Sunday, July 22, 2012

দোহাই মিডিয়া, থামলে ভাল লাগে

দেশে একসময় সবেধন নীলমণি ছিল সাহেব বিবির বাক্স বিটিভি। সে সময় সেটি মূলত: সরকারের কথা বললেও টিভি নাটক, ইংরেজী সিরিয়াল, ডকুমেন্টারি, কার্টুন ইত্যাদি কিছু বিষয়ে ছিল অপ্রতিদ্বন্দ্বী। এই উপমহাদেশে রাষ্ট্রীয় টিভি চ্যানেলের মনোপলি ঘুচায় স্যাটেলাইট টিভি। ৯০ এর দশকের প্রথম দিকে এমটিভিতে বাবা সায়গলের মিউজিক ভিডিও (ঠান্ডা ঠান্ডা পানি) এবং জি নিউজের অনুসন্ধিৎসু খবরের আয়োজন উপমহাদেশের দর্শকদের নতুন যুগের আস্বাদ দেয়। বাংলাদেশ যোগ দেয় একটু পরে। ১৯৯৭ সালে চ্যানেল আই ও এটিএন বাংলার পরীক্ষামূলক সম্প্রচার শুরু হয়। এর পরের ঘটনা তো ইতিহাস। বাংলাদেশে মনে হয় এখন গোটা বিশেক স্যাটেলাইট টিভির সম্প্রচার হয়।

দেশের স্যাটেলাইট টিভিগুলো একদিকে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যমগুলোর একঘেয়ে ও একপেশে অনুষ্ঠান এর বদলে দর্শকদের নিজেদের পছন্দের কিছু দেখার সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু এইসব চ্যানেলের অধিকাংশ নিয়ন্ত্রণ করে কিছু কর্পোরেট হাউজ এবং তাদের পেছনের কিছু রাজনৈতিক দর্শন ও মুনাফালোভী ব্যবসায়ী। বেশীরভাগ চ্যানেলেরই নিজস্ব কোন উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য নেই। এসব অনেক সময় চালানো হয় নিজের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি দেখানোর জন্যে, আর ব্যবসায়ীক প্রতিদ্বন্দ্বীদের টেক্কা দেবার জন্যে বা তাদের প্রতি কুৎসা রটনার জন্যে। আক্ষেপ হয় দেশে এখনও পৃথক কার্টুন, এডুকেশন বা স্পোর্টস চ্যানেল হল না।

বিটিভির অনুষ্ঠান নিয়ে অনেকের অভিযোগ থাকলেও শাইখ সিরাজের 'মাটি ও মানুষ' কিংবা ফেরদৌসী রহমানের 'এসো গান শিখি' ছিল আপামর জনসাধারণের অনুষ্ঠান এবং খুবই জনপ্রিয়। স্যাটেলাইটের যুগে হাজারো অনুষ্ঠানের ভীড়ে সেরকম উল্লেখ করার মত অনুষ্ঠান খুবই কম। এখনকার অনুষ্ঠানের মধ্যে বেশীরভাগই মধ্যবিত্তদের উপদেশ দেয়ায় ব্যস্ত - কিভাবে গ্ল্যামারযুক্ত জীবন যাপন করবেন, কোথায় যাবেন, কি পড়বেন, কি শুনবেন, কি দেখবেন, ইত্যাদি। আর রয়েছে গান, মডেলিং ইত্যাদি বিভিন্ন প্রতিযোগিতা নিয়ে রমরমা বাণিজ্য। আমার এক আভিজ্ঞতা বলি - খাগড়াছড়িতে গিয়েছিলাম - সেখানে কোন এক টিভি চ্যানেলের গানের প্রতিযোগীতায় এক আদিবাসী বালিকার জন্যে এসএমএস ভোটের জন্যে যে পরিমাণ তদবির, ক্যাম্পেইন, মিছিল ইত্যাদির কথা শুনলাম তাতে মনে হল ব্যাপারটি অসুস্থতার পর্যায়ে গিয়েছে। সেই মেয়েটি জিতেছিল কিনা জানিনা - তবে মানুষের এই আবেগকে পুঁজি করে সেই চ্যানেল আর মোবাইল কোম্পানিগুলো কোটি কোটি টাকা কামিয়ে নিয়েছে নিশ্চয়ই - এই ব্যাপারগুলো কিন্তু সংবাদ হয় না।

আপনি খবরের কাগজ খুলে দেখুন, নানা চটকদার খবরের ভীড়ে গণ্ডগ্রামের সেই ক্ষুদ্রঋণের ভার সইতে না পারা কৃষকের আত্মহত্যার খবর আসে না। মিডিয়া এখন শ্রেণীতোষণে ব্যস্ত। তাদের বিজ্ঞাপনী আয়ের মোটা অংশ আসে মোবাইল কোম্পানী থেকে - কাজেই সেসব কোম্পানী নিয়ে সমালোচনামূলক লেখা কম। অমুক তারকা, তমুক বুদ্ধিজীবী কি বলেছেন, তারা ঈদের দিনে কি করবেন বা খাবেন সেটি নিয়ে ফিচার হয়।



ছবির জন্যে কৃতজ্ঞতা ব্ল্যান্ক নয়েজ

আমরা দেখছি এখন মিডিয়াতে তুচ্ছ সব বিষয়ের গ্ল্যামারাইজেশন, খবর সংগ্রহে অসুস্থ প্রতিযোগিতা। আসামের গৌহাটিতে একটি আদিবাসী মেয়ের উপর চড়াও হল গোটা বিশেক উশৃঙ্খল যুবক। এক টিভি ক্যামেরাম্যান ৩০ মিনিট ধরে ভিডিও ধারণ করল মেয়েটিকে সাহায্য না করে। বিডিআর বিদ্রোহের সময় দেখেছি মিডিয়া কি করে ভুল কবরের পেছনে ছুটেছে। সাগর রুনির হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশের আগে গিয়ে আলামত নষ্ট করেছে কারা?

বর্তমানে মিডিয়ার পুঁজি হচ্ছে হুমায়ূন আহমেদের প্রয়াণ। মানুষের আবেগের যায়গাগুলো ধরতে পারে তারা ঠিকই। মৃত্যুর সংবাদ পাবার আধাঘন্টার মধ্যেই কিছু লোক পৌঁছে যায় টিভি চ্যানেলে - টকশোতে নিজেদের তুলে ধরতে। প্রতিটি চ্যানেলে হুমায়ূনকে ভেজে খাওয়া হচ্ছে নানা ভাবে। কফিনের ভেতরের লাশের ছবি দেখাচ্ছে অনেকে। আমরা নাদান দর্শক সেগুলো গোগ্রাসে গিলছি আর হাপুস নয়নে কাঁদছি। হ্যা, আমাদের চোখের জলই, আমাদের আবেগই তাদের উপজীব্য। আমরা প্রশ্ন করছি না কেন এত বাড়াবাড়ি।

এই শেনসেশনালিজমের মূলে রয়েছে যে কোন মূল্যে খবর বেঁচা - মানুষকে আচ্ছন্ন করে রাখা। এ রিপোর্টিংয়ে খবরের বিষয়বস্তু সম্পর্কে কোন গভীর ধারনা থাকে না, এতে থাকে পক্ষপাতিত্ব, দুর্নীতি। এই রিপোর্টিংয়ে জরুরী খবর চাপা পড়ে - তুচ্ছ খবর লাইম লাইটে আসে। এ ধরনের রিপোর্টিংয়ে মানুষের প্রাইভেসি বা শোককে পুঁজি করে।

এ অবস্থা থেকে উন্নতির উপায় কি আমি জানি না। অনিন্দ্যের পোস্টে আকুতি ছিল - "দয়া করে হুমায়ূন আহমেদকে শান্তিতে মরতে দেন"। আমি বলছি মিডিয়াকে "থামলে ভাল লাগে"। অচিরেই না থামলে ভবিষ্যৎে দর্শকরা অন্য কোন বিকল্প খুঁজে নেবে।

প্রথম প্রকাশ সচলায়তন এ।

Thursday, April 05, 2012

বিবেকহীন বস্তি উচ্ছেদ ও নীরব দর্শক

গতকাল বুধবার সকালে বেদখলকৃত সরকারী জমি উদ্ধারে বনানী এলাকার করাইল বস্তি  উচ্ছেদ অভিযান চালায় ঢাকা জেলার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে মেটোপলিটন পুলিশের ৪ প্লাটুন মোতায়েন করা হয়। সরকারী ভাষ্যমতে বেদখলকৃত ১৭০ শতাংশ জমির মধ্যে ৮০ শতাংশ বিটিসিএলের মালিকানাধীন ও ৪৩ শতাংশ পিডব্লিইডি’র এবং বাকি জমি আইসিটির।

