Saturday, October 15, 2011

পার্বত্য চট্টগ্রাম ও পাহাড়িরা কি দূরে সরে যাচ্ছে?



ছুটি এলেই মনটা পালাই পালাই করে কিন্তু আলস্যের কারনে কোথাও যাওয়া হয়না। এবার পুজোর ছুটিতে আড়মোড়া ভেঙ্গে সপরিবারে খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটি বেরিয়ে এলাম। আমার জন্যে ব্যাপারটি ছিল উত্তেজনাকর, কারন হিল্লি দিল্লি করার সুযোগ হলেও দেখা হয়নি চক্ষু মেলিয়া দেশের ভেতরের এই সবুজ ও নীলের পাহাড়-হ্রদের মেলা।

এ অঞ্চলের সৌন্দর্য নিয়ে নতুন কিছু বলার নেই (ছবি দ্রষ্টব্য:  রাঙ্গামাটি , খাগড়াছড়ি, বান্দরবান )। আমাদের সফরসঙ্গী পরিবারের কর্তাটি বললেন দেখুন এইরকম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে মানুষ অনেক পয়সা খরচ করে বিদেশে যায়। তবে বাস্তব হচ্ছে যে পার্বত্য চট্টগ্রাম দিনে দিনে তার রুপ হারাচ্ছে। পর্যটন ও বসতি বাড়ার সাথে পাহাড় কেটে বানানো হচ্ছে বাড়িঘর, হোটেল-রিসোর্ট। বাশ ও সেগুন গাছের গুড়ি ভর্তি সারি সারি ট্রাক তো নিজ চোখেই দেখলাম রাস্তায়। পাহাড় থেকে খাদ্যাভাবে জনপদে নেমে আসে হাতির পাল এমন শুনেছি, কাপ্তাই লেকে আর আগের মত মাছ পাওয়া যায় না। হায় কে কার খবর রাখে।

সত্যিই এগুলো খবর হয় না। খবর হয় না যখন সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদীরা পাহাড়ি-বাঙ্গালী নির্বিশেষে চাঁদা তোলে বা অপহরণ করে, পাহাড়ি-বাঙ্গালী উভয়ের উপর হামলা করে। খবর হয়না যখন পাহাড়িদের জীবন, বসতি নিয়ে রাজনীতি করে জ্ঞানপাপী মানুষ আর তাদের এতটুকু মাথা গোঁজার ঠাই কেড়ে নেয়। খবর হয় না যখন আইন শৃঙ্খলা বাহিনী (বিশেষ করে পুলিশ) টাকার জন্যে নিপীড়িতের পাশে না এসে নির্যাতনকারীর পাশে এসে দাড়ায়। খবর হয় না যখন কল্পনা চাকমারা হারিয়ে যায়। খবর হয়না যখন খাগড়াছড়ির ১৯২টি কাজের বিনিময়ে খাদ্য প্রকল্পের শতভাগ টাকা মেরে দেয় রাজনৈতিক নেতারা যার মধ্যে অধিকাংশই পাহাড়ি। নিজেদের রক্ত নিজেরাই খেয়ে কুমীর বনে যায় (উদাহরণ: ইউনিপের নামে ৩০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে উদ্দীপন চাকমা )।

খবর হয় যখন দেয়ালে পিঠ ঠেকা মানুষ রুখে দাড়ায় এবং নিজের হাতে আইন তুলে নেয়। খবর হয় যখন শান্তিরক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত বাহিনী দুপক্ষের মধ্যে এসে দাড়ায় এবং লোক মারা যায়। খবর হয় যখন পাহাড়ি দুইপক্ষ নিজেদের রক্তে গা ভাসায় আর নিরীহ জনগনকে ত্রাসের রাজ্যে রাখে। খবর হয় যখন আদিবাসী নামকরণ নিয়ে সরকারের মনোভাব প্রতিষ্ঠায় অদ্ভুত সব যুক্তি দেখানো হয়।

এসবের মাঝে একটি জিনিষ আমরা ভুলে যাচ্ছি - তিন পার্বত্য জেলার ১৪টি উপজাতির মনে কি খেলা করছে। এই মূহুর্তে তারা আর বাঙ্গালী দের বিশ্বাস করছে না, এই মূহুর্তে তারা নিজেদের দেশের ভেতরে অবাঞ্ছিত ভাবছে। সংবিধানে আদিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে ডাকা বিক্ষোভে দুর্গম অঞ্চল থেকে চার ঘন্টা হেটে বর্ষীয়ান পাহাড়ি যোগ দিয়েছেন। তাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। এরপর হয়ত শান্তিচুক্তি রদ হয়ে আবার সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু হবে। কিন্তু এমন তো কথা ছিল না।

১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু পার্বত্য চট্টগ্রামে গিয়েছিলেন এবং মানবেন্দ্র লারমা স্বায়ত্তশাসন সহ বিভিন্ন উপজাতির দাবী তুলে ধরলে তিনি বলেন "তোরা সব বাঙ্গালী হইয়া যা"। ১৯৭৩ সালে সংসদের কাছে তার আহ্বানেও সাড়া দেওয়া হয় না। ফলশ্রুতিতে ১৯৭৪ সালে এম এন লারমা জনসংহতি সমিতির একটি সশস্ত্র গ্রুপ গঠন করেন, যা পরে শান্তিবাহিনী নামে পরিচিতি লাভ করে এবং পরে তারা অত্র অঞ্চলে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। ১৯৮১ সালে শান্তিবাহিনী দ্বিধাবিভক্ত হয় এবং ১৯৮৩ সালে বিপক্ষ দলের হাতে মানবেন্দ্র মারা যান। তবে তার অনুজ সন্তু লারমার নেতৃত্বে শান্তিবাহিনী গেরিলা যুদ্ধ অব্যহত রাখে। জিয়া এবং এরশাদ সরকারের আমলে শান্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযান চালায় সেনাবাহিনী এবং আশির দশকে উপজাতিদের উপর নির্লজ্জ্ব হত্যাকান্ড চালানো হয়। কোন সরকারের আমলেই এইসব হত্যাকান্ডের বিচার হয়নি। এছাড়া গ্রেপ্তার, নির্যাতন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, মানবাধিকার কর্মীদের হেনস্থা করা, যৌন নিপীড়ন প্রভৃতি মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে নিয়মিতই। সাথে সাথে শান্তিবাহিনীরও অনুরূপ মানবাধিকার লংঘনের মূল্য দিতে হয়েছে পাহাড়ি-বাঙ্গালি উভয়কেই।

এরশাদের আমলে ১৯৮২-৮৩ সালে ২৬ হাজারের ও বেশী ছিন্নমূল ও ভাঙ্গনের ফলে উদ্বাস্তু পরিবারকে চট্টগ্রামের তিন পার্বত্য জেলায় পুনর্বাসনের জন্যে নিয়ে আসা হয়। তাদের মধ্যে  প্রায় ২০ হাজারেরও বেশি পরিবারের স্থান হয় খাগড়াছড়িতে।  আশির দশকের শেষের দিকে তাদের উপর ‘শান্তিবাহিনী’র হামলার ঘটনা বাড়তে থাকলে সেখান থেকে লোকজনকে সেনাক্যাম্প সংলগ্ন ৮১টি গুচ্ছগ্রামে স্থানান্তর করা হয়।

১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর সম্পাদিত আওয়ামী লীগের শান্তিচুক্তি নিশ্চয়ই এই অবস্থা থেকে উত্তরণের একটি বলিষ্ঠ পদক্ষেপ। এ অবস্থায় আনতে কি পরিমান রাজনৈতিক গণসংযোগ করতে হয়েছে তা অনুমেয়। শান্তিচুক্তির পর তিন পর্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সেনা প্রত্যাহার করা হয়েছে। আশির দশকের তুলনায় বর্তমানে অর্ধেকের কম সেনাক্যাম্প পার্বত্য চট্টগ্রামে রয়েছে। বর্তমানে যা হচ্ছে তাতে উল্টোস্রোত দেখা যাচ্ছে আর সরকারেরও মাথা ব্যাথা নেই।

শান্তিচুক্তি অনুযায়ী ১৯৯৮ সালের ফেব্রুয়ারীতে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) এর প্রায় দুই হাজার সশস্ত্র সদস্য স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে। তবে প্রসিত বিকাশ খীসার নেতৃত্বে একটি দল চুক্তি মানতে অপারগতা প্রকাশ করে এবং পূর্ণ স্বায়ত্বশাসনের দাবীতে ১৯৯৮ সালে গঠন করে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। এই বিভাজন অবশ্য জেএসএসকে দমাতে পারেনি এবং তারা দাপটেই কার্যক্রম চালিয়েছে খাগড়াছড়ি অঞ্চল ছাড়া যেখানে বেশীরভাগ অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ ছিল ইউপিডিএফ এর। কিন্তু ২০০৬ সালের জরুরী সরকারের সময় সন্তু লারমার একক নেতৃত্ব থেকে দল বাঁচাতে সংস্কারের দাবীতে জনসংহতি থেকে বেরিয়ে গিয়ে নতুন আরেকটি রাজনৈতিক দল গঠন করে বেশ কিছু প্রতিবাদী নেতারা। এদের মধ্যে আছেন সন্তু লারমার ঘনিষ্ট সহকর্মী রূপায়ন দেওয়ান, তাতিন্দ্র লাল চাকমা পেলে, সুধাসিন্ধু খীসা, চন্দ্রশেখর চাকমা,শক্তিমান চাকমা প্রমূখ এবং তারা দলের নাম দেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এমএনলারমা)। এই বিভাজনে লাভ হয় ইউপিডিএফ এর যার নমুনা দেখা যাচ্ছে এবারকার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে - অনেক অঞ্চলে ইউপিডিএফ সমর্থিত প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছে।

বর্তমানে গতানুগতিক রাজনৈতিক দলগুলোর জনপ্রিয়তা একেবারে তলানীতে এসে ঠেকেছে। বিএনপি বরাবরই সেটেলার ভোটব্যাংক ভিত্তিক একটি দল, কাজেই ভবিষ্যতে তাদের ভোট পাবার চান্স কম। ভাড়াটে পাহাড়ী নেতা দিয়ে তারা এতদিন পার পেলেও যেহেতু তারা শান্তিচুক্তি ও সেনা প্রত্যাহারের বিরোধীতা (আওয়ামী লীগ একটি ব্রিগেড এবং ৩৫টি অস্থায়ী ক্যাম্প প্রত্যাহার করে ২০০৯ সালে এবং এর বিরুদ্ধে হাইকোর্টে পিটিশন করে তারা) করেছে সব সময়, তাদের আর গ্রহণযোগ্যতা নেই।

আওয়ামী লীগের গ্রহণযোগ্যতা এখন বিশ্বাস ঘাতকের পর্যায়ে। ২০০৮ ও ২০০৯ সালে পররাষ্ট্র মন্ত্রী দীপুমনি আদিবাসী দিবসে আদিবাসীদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে সংহতি প্রকাশ করেন। আর সেই তিনিই এবছর থেকে তিন পার্বত্য জেলার অধিবাসীদের আদিবাসী সম্বোধন করতে বারণ করেছেন এবং বলেছেন বাংলাদেশে কোন আদিবাসী নেই; বিভিন্ন উপজাতি আছে। তার এই অবস্থান পরিবর্তন বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের ফলশ্রুতিতে হয়েছে বলে রিপোর্টে বলা হয়েছে। আদিবাসী নিয়ে দেশী-বিদেশী যে বৃহত্তর রাজনীতি চলছে তা সামাল দিতেই যদি সরকারের এই পদক্ষেপ হয় তাহলে বলতে হয় এই পদক্ষেপটি চতুরতার সাথে নেয়া হয়নি। এই একটি ইস্যুকে পুজি করে পাহাড়ি বিচ্ছিন্নতাবাদীরা অনেককে তাদের চেতনায় সম্পৃক্ত করতে পেরেছে। পার্বত্য অঞ্চলে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ব্যর্থতা সম্পর্কে নতুন করে বলার নেই। জেলা-উপজেলা পর্যায়ের সকল নেতারাই ঠিকাদারিতে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। আগে উন্নয়ন কার্যক্রমের ৭০ ভাগ লোক পেত এখন পুরোটাই যায় তাদের পেটে। পাহাড়িরা তাদের কেন বিশ্বাস করবে?

