলকাতা যান এবং ওখানে বেশ কিছু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করে শরনার্থীদের জন্য অর্থ সংগ্রহ ও বাংলাদেশের সপক্ষে জনমত গড়ে তোলেন। উনি স্বাধীন বাংলায় ছায়ানট সম্প্রসারনের পাশাপাশি কনঠশীলন, আনন্দধ্বণি ইত্যাদি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে তোলেন যার হাজার হাজার কর্মী দেশের সাংস্কৃতিক অঙনকে সমৃদ্ধ করেছে। সাংস্কৃতিক চেতনা গড়ে তোলা ছাড়াও একজন ভাল মানুষ হবার তাগিদ দিতেন সকলকে। রবীন্দ্র সঙীতের বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ও আনচলিক সংগঠনের তিনি অন্যতম ব্যক্তিত্ব ছিলেন এবং বাৎসরিক প্রতিযোগীতা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে রবীন্দ্র সঙীত প্রসারে অবদান রেখেছেন। তিনি নিজেও ভাল রবীন্দ্র সঙীত গেয়েছেন এবং এর শুদ্ধতা সম্পর্কে সর্বদাই সরব ছিলেন। সাংস্কৃতিক অঙনে তিনি ছিলেন অনেকের কাছেই দেবতাতুল্য। একজন মানুষ হিসাবে তার কিছু খারাপ দিকও হয়তো ধরা পড়েছিল কারো চোখে। তবে সেটাই স্বাভাবিক নয়কি? একজন মানুষ কখনই সমালোচনাবিহীন হতে পারে না। তার কৃতকর্ম, অপরের হৃদয় ছুয়ে যাওয়াটুকুকেই মানুষ মনে রাখে।

তার লেখার একটি বৈশিষ্ট ছিল যে তিনি অত্যাধিক শুদ্ধ ও অপ্রচলিত শব্দ ব্যবহার করতেন। অবশ্য উনি গত দশকে তার খোলশ ছেড়ে বেরিয়ে এসে খুব সাধারন ভাষা ব্যবহার শুরু করেন।

আমার ওনার কাছে একটি ব্যক্তিগত ঋণ স্বীকার করার আছে। ওনার সানি্নধ্যে যতটুকু এসেছি তার মধ্যে একবার আমাদের বইয়ের লাইব্রেরি করার উৎসাহ দিয়েছিলেন । বলেছিলেন একটি ভেতরকার ইচ্ছা দরকার বইয়ের সংখ্যা বাড়ানোর জন্যে। তার সেই প্রেরনায় আজ আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহ হাজারেরও অনেক উপরে। তার কথাগুলো এখোনো আমার কানে বাজে "ক'শো বই আছে তোমার?" ।

ওয়াহিদ ভাই তো গেলেন। কিন্তু আমরা কি আর এক ওয়াহিদ ভাইকে অচিরেই পাবো? এই প্রশ্নটা হয়ত আমি এখন থেকে করতেই থাকবো।

1 comment:

sa said...
This comment has been removed by a blog administrator.