এক অসমর্থিত খবরে জানা গেছে যে বুলডোজারের নীচে শত শত বস্তি ধ্বংস হবার সময় ঘুমন্ত দুই শিশু মারা যায়। হ্যা তাদের জানানো হয়েছিল উচ্ছেদের কথা গত মঙ্গলবার বিকেলে - স্থানীয় ভাবে মাইকিং করে। কিন্তু এই দুই শিশুর পিতামাতা হয়ত আমলে নেয়নি। গত বছর ২০শে সেপ্টেম্বর রাজউক এরকম স্বল্প নোটিসে আরেকটি উচ্ছেদ অভিযান চালায় সেখানে। পুলিশ আর পাড়ার মাস্তানদের দ্বারা ১২০টিরও বেশী পরিবার উচ্ছেদ করা হলেও পরে তারা আবার এসে বাসা করে। গত ২০০৮ সালে প্রথম পিডাব্লিউডি উচ্ছেদের নোটিশ পাঠালে আইন ও শালিস কেন্দ্র পুনর্বাসন ছাড়া  উচ্ছেদ মানবাধিকার লঙ্ঘন এই বলে হাইকোর্টে একটি স্টে অর্ডার নেয়। সেই মামলার বিভিন্ন শুনানীতে পুনর্বাসনের কথা বলা হয় তবে গত জানুয়ারীতে হাইকোর্ট সরকারকে আদেশ দেয় দুই মাসের মধ্যে এই বেদখলকৃত জমি উদ্ধার করতে - তবে সেখানে পুনর্বাসনের কোন কথা বলা হয় নি।

করাইল এলাকার এইসব ভূমিহীন বস্তিবাসীর ৩০ ভাগ দিনমুজুর, ২০% রিক্সা-ভ্যান চালায়, ১৮% গার্মেন্টস কর্মী ও ১২% ছোট ব্যবসা করে। তাদের মাসিক আয় ২৫০০-৪৫০০ টাকা এবং স্থানীয় মান্তানদের ৮০ স্কয়ার ফিটের ঘর ভাড়া দিতে হয়  ৮০০-১২০০ টাকা।

হ্যা, আমাদেরও ঈদ হয়। ছবি ডেভিড হোয়াইটের সৌজন্যে


এই টাকায় তাদের কিভাবে চলে সে খেয়াল কি রাখে কেউ? জ্যাম এড়াতে আমি অনেক সময় রিক্সায় তেজগাঁয়ের রেললাইনের পাশের বস্তি ও ৪র্থ শ্রেণী কর্মচারীদের বাসস্থান এর পাশের রাস্তাটি দিয়ে আসি। বিজয় স্বরণী ও তেজগাওঁ এর ওভারব্রিজের নীচে এক অদ্ভুত বাজার বসে। কাছাকাছি কাওরান বাজারে যেসব শাক-সব্জি আসে সেসব ট্রাক থেকে নামানোর সময়টা কখনও দেখেছেন কি? কিছু বস্তির ছেলে চাপ খাওয়া, নষ্ট হওয়া শাক সব্জি সংগ্রহ করে সেখান থেকে, এবং অনেকসময় ভালগুলো চুরি করে - অবশ্যই  শারীরিক প্রহার এবং গালাগালির ঝুঁকি মাথায় নিয়ে। সেইসব শাকসব্জি এবং হয়ত সরাসরি আড়ত থেকে পঁচে যাওয়া শাক-সব্জি দিয়েই উল্লেখিত বাজারটি সাজানো। সারি করে বিছিয়ে রাখা পাকা করলা, থেৎলানো পটল, পঁচা শসা, কাল হয়ে যাওয়া আলু - এগুরো নিত্য নৈমিত্তিক চিত্র। এখানে বাজার করতে আসে বস্তির নিম্নবিত্তরা। হ্যা, আমাদের মত বেশী দামের ফ্রেস সব্জি কেনার সামর্থ না থাকতে পারে, কিন্তু তাদেরও তো বাঁচতে হয়।  বাজারের একটি মাত্র মাংসের দোকানে ঘন্টার পর ঘন্টা একটি মাংসের পিস ঝুলে প্রমান করে তারা - না তাদের জীবনেও বিশেষ অনুষ্ঠান থাকে যখন তারা মাংস খেতে পারে।

কিন্তু এই বস্তিবাসীদের  আবাসহীন করা ঠেকাতে তেমন কেউ নেই তাদের পক্ষে লড়ার। কিছু এনজিও প্রেসক্লাবে মানববন্ধন করেছে এবং অনেকে পত্রপত্রিকায় লিখছে।  কিন্তু আমাদের কার সময় আছে সেগুলোর প্রতি দৃষ্টি দেবার?

তত্বাবধায়ক সরকারের সময় মিরপুরে বস্তিবাসীদের জন্যে বাসস্থান করার কথা উঠল। সেটা আর এগোয় নি। কে করবে বলেন। তাদের জন্যে করে কার কি লাভ হবে?

আজকে বস্তিবাসীরা মহাখালীতে মানববন্ধন করছে। বনানী গুলশান এলাকায় ট্রাফিক ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে। সেখানে কোন রিক্সা চলছে না - ধর্মঘটে গেছে তারা। আমাদের সাধারণ প্রতিক্রিয়া কি হবে ভাবছি। অসহ্য গরমে ঘন্টার পর ঘন্টা ট্রাফিক জ্যামে থেকে সরকারের গুষ্টি উদ্ধার করব। তাতে পরিস্থিতির কোন পরিবর্তন হবে না। এসব ভূমিহীন মানুষ আবার বসতি গড়বে নতুন কোন করাইলে। আমরা আমাদের সমস্যাকে শুধু এড়ানোর চেষ্টা করব - ঢাকাকে তিলত্তোমা করার কথা বলব কিন্তু সমস্যা মিটবে না। এ জন্যে আমরা নীরব দর্শকরাও অনেকটা দায়ী।

(ছবির জন্যে কৃতজ্ঞতা দুস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্র)

Sunday, February 12, 2012

এ-কেমন মৃত্যু ?

আজ সকালে মেইল চেক করার সময় বন্ধু চ্যাটে এল ও জানালো আজকের দিনের বিভীষিকাময় খবরটি - সাংবাদিক সাগর সরোয়ার ও টিভি রিপোর্টার মেহেরুন রুনীর নৃশংস হত্যাকান্ড। সে বলছিল "গতকাল রাতেই সাগরকে একটি প্রেস রিলিজ পাঠিয়েছিলাম - আজকে সেটাই হাতে নিয়ে স্তব্ধ হয়ে বসে আছি।"

এইতো একদিন আগেও যারা ছিলেন সুখী দম্পতি, আজ শুধুই স্মৃতি আর ছবি। সারাদিন ফেসবুকে সাংবাদিক বন্ধুদের কাছ থেকে সাগর-রুনী নিয়ে শোকগাথা ও স্মৃতিচারণ, তাদের ছেলে মেঘকে নিয়ে নানা কথা পড়তে পড়তে ও ছবি দেখে আমরাও শোকাচ্ছন্ন ও ভারাক্রান্ত হই বইকি।

সাগরের ডয়েশে ভেলেতে চাকুরির সুবাদে দম্পতিটি জার্মানিতে প্রবাস জীবন কাটিয়ে গত বছর ফিরে এসেছেন। অন্য অনেকের মত বিদেশে থেকে জাননি। হয়ত দেশকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল। কিন্তু ভাগ্যে রইল বিভীষিকাময় মৃত্যু।

অনেকের মনেই নানা প্রশ্ন - এটা কি ডাকাতি না প্রতিহিংসামূলক খুন। তারা দুজন কি তাদের রিপোর্টিং এর জন্যেই কোন শক্র তৈরি করেছিলেন? নাকি এটি কোন পারিবারিক বিরোধ? সেসব হয়ত জানা যাবে অথবা যাবে না। তবে আমাদের সমাজ যে অমানবিক ও কলুষিত হয়ে গেছে তা বোঝা যায় ঘাতকদের আচরণে। পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ীঃ "সাগরের দেহে ১৯টি বড় ধরনের আঘাতের চিহ্ন ছিল। এছাড়া ছোটখাটো আরো ২০-২৫টি কাটা দাগ পাওয়া গেছে। বুকের বাম পাশে একটা ছুরির ৮০ ভাগ গেঁথে ছিল।" হায়, এ পোড়ার দেশে খুনেও রহম নেই।

এ মৃত্যু আমাদের অনেককেই নাড়িয়ে দিয়েছে। এসব জেনে নির্লজ্জ স্বাভাবিক থাকা যায় না। তবে বাস্তবতা এই যে দেশে নানান নৃশংসতা অব্যহত রয়েছে ও থাকবে। কারন আমরা কখনও মূল নিয়ে ভাবি না। সমাজে বৈষম্য বাড়ছে। পাওয়া আর না পাওয়ার দলের মধ্যে একধরণের অবিশ্বাসের ব্যবধান তৈরি হচ্ছে। ফলে দেখা যায় খুব অল্প খরচ করেই মানুষ খুন করা যায়। আর নৃশংসতার ব্যাপারটিও সমাজসৃষ্ট। কোরবানীর সময় অভিভাবকরা অতি উৎসাহে সন্তানদের পশু জবাই করা দেখাব। পাকিস্তান ও গুটি কয়েক দেশ ব্যতিত পৃথিবীর কোথাও প্রকাশ্যে পশু জবাইয়ের চল নেই। ফলে লক্ষ্য করবেন এসব দেখে দেখে শেখার ফলে দেশে জবাই ও ছুরিকাঘাতে মৃত্যুর হার বেশী। কিন্তু এ নিয়ে রাষ্ট্র বা বুদ্ধিজীবীরা ভেবেছে কখনও?