পার্বত্য উপজেলাগুলোতে প্রাথমিক শিক্ষার হার ভাল। সরকারী স্কুল ছাড়াও ব্র্যাক ও অন্যান্য বেসরকারী স্কুল রয়েছে। আমি প্রচুর ছেলেমেয়েকে দেখেছি স্কুল ড্রেস পড়ে রাস্তায় হাটতে। কিন্তু উচ্চশিক্ষার হার কম - হাতে গোনা গুটিকয়েক কলেজ এবং কোন বিশ্ববিদ্যালয় নেই। এই অঞ্চলে নেই কোন বিশ্ববিদ্যালয় - প্রধানমন্ত্রী হাসিনা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘোষণা দিলেও পাহাড়িদের একপক্ষ এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। ফলে সেটি এখনও পরিকল্পনা পর্যায়েই আছে। পাহাড়িদের উচ্চশিক্ষার জন্যে তাই বাইরে যেতে হয়। আর উচ্চ শিক্ষিতদের চাকুরির উপায় কি? নেই কোন কলকারখানা, উল্লেখযোগ্য বেসরকারী বাণিজ্য। তাই একমাত্র কাজ মিলে এনজিও বা সাহায্য সংস্থার অফিসে।

এরপর রয়েছে সাহায্য সংস্থা/এনজিওর দৌরাত্ম্য। এই সব সংস্থায় উচ্চশিক্ষিত ইউপিডিএফ এর কর্মীরা অনায়াসে কাজ পাচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে ইএনডিপির ২০১৩ পর্যন্ত প্রকল্প রয়েছে হাজার কোটি টাকার। তাদের স্বাস্থ্য কর্মসূচি গুলো খুবই উপযোগী (এবং অকার্যকর সরকারী স্বাস্থ্য সেবার বিকল্প) কিন্তু উন্নয়ন কার্যক্রমের আওতায় বিভিন্ন কমিউনিটিকে তারা ৪ লাখ করে অনুদান দিচ্ছে যা রিপোর্ট মোতাবেক ইউপিডিএফ এর কর্মীরা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কাজে লাগাচ্ছে। ২০০৭ সাল থেকে ইউপিডিএফ সকল মাইক্রোক্রেডিট কার্যক্রম বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে ফলে কিছু পাহাড়ি কাজ কর্ম বাদ দিয়ে দানে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে এবং তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে লাগানো যাচ্ছে। 

অনেক এনজিওদের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ। মানবাধিকারের ইস্যুকে পুঁজি করে সব দোষ সরকারের ঘাড়ে, শান্তিচুক্তির উপর অথবা সুযোগ বুঝে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দিকে চাপিয়ে দিলেই কি সমস্যার সমাধান হয়ে যায়? পাহাড়ের সমস্যার শতভাগ বহিরাগত বা সেনাদের দ্বারা উদ্ভুত নয় আর পাহাড়ের রাজনীতিতেও বহিরাগতদের নিয়ন্ত্রণে নেই। সমীকরণটা ভিন্ন- দুর্নীতিতে পাহাড়ি নেতারাও পিছিয়ে নেই আর ইউপিডিএফ-জেএসএস এর সংঘাত অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতির অবনতি ঘটাচ্ছে। যেখানে ভূমি, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও শিক্ষার দিক থেকে বহিরাগতরা পিছিয়ে, সেখানে কিছুসংখ্যক ভূমি সন্ত্রাসীদের জন্যে এসব দরিদ্র মানুষকে ঢালাওভাবে রাজনৈতিক গিনিপিগ বানানো হচ্ছে। এটি হচ্ছে বিভাজনের রাজনীতি যা খেলছে সব পক্ষই।

এদেশ পাহাড়ি-বাঙ্গালি সবার। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিচ্ছিন্ন কোনো জনপদ নয় - একে গড়ে তুলতে হবে পাহাড়ি-বাঙ্গালি মিলেই। পাহাড়ি-বাঙ্গালি বা জাতি-উপজাতি কেন্দ্রিক বৈষম্য থাকা চলবে না। ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি করতে হবে, উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান, উন্নয়ন ইত্যাদি চালিয়ে যেতে হবে। পাহাড়িদের ন্যায়সঙ্গত দাবির প্রতি শ্রদ্ধা শান্তির নিশ্চয়তা দিতে পারে।  অথচ সেটা করার জন্যে একসাথে কাজ করার পূর্বশর্ত - পরস্পর বিশ্বাসটুকু হারিয়ে যাচ্ছে।

বর্তমান পরিস্থিতি খুবই নাজুক পরিস্থিতি। পাহাড়িরা শান্তি চুক্তিতে একটি ভুয়া প্রতিশ্রুতি ভাবছে। প্রতিনিয়তই নানা গুজব মানুষকে বিচলিত ও আতঙ্কিত করে। স্থানীয় সূত্রমতে আগামী যে কোন নির্বাচনে এলাকায় একচ্ছত্রভাবে পাহাড়িদের জয় হবে, ইতোমধ্যেই যার আলামত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে পাওয়া গিয়েছে। এখানে পুরো ১৯৭১ এর ফর্মুলার সাথে মিল পাওয়া যাচ্ছে। বহিরাগতদের অত্যাচার, মানবাধিকার লঙ্ঘন, পাহাড়িদের অধিকার আদায়ের লড়াই, আর নিজভূমে মেজরিটি (যেমন ১৯৭০ এর নির্বাচনে পশ্চিম পাকিস্তানী কোন দল জিততে পারেনি এ বঙ্গে) এই স্ক্রিপ্টটি মিলে যাচ্ছে। এর সমাধান বা তাদের আপন করার কোন পরিকল্পনা নেই সরকারের বা অন্যান্য রাজনৈতিক দলের। তারা আদিবাসী নামকরণ ইস্যুতে তাদের দুরে ঠেলে দিচ্ছে। তাদের ধারনা সেনাবাহিনীর বুলেটের নীচেই সব ঠিক থাকবে - এভাবে সেনাবাহিনীকেও সংঘর্ষের দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। এর পরিণতি কি হবে তা আমরা জানি।

ফলে পাহাড়িরা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের সাথে আমাদের দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। এই দূরত্ব ঘুচাতে এবং পাহাড়িদের অধিকার নিশ্চিত করতে আমরা সাধারণ মানুষেরা কি করতে পারি?

সচলায়তনে প্রকাশিত

Wednesday, June 22, 2011

গুগল অনুবাদ, হাস্যকর নয় মোটেই

বিশ্বের ৬০ কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ২৭.৩% হচ্ছে ইংরেজী ভাষী (সূত্র) আর ২২.৬% হচ্ছে চৈনিক ভাষী। অন্যান্য ভাষাভাষীরা অনেক পিছিয়ে (স্প্যানিশ ৭.৮%, জাপানী ৫%, পর্তুগীজ ৪.৩%, জার্মান ৩.৮%, আরবী ৩.৩%) - বাংলা, হিন্দিভাষী বিশাল জনগোষ্ঠী ইন্টারনেটে তাদের ভাষায় কথা বলে তুলনামূলকভাবে কম। রয়েছে আরও অসামঞ্জস্যতা - ৩১৩ বিলিয়ন ওয়েবপেইজের ৬৮.৪% ইংরেজী ভাষায় তার পরে মাত্র ৫.৯% জাপানি ভাষায় আর ৫.৮% জার্মান ভাষায় (সূত্র)। ২২.৬% চৈনিক ভাষী ব্যবহারকারী ওয়েব কন্টেন্টের মাত্র ৩.৯% তৈরি করে।



এই সব পরিসংখ্যান একটি কথা বলে - আমরা বিশ্বকে জানি বা দেখি ইংরেজী ভাষীদের দৃষ্টিতে - হবেই না কেন বিশ্বের ৬২.৫৫% সংবাদপত্র/ম্যাগাজিন, ২২% বই, ৪৫% জার্নাল, ৩৫% ছবি ও ভিডিও ইংরেজী ভাষায়। কিন্তু এটি একে অপরকে বোঝার ক্ষেত্রে সমস্যার সৃষ্টি করছে নানা স্টেরিওটাইপ তৈরির মাধ্যমে। আমরা ব্রাজিলের কোন ব্লগারের বক্তব্য জানতে পারব না যদি না কেউ অনুবাদ করে দেয় তার ব্লগ। তেমনি বাংলা ব্লগারের লেখা  একজন ব্রাজিলিয় পড়তে পারে না।

বিশ্ব সমাজকে এগিয়ে নিতে গেলে তাই অনুবাদ একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। অনুবাদের কার্যকরী টুলটি সেক্ষেত্রে একটি জরুরী উদ্ভাবন। কিন্তু বাস্তবিক ক্ষেত্রে মেশিন ট্রান্সলেশন কি পর্যায়ে আছে? এক ক্লিকে অনুবাদের ব্যবস্থাটি এখনও নিখুঁত নয়। তার চেয়ে বড় কথা হল মেশিন সব অনুবাদ করে দেবে এই ধারনাটি কম্পিউটার কবিতা লিখবে এরই সমার্থক।

অনুবাদ একটি শিল্প। একজন অনুবাদকের দুই ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা থাকা লাগে, পাঠকদের কথা চিন্তা করতে হয় - তবেই সে সঠিক অর্থ ফুটিয়ে তুলতে পারে। আমাদের অনেকেরই জানা নেই যে অনুবাদ একটি ১৮-২০ বিলিয়ন ডলার ইন্ডাস্ট্রি। বিশ্বাস হচ্ছে না? ছবির সাবটাইটেল একটি বড় অনুবাদের জায়গা। এরপর ধরুন ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অনেক প্রকাশনা নিয়ম অনুযায়ী সদস্য দেশগুলোর ২৩টি ভাষায় অনূদিত হয়। অনেক পেশাদারী অনুবাদের প্রতিষ্ঠান রয়েছে এসব ক্ষেত্রে কর্মরত। তাদের কাজের সুবিধার জন্যে নানা সফট্ওয়্যারের উদ্ভব হয়েছে - যেমন প্রোপাইটরী সিসট্রান, ট্রাডোস ইত্যাদি - বা ওপেন সোর্স - যেমন লিঙ্গোটেক, লুসি সফটওয়্যার, আপেরিটিয়াম ইত্যাদি। এইসব সফট্ওয়্যারের মূল মন্ত্র হচ্ছে একই বাক্যের অনুবাদ যাতে দুইবার না করতে হয়। সেজন্যে তারা সাহায্য নেয় ট্রান্সলেশন মেমোরির। মেশিন অনুবাদে যেই ভাষায় সবচেয়ে বেশী কন্টেন্ট পাওয়া যায় সেই ভাষায় অনুবাদ সবচেয়ে বোধগম্যভাবে হয়। কিন্তু এইসব ট্রান্সলেশন মেমোরি বিনামূল্যের নয় - বাজারে বিক্রি হয়। তবে যেই সফ্টওয়্যার ব্যবহার করা হোক মানুষ কর্তৃক মান নিয়ন্ত্রণই সফল বাণিজ্যিক অনুবাদের চাবিকাঠী।

অনুবাদকে তার ব্যয়বহুল ইন্ডাস্ট্রির কবল থেকে মুক্ত করে সার্বজনীন করার লক্ষ্যে ওপেন ট্রান্সলেশন ধারনার উদ্ভব ঘটে। এখানে ক্রাউড সোর্সিং এবং স্বেচ্ছাসেবী অনুবাদের মাধ্যমে মেশিন ট্রান্সলেশন টুলস ব্যবহার করা হয়। গুগলের ট্রান্সলেটর টুলকিট এমন একটি ওপেন ট্রান্সলেশন টুল যেখানে স্বেচ্ছাসেবীরা নিত্য নতুন অনুবাদ সৃষ্টি করে চলেছে এবং সবার জন্যে উন্মুক্ত ট্রান্সলেশন মেমোরি রিপোজিটরি তৈরি করছে।

টেড তাদের ভিডিও অনুবাদের জন্যে অর্ধ মিলিয়ন ডলার খরচ করেছে। তাদের পেশাদারী সংস্থা দিয়ে করা কিছু বাংলা অনুবাদ দেখে যারপরনাই বিরক্ত হয়েছিলাম এবং তাদের একজনকে বলেছিলাম গ্লোবাল ভয়েসেস বাংলা সংস্করণে   স্বেচ্ছাসেবীদের দ্বারা এর থেকে অনেক উঁচু মানের কাজ হয়। তাদের সমস্যা ছিল কাজটি বুঝে নিয়েছিল অবাঙ্গালী কেউ - তাই যা ইচ্ছা বুঝিয়ে দিয়েছিল অনুবাদ সংস্থা। টেড এর পরে কমিউনিটি বেইজড ওপেন ট্রান্সলেশন মডেল চালু করে যা সাফল্য পায়

বাংলা বা তামিলের মত বহু ব্যবহৃত ভাষার জন্যে কার্যকরী মেশিন ট্রান্সলেশন টুলস এতদিন তৈরি না হওয়ার পেছনে রয়েছে পর্যাপ্ত উদ্যোগ ও অর্থের অভাব - অনুবাদক ও অন্কুর এর মত গুটিকয়েক প্রকল্প বেশি দুর আগাতে পারেনি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে।  



এছাড়াও রয়েছে প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ - অনুবাদ কিন্তু শুধু শব্দের প্রতিস্থাপন নয় - রয়েছে ব্যাকরণ, বাক্যের গঠন, রুপক, বাগধারা ইত্যাদির প্রভাব। যেমন ধরুন দক্ষিণ এশীয় ভাষাগুলোতে বাক্যগুলো (subject-object-verb * আমি-ভাত-খাই) নিয়মে গঠিত হয় যেখানে ইংরেজীতে বাক্য গঠিত হয় (subject-verb-object * I eat rice) এই নিয়মে। এছাড়াও পর্যাপ্ত উন্মুক্ত কন্টেন্টের অভাব একটি বড় কারন ছিল। বিষয়টা ব্যাখ্যা করি। একটি মেশিন ট্রান্সলেশন টুলস তিনটি নিয়ম মেনে কাজ করতে পারে:

ক) রুলস বেইজড (ব্যাকরণের নিয়ম আর অভিধান)
খ) স্ট্যাটিস্টিকাল (দ্বিভাষী ট্রান্সলেশন মেমোরি বা করপাস নিয়ে কাজ করে) আর
গ) হাইব্রিড (উপরের দুয়ের সংমিশ্রণ)

গুগল প্রথম দিকে রুলস বেইজড প্রক্রিয়ায় অনুবাদ করলেও ২০০৭ সাল থেকে স্ট্যাটিসটিক্যাল মেথড চালু করে। এই প্রক্রিয়ায় বিশালাকার টেক্সট কর্পোরা এর দরকার হয়। এটি কার্যকরী করতে ন্যুনতম ২০ লাখ শব্দ নিয়ে কাজ করতে হয় এবং অনেক কম্পিউটিং শক্তি লাগে। এই প্রক্রিয়ার সুবিধা হল যে এটি অনুবাদকারীকে সুযোগ দেয় বেশ কিছু কাছাকাছি শব্দ থেকে বেছে নিতে।

[img]http://3.bp.blogspot.com/-aeV8jF52kRI/Tai2LKwMrEI/AAAAAAAAATk/2KLnTwuFBkE/s400/image00.png[/img]
  
এই পদ্ধতিতে আরেকটি সুযোগ আছে - ক্রমাগত অনুবাদের মান বৃদ্ধি করা। গুগল ব্লগ অনুযায়ী আপনি ভুল অনুবাদকে ঠিক করতে পারবেন অনায়াসেই এবং গুগল সেটি মনে রাখবে এবং পরবর্তী বার সঠিক অনুবাদ উপস্থাপন করবে।

কাজেই আমি মনে করি গুগল ট্রান্সলেইটে বাংলা ভাষাভাষীদের জন্যে একটি যুগান্তকারী টুল। এটি এযাবৎকালে পাওয়া যাওয়া একমাত্র টুল অনুবাদক অনলাইনের চেয়ে বহুগুণে সমৃদ্ধ। আর এখন বাংলা ভাষা থেকে বিশ্বের ৬২টি ভাষায় (ভুল হলেও) অনুবাদ সম্ভব - এর শক্তি নিশ্চয়ই অনুমেয়। আসুন ওপেন ট্রান্সলেশন ধারনা আপন করে গুগল ট্রান্সলেট এর ভুলগুলো নিজেরা শুদ্ধ করে দেই ভবিষ্যৎ কল্যাণের জন্যে অথবা  গুগল ট্রান্সলেটর টুলকিট ব্যবহার করে গুগলের ট্রান্সলেশন মেমরিকে সমৃদ্ধ করি।

ছবির জন্য কৃতজ্ঞতা: অনুবাদক, ইন্টারনেট ওয়ার্ল্ড স্ট্যাটস, গুগল ট্রান্সলেট।

বিবিধ রেফারেন্স:

ওপেন ট্রান্সলেশন টুলস ম্যানুয়াল
গুগল ট্রান্সলেট পাঁচটি উপমহাদেশীয় ভাষা যোগ করেছে
*  ওপেন ট্রান্সলেশন দিয়ে বিশ্বে পরিবর্তন আনা
*  Development of A Morphological analyser for Bengali
*  Bootstrapping of a rule based English-Bangla machine translation system using work done for a sister language - BRAC University Institutional Repository

সচলায়তনে প্রকাশিত

Tuesday, May 24, 2011

স্বাস্থ্যই সকল ব্যবসার মূল

ঢাকায় সচলায়তনের প্রাণভোমরা নজরুল দম্পতির সৌজন্যেই বেশীর ভাগ সচলাড্ডা হয়। এই প্রথা ভাঙ্গতেই সিদ্ধান্ত নিলাম ৯ই মে আমার বাসায় একটি ছোটখাট আড্ডা জমাব সচলদের নিয়ে। সব প্রস্তুতি শেষ করতে করতে পারিবারিক এক অসুস্থতা বাগড়া বসাল। আমার শাশুড়ি সপ্তাহ দুই ধরে খাবারে রুচি হচ্ছিল না বলে খুব দুর্বল হয়ে পড়ায় বিভিন্ন ডাক্তার দেখানোর পর শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হল যে ওনাকে স্কয়্যার হাসপাতালে এক পাকস্থলীর চিকিৎসকের তত্বাবধানে ভর্তি করা হবে। সেই মোতাবেক ৮ই মে সকালে তাকে ভর্তি করানোর জন্যে উদ্যোগ নিলে বলা হল বিকেল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে সিটের জন্যে। সেদিন সকালে ভর্তি হলে হয়ত গল্পটি অন্যরকম হত।

কিন্তু বিধাতা আমাদের জন্যে অনেক অভিজ্ঞতা জমা করে রেখেছিলেন।

সেদিনই তিনি গোসল করতে গিয়ে বাথরুমে পড়ে যান এবং তার পা ভাঙ্গে ও মাথা ফেটে যায়। এর পর গত দুই সপ্তাহেরও বেশী ধরে তিনটি হাসপাতাল ও গণ্ডা দুয়েক বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সাথে বোঝাপড়া করে যে অভিজ্ঞতা হল তাতে বাংলাদেশের ব্যক্তিমালিকানাধীন স্বাস্থ্য সেবার চিত্র সম্পর্কে একটি ধারনা পাওয়া যায়।

অ্যাম্বুলেন্স পর্ব:

আমরা প্রথমে বুঝতে পারিনি যে ওনার পা ভেঙ্গেছে - কিন্তু প্রচণ্ড ব্যাথায় উনি দাড়াতে পারছিলেন না বা পা ভাঁজ করতে পারছিলেন না। তাই অ্যাম্বুলেন্স ডাকার সিদ্ধান্ত হয়। স্কয়্যারের ইমার্জেন্সির নাম্বারটিতে অনেক চেষ্টা করেও না পাওয়ায় কয়েকশ গজ দুরের হোটেল থেকে রুপান্তরিত হাসপাতালটিতে গেলাম। সামনে গোটা চারেক অ্যাম্বুলেন্স দাড়িয়ে থাকতে দেখে উদ্বেগ কমল। অ্যাম্বুলেন্স চাইতেই বলল কোথা থেকে আসবেন।

: কাছেই বাসা - তবে আমরা স্কয়্যারে নিয়ে যাব।
: না আমাদের হাসপাতালে না আনলে আমরা অ্যাম্বুলেন্স দেব না।
: আমি তো ভাড়া দেব।
: এই অ্যাম্বুলেন্স আমাদের নিজস্ব ব্যবহারের জন্যে।

সময় চলে যাচ্ছে দেখে বাড়ি ফিরে একটি গাড়ির পেছনের সিটে লম্বা করে শুইয়ে ওনাকে নিয়ে গেলাম।

কেবিন পর্ব:

ওনাকে ইমার্জেন্সিতে নিয়ে যাবার পর জানা গেল যে কোমরের নীচ থেকে তার পা ভেঙ্গেছে - তবে মাথার আঘাতটি গুরুতর নয়। মাথায় চারটে সেলাই আর পায়ে ট্র্যাকশন ব্যান্ডেজ দিয়ে ছেড়ে দেবার আগে ইমার্জেন্সীর ডাক্তাররা বুদ্ধি দিলেন দ্রুত একটি সিট যোগাড় করতে - কারন ওনার পায়ের অপারেশন লাগবে আর অনেকদিন থাকতে হবে। তদবির কালচারে গা ভাসিয়ে ততক্ষণে আমরা বরাদ্দ পেলাম উচ্চমূল্যের একটি ডিলাক্স কেবিন। আমাদের সৌভাগ্য যে মাথা গোঁজার ঠাই পেয়েছিলাম কারন পরবর্তী কয়েক দিন অবস্থানের সময়ও আমাদের কাঙ্খিত সাধারণ কেবিনের দেখা মেলে নি।

নার্স পর্ব:

স্কয়্যার হাসপাতাল প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে উন্নত ও প্রফেশনাল একটি হাসপাতাল। কিন্তু বাঙ্গালীরা সেবা ক্ষেত্রে অতটা প্রফেশনাল না এটা প্রমাণ করতে সেরকম কিছু নার্স জুটল আমাদের কপালে।

১) : একটি বাটি দিন রুগী বমি করবে

: (রুগীর জন্যে আনা খাবারের ঢাকনা উপুর করে) এটাতেই করুন এখন - বমির বোল এই ফ্লোরে আর নাই।

২) :  রুগীর শরীর খারাপ লাগছে - একটু মাথাটা মুছিয়ে দিন না কাইন্ডলি।

:  আপনারাই মুছিয়ে দেন - আমার ডিউটি শেষ এখন।

৩) ইমার্জেন্সী বাটন টেপার পাঁচ মিনিট পরেও নার্সের দেখা না পেয়ে তাকে ডাকতে গেলে

: আপনারা এত দেরী করছেন কেন? রুগীর শ্বাস নিতে অসুবিধা হচ্ছে।

: এইটাতো কার্ডিয়াক ফ্লোর আর আমি শুধু একা আছি। আপনাদের অর্থপেডিক্সের ডিউটি ডাক্তারতো বারো তলায় আছে - ডেকে আনছি - অপেক্ষা করেন একটু।

ডাক্তারদের রোগ নির্ধারণ পর্ব:

মাকে ভর্তি করা হল এক বিশেষজ্ঞ হাড়ের ডাক্তারের তত্বাবধানে (যাকে আমরা চিনি না)। রুগীর অবস্থা সম্পর্কে আমাদের প্রাথমিক ধারণা দিলেন একজন ডিউটি ডাক্তার। তবে অনেক প্রশ্নের উত্তরই ছিল স্যার রাতে আসবেন উনিই বিস্তারিত জানাবেন। সেইদিন রাতে তিনি আসেননি। রাতে মার কাশি ও অনেক শ্বাস কষ্ট হয় কিন্তু সঠিক চিকিৎসা তিনি পান নি।

পরের দিন সকালে আমি এদের অফিসে গিয়ে খুব রাগারাগি করলাম। বললাম ডাক্তার না থাকলে বলেন আমরা অন্য হাসপাতালে যাই। দশটার দিকে জানানো হলো স্যার স্কয়্যারেই আউটডোরের রুগী দেখেন। সেখানে গিয়ে অনুরোধ করেন। সেখানে যেতেই জানলাম উনি রাউন্ডে বেরিয়েছেন। বো টাই লাগানো ফিটফাট ডাক্তারটি বললেন যে তার অপারেশন লাগবে হাড়ের - জটিল কিছু না তবে ইলেকট্রোলাইট ইম্ব্যালেন্স আছে শরীরে সেটা ঠিক করতে বেশ কয়েকদিন লাগবে। আর শরীরে রক্ত কম (মাথা কেটে অনেক রক্ত ঝড়েছিল) তাই রক্ত দেয়া লাগবে।

তিনি কিডনি, মেডিসিন ইত্যাদি বেশ কিছু কনসালট্যান্টকে রেফার করে বললেন ওনারা রুগীকে তৈরি করে দিলেই আমি অপারেশন করব। এরপর শুরু হল বিভিন্ন ডাক্তারের আগমন এবং আমাদের রোগের ইতিহাস বারংবার বর্ণনা করার নাটক।

১) : ওনার ডায়বেটিস কবে থেকে?
: ওনার তো ডায়াবেটিস নেই।
: কিন্তু ফাস্টিং গ্লুকোজ ১৪ কেন? শেষ কবে করিয়েছেন টেস্ট?
: এইতো মাস দুয়েক আগে। কেন বেশি সেতো আপনি ভাল বলতে পারবেন (ওনাকে গ্লুকোজ স্যালাইন দেয়া হয়েছিল)।

২) : ওনার কিডনির সমস্যার জন্যে কোন ঔষধ খাচ্ছেন কি?
: কিডনির সমস্যা?
: হ্যা জানেন না? ক্রিটেনিন লেভেল খুব হাই। কিডনির টেস্ট শেষ কবে করিয়েছিলেন?
: ওনার হাইপার টেনশন ছাড়া আর কোন বড় অসুখ নেই।