আজ আরেক প্রবাসী বান্ধবীর সাথে কথা হচ্ছিল। সে দেশে ফেরার জন্যে চাকুরি খুঁজছে কিছুদিন ধরে। আজকের সংবাদে মুহ্যমান সে বলল এখন আমি ফেরার ব্যপারে নতুন করে ভাবব। এতদিন ফিরে আসার জন্যে উদ্বুদ্ধ করলেও আজ তাকে কোন কিছু বলতে পারিনি। এই মৃত্যু উপত্যকা থেকে আমার দেশকে ফিরে কেড়ে না আনলে আমি তার নিরাপদ ভবিষ্যৎের প্রতিশ্রুতি দেই কিভাবে?

Sunday, January 22, 2012

ভিআইপিতন্ত্র

ক্লাস টুতে স্কুলের বাংলা টিচার আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে বড় হলে কি হব। আমি উত্তর দিয়েছিলাম 'পুলিশ'। কারন পুলিশরা তখন আমার চোখে ছিল বীরত্ব-ক্ষমতার প্রতীক। এখন যদি আমাকে একই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা হয়, তাহলে চোখ বুঁজে অবশ্যই বলব ভিআইপি।

ভিআইপির সঠিক কোন সংজ্ঞা নেই, স্বার্থ আর ক্ষমতাই তাদের নিয়ন্ত্রক। ভিআইপি হতে লাগে না কোন যোগ্যতা, ন্যুনতম মনুষ্যত্ব বা পড়াশোনা। 'লেখাপড়া করে যে গাড়ি-ঘোড়া চড়ে সে' ধরণের তত্ব এক্ষেত্রে অচল। বাংলাদেশের শতাধিক এমপির শিক্ষাগত যোগ্যতা "স্বশিক্ষিত"। সেই স্বশিক্ষিতদের হাতে আমার শৈশবের হিরো পুলিশকে অনায়াসেই চড় খেয়েও তা হজম করতে হয়। বহু বিচারকের একটি করে অন্তত থার্ড ডিভিশন রয়েছে। তারপরও আপনি যদি ভুলে যান যে তারা সাধারণ মানুষ নয়, বিচারপতি, তাহলে হয়ত আপনাকে হাইকোর্টে হাজির হয়ে হাত জোড় করে ক্ষমা চাইতে হবে।

এই ভিআইপি সংস্কৃতি কি করে বাঙ্গালীদের গ্রাস করল? মুগল সম্রাটেরা তাদের আর্থ-রাজনৈতিক স্বার্থ পূরণের জন্য বংশানুক্রমিক উত্তরাধিকারসূত্রে জমির মালিক ভূঁইয়া বা ভূপতিদের নিয়ে জমিদারতন্ত্র চালু করেন। মুগল আমলে জমি ছিল মর্যাদার প্রতীক এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তির একটি উৎস - কারন জমিদারকে পুলিশ, বিচার বিভাগ ও সামরিক বাহিনীর কিছু দায়িত্ব পালন করতে হতো। উচ্চাভিলাসী জমিদাররা শাসকশ্রেণীকে তুষ্ট করার বিনিময়ে সার্বভৌম ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতেন। ঔপনিবেশিক আমলেও জমিদাররা ছিলেন বহাল তবিয়তেই তবে তাদের খাজনা আদায় ছাড়া অন্যান্য ক্ষমতা হ্রাস পায়। ১৯৫১ সালে জমিদারি ব্যবস্থার আনুষ্ঠানিক বিলোপ হলেও জমিদার বাহাদুররা ঠিকই রয়ে গেছেন অন্য চেহারায়। আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে জমিদারতন্ত্রের মীথ প্রথিত। ফলে অর্থের প্রাচুর্য বা ক্ষমতাধর হলে সেই জমিদারী মানসিকতা জেগে ওঠে। তারা এবং তাদের আশেপাশের লোকেরা ভিআইপি স্ট্যাটাসের সুবিধা ভোগে তৎপর হয়ে ওঠে। এমনকি প্রভাবশালী নেতার মুরগীরও ভিআইপি স্ট্যাটাস পাবার নজির দেখা গেছে।

আপনার দৈনন্দিন জীবনে নানা সমস্যার মধ্যে আপনারা ভিআইপির উপস্থিতি টের পাবেন। এই দেশটি স্পষ্টতই ভিআইপিদের দেশ হয়ে উঠেছে। আপনি ভিআইপি হলেন তো বিনা ঘুষে, বিনা পুলিশী ঝামেলায় আপনার জীবন চলবে। আপনার ট্রাফিক জ্যামে পড়তে হবে না, কারন বিশেষ পুলিশি ব্যবস্থায় আপনার চলাচল। আপনি বিদেশের ভিসা সহজে পাবেন। ভিআইপিদের মধ্যে কি কেউ বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডে মারা গেছে?

এই কারনেই আমরা সবাই ভিআইপি হতে চাই। পরিচয়ের পর কয়েকটি বাক্যের মধ্যে আমরা উচ্চারণ করে ফেলি আমরা কোন ভিআইপির কত কাছের। ভাবি এতেই যদি শিকে ছিঁড়ে। সকলের জন্যে সমান অধিকার এই জিনিষটি আমরা মুখে বললেও তলে তলে লালায়িত থাকি একটু ভিআইপি সুখের।

এই ভিআইপিতন্ত্রের বুকে কিছুটা চির ধরিয়েছে প্রযুক্তিনির্ভর টুলস। ইন্টারনেট ও মোবাইল সহজলভ্য হবার সাথে সাথে যোগাযোগের নিমিত্ত এখন হাতের মুঠোয়। ব্লগে, ফেসবুকে সবাই আমাদের মনের ভাব প্রকাশ করতে পারি। এখন বুদ্ধিজীবীরা আগের মত আর বিবৃতি দিয়ে সুখ পান না- কারন আম জনতা তাদের চেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত কথা বলে ফেলে। বিশ্বের অনেক নামিদামী পত্রিকা বিদেশী সংবাদদাতা তুলে নিচ্ছে - কারন ব্লগ-টুইটারে ব্রেকিং নিউজ মিলে। ওপেনসোর্স, ক্রিয়েটিভ কমন্স, ক্রাউডসোর্সিং, কমিউনিটি, কোলাবরেশনের মাধ্যমে শেয়ার্ড নলেজ - উইকিপিডিয়া, ইউটিউব, ফ্লিকার, ফেসবুক, ব্লগ কমিউনিটি। ওয়েবের মাধ্যমে কোটি লোকের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সৃষ্টি সবার হাতের মুঠোয়। এইসব শত শত ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ২০০৬ সালের ম্যান অফ দা ইয়ার সম্মান দেয়।

১৯৯৯ সালে ন্যাপস্টার সবার নিজস্ব সঙ্গীত আর্কাইভ উন্মুক্ত করার মাধ্যমে একে অপরের মধ্যে গান আদান প্রদান সহজলভ্য করে দিল। সঙ্গীত ইন্ডাস্ট্রি প্রমাদ গুনল। অচিরেই তাদের নামে মামলা হল এবং ২০০১ সালে এটি বন্ধ হয়ে গেল। ন্যাপস্টারের দুর্বলতাগুলো জয় করে পরে র‌্যাপিডশেয়ার, মেগাআপলোড, ড্রপবক্স এর মত শেয়ারিং সাইট জন্ম নেয়। সম্প্রতি আবার এইসব শেয়ারিং সাইট ও কোলাবরেটিভ কন্টেন্ট এর বিরুদ্ধে আটঘাট বেঁধে লাগা হচ্ছে। বহুল আলোচিত সোপা ও পিপা আইন চালু হলে টুইটার বা ইউটিউবএর মত সাইটকে প্রতিটি পোস্ট পরীক্ষা করে পাবলিশ করতে হত (এখানে বিস্তারিত)- যা বাস্তবে সম্ভব নয়। ব্যপক প্রতিবাদের মুখে আইনগুলো পাশ করা থেকে বিরত রাখা গেছে, কিন্তু এরকম চাপ আরও আসবে মেধাস্বত্ত রক্ষার নামে।

মোগাআপলোডের বিরুদ্ধে কপিরাইট লংঘন আর ৫০০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশী ক্ষতিসাধনের অভিযোগ এসেছে এবং একে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মেগাআপলোড কোম্পানিটি হংকংএর এবং পাইরেসীর অভিযোগে অভিযুক্ত এর কিছু কন্টেন্ট আমেরিকার লিজড সার্ভারে রাখার কারনে ফেডারেল কোর্ট তাদের জুরিস্ডিকশন দাবী করে। আমেরিকার অনুরোধে নিউজিল্যান্ড থেকে এর তিনজন (জার্মান ও ডাচ) হর্তাকর্তাকে গ্রেফতার করা হয়। এর প্রতিবাদে বেনামী হ্যাকাররা আমেরিকার জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট, এফবিআই, কপিরাইট অফিস, ইউনিভার্সাল মিউজিক গ্রুপ ইত্যাদির ওয়েবসাইট হ্যাক করে

এক স্বদেশীর বিরুদ্ধে বিদেশ থেকে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেবার জন্যে মামলা ঠোকা হয়েছে। ফেসবুক একটি ক্লোজড সাইট। কাজেই এখানে অসদাচরণ প্রদর্শনের (?) জন্যে বড়জোড় চাকুরিজীবির বিভাগীয় শাস্তি হতে পারে, মামলা নয় (জুরিস্ডিকশনের ব্যাপারটিও আছে), যেখানে সে ভুল স্বীকার করে স্ট্যাটাসটি মুছে দিয়েছে। তার অনুপস্থিতির কারনে আদালত অবমাননার শাস্তি প্রদান যেন ঝিকে মেরে বৌকে শেখান - খবরদার বাড়াবাড়ি করবে না। অথচ জামাত নেতা জনসভায় প্রকাশ্যে প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে হুমকি দেয়। তার বিরুদ্ধে মামলা হয় না - কারন সে রাজনৈতিক ভিআইপি।