লক্ষ্য করা হল যে বেশীরভাগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তারই নির্দিষ্ট কোন নির্দেশনা দেয় না - মূল অর্থপেডিক্স এর ডাক্তারের কাছে উপদেশ হিসেবে পেশ করে। এরপর সেটার প্রতিফলন হয় উনি যখন পরদিন তার রাউন্ডে আসে তখন। ইতিমধ্যে ওনার শ্বাস নিতে অসুবিধাটি বাড়ে এবং অক্সিজেন দেয়া হয়। আমাদের ক্রনিক অর্গান ফেইলিউর ইত্যাদি গালভরা শব্দ দিয়ে ভয় ও দেখানো হয়। আমরা তখন এক চেনা অর্থোপেডিক্সের ডাক্তারের শরণাপন্ন হই যার পরামর্শে পপুলার হাসপাতালে ওনাকে স্থানান্তর করি।

রক্তদান পর্ব:

রক্তের জন্যে ফেসবুকে আবেদন করেছিলাম। কিছু সাড়াও পেয়েছি। পরে আত্মীয়ের মধ্যে থেকে দুইজন এগিয়ে আসেন। স্কয়্যার আবার দাতাদের (উচ্চমূল্যের) ১৮টি টেস্ট করে ম্যাচিং করিয়েই রক্ত দেয়া অনুমোদন করে - নাহলে তাদের ব্লাড ব্যাংক থেকে বিক্রি করে। আমাদের প্রথম রক্তদাতা ত্রিশ বছরের একজন যুবক - রক্তদানের পরের দিন তার হাতে লম্বা করে কালশিরা পরে গেল। আমরা যারপরনাই বিব্রত হলাম এবং জানলাম যে রক্ত ওরা নেয় একটি মেশিনের মাধ্যমে - যেটিতে অ্যালার্ম বাজার পরও কোন অ্যাটেন্ডেন্ট ছিল না বলে রক্ত ব্যাগ থেকে উপচে পুনরায় শরীরে গিয়ে এমন হতে পারে।

 আইসিইউ পর্ব:

পপুলারে আসার পর দিন যানা যায় যে ওনার নিউমোনিয়া হয়েছে এবং খুব সম্ভবত এটি হসপিটাল অ্যাকোয়ার্ড নিউমোনিয়া - অর্থ্যাৎ স্কয়্যার থেকেই হয়েছে রুগীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বিপর্যস্ত থাকার কারনে (অথচ সেখানকার ডাক্তাররা সেটা ধরতে পারে নি)। ওনার শ্বাস কষ্ট বাড়লে তাকে ১৩ তারিখ আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে আবার একগাদা টেস্ট করা হয় এবং বলা হয় ওনার হয়েছে প্রাণঘাতি এআরডিএস (অ্যাকোয়ার্ড রেস্পিটরী ডিসট্রেস সিনড্রোম) যেটি বেশ কিছু কারনেই হতে পারে। রুগীর ইলেক্ট্রোলাইটের সমস্যা কেটে গিয়ে শরীরের অবস্থা কিছুটা ভাল হলেও ফুসফুসের অবস্থা ও অক্সিজেন ডিপেন্ডেন্সি অপরিবর্তিত থাকে। এই অবস্থায় অ্যানেস্থেসিস্ট অস্ত্রোপচারে রাজী না হলে ভাঙ্গা পায়ের চিকিৎসা আরও অনিশ্চিত হয়ে যায়।

১৫ তারিখে তার সিটি স্ক্যানের রিপোর্ট আসে এবং বলা হয় যে টিউমার জাতীয় কিছু দেখা গেছে তার ফুসফুসে এবং ক্যান্সার কিনা নিশ্চিত করার জন্যে বায়োপসী আর ব্রন্কোস্কপি করা লাগবে।

আমরা সবাই ভেঙ্গে পড়ি - এবং মনে হয় নির্দিষ্টভাবে রোগ নির্ধারণের আগে এরকম বলাটা মূল শোষক সিস্টেমেরই একটি অংশ। আমরা বিদেশে অবস্থানরত এক আত্মীয় ক্যান্সার বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হই। তিনি বলেন যে যদি তার ক্যান্সার হয়েও থাকে এখন এই শারীরিক অবস্থায় কোন চিকিৎসা দেয়া যাবে না। ডাক্তারদের উচিৎ তার ফুসফুসের সমস্যা নির্মূল করে আইসিইউ থেকে বের করে আনা এবং পরে ক্যান্সার নির্ধারনের পদক্ষেপ নেয়া।

 জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জাম পর্ব:

ইতিমধ্যে এক বিশেষজ্ঞ ডাক্তার মতামত দেন যে রুগীর সচেতনতা আছে বলে আইসিইউতে রাখা ঠিক হচ্ছে না - তাকে হাই কেয়ার বা সেরকম ইউনিটে রাখা উচিৎ। কারন আইসিউতে ঢোকা রুগীদের মধ্যে বাঁচার চান্স ৫০:৫০ এবং প্রতিদিনই কেউ না কেউ মারা যাচ্ছে। এটি রুগীর উপর প্রভাব ফেলে এবং সত্যিকার অর্থেই মাও হাল ছেড়ে দেয় এই সময়। তবুও তাকে ব্যয়বহুল আইসিইউতেই রাখা হয় এবং অবস্থা দিনে দিনে খারাপ হতে থাকে এবং শরীর থেকে পর্যাপ্ত কার্বন ডাই অক্সাইড বের করতে পারছিলেন না তিনি। বিশেষজ্ঞ ডাক্তার তখন লাইফ সাপোর্টের কথা বললেও পপুলারের ডিউটি ডাক্তাররা উপদেশ দেন যে বাইপ্যাপ মেশিন নামে একটি মেশিন আছে যেটির মাধ্যমে নল না ঢুকিয়ে এই অবস্থার উন্নতি ঘটানো সম্ভব। সেটি ভাড়ায় যোগাড় করা হত নাকি আগে। তবে আমাদের এই দরকারের সময়ে সেটি পাওয়া সম্ভব হয় না।

তখন আমাদের কাছে হাসপাতালের প্রশাসন থেকে অদ্ভুত এক উপদেশ আসে। যেহেতু হাসপাতাল যোগাড় করতে পারছে না - আমরা মেশিনটি কিনে দিতে পারি। মেশিনটির মূল্য ২লাখ থেকে আড়াই লাখের মধ্যে। আমার আর কোন অনুভূতি তখন কাজ করে না। আমাদের আত্মীয় ডাক্তারটি সুদুর বিদেশ থেকে চিৎকার করে বলে তোরা কোথায় গেছিস? বের হ ওখান থেকে - জীবনরক্ষাকারী যন্ত্রপাতি নেই আবার কোন মুখে রুগীকে কিনতে বলে। আমরা লজ্জা - আত্মসম্মানের মাথা খেয়ে হাসপাতালকে পুনরায় অনুরোধ করি কোথাও থেকে যোগাড় করতে -কারন রুগীকে এই অবস্থায় নড়াতে চাচ্ছিলাম না। পরদিন সন্ধ্যায় অবশেষে মেশিনটি আসে কিন্তু ততক্ষণে মার অবস্থা আরও অবনতির দিকে - তাকে লাইফ সাপোর্ট সিস্টেমে দিয়ে দেয়া হয়।

 ডাক্তারদের নৈতিকতা পর্ব:

ওনাকে লাইফ সাপোর্টে দেবার আগেই আমরা একটি মেডিকেল বোর্ড বসানোর কথা বলেছিলাম। আমরা দুজনের নাম প্রস্তাব করি এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও কয়েকজনের কথা বলে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় যে তাদের অধিকাংশই বোর্ডে আসতে রাজী হয় না। এদের একজনকে ব্যক্তিগত অনুরোধ করলে তিনি জানান যে তিনি বোর্ডে আসতে না পারলেও একবার এসে রোগী দেখে যাবেন। নিশ্চয়ই ৫ মিনিটে এক হাজার টাকা উপার্জন আর আধা ঘন্টায় দুই হাজার টাকা আয়ের মধ্যে ফারাক আছে।

অবশেষে মাকে ল্যাব এইডে নেয়া হয় - মূলত উন্নত যন্ত্রপাতি ও চিকিৎসার আশায়। সেখানে অবশেষে মেডিক্যাল বোর্ড আজ বসে এবং আমি ডাক্তার প্রতি ২ হাজার টাকা করে হাতে নিয়ে বাইরে দাড়িয়ে থাকি। এটা নাকি হাসপাতালের নিয়ম যে বাইরে থেকে ডাক্তার আসলে সেই বিল হাসপাতালের মূল বিলের সাথে যোগ হবে না - রুগী ক্যাশে আলাদা দেবে। এর সাথে আয়কর ফাঁকি বা অন্য কিছুর সম্পর্ক আছে কিনা জানি না তবে আমার বুদ্ধিতে কুলোয় না। আমি এই সিস্টেমের কাছে নিজেকে সঁপে দিয়েছি। এনারা সিদ্ধান্ত দিয়েছেন সিটি গা্ইডেড বায়োপসী আর ব্রন্কোস্কপী করা হবে কারন তারা বুঝতে পারছেন না রুগীর নিউমোনিয়া, যক্ষা না ক্যান্সার। সেই অনুযায়ী পরবর্তী চিকিৎসা হবে।

না মাসে পাঁচ লাখ টাকা বেতনের এইসব ডাক্তারের কাছে বাস্তব জগৎটি ধরা পরে না। চোখের সামনে দেখা অ্যাক্সিডেন্টের পর আইসিউতে লাইফ সাপোর্টে থাকা সিটি কর্পোরেশনের এক ময়লার ট্রাক ড্রাইভারের আত্মীয়দের কথোপকথন:

: রুগীর অবস্থা কিরকম?
: ভাল না, বাঁচার চান্স খুবই কম।
: ওনার গলার থিকা নল কবে খুলবেন?
: এটা খুললেতো উনি নিজে শ্বাস নিতে পারবেন না মারা যাবেন। রাখতে হবে।
: শুনছি যে অনেক খরচ।
: হ্যা লাইফ সাপোর্টে থাকলে ৪০০০০-৫০০০০ টাকা খরচ হয় প্রতিদিন।
: তাইলে তো পারুম না।
: এইটা আপনাদের সিদ্ধান্ত।

কয়েক ঘন্টা পরে:
: আমাদের রুগীকে ছাড়বেন কবে।
: এরকম করেন কেন? রুগী মরতেও তো সময় লাগে।

 প্রতিকার কোথায়:

সময় এসেছে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে ভাববার। জীবনের, স্বজনের প্রতি আমাদের ভালবাসা, দায়িত্ববোধ ও অনুরাগের সুযোগ নিয়ে মানুষের সারা জীবনের সঞ্চয় নিয়ে ছিনিমিনি খেলার জন্যে এক শ্রেণীর স্বাস্থ্য বেনিয়া তৎপর। সরকারী স্বাস্থ্য সেবা সেই শূন্যস্থান পুরণের মত অবস্থায় নেই। প্রতিবেশী ভারতে হেল্থ ইনস্যুরেন্সের চল বাড়ছে বিজ্ঞাপনে দেখলাম। আমাদের দেশে হেল্থ ইন্স্যুরেন্স কই?

আমার শাশুড়ীকে লাইফ সাপোর্টে দেবার পর উনি কথা বলতে পারেন না আর। কিন্তু ইশারায় অনেক বলেন। যেমন ল্যাব এইডে স্থানান্তর করার আগে উনি হাত জোড় করে কাকুতি মিনতি করছিলেন ওনাকে বাসায় নিয়ে যেতে। হাত গালে দিয়ে দেখালেন যে উনি একটু শুতে চান। ওনাকে আশ্বাস দিয়েছিলাম ওখান থেকে নিয়ে যাব। কিন্তু নিয়ে তুললাম মুদ্রার ওপিঠ আরেকটি হাসপাতালে। এখন তিনি অভিমানে ফ্যালফ্যাল করে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে থাকেন। আর অনুভুতি শুন্য আমরা আমাদের মাকে এইসব বেনিয়াদের হাতে ফেলে রেখে দায়িত্ব পালন করি। খাই দাই অফিস করি। ভেবেও দেখি না - ওই বেডে আমিও একদিন হয়ত থাকব এমনই ফ্যালফ্যালে দৃষ্টিতে তাকিয়ে।

সচলায়তনে প্রকাশিত

Thursday, December 23, 2010

আমাকে শুদ্ধ করতে চাও কে গো তোমরা?

পৃথিবীর যাবতীয় অনাচারের অধিকাংশ হয়েছে আত্মগরিমা ও নিজের মতবাদ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। অনেকে মনে করেছে তাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ কোন জাতি নেই তাই তাদেরই দেশ দখল করে বিশ্ব শাসন করা উচিত। আবার অনেকে মনে করেছে তাদের মত মানবতাবাদী (?) বিশ্বে বিরল তাই তারা তাদের মানবতাবাদ বিশ্বে প্রতিষ্ঠা করেই ছাড়বে। কেউ কেউ মনে করে তারাই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধর্মের ধারণকারী, কাজেই অন্যদের নীচু করে দেখে তাদের দাব ...পৃথিবীর যাবতীয় অনাচারের অধিকাংশ হয়েছে আত্মগরিমা ও নিজের মতবাদ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। অনেকে মনে করেছে তাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ কোন জাতি নেই তাই তাদেরই দেশ দখল করে বিশ্ব শাসন করা উচিত। আবার অনেকে মনে করেছে তাদের মত মানবতাবাদী (?) বিশ্বে বিরল তাই তারা তাদের মানবতাবাদ বিশ্বে প্রতিষ্ঠা করেই ছাড়বে। কেউ কেউ মনে করে তারাই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধর্মের ধারণকারী, কাজেই অন্যদের নীচু করে দেখে তাদের দাবিয়ে রাখাটাই জায়েজ। এদের রোষানলে পরে সব সময়ই নির্যাতিত হচ্ছে সংখ্যালঘুরা, নির্মম ভাবে।

এই ২০১০ সালে আমি বিশ্বের বুকে এমনই এক অনাচারের বিস্তার দেখে স্তম্ভিত। কারেক্টিভ রেপ বা শোধক ধর্ষণ নামে একটি প্রথা চালু হয়েছে একবিংশ শতকে যা দক্ষিণ আফ্রিকায় অনাচারের পাহাড় তৈরি করছে। সমকামী নারীদের ধর্ষণ করলেই তারা শুদ্ধ সম্ভোগের স্বাদ পাবে এবং পরিশুদ্ধ হয়ে সাধারণ যৌন জীবন যাপন করবে এমন ধারণা একদল লোকের। তাদের মতে এইসব সমকামীদের সত্যিকারের  আফ্রিকার নারী বানানোর এই সুযোগ।

এক  রিপোর্ট জানাচ্ছে যে ওয়েস্টার্ন কেপের ৮৬ ভাগ সমকামী নারী ধর্ষণের ভয়ে ভীত।  এই ধরণের আক্রমণের শিকার দক্ষিণ আফ্রিকার মহিলা ফুটবল দলের তারকা ইউডি যাকে ২০০৯ সালে গণধর্ষণের পর মেরে ফেলা হয়।

প্রতি বছর দক্ষিণ আফ্রিকায় ৫০০র ও বেশী সমকামী মহিলা শোধক ধর্ষণের শিকার হচ্ছে এবং ৩০ জনকে মেরে পর্যন্ত ফেলা হচ্ছে। সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকার বিচার ব্যবস্থা এই শোধক ধর্ষণকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে স্বীকার করে না। ফলে এইসব ধর্ষণকারী স্বল্প জরিমানা দিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে।

দক্ষিণ আফ্রিকায় ধর্ষণের জন্যে পুরুষদের এমন অজুহাতের কমতি নেই। নেলসন ম্যান্ডেলার দেশের কতিপয় লোকেরা জিম্বাবুয়ে থেকে পলায়নরত উদ্বাস্তুদের ধর্ষণ করতেও পিছপা হয় না। হায়, কে কাকে শোধরাতে আসে!

বুসিসিওয়ে সিগাসা নামে দক্ষিণ আফ্রিকার একজন কবি আর ব্লগার ধর্ষিত হওয়ার ছয় মাস পরে ২০০৬ সালের এপ্রিল মাসে জানতে পারেন যে তার দেহে এইচআইভি ভাইরাস ঢুকেছে।

এখানে রয়েছে তার দু:খের কাহিনীর কিয়দংশ, যা তিনি তার ব্লগ মাই রিয়ালিটিজ এ লিখেছেন:
 বেশী দিন হয়নি জানতে পারলাম যে আমি এইচআইভি তে আক্রান্ত। আমি অনেক বেশীবার আক্রান্ত আর ধর্ষিত হয়েছি যার ফলে এই ভাইরাসে আমি আক্রান্ত হয়েছি। কারণ হল যে আমি একজন নারী যে নিজেকে সমকামী বলি একজন মহিলার সাথে আমার সম্পর্কের কারনে। আমাকে আক্রমণকারী আর বিভিন্ন ধর্ষক পুরুষরা এমন করেছে আমাকে বোঝানোর জন্য যে নারী হওয়ার আসল মানে কি।
বুসি এই সুন্দর পৃথিবীতে বাঁচতে পারেন নি যেহেতু তিনি ২০০৭ সালের মার্চ মাসে রোগে ভুগে মারা যান । কিন্তু তার ব্লগ আর কবিতা তার জীবনের প্রতি এই অবিচারের শক্তিশালী প্রমাণ হিসেবে রয়ে গেছে।

জুলুমের শিকার এইসব নারীদের কথা  লিপিবদ্ধ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তাদের ছবি নিয়ে প্রদর্শনী হচ্ছে। আন্তর্জাতিকভাবে দক্ষিণ আফ্রিকার সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার জন্যে। আপনারা চাইলে চেন্জ.অর্গের এই পিটিশনটি সাইন করতে পারেন।

 বুসির ছবি জানেলে মুহলি আর এলেন আইজেনমানের সৌজন্যে

সচলায়তনে প্রকাশিত

Thursday, November 04, 2010

বাড়ি ফেরা

ঢাকায় ফিরেছি দুই সপ্তাহ আগে। বাবা-মার অসুস্থতার জন্যে দেশে ফেরার তাগিদ ছিল। গত জুনেই এ কারনে ঘুরে গেছি। এবারে একেবারেই ফিরেছি - তাই বেশ প্রশান্তি মনে। তার জন্যে সাহায্য করেছে নিয়তি। জুলাই মাসে আবেদন করেছিলাম ঢাকায় একটি চাকুরির জন্যে। সেটিই ত্বরান্বিত করল বাকি সবকিছু। প্রকল্পটি স্বল্প মেয়াদের কাজেই কয়েক মাস পরেই আবার চাকুরি অনিশ্চিত। কিন্তু সেটি কোন ব্যাপারই নয় আমার জন্যে। আমার দরকার ছিল একটি অজুহাত, ফেরার জন্যে।

এই ফেরাটা কেমন হল? বাড়ি ফেরার মধ্যে আলাদা একধরনের ভালোলাগা কাজ করে। কারও হয়ত প্রতিদিন বাড়ি ফিরতে ভাল লাগে। কারও হয়ত কয়েক মাস বা কয়েক বছর পর। আমি এত হিসাব কষি না। বাইরে থাকলে কখনই সেখানকার বসত বাড়িকে নিজের বাড়ি মনে হত না।

মানুষ একজীবনে সব অসম্পূর্ণতা ধুয়ে মুছে ফেলতে চায়। কিন্তু কালে সেই অসম্পূর্ণতাগুলো জীবনেরই অঙ্গ হয়ে যায়। বাড়ি ফেরা মানে হচ্ছে চেনা জীবনের সেই অসঙ্গতির মধ্যে ফিরে যাওয়া - সেই লোড শেডিং সেই ট্রাফিক। আর কিছু উপরি পাওনা আছে - মায়ের হাতের রান্না ঝোলের স্বাদ পুনরায় আয়েশ করে পাওয়া।

ঢাকা বদলেছে অনেক - লোক বেড়েছে - খাম্বায় তার বেড়েছে - অসহিষ্ণুতা বেড়েছে। আর বেড়েছে দ্রব্য মূল্য - রিক্সায় উঠেই দশ টাকা, সিএনজি একশ টাকা, ভিক্ষা পাঁচ টাকা। মানুষের বেতন কি বেড়েছে এই জ্যামিতিক হারে? চারিদিকে টাকা আয়ের জন্যে হাহাকার।

আমার বড় চাচার বড় ছেলে বিদ্যুৎ বিভাগের বিভাগীয় প্রকৌশলী, চাকুরির বয়স শেষ হল প্রায়। গেলবার হজ্ব করেছেন তাই দাড়ি রেখেছেন। তিনি ঘুষ খান না তাই তার শত্রু অনেক। এবার তার চাকুরি খাবার জোড় তদবির করছে সহকর্মীরা তিনি জামাতের লোক এই অপবাদ দিয়ে। প্রকারান্তরে জামাতের অবস্থানই মজবুত করছে এইসব স্বার্থান্বেষী অর্বাচীনরা।

প্রতিদিন অফিসে যাওয়ার সময় ঘন্টাখানেক সিএনজিতে জ্যামে বসে থাকি। মোবাইল ইন্টারনেটের কল্যানে ফেসবুক দেখি, এটা ওটা করি। আর ভাবি জাকার্তা/বার্লিনের মত যদি ওভারপাস আন্ডারপাস হত তাহলে ২০ মিনিটে অফিস পৌছানো যেত। বাস্তবতা এই যে এই অসঙ্গতি গুলো নিয়েই বেঁচে থাকতে হবে। তার পরেও বাড়ি ফেরার মধ্যে আনন্দ আছে।

সেই আনন্দ নিয়েই এখন ঘুমাতে যাচ্ছি। শুভরাত্রি।

ছবির জন্যে কৃতজ্ঞতা: ময়ান ব্রেন

সচলায়তনে প্রকাশিত

Thursday, September 16, 2010

যেই লোকটি মাইকেল রকেফেলারকে খেয়ে ফেলেছিল

হ্যা, আঁতকে ওঠার মতই এই শিরোনামটি। 'দ্যা ম্যান হু এইট মাইকেল রকেফেলার' হচ্ছে জেফ কোহেন পরিচালিত নিউ ইয়র্কের অফ ব্রডওয়ের সাম্প্রতিক মঞ্চায়িত একটি (সেপ্টেম্বর ১০ -অক্টোবর ৩, ২০১০) নাটকের নাম যা ক্রিস্টোফার স্টোকসের একই শিরোনামে একটি ছোট গল্প অবলম্বনে রচিত।

এখন স্বভাবতই মনে প্রশ্ন জাগবে এই মাইকেল রকেফেলার কে। কোন সাধারণ মানুষ হলে এত মনোযোগ পেতেন না যতটুকু মাইকেল রকফেলার পেয়েছেন ১৯৬১ সালে তৎকালীন নিউ গিনিতে তার অন্তর্ধানের পরে। ১৯৩৮ সালে নিউ ইয়র্কে জন্ম নেয়া মাইকেল তৎকালীন নিউইয়র্কের মেয়র এবং পরবর্তী আমেরিকান ভাইস প্রেসিডেন্ট নেলসন অলড্রিচ রকেফেলারের  ছেলে।

আজকের দিনে যেমন  বিল গেটস বা আম্বানি পরিবারের সম্পদ ও সাম্রাজ্যের কথা আমাদের মুখে মুখে সেরকমই আমেরিকার রকেফেলার পরিবারের  নামের পরিচিতি উনবিংশ শতাব্দি শেষ ভাগ থেকে বিশ্বব্যাপী রয়েছে। জন ডি রকেফেলার অবশ্য দানেও সুপরিচিত ছিলেন –- শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় তারই অর্থে তৈরি এবং তিনি প্রায় ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার দান করছেন শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং শিশুদের কল্যাণে (১৯২৫ সালের ৫০০ মিলিয়ন মানে বর্তমানে ৫ বিলিয়ন ডলার)। তাদের পরিবারেরই সন্তান নেলসন ডি রকেফেলার ১৯৫৮ সালে নিউ ইয়র্কের গভর্নর হন। তিনি তিন বার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্যে দাড়িয়ে ১৯৭৪ সালে ভাইস প্রেসিডেন্ট হন।

ছবি: কলেজে মাইকেল

মাইকেলের বেড়ে ওঠা ছিল শান শওকতের মধ্যে - খেদমতে ছিল প্রচুর কাজের লোক। সেরা স্কুল, ইউরোপে ছুটি কাটাতে যাওয়া এবং আমেরিকা ও ল্যাটিন আমেরিকায় রকফেলার ম্যানসনগুলিতে ভ্রমণ - এগুলো তার জন্যে ছিল নস্যি। মাইকেলের গ্রাজুয়েশন হয় ১৯৬০ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজী সাহিত্যে এবং তার পরিবারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যোগ দেয়াই তার অবধারিত নিয়তি ছিল।

কিন্তু একটু পড়ুয়া টাইপের (তার চোখের চশমার জন্যে) মাইকেল বখে যান নি এবং তার ধনের গর্ব ছিল না। তিনি তার প্রচলিত জীবনধারার বাইরে অভিজ্ঞতা লাভের জন্যে পুয়ের্টোরিকোতে এক গ্রীষ্মের ছুটি কাটান মুদি দোকানে কাজ করেন এবং ভেনেজুয়েলাতে তাদের পরিবারের র‍্যান্চে রাখালের কাজ করেছেন। নতুন যায়গা, মানুষ ও বিষয়ের প্রতি তার আগ্রহ ছিল। এবং সেই আগ্রহ মেটাতে নিয়তির খেলায় মাত্র তেইশ বছর বয়সে নিউ গিনির জঙ্গলে তিনি অন্তর্ধান হন।