এইভাবে বিশ্বজুড়ে সাধারণ অনলাইন ব্যবহারকারির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে সংবাদ বা তাদের মনের ভাব প্রকাশ করার জন্যে। ওদিকে অসাধু ভিআইপি রাজনীতিবিদরা তাদের বিশ্বব্যাপী গোপন ব্যান্ক অ্যাকাউন্ট থেকে লক্ষ কোটি টাকা আদান প্রদান করে অস্ত্র বা নিষিদ্ধ জিনিষ কিনছে -কারুরই মাথা ব্যাথা নেই।

গুয়াতেমালাতে আমেরিকার চাপে একটি বিশেষ কোর্ট এবং দুটি বিশেষ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে কপিরাইট আইনের জন্যে। দেড় কোটি মানুষের এই দেশে প্রতি বছর ৬০০০ লোক খুন হয় এবং খুনীদের বিচার হয় না। মাইকেল জ্যাকসনের পাইরেট গান ডাউনলোড করার জন্যে কারও পাঁচ বছরের সাজা হতে পারে - অথচ তাকে খুনের দায়ে ডাক্তারের সাজা হয়েছে একবছর।

ইন্টারনেটকে সাধারণ মানুষের হাত থেকে ভিআইপিদের কব্জায় নিয়ে আসার জন্যে তোড়জোড় হচ্ছে আমাদের দেশেও। কপিরাইট আর সাইবার আইনের পক্ষে সোচ্চার হচ্ছে কতিপয় গোষ্ঠি। প্রথমে একশ্রেণীর মিডিয়া কর্পোরেট ব্লগ চালু করে মতামত প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছে কিন্তু ব্যর্থ হওয়ায় নতুন নতুন ফন্দি আঁটছে। এটি করছে তাদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে। বিভিন্ন সভা সমিতির মাধ্যমে তারা ব্লগ ভিআইপি সাজার চেষ্টায় ব্যস্ত।

ইন্টারনেটকে ভয় ভীতির উর্ধ্বে রেখে সাধারণ মানুষের ব্যবহার্য না করতে পারলে এটি অন্য সব মাধ্যমের মতই ভিআইপি নিয়ন্ত্রিত হবে। মানুষের কণ্ঠ রোধ করতে পারলে কাদের লাভ হয় তা মানুষ চীন, উত্তর কোরিয়া, ইরান ইত্যাদি স্বৈরাচারী শাসকের দেশ থেকে অনুমেয়। আমাদের তাই ভাবতে হবে - আমরা আমাদের এবং সাধারণ মানুষের অধিকারের লক্ষ্যে লড়ব না ভিআইপি হবার ইঁদুর দৌড়ে যোগ দেব।

Saturday, November 05, 2011

জাগো বাংলাদেশ নিয়ে যত কথা

গতকাল অফিসে যাবার সময়ে শেরাটন হোটেলের সামনের মোড়ে দেখলাম হলুদ টিশার্ট পরা কয়েকজন ছেলেমেয়ে বিভিন্ন গাড়ির কাছে এসে কিছু জিজ্ঞেস করছে। গাড়ি সিগন্যালে থামতেই ১৪-১৫ বছর বয়সী এক কিশোরী এগিয়ে এল। স্যার বলে সম্ভাষণ করে তাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা শুরু করতেই গাড়ি আবার নড়ল। দ্রুত পকেটে হাত দিয়ে কিছু টাকা হস্তান্তর করতেই Primary Education For All লেখা একটি স্টিকার পেলাম। অন্য গাড়িতে দেখলাম ফুল দেয়া হচ্ছে।

এরপর অফিস যেতে যেতে ভাবছিলাম যে ওইখানে প্রায়ই পথশিশুরা ফুল নিয়ে দাড়িয়ে থাকে অথচ তাদের কাছ থেকে কালে ভদ্রে কিছু কেনা হয় না। তাহলে আমি ঐ হলুদ পোশাক পড়া কিশোরীকে কেন সাহায্য করলাম?
(ছবি: গতকাল সিলেটে ড: জাফর ইকবাল ভলান্টিয়ার ফর বাংলাদেশের হলুদ টি শার্ট পরা। সৌজন্যে জাগো বাংলাদেশ ও টিটিএল)

বিভিন্ন ব্লগে এই নিয়ে লেখালেখি হচ্ছে যার বেশীরভাগেই দেখলাম তথ্যের অভাবে গালগল্প, ব্র্যান্ডিং ও কাঁদা-ছোড়াছুড়ি চলছে। এইসব কিশোর-কিশোরী বা তাদের কে পাঠিয়েছে তা সম্পর্কে আমরা কতটুকু জানি? কালকের এই আয়োজনটি কিন্তু রীতিমত পাবলিক ক্যাম্পেইন করা একটি কর্পোরেট পৃষ্ঠপোষকতার উদ্যোগ। ডেইলি স্টারে এসেছে যে জাগো বাংলাদেশ নামক এনজিওর ভলান্টিয়ার্স ফর বাংলাদেশ শাখার প্রায় ৭০০০ স্বেচ্ছাসেবক যারা বিভিন্ন ইংরেজী ও বাংলা মাধ্যমের স্কুল এবং কলেজ ইউনিভার্সিটিতে পড়ে তারা দেশের দশটি শহরে রাস্তার মোড়ে মোড়ে দাড়িয়ে জাতিসংঘের উৎসাহে প্রবর্তিত ইউনিভার্সাল চিলড্রেনস ডে সম্পর্কে জানাবে এবং পথশিশুদের জন্যে অর্থ সংগ্রহ করবে ৩রা নভেম্বর ২০১১ তারিখে। একই দিনে তারা ১৮০০ পথশিশুকে বিভিন্ন খেলার যায়গায় নিয়ে যাবে, তাদের খাবার এবং চিকিৎসা দেবে। এর মূল স্পন্সর আমেরিকান দুতাবাস এবং সহায়তা করেছে এয়ারটেল, পিজ্জা হাট, কেএফসি, ফারইস্ট লি: ওয়ান্ডারল্যান্ড, টিটিএল এবং অন্যান্য সংস্থা। অনেক প্রতিথযশা যেমন জাফর ইকবাল স্যারও তাদের উৎসাহিত করেছেন ( এবং তার বিরুদ্ধে ফতোয়া দেবার ধৃষ্টতা পেয়েছে ছাগুরা)। জাগো বাংলাদেশ ২০০৭ সাল থেকেই ইউনিভার্সাল চিলড্রেনস ডে পালন করে আসছে।

 সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ২৫ বছর বয়সী বাংলাদেশী যুব্ক করভি রক্ষান্দ ধ্রুবের গল্প স্বপ্নের মতন, অন্তত দেশে বিদেশে সেভাবেই প্রচারিত। বিলেত থেকে ২১ বছর বয়সে আইনে স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফেরে ধ্রুব। কথা ছিল পারিবারিক ব্যবসা সামলাবে সে, কিন্তু মাথায় ভুত চাপল পথশিশুদের জন্যে স্কুল করবে সে। ২০০৭ সালের এপ্রিল মাসে রায়ের বাজারে বন্ধুদের সাহায্যে একটি রুম ভাড়া নেয় জাগো এবং একটি ছোট ইংরেজী স্কুল খোলে যেখানে ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডনের এডএক্সেল কারিকুলামে পড়ানো হয়। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পাশাপাশি মেলে খাবার ও চিকিৎসা। বাড়ি যাবার সময় আবার আধা কেজি চালও পায়। ধ্রুব করিৎকর্মা ছেলে, তার যোগাযোগ, সামাজিক মর্যাদা ইত্যাদি কাজে লাগিয়ে দেশী-বিদেশী সাহায্য যোগাড় করে স্কুলটি এগিয়ে নেয়। এর জন্যে আকর্ষনীয় প্রেজেন্টেশন, ভিডিও ও নানা ক্যাম্পেইনের উদ্যোগ নেয়।

বর্তমানে এই বিল্ডিং এর দুই তলা জুড়ে ৩৬০ জন করে দুই শিফটে ৭২০ জন পথশিশু শিক্ষা নেয়। তাদের ঢাকা, চট্টগ্রাম সহ অন্যান্য কয়েকটি শহরে আরও গুটি কয়েক ছোট স্কুল আছে। ইতিমধ্যে দেশী ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারও পেয়েছে ধ্রুব। এছাড়াও দ্যা ঢাকা প্রজেক্ট নামে আরেকটি স্কুল আছে যেখানে বিশেষ ভাবে এমিরেটস এর বিমানবালাদের অর্থায়নে বাংলা ও ইংরেজী মাধ্যমে পড়ানো হয়।

দুবছর আগে বাড়ি থেকে তাকে জানিয়ে দেয়া হয়, বেছে নাও - পারিবারিক ব্যবসা না তোমার খামখেয়ালি। ধ্রুব বাড়ি থেকে বের হয়ে স্কুলের একটি রুমে আশ্রয় নিয়ে বলে দিনের অধিকাংশ সময়তো এখানেই থাকি, নাহয় আরেকটু থাকলাম। জাগো বাংলাদেশে আরও বিভিন্ন সামাজিক কাজের সাথে জড়িত - তাদের ওয়েবসাইট অনুযায়ী