View Larger Map

আজও পর্যন্ত নিউ গিনিকে বেশ রহস্যভরা এলাকা হিসেবে সুবিদিত। গত শতাব্দী জুড়ে ইংরেজ এবং ওলন্দাজ মিশনারীরা সেখানকার জংলী আদিবাসীদের ভালভাবে বোঝার চেষ্টা করেছেন এবং সভ্য জগৎে ফিরে এসে তাদের ছিন্নমস্তক এবং মানুষের মাংস খাবার গল্প ছড়িয়ে বিশ্বব্যাপী মনযোগ আকর্ষণ করেছেন। এই সব জংলীরা বাস করতেন ঘন জঙ্গলে - মাইলের পর মাইল ভেতরে। ওখানে কম সভ্য লোকই যেতে পারত বলে তাদের এইসব মানুষখেকো আদিম আচার তখনও চলছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সেখানে নৃতত্ত্ববিদদের বেশ কটি অভিযান চালিত হয় এবং ঘটনাক্রমে মাইকেল ১৯৬১ সালে সেরকম একটি অভিযানে অংশ নিয়ে পাপুয়া নিউ গিনি আসে।

হার্ভার্ডের গ্রাজুয়েশন শেষে ৬ মাস বাধ্যতামূলক সামরিক ট্রেইনিং এর পরে বাবার ব্যাক্তিগত আর্টের সংগ্রহশালার জন্যে শিল্পকর্ম সংগ্রহ করার জন্যে তার দক্ষিণ আমেরিকার আন্দেজ অঞ্চলে যাবার কথা ছিল। কিন্তু তার রুমমেটের কাছে শুনতে পান যে রবার্ট গার্ডনার নামে হার্ভার্ডের একজন তরুণ প্রফেসর বিশ্ববিদ্যালয়ের জাদুঘরের হয়ে নিউ গিনিতে একটি নৃতাত্বিক অভিযানে যাবেন। ঠিক হল যে রকফেলার নিজ খরচে অভিযানে যোগ দেবেন এবং রবার্টের ডকুমেন্টারি দলে সাউন্ড রেকর্ডার এবং ফটোগ্রাফারের কাজ করবেন।

তারা তৎকালীন ডাচ নিয়ন্ত্রিত নিউ গিনিতে (বর্তমানে দ্বীপটির এক অংশ ইন্দোনেশিয়ার এবং আরেক অংশ স্বাধীন পাপুয়া নিউ গিনি) এসে বালিয়েম উপত্যকার এনদানি আদিবাসীদের উপর একটি ডকুমেন্টারি তৈরি করা শুরু করেন। এই অভিযানের ছবিতে দেখা যায় মুখভর্তি দাড়ি ও খাকি প্যান্ট পড়া মাইকেল আদিবাসীদের সাথে কথা বলছেন ও তাদের ছবি তুলছেন। এই অভিযানে মাইকেল আসমাত আদিবাসীদের (বর্তমানে ইন্দোনেশিয়ার অধীনে পাপুয়ার একদল জংলী)সম্পর্কে শোনেন এবং তাদের কাঠের কাজ, মস্তকের খুলিতে কাজ ইত্যাদি সংগ্রহ করতে আগ্রহী হন।

১৯৬১ সালের জুন মাসে তিনি মূল অভিযান থেকে আলাদা হয়ে আসমাতদের সন্ধানে যান। তিনি স্টিলের কুঠার আর সিগারেট এর বদলে এগুলোর কয়েকটি নমুনা যোগাড় করেন এবং বিস পোল (৩০ ফুট লম্বা কাঠের কারুকার্যখচিত পোল) এবং কাঠের ক্যানো (নৌকা) সংগ্রহ করতে মনস্থ করেন। রকফেলার তার ডায়রিতে লেখেন আসমাত আদিবাসী সম্পর্কে: “এইসব শিল্পের মতই আশ্চর্যজনক হচ্ছে তাদের আচার ও রীতি যা এখনও আদিম রয়ে গেছে। পাঁচ বছর আগেও এরা সবাই হেডহান্টিং(ছিন্নমস্তক সংগ্রহ) করত। কিছু গহীন এলাকায় এখনও তারা তা করে।” তবে উদ্ধত ও বিপদজনক আসমাতদের সাথে সমস্যা হওয়ায় তিনি আবার মূল অভিযানে ফিরে যান জুলাই মাসে। সেপ্টেম্বর মাসে তারা সবাই আমেরিকা ফিরে যান।

বাড়িতে ফিরে মাইকেল শোনেন যে তার বাবা-মার বিবাহ বিচ্ছেদ হচ্ছে এবং তার মন ভারাক্রান্ত হয়। তিনি আবার নিউ গিনি ফিরে যেতে মনস্থ করেন এবং সেই অভিযানের জন্যে যোগাড়-যন্তর শুরু করেন। এর জন্যে সরকারী অনুমোদনের দরকার ছিল – তবে তার পিতা ক্ষমতার জোরে সহজেই মার্কিন ও ডাচ সরকারের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় অনুমতি সংগ্রহ করে দেন। দু সপ্তাহ বাড়ি থেকেই তিনি সেপ্টেম্বরেই আবার পাপুয়া নিউ গিনি ফিরে যান।

তিনি প্রথমে থামেন উত্তরের উপকুলের হলান্ডিয়াতে (তখনকার ডাচ কলোনির রাজধানী) এবং ডাচ সরকারকে বলেন একজন গাইড জোগাড় করতে। ঠিক হয় ডাচ ব্যুরো অফ নেটিভ অ্যাফেয়ার্সের রেনে ওয়াসিন্ক যাবে তার সাথে। এটি একটি অবিবেচক সিদ্ধান্ত ছিল কারন রেনে একজন নৃতত্ববিদ ছিলেন – অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বুশম্যান নয়। তারা ৩০ ফুট লম্বা একটি মোটর চালিত ক্যানু (নৌকা) কেনেন এবং অক্টোবরের মাঝামাঝি আসমাতদের লোকালয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যান। তারা ডজনের ও বেশী আসমাত গ্রামে যান এবং ডাচ মিশনারীদের সহায়তায় তাদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেন। তিনি আরও আদিবাসী শিল্পকর্ম যোগাড় করেন এবং এবং ছিন্ন মস্তকের জন্যে ১০টি কুঠার দেবেন বলে ঘোষণা দেন যা পরে ডাচ সরকারী কর্মকর্তা কর্তৃক সমালোচিত হয় (কারণ এটি আদিবাসীদের মানুষ হত্যা করতে উদ্বুদ্ধ করবে)।

ছবিতে: রেনে ওয়াসিন্ক
এই অভিযানে তার খুব কষ্ট হলেও বিরল শিল্প কর্ম সংগ্রহের লক্ষ্যে তিনি তা চালিয়ে নিতে থাকেন। ১৯৬১ সালের নভেম্বরের ১৮ তারিখে তারা আইলান্ডেন নদী দিয়ে যাচ্ছিলেন যা আরাফুরা সাগরে এসে মিশেছে। সাগরের বিস্তীর্ণ মোহনায় এসে জোড়াল স্রোতের তোড়ে তাদের নৌকায় পানি ঢোকে ও তা উল্টিয়ে যায়। তাদের সাথের আদিবাসী দুই বালক পেট্রোলের জেরিকেনের তেল ফেলে সেটাকে লাইফবয় করে সাহায্যের জন্যে কুলের সন্ধানে ছুটে যায়। মাইকেল ও রেনে উল্টানো নৌকা ধরে ভাসতে থাকেন খরস্রোতা নদীর মোহনায়। স্রোত নৌকাটাকে এবং সাথে সাথে মাইকেল ও রেনেকেও সাগরের দিকে টেনে নিতে থাকে। তাদের আশা ছিল সাহায্য আসবে সহসাই – এবং এই আশায় একটি রাত ভেসে কাটায় তারা। ভোর পাঁচটার দিকে তারা তীরের দেখা পায় এবং আন্দাজ করে ৪ থেকে ৭ মাইল দুরে তা হবে। তারা নৌকার কাঠ ভেঙ্গে দাড় বাইতে চেষ্টা করে উল্টানো নৌকার দিক পরিবর্তনের জন্যে। কিন্তু ব্যর্থ হয়। তারা ক্রমশই সমুদ্রের দিকে ভেসে যাচ্ছে দেখে মাইকেল সাঁতরে কুলের দিকে যাবার সিদ্ধান্ত নেয়। রেনে তাকে বোঝাবার ব্যর্থ চেষ্টা করে এবং শেষে বলে “মাইকেল তুমি পাগল হয়ে গেছ”। রেনে সাঁতার ভাল মত পারেন না তাই বোটের কাছে থেকে গেলেন।

সেই আদিবাসী ছেলে দুটি পাঁচ ঘন্টা সাঁতরে তীরে পৌঁছে খবরটি দেয় যে মাইকেল ও রেনে বিপদে পড়েছে। পরদিন সকালে ডাচ সরকার ১২টি নৌকা ও সার্চ প্লেন সহকারে উদ্ধার টিম পাঠায়। নভেম্বরের ১৯ তারিখ বিকেলে রয়্যাল ডাচ নেভি রেনেকে সাগর থেকে উদ্ধার করে।

মাইকেলের বাবা তৎকালীন নিউ ইয়র্কের গভর্নর ও পরবর্তীকালে আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট নেলসন রকেফেলার
খবর পেয়ে গভর্নর নেলসন রকেফেলার পাপুয়া ছুটে আসেন। তার উদ্যোগে আরও দশদিন সার্চ অব্যাহত থাকে, কিন্তু মাইকেলের দেখা মেলে না।

রেনে মনে করেন যে মাইকেল ভাটার সময় সাঁতরে কুলে যেতে পারেন নি। তবে মাইকলের বাবার গুরুত্ব বিবেচনা করে এরপর সংবাদপত্র বিভিন্ন ধরনের চটকদার সংবাদ তৈরি করতে থাকে (হলুদ সাংবাদিকতা তখনও ছিল)। প্রথম দিকে চাউর হয় কোন কুমীর বা হাঙ্গর মাইকেলকে খেয়েছে তাই সে কুলে পৌঁছাতে পারে নি। এর পর বিভিন্ন সময় প্রত্যক্ষদর্শীর বরাত দিয়ে খবর এসেছে মাইকেলকে জঙ্গলিরা ধরে রেখেছে বা সে স্বেচ্ছায় তাদের সাথে আছে। এ জন্যে মাইকেলের পরিবার কখনই তার ফিরে আসার আশা ছাড়ে নি।

মাইকেলের এই ঘটনা নিয়ে বেশ কটি বই লেখা হয়েছে, টিভিতে ডকুমেন্টারি ও চলচ্চিত্রায়ন হয়েছে যাতে তার রহস্যময় অন্তর্ধানের বিভিন্ন ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

ছবি: সাংবাদিক মিল্ট মাখলিন
আট বছর পরে সাংবাদিক মিল্ট মাখলিন নিউ গিনিতে পৌছান মাইকেল রকেফেলারের অন্তর্ধান রহস্য তদন্ত করতে। তিনি আসমাতদের গ্রামে কাজ করা এক ডাচ মিশনারী উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন যে জঙ্গলিরা তাকে ধরে খেয়ে ফেলেছে। এই মিশনারী জানান যে মাইকেল যেখানে অদৃশ্য হয়েছে তার অনতিদুরেই পাঁচজন আসমাত লোককে ডাচ পুলিশ বছর দুই আগে হত্যা করে। তারা প্রতিশোধ নেবার জন্যে মুখিয়ে ছিল। পানিতে থাকা অবস্থায়ই জঙ্গলিরা তীর মেরে মাইকেলকে আহত করে। এর পর তাকে ডাঙ্গায় তোলা হয় এবং মাথা কেটে নেয়া হয়। তার শরীরের কিছু অংশ রেঁধে তারা খায় এবং বাকি অংশ মাটিতে পুঁতে ফেলে। দুজন আদিবাসী যোদ্ধা জানায় যে তারা একজন সাদা চামড়ার উইচ ডক্টরকে ধরে মাথা কেটে ফেলে এবং তার যাদু এখন তাদের কাছে। এদের একজন যাদু হিসেবে মাইকেলের চশমা দেখায়।

কেউ কেউ এমনও বলেছে যে ডাচ সরকার জঙ্গলি দ্বারা মাইকেলের মৃত্যুর ঘটনা লুকিয়েছে তখন কারণ এতে পর্যটক/অভিযান আসা বন্ধ হয়ে যেত।