ইউনিভার্সাল চিলড্রেনস ডের ২০১০ সালের অনুষ্ঠানে প্রায় ২০০০ স্বেচ্ছাসেবক অংশ নেয়। এইসব স্বেচ্ছসেবকদের আনুষ্ঠানিক কাঠামো দিতে অঙ্গসংস্থা ভলান্টিয়ার ফর বাংলাদেশ গঠিত হয় কাকরাইলে এবছর আমেরিকান দুতাবাসের সহযোগীতায়। উদ্দেশ্য আগামী ২ বছরের মধ্যে ২১টি স্বেচ্ছাসেবক দল তৈরি করা। তাদের চুড়ান্ত লক্ষ্য ৬৪টি জেলায় স্বেচ্ছাসেবক দল তৈরি করা। তাদের কার্যক্রমের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে সামাজিক মিডিয়ার ব্যবহার - আপনি যোগ দিতে চান? ফেসবুক লগিন ব্যবহার করে যোগ দিতে পারেন। ফেসবুকে তাদের স্বেচ্ছাসেবকের সংখ্যা ৬০০০ এর উপরে। এবারের ইউনিভার্সাল চিলড্রেনস ডে উপলক্ষ্যে ভলান্টিয়ার ফর বাংলাদেশ বেশ কটি ওয়ার্কশপের আয়োজন করে দেশজুড়ে -চট্টগ্রাম, ঢাকার আইএসডি, সেইন্ট যোসেফ ইত্যাদি নামকরা স্কুল ছাড়াও ওয়ান্ডারল্যান্ডে ছিল এইসব আয়োজন। নয়নকাড়া ভিডিও এবং ছবি ফেইসবুক ও ইউটিউবে শেয়ার করা হয়েছে এবং আরও ছাত্রছাত্রী উদ্বুদ্ধ হয়েছে। আমি কেন সেই কিশোরীকে সাহায্য করলাম সেটি এখন খোলাসা হল। এটি ছিল পূর্ব প্রস্তুতি নেয়া ইভেন্ট এবং এতে একটি স্টানিং ইফেক্ট ছিল। এতজনের স্বতস্ফুর্ত অংশগ্রহণের পেছনে সামাজিক মিডিয়ার অবদান অনস্বীকার্য। টুইটারের মাধ্যমে জানা যায় যে ঢাকার উত্তরাংশে পুলিশ গতকাল তাদের কার্যক্রমে বাধা দেয় এবং ধ্রুব গুলশান থানায় গিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়।

আজকে অরিত্রের লেখায় জাগো বাংলাদেশের পক্ষে বিপক্ষে অনেক কথা এসেছে। অনেকে স্বেচ্ছাসেবকদের পোষাক নিয়ে আপত্তি করেছেন (সাবিহ ওমর ভালো জবাব দিয়েছেন তাদের)। অনেকে কত টাকা উঠেছে তার হিসেব চা্চ্ছেন। অনেক স্বেচ্ছাসেবককে টিশার্ট পরিহিত অবস্থায় শিশা বারে দেখা গেছে সেসব ছবি এসেছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে এই সবই কিন্তু বিভিন্ন ব্লগে আসার সাথে সাথে তাদের ফেসবুক গ্রুপে পোস্ট হয়ে যাচ্ছে এবং জবাব চাচ্ছে অনেকে। আগ্রহীরা চাইলে ধ্রুব, জাগো ফাউন্ডেশন এবং ভলান্টিয়ার ফর বাংলাদেশ ফেসবুক পেইজে এইসব নিয়ে আলোচনা দেখতে পারেন। সামাজিক মিডিয়ার সুবিধাটা এইখানে - পত্রিকার মত একপেশে রিপোর্ট না। জবাবদিহীতার আশা করা যায়।

এইসব স্বেচ্ছাসেবক দেশের দুর্নীতিগ্রস্ত সমাজের অন্তর্গত - কাজেই গুটিকয়েকের ব্যক্তিগত দুর্নীতিকে জেনেরালাইজ করা হয়ত ঠিক হবে না। ২০১০ সালে ৬ ঘন্টায় তোলা হয়েছিল ২৪ লাখ টাকা, এবার শোনা যাচ্ছে ৩৮ লাখ টাকার কথা - জাগো বাংলাদেশ তাদের আয় ব্যয়ের রিপোর্ট প্রদানে স্বচ্ছ হবেন এ আশা রইল - না হলে সবাই যা বোঝার বুঝে যাবেন।

ধ্রুবর ফেইসবুক স্ট্যাটাস থেকে একটি অংশ তুলে ধরার লোভ সামলাতে পারছি না:
One parent of a volunteer complained: I can't find a parking lot at JAAGO School in Karail. Can you please find me a parking lot and please do make a school with parking lot next time?

Korvi Rakshand answered: The kids who comes to the JAAGO School don't have cars. Actually, they don't have 3 meals a day. Right now, JAAGO is trying to arrange education and food for them. Once they study, become rich and can buy cars, we will definitely relocate the school which will have a parking lot and most probably a Helipad also.
এই প্রশ্নোত্তর পর্ব দিয়ে বোঝা যায় যে জাগোকে অনেক প্রতিবন্ধকতার মোকাবেলা করতে হয়েছে বুদ্ধিমত্তা দিয়ে এতজন স্বেচ্ছাসেবকদের একত্রিত করতে। তবে তাদের জন্যেই দামী স্কুলের এইসব উচ্চবিত্ত ঘরের স্বেচ্ছাসেবকরা যাদের অনেকে আদর করে ফার্মের মুরগি বলে ডাকে তারা এই প্রথমবার অ্যাক্টিভিজমের স্বাদ পাচ্ছে। আমেরিকান দুতাবাসের পৃষ্ঠপোষকতায় অনুষ্ঠান বলে হয়ত তাদের পিতামাতা তাদের রাস্তায় ছেড়েছে। তারা ভবিষ্যৎে দেশের সংকটময় মুহূর্তগুলোতে এইভাবে নেমে আসবে কিনা এবং কর্পোরেট বেনিয়া গন্ধ ছাড়া উদ্যোগগুলোতে তাদের অংশগ্রহণ কেমন সেটা দেখার আকাঙ্খা রইল। তারাও দেশেরই অংশ এবং আমরা শ্রেণীভেদ করে তাদের যেন দুরে না ঠেলি। স্বেচ্ছাসেবকতা করা তাদেরও অধিকার এবং দেখা যাক তেল গ্যাস রক্ষার মত বা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এর মত জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতে তাদের ভূমিকা কেমন থাকে।

এখানে উল্লেখযোগ্য গতকালের আয়োজনে আলোকচিত্রে স্বেচ্ছাসেবা দিয়ে সহায়তা করেছে থ্রু দ্যা লেন্স (টিটিএল) নামক অ্যামেচার ফটোগ্রাফারদের সংগঠন (আমার কয়েক বন্ধুও আছে সেখানে)। জাতীয় অন্যান্য অ্যাক্টিভিজমে তাদের সচরাচর দেখা যায় না। ভবিষ্যৎে কি তাদের পাওয়া যাবে?

জাগো বাংলাদেশ আর ভলান্টিয়ার ফর বাংলাদেশের উদ্দেশ্য মহৎ হলেও আমেরিকান সরকারের ভূমিকা এখানে প্রশ্নবিদ্ধ। ৬৪টি জেলায় স্বেচ্ছাসেবক নেটওয়ার্ক হলে তাদের কি লাভ? বিষয়টা এতটা জটিল যে বলতে হয় খুব খেয়াল কৈরা।

Saturday, October 15, 2011

পার্বত্য চট্টগ্রাম ও পাহাড়িরা কি দূরে সরে যাচ্ছে?



ছুটি এলেই মনটা পালাই পালাই করে কিন্তু আলস্যের কারনে কোথাও যাওয়া হয়না। এবার পুজোর ছুটিতে আড়মোড়া ভেঙ্গে সপরিবারে খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটি বেরিয়ে এলাম। আমার জন্যে ব্যাপারটি ছিল উত্তেজনাকর, কারন হিল্লি দিল্লি করার সুযোগ হলেও দেখা হয়নি চক্ষু মেলিয়া দেশের ভেতরের এই সবুজ ও নীলের পাহাড়-হ্রদের মেলা।

এ অঞ্চলের সৌন্দর্য নিয়ে নতুন কিছু বলার নেই (ছবি দ্রষ্টব্য:  রাঙ্গামাটি , খাগড়াছড়ি, বান্দরবান )। আমাদের সফরসঙ্গী পরিবারের কর্তাটি বললেন দেখুন এইরকম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে মানুষ অনেক পয়সা খরচ করে বিদেশে যায়। তবে বাস্তব হচ্ছে যে পার্বত্য চট্টগ্রাম দিনে দিনে তার রুপ হারাচ্ছে। পর্যটন ও বসতি বাড়ার সাথে পাহাড় কেটে বানানো হচ্ছে বাড়িঘর, হোটেল-রিসোর্ট। বাশ ও সেগুন গাছের গুড়ি ভর্তি সারি সারি ট্রাক তো নিজ চোখেই দেখলাম রাস্তায়। পাহাড় থেকে খাদ্যাভাবে জনপদে নেমে আসে হাতির পাল এমন শুনেছি, কাপ্তাই লেকে আর আগের মত মাছ পাওয়া যায় না। হায় কে কার খবর রাখে।