১৯৭২ সালে প্রকাশিত মিল্ট মাখলিন এর 'দ্যা সার্চ ফর মাইকেল রকফেলার' বইটি অবলম্বনে একটি চলচ্চিত্র তৈরি হচ্ছে যা এ বছরই বের হবার কথা। ১৯৯৫ সালে ডিসকভারী চ্যানেলে মাইকেলের উপর একটি ডকুমেন্টারীতে তার পরিবারের লোকজনের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়।

পরিস্থিতি এখন অনেক বদলেছে - নিউ গিনির এক অংশ এখন ইন্দোনেশিয়ার পাপুয়া প্রদেশ এবং অপর অংশ স্বাধীন পাপুয়া নিউ গিনি। কিন্তু কিছু জিনিষ এখনও বদলায়নি। ২০০৫ সালে নিউ ইয়র্কার পত্রিকা ইন্দোনেশিয়ার পাপুয়ার ইরিন জায়াতে একটি অভিযাত্রার খবর ছাপায় যেখানে এক জঙ্গলী গোত্রের সাথে সভ্য জগৎের মানুষের প্রথম দেখা হয়। যা বোঝায় যে এই অঞ্চলের বহু এলাকা এখনও সভ্য মানুষের যোগাযোগের বাইরে।

মজার ব্যাপার হচ্ছে এই সাইটটি এ কে রকফেলারের নামে যাকে বলা হয় মাইকেল রকফেলারের মিশ্র সন্তান যে ইন্দোনেশিয়ার পাপুয়ার স্বাধীনতা আন্দোলনের সমর্থনে বিভিন্ন কর্মকান্ড করে যাচ্ছে।

মাইকেল রকেফেলারের সংগৃহীত অনেক শিল্পকর্ম এখন মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অফ আর্টস (মোমা) এর মাইকেল সি রকেফেলার কালেকশনে আছে (মাইকলের বাবা এই জাদুঘরের একজন ট্রাস্টি ছিলেন)।

ছবি এবং অন্যান্য গল্পের জন্যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি নিম্নলিখিত সাইটগুলির কাছে:

১) মাইকেল রকেফেলারের অন্তর্ধান - পাপুয়া হেরিটেজ সোসাইটি

২) মাইকেল রকেফেলার - ডেভিড ক্রাইচেক, ট্রুটিভি ক্রাইম লাইব্রেরী

আরও কিছু সহায়ক লিঙ্ক:

১) দ্যা সার্চ ফর মাইকেল রকেফেলার - আগামেমনন ফিল্মস

২) ইন্দোনেশিয়ার পাপুয়া রেইন ফরেস্টের আদিবাসীদের ছবি - যারা সভ্য জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন

৩) লিওনার্দ নিময়ের উপস্থাপনায় টিভি ডকুমেন্টারি ইউটিউবে দেখুন:

পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩

সচলায়তনে প্রকাশিত

Sunday, September 12, 2010

ফ্রি মানে মাগনা নয় - পর্ব তিন

পর্ব তিন:

ইন্টারনেটের জন্মই হয়েছিল একে অপরের সাথে তথ্য ভাগ (share) করার জন্যে। আমরা বিগত দশকে উইকিপিডিয়া, ফেসবুক, ফ্লিকার ইত্যাদি যে সব উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ দেখেছি সেগুলো কিন্তু সফল হয়েছে আমার আপনার স্বেচ্ছাসেবার ফলে বেশী পরিমাণে বিষয়বস্তু (content) তৈরীর মাধ্যমে। ইন্টারনেট সেইসব ব্যক্তির উপর ভরসা করে যারা স্বাধীন ভাবে আবেগ দিয়ে তাদের সময় এখানে ব্যয় করে। এইসব স্বেচ্ছাসেবীরা অধিকাংশই আপাত:দৃষ্টিতে বিনামূল্যে কাজ করলেও তাদের কিন্তু কিছুটা প্রাপ্তি আছে যা মূল্যে পরিমাপযোগ্য নয়। সে নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব আজকে।

ছবি ফ্লিকার থেকে লোটে গ্রোনকারের সৌজন্যে। সিসি বাই-এনসি-এসএ

মানুষ কেন বিনামূল্যে কন্টেন্ট তৈরি করতে পছন্দ করে? এই পৃথিবীতে অনেকে আছে যারা নিজে থেকে অনেক কিছু করতে করতে চায় আপাতদৃষ্টিতে কোন লাভের আশা ছাড়াই। এটাও কিন্তু নতুন কিছু নয়। ধরুন অনেক বাঙ্গালী পছন্দ করে অন্যকে উপদেশ দিতে। ঔষধ, পথ্য থেকে শুরু করে এহেন কোন বিষয় নেই যা আমরা উপদেশ হিসেবে পাই। এগুলো কিন্তু উন্নত বিশ্বে মানুষ পেশাজীবীদের কাছ থেকে সাধারণত যোগাড় করে অথচ আমরা বিনামূল্যেই তা পাই।

বর্তমানে ইন্টারনেটের কল্যাণে পেশাজীবী উপদেশক, যেমন বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসক বা স্থপতি এদের সাথে পাল্লা দিয়ে অপেশাদার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মানুষও তাদের মতামত দিতে পারছে। ফলে বিশেষজ্ঞ অভিমতের মূল্য হঠাৎ করেই কমে গেছে। আগে রাজনীতি সম্পর্কে কলাম লিখতেন নামভারী রাজনীতিক/বুদ্ধিজীবীরা। বর্তমানে ব্লগে নাম না জানা সাধারণ নাগরিকের কাছ থেকে গভীর বিশ্লেষণ পাওয়া যায় তাও আবার বিনামূল্যে। এই সব অপেশাদারদের কি প্রণোদনা দেয় বিনে পয়সায় এই সেবা দেবার?

এই সব কাজ কিন্তু আসলে আল্ট্রু্ইজম (নি;স্বার্থ ত্যাগ) বা সাহায্য নয়। অ্যাডাম স্মিথ বলেছেন ”আলোকপ্রাপ্ত ব্যাক্তিগত ইচ্ছা মানব জীবনের সবচেয়ে শক্তিশালী সম্পদ”। আলোকপ্রাপ্ত বা সংস্কারমুক্ত ব্যাক্তিগত ইচ্ছা' বা এনলাইটেন্ড সেল্ফ ইন্টারেস্ট' নৈতিকতার নীতিবিদ্যার একটি দর্শন যা বলে যে যেসব ব্যক্তি অন্যের লাভের জন্যে কাজ করে বা অন্যকে সহায়তা করে, আদতে তার নিজের ব্যাক্তিগত ইচ্ছাই পূরণ করে। এখানে খেয়াল রাখতে হবে যে এই ব্যাক্তিগত ইচ্ছা যদি সংস্কারমুক্ত না হয় বা কুটকৌশল সমৃদ্ধ হয় তাহলে এই দর্শন কার্যকরী হবে না এবং হিতে বিপরীত হতে পারে।
মানুষ অনেক কিছুই বিনামূল্যে করে দেয় তার নিজস্ব কারণে - অনেকে মজা করার জন্যে করে, কারণ তাদের ভাল লাগে - কারণ তারা তাদের প্রতি অন্যের দৃষ্টি ফেরাতে চায় – তাদের মতামতগুলো প্রচার করতে চায় এবং চায় অন্যরা তাদের সমর্থন করুক – এছাড়াও অনেক ব্যাক্তিগত কারণ থাকে তাদের।

লেখক ক্রিস অ্যান্ডারসন তার ফ্রি বইতে এই ব্যাপারটিকে সরলীকরণ করেছেন: "মানুষের শারীরিক চাহিদা গুলো যখন মিটে যায় মানুষের জন্যে কাঙ্খিত পণ্য হয় সামাজিক মূলধন" (Social Capital) - অর্থাৎ, আমাদের পারিপার্শিক সমাজে আমাদের সুনাম, প্রভাব, প্রতিপত্তি ইত্যাদি।

২০০৭ সালে ওরাইলি মিডিয়ার লেখক অ্যান্ডি ওরাম একটি গবেষণা করেন ইন্টারনেটে ছড়িয়ে থাকা অপেশাদার কন্টেন্টগুলো নিয়ে যেগুলো বিশ্বব্যাপী ব্যাবহারকারীরা তৈরি করেছে কোন অর্থনৈতিক সুবিধা ছাড়াই। তিনি এর পরিমাণ ও উন্নত মান দেখে অবাক হন - গেমস, হার্ডওয়ার ও সফ্টওয়ারের ইনস্ট্রাকশন ম্যানুয়াল, পণ্যের রিভিউ যা বাণিজ্যিক বিক্রেতাদের সেবার সংস্করণ থেকে অনেকগুণ সমৃদ্ধ। তিনি এরপর দীর্ঘমেয়াদী একটি জরিপ করেন জানার জন্যে যে কি মানুষকে প্রণোদনা দেয় এইসব বিনামূল্যে করে দেবার।

ছবি ফ্লিকার থেকে পিট ফ্লেচ এর সৌজন্যে। সিসি বাই-এনসি-এনডি

জরিপের ফলাফলের তালিকায় প্রথম ছিল কমিউনিটি - মানুষ এগুলো করে কমিউনিটি(তার পারিপার্শিক সমাজ) দ্বারা প্রণোদিত হয়ে, দ্বিতীয়টি হচ্ছে ব্যাক্তিগত উন্নয়ন, অর্থাৎ অনুশীলন মানুষকে উন্নত কিছু তৈরি করতে সহায়তা করে। তৃতীয় বিষয়টি হচ্ছে জ্ঞান ভাগ করে নেয়া - অনেকেরই কিছু অর্জিত জ্ঞান থাকে যা প্রয়োগের সুযোগ হয় না - তাই ইন্টারনেটের কল্যাণে তারা উপযুক্ত কমিউনিটি খুঁজে সেগুলো দ্বারা অপরকে সহায়তা করতে সচেষ্ট হয় কোনরূপ প্রতিদানের আশা না করেই। মজার বিষয় হচ্ছে - সুনাম বা খ্যাতির আকাঙ্খা এই তালিকার নীচের দিকে ছিল। আর মানুষ কিভাবে সময় পায় এগুলো করার অন্য কোন কিছু করা বাদ দিয়ে যা তাকে সেরকম সামাজিক বা মানসিক প্রশান্তি এনে দেবে না? আমার নিজের কথাই ধরুন - এক জীবনে রকের আড্ডায় অনেক সময় অহেতুক ব্যয় করেছি - এখন হয়ত ফুরসত পেলে করণীয় বেছে নিতে হলে ব্লগিংকেই বেছে নেব দুটোর মধ্যে।

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে কর্মস্থল ও অন্যান্য স্থানে আমরা যেসব কাজ করে থাকি তাতে কিন্তু আমাদের জ্ঞান ও শক্তি বা ইচ্ছার কিছু অংশ অলস ভাবে থেকে যায় – সেগুলো সম্পূর্ণ ব্যবহার করার সুযোগ হয় না। সমাজবিজ্ঞানীরা একে বলেন কগনিটিভ সারপ্লাস। আমরা সেসব ক্ষেত্র আমাদের শ্রম বিনামূল্যে দিতে পছন্দ করি যা আমাদের বলার সুযোগ, সম্মান লাভ, অন্যের মনযোগ ও পাঠকশ্রেণী এনে দিতে সাহায্য করে। সংক্ষেপে বলতে হয় এসব কাজ বিনামূল্যে করলেও আমরা এর থেকে অর্থের বিনিময়ে চাকুরির থেকে বেশী পরিমান সন্তুষ্টি লাভ করি।

আমরা ইন্টারনেটের বৃদ্ধির সাথে এই ব্যাপারটি মিলিয়ে দেখতে পারি। বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি মানুষ নতুন কিছু তৈরি করে চলেছে ইন্টারনেটে যার বদলে বেশী বা কম পরিচিতি পাচ্ছে যা হয়ত তার পূর্বের জীবন যাত্রার মাধ্যমে সম্ভব হত না। এভাবেই ফ্রি কন্টেন্টের জোয়ার বইছে।

ইন্টারনেটে স্বেচ্ছাসেবা এবং দানের অর্থনীতি (gift economy):

অনেক সময় আপনি অনেক বিনামূল্যের জিনিষ ব্যবহার করেন এবং হয়ত জানতেও পারেন না যে কিভাবে এর জন্যে আপনাকে মূল্য দিতে হচ্ছে। যেমন ধরুন বিনে পয়সার একটি ম্যাগাজিন পেলেন সেটা আসলে বিজ্ঞাপনদাতাদের কর্তৃক ভর্তুকি দেয়ার ফলে আপনি বিনামূল্যে পেয়েছেন। এই খরচটি ঐ নির্দিষ্ট পণ্যের বাজেটে ধরা আছে এবং আপনি বা অন্য কেউ যখন সেই পণ্যটি বেশী মূল্যে কিনছেন তখন ম্যাগাজিনটির দাম পরিশোধিত হয়ে যাচ্ছে। এটি একটি ত্রিমুখী মডেল যেখানে ম্যাগাজিন কোম্পানি বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে পাঠকদের বিক্রি করছে তাদের পণ্যের সম্ভাব্য ক্রেতা হিসেবে।