সত্যিই এগুলো খবর হয় না। খবর হয় না যখন সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদীরা পাহাড়ি-বাঙ্গালী নির্বিশেষে চাঁদা তোলে বা অপহরণ করে, পাহাড়ি-বাঙ্গালী উভয়ের উপর হামলা করে। খবর হয়না যখন পাহাড়িদের জীবন, বসতি নিয়ে রাজনীতি করে জ্ঞানপাপী মানুষ আর তাদের এতটুকু মাথা গোঁজার ঠাই কেড়ে নেয়। খবর হয় না যখন আইন শৃঙ্খলা বাহিনী (বিশেষ করে পুলিশ) টাকার জন্যে নিপীড়িতের পাশে না এসে নির্যাতনকারীর পাশে এসে দাড়ায়। খবর হয় না যখন কল্পনা চাকমারা হারিয়ে যায়। খবর হয়না যখন খাগড়াছড়ির ১৯২টি কাজের বিনিময়ে খাদ্য প্রকল্পের শতভাগ টাকা মেরে দেয় রাজনৈতিক নেতারা যার মধ্যে অধিকাংশই পাহাড়ি। নিজেদের রক্ত নিজেরাই খেয়ে কুমীর বনে যায় (উদাহরণ: ইউনিপের নামে ৩০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে উদ্দীপন চাকমা )।

খবর হয় যখন দেয়ালে পিঠ ঠেকা মানুষ রুখে দাড়ায় এবং নিজের হাতে আইন তুলে নেয়। খবর হয় যখন শান্তিরক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত বাহিনী দুপক্ষের মধ্যে এসে দাড়ায় এবং লোক মারা যায়। খবর হয় যখন পাহাড়ি দুইপক্ষ নিজেদের রক্তে গা ভাসায় আর নিরীহ জনগনকে ত্রাসের রাজ্যে রাখে। খবর হয় যখন আদিবাসী নামকরণ নিয়ে সরকারের মনোভাব প্রতিষ্ঠায় অদ্ভুত সব যুক্তি দেখানো হয়।

এসবের মাঝে একটি জিনিষ আমরা ভুলে যাচ্ছি - তিন পার্বত্য জেলার ১৪টি উপজাতির মনে কি খেলা করছে। এই মূহুর্তে তারা আর বাঙ্গালী দের বিশ্বাস করছে না, এই মূহুর্তে তারা নিজেদের দেশের ভেতরে অবাঞ্ছিত ভাবছে। সংবিধানে আদিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে ডাকা বিক্ষোভে দুর্গম অঞ্চল থেকে চার ঘন্টা হেটে বর্ষীয়ান পাহাড়ি যোগ দিয়েছেন। তাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। এরপর হয়ত শান্তিচুক্তি রদ হয়ে আবার সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু হবে। কিন্তু এমন তো কথা ছিল না।

১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু পার্বত্য চট্টগ্রামে গিয়েছিলেন এবং মানবেন্দ্র লারমা স্বায়ত্তশাসন সহ বিভিন্ন উপজাতির দাবী তুলে ধরলে তিনি বলেন "তোরা সব বাঙ্গালী হইয়া যা"। ১৯৭৩ সালে সংসদের কাছে তার আহ্বানেও সাড়া দেওয়া হয় না। ফলশ্রুতিতে ১৯৭৪ সালে এম এন লারমা জনসংহতি সমিতির একটি সশস্ত্র গ্রুপ গঠন করেন, যা পরে শান্তিবাহিনী নামে পরিচিতি লাভ করে এবং পরে তারা অত্র অঞ্চলে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। ১৯৮১ সালে শান্তিবাহিনী দ্বিধাবিভক্ত হয় এবং ১৯৮৩ সালে বিপক্ষ দলের হাতে মানবেন্দ্র মারা যান। তবে তার অনুজ সন্তু লারমার নেতৃত্বে শান্তিবাহিনী গেরিলা যুদ্ধ অব্যহত রাখে। জিয়া এবং এরশাদ সরকারের আমলে শান্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযান চালায় সেনাবাহিনী এবং আশির দশকে উপজাতিদের উপর নির্লজ্জ্ব হত্যাকান্ড চালানো হয়। কোন সরকারের আমলেই এইসব হত্যাকান্ডের বিচার হয়নি। এছাড়া গ্রেপ্তার, নির্যাতন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, মানবাধিকার কর্মীদের হেনস্থা করা, যৌন নিপীড়ন প্রভৃতি মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে নিয়মিতই। সাথে সাথে শান্তিবাহিনীরও অনুরূপ মানবাধিকার লংঘনের মূল্য দিতে হয়েছে পাহাড়ি-বাঙ্গালি উভয়কেই।

এরশাদের আমলে ১৯৮২-৮৩ সালে ২৬ হাজারের ও বেশী ছিন্নমূল ও ভাঙ্গনের ফলে উদ্বাস্তু পরিবারকে চট্টগ্রামের তিন পার্বত্য জেলায় পুনর্বাসনের জন্যে নিয়ে আসা হয়। তাদের মধ্যে  প্রায় ২০ হাজারেরও বেশি পরিবারের স্থান হয় খাগড়াছড়িতে।  আশির দশকের শেষের দিকে তাদের উপর ‘শান্তিবাহিনী’র হামলার ঘটনা বাড়তে থাকলে সেখান থেকে লোকজনকে সেনাক্যাম্প সংলগ্ন ৮১টি গুচ্ছগ্রামে স্থানান্তর করা হয়।

১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর সম্পাদিত আওয়ামী লীগের শান্তিচুক্তি নিশ্চয়ই এই অবস্থা থেকে উত্তরণের একটি বলিষ্ঠ পদক্ষেপ। এ অবস্থায় আনতে কি পরিমান রাজনৈতিক গণসংযোগ করতে হয়েছে তা অনুমেয়। শান্তিচুক্তির পর তিন পর্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সেনা প্রত্যাহার করা হয়েছে। আশির দশকের তুলনায় বর্তমানে অর্ধেকের কম সেনাক্যাম্প পার্বত্য চট্টগ্রামে রয়েছে। বর্তমানে যা হচ্ছে তাতে উল্টোস্রোত দেখা যাচ্ছে আর সরকারেরও মাথা ব্যাথা নেই।

শান্তিচুক্তি অনুযায়ী ১৯৯৮ সালের ফেব্রুয়ারীতে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) এর প্রায় দুই হাজার সশস্ত্র সদস্য স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে। তবে প্রসিত বিকাশ খীসার নেতৃত্বে একটি দল চুক্তি মানতে অপারগতা প্রকাশ করে এবং পূর্ণ স্বায়ত্বশাসনের দাবীতে ১৯৯৮ সালে গঠন করে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। এই বিভাজন অবশ্য জেএসএসকে দমাতে পারেনি এবং তারা দাপটেই কার্যক্রম চালিয়েছে খাগড়াছড়ি অঞ্চল ছাড়া যেখানে বেশীরভাগ অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ ছিল ইউপিডিএফ এর। কিন্তু ২০০৬ সালের জরুরী সরকারের সময় সন্তু লারমার একক নেতৃত্ব থেকে দল বাঁচাতে সংস্কারের দাবীতে জনসংহতি থেকে বেরিয়ে গিয়ে নতুন আরেকটি রাজনৈতিক দল গঠন করে বেশ কিছু প্রতিবাদী নেতারা। এদের মধ্যে আছেন সন্তু লারমার ঘনিষ্ট সহকর্মী রূপায়ন দেওয়ান, তাতিন্দ্র লাল চাকমা পেলে, সুধাসিন্ধু খীসা, চন্দ্রশেখর চাকমা,শক্তিমান চাকমা প্রমূখ এবং তারা দলের নাম দেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এমএনলারমা)। এই বিভাজনে লাভ হয় ইউপিডিএফ এর যার নমুনা দেখা যাচ্ছে এবারকার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে - অনেক অঞ্চলে ইউপিডিএফ সমর্থিত প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছে।

বর্তমানে গতানুগতিক রাজনৈতিক দলগুলোর জনপ্রিয়তা একেবারে তলানীতে এসে ঠেকেছে। বিএনপি বরাবরই সেটেলার ভোটব্যাংক ভিত্তিক একটি দল, কাজেই ভবিষ্যতে তাদের ভোট পাবার চান্স কম। ভাড়াটে পাহাড়ী নেতা দিয়ে তারা এতদিন পার পেলেও যেহেতু তারা শান্তিচুক্তি ও সেনা প্রত্যাহারের বিরোধীতা (আওয়ামী লীগ একটি ব্রিগেড এবং ৩৫টি অস্থায়ী ক্যাম্প প্রত্যাহার করে ২০০৯ সালে এবং এর বিরুদ্ধে হাইকোর্টে পিটিশন করে তারা) করেছে সব সময়, তাদের আর গ্রহণযোগ্যতা নেই।

আওয়ামী লীগের গ্রহণযোগ্যতা এখন বিশ্বাস ঘাতকের পর্যায়ে। ২০০৮ ও ২০০৯ সালে পররাষ্ট্র মন্ত্রী দীপুমনি আদিবাসী দিবসে আদিবাসীদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে সংহতি প্রকাশ করেন। আর সেই তিনিই এবছর থেকে তিন পার্বত্য জেলার অধিবাসীদের আদিবাসী সম্বোধন করতে বারণ করেছেন এবং বলেছেন বাংলাদেশে কোন আদিবাসী নেই; বিভিন্ন উপজাতি আছে। তার এই অবস্থান পরিবর্তন বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের ফলশ্রুতিতে হয়েছে বলে রিপোর্টে বলা হয়েছে। আদিবাসী নিয়ে দেশী-বিদেশী যে বৃহত্তর রাজনীতি চলছে তা সামাল দিতেই যদি সরকারের এই পদক্ষেপ হয় তাহলে বলতে হয় এই পদক্ষেপটি চতুরতার সাথে নেয়া হয়নি। এই একটি ইস্যুকে পুজি করে পাহাড়ি বিচ্ছিন্নতাবাদীরা অনেককে তাদের চেতনায় সম্পৃক্ত করতে পেরেছে। পার্বত্য অঞ্চলে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ব্যর্থতা সম্পর্কে নতুন করে বলার নেই। জেলা-উপজেলা পর্যায়ের সকল নেতারাই ঠিকাদারিতে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। আগে উন্নয়ন কার্যক্রমের ৭০ ভাগ লোক পেত এখন পুরোটাই যায় তাদের পেটে। পাহাড়িরা তাদের কেন বিশ্বাস করবে?

পার্বত্য উপজেলাগুলোতে প্রাথমিক শিক্ষার হার ভাল। সরকারী স্কুল ছাড়াও ব্র্যাক ও অন্যান্য বেসরকারী স্কুল রয়েছে। আমি প্রচুর ছেলেমেয়েকে দেখেছি স্কুল ড্রেস পড়ে রাস্তায় হাটতে। কিন্তু উচ্চশিক্ষার হার কম - হাতে গোনা গুটিকয়েক কলেজ এবং কোন বিশ্ববিদ্যালয় নেই। এই অঞ্চলে নেই কোন বিশ্ববিদ্যালয় - প্রধানমন্ত্রী হাসিনা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘোষণা দিলেও পাহাড়িদের একপক্ষ এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। ফলে সেটি এখনও পরিকল্পনা পর্যায়েই আছে। পাহাড়িদের উচ্চশিক্ষার জন্যে তাই বাইরে যেতে হয়। আর উচ্চ শিক্ষিতদের চাকুরির উপায় কি? নেই কোন কলকারখানা, উল্লেখযোগ্য বেসরকারী বাণিজ্য। তাই একমাত্র কাজ মিলে এনজিও বা সাহায্য সংস্থার অফিসে।

এরপর রয়েছে সাহায্য সংস্থা/এনজিওর দৌরাত্ম্য। এই সব সংস্থায় উচ্চশিক্ষিত ইউপিডিএফ এর কর্মীরা অনায়াসে কাজ পাচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে ইএনডিপির ২০১৩ পর্যন্ত প্রকল্প রয়েছে হাজার কোটি টাকার। তাদের স্বাস্থ্য কর্মসূচি গুলো খুবই উপযোগী (এবং অকার্যকর সরকারী স্বাস্থ্য সেবার বিকল্প) কিন্তু উন্নয়ন কার্যক্রমের আওতায় বিভিন্ন কমিউনিটিকে তারা ৪ লাখ করে অনুদান দিচ্ছে যা রিপোর্ট মোতাবেক ইউপিডিএফ এর কর্মীরা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কাজে লাগাচ্ছে। ২০০৭ সাল থেকে ইউপিডিএফ সকল মাইক্রোক্রেডিট কার্যক্রম বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে ফলে কিছু পাহাড়ি কাজ কর্ম বাদ দিয়ে দানে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে এবং তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে লাগানো যাচ্ছে। 

অনেক এনজিওদের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ। মানবাধিকারের ইস্যুকে পুঁজি করে সব দোষ সরকারের ঘাড়ে, শান্তিচুক্তির উপর অথবা সুযোগ বুঝে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দিকে চাপিয়ে দিলেই কি সমস্যার সমাধান হয়ে যায়? পাহাড়ের সমস্যার শতভাগ বহিরাগত বা সেনাদের দ্বারা উদ্ভুত নয় আর পাহাড়ের রাজনীতিতেও বহিরাগতদের নিয়ন্ত্রণে নেই। সমীকরণটা ভিন্ন- দুর্নীতিতে পাহাড়ি নেতারাও পিছিয়ে নেই আর ইউপিডিএফ-জেএসএস এর সংঘাত অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতির অবনতি ঘটাচ্ছে। যেখানে ভূমি, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও শিক্ষার দিক থেকে বহিরাগতরা পিছিয়ে, সেখানে কিছুসংখ্যক ভূমি সন্ত্রাসীদের জন্যে এসব দরিদ্র মানুষকে ঢালাওভাবে রাজনৈতিক গিনিপিগ বানানো হচ্ছে। এটি হচ্ছে বিভাজনের রাজনীতি যা খেলছে সব পক্ষই।

এদেশ পাহাড়ি-বাঙ্গালি সবার। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিচ্ছিন্ন কোনো জনপদ নয় - একে গড়ে তুলতে হবে পাহাড়ি-বাঙ্গালি মিলেই। পাহাড়ি-বাঙ্গালি বা জাতি-উপজাতি কেন্দ্রিক বৈষম্য থাকা চলবে না। ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি করতে হবে, উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান, উন্নয়ন ইত্যাদি চালিয়ে যেতে হবে। পাহাড়িদের ন্যায়সঙ্গত দাবির প্রতি শ্রদ্ধা শান্তির নিশ্চয়তা দিতে পারে।  অথচ সেটা করার জন্যে একসাথে কাজ করার পূর্বশর্ত - পরস্পর বিশ্বাসটুকু হারিয়ে যাচ্ছে।

বর্তমান পরিস্থিতি খুবই নাজুক পরিস্থিতি। পাহাড়িরা শান্তি চুক্তিতে একটি ভুয়া প্রতিশ্রুতি ভাবছে। প্রতিনিয়তই নানা গুজব মানুষকে বিচলিত ও আতঙ্কিত করে। স্থানীয় সূত্রমতে আগামী যে কোন নির্বাচনে এলাকায় একচ্ছত্রভাবে পাহাড়িদের জয় হবে, ইতোমধ্যেই যার আলামত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে পাওয়া গিয়েছে। এখানে পুরো ১৯৭১ এর ফর্মুলার সাথে মিল পাওয়া যাচ্ছে। বহিরাগতদের অত্যাচার, মানবাধিকার লঙ্ঘন, পাহাড়িদের অধিকার আদায়ের লড়াই, আর নিজভূমে মেজরিটি (যেমন ১৯৭০ এর নির্বাচনে পশ্চিম পাকিস্তানী কোন দল জিততে পারেনি এ বঙ্গে) এই স্ক্রিপ্টটি মিলে যাচ্ছে। এর সমাধান বা তাদের আপন করার কোন পরিকল্পনা নেই সরকারের বা অন্যান্য রাজনৈতিক দলের। তারা আদিবাসী নামকরণ ইস্যুতে তাদের দুরে ঠেলে দিচ্ছে। তাদের ধারনা সেনাবাহিনীর বুলেটের নীচেই সব ঠিক থাকবে - এভাবে সেনাবাহিনীকেও সংঘর্ষের দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। এর পরিণতি কি হবে তা আমরা জানি।

ফলে পাহাড়িরা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের সাথে আমাদের দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। এই দূরত্ব ঘুচাতে এবং পাহাড়িদের অধিকার নিশ্চিত করতে আমরা সাধারণ মানুষেরা কি করতে পারি?

সচলায়তনে প্রকাশিত

Wednesday, June 22, 2011

গুগল অনুবাদ, হাস্যকর নয় মোটেই

বিশ্বের ৬০ কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ২৭.৩% হচ্ছে ইংরেজী ভাষী (সূত্র) আর ২২.৬% হচ্ছে চৈনিক ভাষী। অন্যান্য ভাষাভাষীরা অনেক পিছিয়ে (স্প্যানিশ ৭.৮%, জাপানী ৫%, পর্তুগীজ ৪.৩%, জার্মান ৩.৮%, আরবী ৩.৩%) - বাংলা, হিন্দিভাষী বিশাল জনগোষ্ঠী ইন্টারনেটে তাদের ভাষায় কথা বলে তুলনামূলকভাবে কম। রয়েছে আরও অসামঞ্জস্যতা - ৩১৩ বিলিয়ন ওয়েবপেইজের ৬৮.৪% ইংরেজী ভাষায় তার পরে মাত্র ৫.৯% জাপানি ভাষায় আর ৫.৮% জার্মান ভাষায় (সূত্র)। ২২.৬% চৈনিক ভাষী ব্যবহারকারী ওয়েব কন্টেন্টের মাত্র ৩.৯% তৈরি করে।



এই সব পরিসংখ্যান একটি কথা বলে - আমরা বিশ্বকে জানি বা দেখি ইংরেজী ভাষীদের দৃষ্টিতে - হবেই না কেন বিশ্বের ৬২.৫৫% সংবাদপত্র/ম্যাগাজিন, ২২% বই, ৪৫% জার্নাল, ৩৫% ছবি ও ভিডিও ইংরেজী ভাষায়। কিন্তু এটি একে অপরকে বোঝার ক্ষেত্রে সমস্যার সৃষ্টি করছে নানা স্টেরিওটাইপ তৈরির মাধ্যমে। আমরা ব্রাজিলের কোন ব্লগারের বক্তব্য জানতে পারব না যদি না কেউ অনুবাদ করে দেয় তার ব্লগ। তেমনি বাংলা ব্লগারের লেখা  একজন ব্রাজিলিয় পড়তে পারে না।