গিফ্ট ইকোনমি বা দানের অর্থনীতিতে এই ভর্তুকির পরিমাণ আরও সুক্ষ্ণ। আপনারা যে সচলায়তনে ব্লগ করেন -– যদিও ধরুন এখানে বিজ্ঞাপনের কারবার নেই, এর মানে এই নয় যে পাঠক আপনার ব্লগ পড়লে কোন মূল্যের স্থানান্তর হয় না। প্রতিটি পাঠক তার সময় ব্যয় করে আপনার ব্লগ পড়লে আপনার জনপ্রিয়তা বাড়ে - এবং এর পরিমাপযোগ্য অর্থনৈতিক মূল্য না থাকলেও অবশ্যই ধনাত্মক (বা ঋণাত্মক) মূল্য আছে। সচল লিলেনদার ফেসবুক স্ট্যাটাসে প্রচুর বন্ধু লাইক মারলেন এবং পরবর্তী বইমেলায় তিনি এই জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে ফেসবুক স্ট্যাটাস নিয়ে একটি বই বের করার সাহস পেলেন। তিনি অবশ্যই ব্যতিক্রম - কারণ অনেকেরই জনপ্রিয়তা ও অর্থ উপার্জন করা হয় না - এটি অবশ্য সিস্টেমের ব্যর্থতা নয়, তারা হয়ত চান না বা পারেন না।

পাওলো কোয়েলহো, ছবি উইকিমিডিয়া কমন্সের সৌজন্যে

ব্রাজিলের লেখক পাওলো কোয়েলহো তার উপন্যাস ও অন্যান্য লেখা ইন্টারনেট ব্যবহার করে বিনামূল্যে পাঠকদের দেবার পক্ষপাতি। তার অনেক উপন্যাসের পুরোটা বা কিছু অধ্যায় তিনি তার ব্লগে নিয়মিত তুলে দেন এবং পাঠকদের সাথে সে নিয়ে আলোচনায় মত্ত হন। কপিরাইটের সাধারণ ধারণা যে পাইরেসী লেখকের আয় কমায় - তার ক্ষেত্রে খাটে নি। তার একটি উপন্যাসের রাশিয়ান সংস্করণ একজন পাঠক ইন্টারনেটে তুলে দেয়। সেই উপন্যাস জনপ্রিয় হওয়ায় পরবর্তী ৩ বছরে তার সেই উপন্যাসের বিভিন্ন ভাষার সংস্করণ ১০ লাখের বেশি বিক্রি হয়। অর্থাৎ এইখানে বিনামূল্যের অর্থনীতির নতুন এক মাত্রা তৈরি হচ্ছে।

দানের অর্থনীতির আরেকটি উদাহরণ - আপনি গুগলে যখনই কোন কিছু সার্চ করেন আপনি তাদের বিজ্ঞাপন নিশানা করার মডেলকে উন্নত করার কাজে লাগেন, অর্থাৎ আপনার নিজের দরকারের একটি সার্চকে গুগুল তার লাভের জন্যে কাজে লাগায়। ফলে বিজ্ঞাপনদাতারা আরও আকর্ষিত হয় গুগলে বিজ্ঞাপন দিতে। আপনি হয়ত জানেনও না যে আপনি একটি বিনে পয়সার সেবা ব্যবহার করলেন আসলে আপনারই শ্রমের বিনিময়ে।

ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট ফ্রেড উইলসনের নামকরণকৃত ফ্রিমিয়াম মডেলটি ব্যবহার করা হয় সফ্টওয়্যারের ক্ষেত্রে। ফ্লিকারের প্রিমিয়াম ভার্সনের মূল্য বছরে ২৫ ডলার। দেখা গেছে একটি গতানুগতিক অনলাইন সাইটের ক্ষেত্রে শতকরা ৫% প্রিমিয়াম ভোক্তা বাকী ৯৫% বিনামূল্যের ভোক্তার খরচকে বহন করে। এখানে তারা সেটা পারে কারণ এই ৯৫% ভোক্তাকে সেবা দেওয়ার প্রান্তিক খরচ খুবই কম – প্রায় শুণ্যের কাছাকাছি - কারন তাদের পরিকাঠামো মূলত প্রিমিয়াম ভোক্তাদের সেবার জন্যে নিবেদিত ,– অন্যান্যরা বাই প্রডাক্ট। ফ্লিকার সব ভোক্তাদের উপর ফি ধার্য করে না - কারণ তাহলে নতুন কেউ আসবে না এই সেবা নিতে। ফলে তাদের মধ্য থেকে প্রিমিয়াম গ্রাহক হবার সম্ভাবনা কমে যাবে। এ ছাড়াও তাদের নানা রকম আয়ের উৎস আছে যার মাধ্যমে অনলাইন প্রতিষ্ঠানগুলো চলতে পারে ও লাভের মুখ দেখে।


ছবি ফ্লিকার থেকে ডেভিড এরিকসন এর সৌজন্যে, সিসি বাই-এনসি লাইসেন্সের আওতায় ব্যবহৃত 

আমরা এতক্ষণ পর্যন্ত দুটি মডেলের কথা আলোচনা করলাম –বিনে পয়সার পণ্যের – কিছু অর্থমূল্য বা শূণ্য অর্থমূল্য। কিন্তু তৃতীয় আরেকটি মডেল আছে - তা হচ্ছে ঋণাত্মক মূল্য – বা পণ্য ব্যবহারের জন্যে টাকা পাওয়া। ক্যাশব্যাক বা গিফট ভাউচার এরকম মডেলের উদাহরণ। যদিও এগুলো আসলে এক ধরণের মূল্য ছাড়, ভোক্তাদের বোঝানো হয় যে তারা টাকা সত্যিই ফেরত পাচ্ছে।

এখন আসা যাক ফ্রি পণ্যের অসুবিধার কথা। মাগনা পাইলে মানুষ আলকাতরাও খায় এই প্রবাদবাক্য সবক্ষেত্রেই খাটে। তবে আসল কথা হচ্ছে বিনামূল্যের পণ্যের প্রতি মানুষের সাধারণত: অবজ্ঞা থাকে। আমি ম্যাট্রিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে পাশ করার পর আমাকে একটি সাইকেল কিনে দেয়া হয়েছিল। কষ্টের প্রতিদান হিসেবে প্রাপ্ত বলে সেই সাইকেল আমি খুব যত্নের সাথে চালাতাম। অথচ আমার ছোট ভাই নটরডেমে ভর্তি হবার পর কলেজে সেটি বেখেয়ালে হারিয়ে ফেলে - কারণ তার সেই টান ছিল না সাইকেলটির প্রতি। কাজেই কোন পণ্যের যদি খুব সামান্য মূল্যও থাকে বা ব্যবহারের কঠিন শর্ত থাকে তাহলে তা ব্যবহারে দায়িত্বশীলতার পরিচয় পাওয়া যায়।

গুগলের ফ্রি পণ্যের সাম্রাজ্য

গুগলের সাম্রাজ্য অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক ফ্রি পণ্যের ক্ষেত্রে। বর্তমানে গুগলের রয়েছে ১০০টিরও বেশী পণ্য এবং তাদের বেশীরভাগই ফ্রি - সত্যিই কোন লুকানো খরচ নেই। এবং এই দিয়েই তাদের সাম্রাজ্য গড়া হয়েছে। তারা তাদের সার্চ ইঞ্জিন আর কিছু সাইটে বিজ্ঞাপন দিয়ে এত পয়সা আয় করে যে তারা সত্যিই অন্য সব সেবা বিনামূল্যে দিতে পারে যেগুলো বিশ্বব্যাপী ভোক্তাদের আকর্ষণ করে রাখে। এবং ভোক্তা বাড়ার সাথে সাথে তাদের আয় এবং সেবার মানও বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে নতুন নতুন ধারণা বাজারে ছাড়া এটা না ভেবেই যে সেটা কি বাণিজ্যিকভাবে সফল হবে কি না। গুগলের সাফল্যের ধারাবাহিকতা এখানে দেখা যাক:

১৯৯৯-২০০১ - সার্চ ইঞ্জিনকে আরও কার্যকরী করায় সক্ষম
২০০১-২০০৩ - এডসেন্সের মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দাতাদের পছন্দ মত বিজ্ঞাপন তৈরি ও স্থাপনার সুযোগ করে দেয়া এবং সবচেয়ে ভাল যায়গার জন্যে একে অপরের মধ্যে প্রতিযোগিতা করা।
২০০৩ - বর্তমান পর্যন্ত - অনেক ধরণের সেবা তৈরি করা

ছবি ফ্লিকার থেকে অ্যালাঁ বাখেলিয়ের এর সৌজন্যে। সিসি বাই-এনসি-এনডি

১০ বছরের মাথায় আজকে গুগল ২০ বিলিয়ন ডলার কোম্পানি এবং এর সবকিছু ফ্রি পণ্যের উপর ভিত্তি করে তৈরি। গুগল কিন্তু থেমে নেই - তারা মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার খরচ করে ডাটা সেন্টার তৈরি করছে তাদের সেবার গতি বাড়ানোর জন্যে ও মান উন্নয়নের জন্যে। তাদের পঞ্চাশটির কাছাকাছি ডাটা সেন্টারে এখন আছে ৫ লাখেরও বেশী সার্ভার - যা একসময় তাদের অন্য প্রতিযোগীর কাছ থেকে অনেক তফাৎ তৈরি করবে। এতে যা হচ্ছে তা হচ্ছে নতুন নতুন ব্যবহারকারী বাড়ছে এবং মাথাপ্রতি সেবার খরচ কমে যাচ্ছে। ফলে তারা আরও বেশী বিনামূল্যের সেবা দিতে পারছে।

গুগলের ডাইরেক্টরি সার্ভিস গুগ ৪১১ এর কথাই ধরুন। যেখানে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী এওএল এই সেবার জন্যে টাকা নেয় গুগল তা দেয় বিনে পয়সায়। কিভাবে? প্রতিবার যখন ভোক্তারা তথ্য চেয়ে গুগ ৪১১কে ফোন করে তারা রেখে যায় গুরুত্বপূর্ণ কন্টেন্ট - তাদের কণ্ঠ - যা বিভিন্ন অ্যাক্সেন্টের ও গতির। এই তথ্য কাজে লাগিয়ে গুগল তাদের ভয়েস রেকগনিশন সার্চ ইঞ্জিন সফটওয়্যার উন্নত করার চেষ্টায় রত আছে। বিনামূল্যে এই সেবা না দিলে এইসব রিসার্চ কন্টেন্ট তাদের পয়সা দিয়ে কিনতে হত।

গুগলের সুবিধা হচ্ছে এর বিভিন্ন নতুন ধারণা যদি সফল নাও হয় এর ক্ষতি নেই। ব্যর্থ উদ্যোগ যেমন গুগল ওয়েভ, অর্কুট ইত্যাদির ও লক্ষ লক্ষ ব্যবহারকারী আছে। তাই নতুন পণ্য বাজারে ছাড়ার আগে এরা প্রচুর ব্যবহারকারীকে বেটা টেস্টিংয়ের জন্যে নিয়োগ করতে পারে (বিনে পয়সায়) এবং ফল আশানুরুপ না হলে সেটি বাদ দিয়ে নতুন কোন উদ্যোগ শুরু করতে পারে।

দ্যা বিগ সুইচের লেখক নিকোলাস কার বলেছেন “গুগল চায় তথ্য প্রবাহ হোক বিনামূল্যে। কারণ যখন তথ্য পাবার মূল্য কমে যাবে এটি আরও বেশী পরিমানে আয়ের উৎস হবে তাদের জন্যে”।

ওয়ালমার্ট এবং এইচএনএমের মত ডিসকাউন্ট স্টোরের চাপে পিষ্ট ছোট ছোট স্টাইল বুটিকগুলো বর্তমানে নতুন নতুন উদ্ভাবনী শক্তি এবং অনেক ক্ষেত্রে ইন্টারনেট ব্যবহার করে টিকে থাকার চেষ্টা করছে। ভবিষ্যৎে গুগল সাম্রাজ্যের ফ্রির এই যথেচ্ছাচার মনোপলি ঠেকাতে সেরকম শৈল্পিক বুটিক বা ছোট নতুন ধারণার ইন্টারনেটভিত্তিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান যায়গা করে নিতে পারবে কি না সেটি দেখার বিষয়।

পরবর্তী পর্বে থাকবে ফ্রি সংস্কৃতি এবং উদ্ভাবকদের কাজের মূল্য নিশ্চিত করা (ওপেন সোর্স, কপিরাইট/কপিলেফ্ট) ইত্যাদি

প্রথম প্রকাশ: সচলায়তন