বিশ্ব সমাজকে এগিয়ে নিতে গেলে তাই অনুবাদ একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। অনুবাদের কার্যকরী টুলটি সেক্ষেত্রে একটি জরুরী উদ্ভাবন। কিন্তু বাস্তবিক ক্ষেত্রে মেশিন ট্রান্সলেশন কি পর্যায়ে আছে? এক ক্লিকে অনুবাদের ব্যবস্থাটি এখনও নিখুঁত নয়। তার চেয়ে বড় কথা হল মেশিন সব অনুবাদ করে দেবে এই ধারনাটি কম্পিউটার কবিতা লিখবে এরই সমার্থক।

অনুবাদ একটি শিল্প। একজন অনুবাদকের দুই ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা থাকা লাগে, পাঠকদের কথা চিন্তা করতে হয় - তবেই সে সঠিক অর্থ ফুটিয়ে তুলতে পারে। আমাদের অনেকেরই জানা নেই যে অনুবাদ একটি ১৮-২০ বিলিয়ন ডলার ইন্ডাস্ট্রি। বিশ্বাস হচ্ছে না? ছবির সাবটাইটেল একটি বড় অনুবাদের জায়গা। এরপর ধরুন ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অনেক প্রকাশনা নিয়ম অনুযায়ী সদস্য দেশগুলোর ২৩টি ভাষায় অনূদিত হয়। অনেক পেশাদারী অনুবাদের প্রতিষ্ঠান রয়েছে এসব ক্ষেত্রে কর্মরত। তাদের কাজের সুবিধার জন্যে নানা সফট্ওয়্যারের উদ্ভব হয়েছে - যেমন প্রোপাইটরী সিসট্রান, ট্রাডোস ইত্যাদি - বা ওপেন সোর্স - যেমন লিঙ্গোটেক, লুসি সফটওয়্যার, আপেরিটিয়াম ইত্যাদি। এইসব সফট্ওয়্যারের মূল মন্ত্র হচ্ছে একই বাক্যের অনুবাদ যাতে দুইবার না করতে হয়। সেজন্যে তারা সাহায্য নেয় ট্রান্সলেশন মেমোরির। মেশিন অনুবাদে যেই ভাষায় সবচেয়ে বেশী কন্টেন্ট পাওয়া যায় সেই ভাষায় অনুবাদ সবচেয়ে বোধগম্যভাবে হয়। কিন্তু এইসব ট্রান্সলেশন মেমোরি বিনামূল্যের নয় - বাজারে বিক্রি হয়। তবে যেই সফ্টওয়্যার ব্যবহার করা হোক মানুষ কর্তৃক মান নিয়ন্ত্রণই সফল বাণিজ্যিক অনুবাদের চাবিকাঠী।

অনুবাদকে তার ব্যয়বহুল ইন্ডাস্ট্রির কবল থেকে মুক্ত করে সার্বজনীন করার লক্ষ্যে ওপেন ট্রান্সলেশন ধারনার উদ্ভব ঘটে। এখানে ক্রাউড সোর্সিং এবং স্বেচ্ছাসেবী অনুবাদের মাধ্যমে মেশিন ট্রান্সলেশন টুলস ব্যবহার করা হয়। গুগলের ট্রান্সলেটর টুলকিট এমন একটি ওপেন ট্রান্সলেশন টুল যেখানে স্বেচ্ছাসেবীরা নিত্য নতুন অনুবাদ সৃষ্টি করে চলেছে এবং সবার জন্যে উন্মুক্ত ট্রান্সলেশন মেমোরি রিপোজিটরি তৈরি করছে।

টেড তাদের ভিডিও অনুবাদের জন্যে অর্ধ মিলিয়ন ডলার খরচ করেছে। তাদের পেশাদারী সংস্থা দিয়ে করা কিছু বাংলা অনুবাদ দেখে যারপরনাই বিরক্ত হয়েছিলাম এবং তাদের একজনকে বলেছিলাম গ্লোবাল ভয়েসেস বাংলা সংস্করণে   স্বেচ্ছাসেবীদের দ্বারা এর থেকে অনেক উঁচু মানের কাজ হয়। তাদের সমস্যা ছিল কাজটি বুঝে নিয়েছিল অবাঙ্গালী কেউ - তাই যা ইচ্ছা বুঝিয়ে দিয়েছিল অনুবাদ সংস্থা। টেড এর পরে কমিউনিটি বেইজড ওপেন ট্রান্সলেশন মডেল চালু করে যা সাফল্য পায়

বাংলা বা তামিলের মত বহু ব্যবহৃত ভাষার জন্যে কার্যকরী মেশিন ট্রান্সলেশন টুলস এতদিন তৈরি না হওয়ার পেছনে রয়েছে পর্যাপ্ত উদ্যোগ ও অর্থের অভাব - অনুবাদক ও অন্কুর এর মত গুটিকয়েক প্রকল্প বেশি দুর আগাতে পারেনি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে।  



এছাড়াও রয়েছে প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ - অনুবাদ কিন্তু শুধু শব্দের প্রতিস্থাপন নয় - রয়েছে ব্যাকরণ, বাক্যের গঠন, রুপক, বাগধারা ইত্যাদির প্রভাব। যেমন ধরুন দক্ষিণ এশীয় ভাষাগুলোতে বাক্যগুলো (subject-object-verb * আমি-ভাত-খাই) নিয়মে গঠিত হয় যেখানে ইংরেজীতে বাক্য গঠিত হয় (subject-verb-object * I eat rice) এই নিয়মে। এছাড়াও পর্যাপ্ত উন্মুক্ত কন্টেন্টের অভাব একটি বড় কারন ছিল। বিষয়টা ব্যাখ্যা করি। একটি মেশিন ট্রান্সলেশন টুলস তিনটি নিয়ম মেনে কাজ করতে পারে:

ক) রুলস বেইজড (ব্যাকরণের নিয়ম আর অভিধান)
খ) স্ট্যাটিস্টিকাল (দ্বিভাষী ট্রান্সলেশন মেমোরি বা করপাস নিয়ে কাজ করে) আর
গ) হাইব্রিড (উপরের দুয়ের সংমিশ্রণ)

গুগল প্রথম দিকে রুলস বেইজড প্রক্রিয়ায় অনুবাদ করলেও ২০০৭ সাল থেকে স্ট্যাটিসটিক্যাল মেথড চালু করে। এই প্রক্রিয়ায় বিশালাকার টেক্সট কর্পোরা এর দরকার হয়। এটি কার্যকরী করতে ন্যুনতম ২০ লাখ শব্দ নিয়ে কাজ করতে হয় এবং অনেক কম্পিউটিং শক্তি লাগে। এই প্রক্রিয়ার সুবিধা হল যে এটি অনুবাদকারীকে সুযোগ দেয় বেশ কিছু কাছাকাছি শব্দ থেকে বেছে নিতে।

[img]http://3.bp.blogspot.com/-aeV8jF52kRI/Tai2LKwMrEI/AAAAAAAAATk/2KLnTwuFBkE/s400/image00.png[/img]
  
এই পদ্ধতিতে আরেকটি সুযোগ আছে - ক্রমাগত অনুবাদের মান বৃদ্ধি করা। গুগল ব্লগ অনুযায়ী আপনি ভুল অনুবাদকে ঠিক করতে পারবেন অনায়াসেই এবং গুগল সেটি মনে রাখবে এবং পরবর্তী বার সঠিক অনুবাদ উপস্থাপন করবে।

কাজেই আমি মনে করি গুগল ট্রান্সলেইটে বাংলা ভাষাভাষীদের জন্যে একটি যুগান্তকারী টুল। এটি এযাবৎকালে পাওয়া যাওয়া একমাত্র টুল অনুবাদক অনলাইনের চেয়ে বহুগুণে সমৃদ্ধ। আর এখন বাংলা ভাষা থেকে বিশ্বের ৬২টি ভাষায় (ভুল হলেও) অনুবাদ সম্ভব - এর শক্তি নিশ্চয়ই অনুমেয়। আসুন ওপেন ট্রান্সলেশন ধারনা আপন করে গুগল ট্রান্সলেট এর ভুলগুলো নিজেরা শুদ্ধ করে দেই ভবিষ্যৎ কল্যাণের জন্যে অথবা  গুগল ট্রান্সলেটর টুলকিট ব্যবহার করে গুগলের ট্রান্সলেশন মেমরিকে সমৃদ্ধ করি।

ছবির জন্য কৃতজ্ঞতা: অনুবাদক, ইন্টারনেট ওয়ার্ল্ড স্ট্যাটস, গুগল ট্রান্সলেট।

বিবিধ রেফারেন্স:

ওপেন ট্রান্সলেশন টুলস ম্যানুয়াল
গুগল ট্রান্সলেট পাঁচটি উপমহাদেশীয় ভাষা যোগ করেছে
*  ওপেন ট্রান্সলেশন দিয়ে বিশ্বে পরিবর্তন আনা
*  Development of A Morphological analyser for Bengali
*  Bootstrapping of a rule based English-Bangla machine translation system using work done for a sister language - BRAC University Institutional Repository

সচলায়তনে প্রকাশিত