Wednesday, July 07, 2010

বন্ধু বিনে

টিএসসি

আমার পাঁচ বছরের প্রবাস জীবনে যে ব্যপারটি বুঝেছি তা হচ্ছে বন্ধুর উপস্থিতির চাইতে তার অনুপস্থিতি বেশি উপলব্ধি করা যায়। আমাদের দেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে বন্ধু, সহপাঠী বা সহকর্মীর যেরকম একটি স্থান আছে আমাদের জীবনে, জার্মানীতে গিয়ে বুঝলাম যে সেখানকার সমাজ ভিন্ন। দুই মাস একসাথে যাদের সাথে ইন্টার্নশিপ করেছি, কফি ও লান্চের সময় কাটিয়েছি অনেক গল্প করে, ঘুণাক্ষরেও কি ভেবেছি তাদের সাথে কোনও যোগাযোগ থাকবে না পরবর্তীতে? বিদায় নেবার সময় সবাই ফোন নম্বর, ইমেইল বিনিময় করলাম। সেটাই ছিল শেষ যোগাযোগ। পিটার আসত দেড়শত কিলোমিটার দুরে পোলিশ বর্ডারে অবস্থিত ফ্রান্কফুর্ট (ওডার) থেকে। পরে একবার সে শহরে যখন গেলাম, তাকে ফোন দিলাম। ভেবেছিলাম, তার সাথে সম্ভব হলে দেখা করব। কিন্তু ফোনে কথা বলার পর তার আগ্রহ দেখিনি। হয়ত আমার আগেই জানানো উচিৎ ছিল - কারণ কাজের সময় ছুটি নেয়ার ব্যাপার আছে - অথবা হয়ত আমিই কারণ। এরপর নিজেকেই গুটিয়ে নিয়েছি।

কিন্তু বন্ধু বিনে জীবন কি পরিপূর্ণ হয়? তাই প্রবাসে ভরসা ছিল ফোন। ঢাকার যে বন্ধুর সাথে একদিন দেখা বা কথা না হলে মনে হত কি যেন অপূর্ণ রয়ে গেছে সে বন্ধুর সাথে কথা বলা হতো প্রথমদিকে মাসে- দুইমাসে একবার করে। তারপর একসময় দুরত্ব বাড়তে লাগল সমস্ত বন্ধুদের সাথে। ততদিনে ব্লগের মাধ্যমে অনেক পরিচিতি বাড়ল। অনেকের সাথে অনলাইনে ভাল সখ্যতাও হল। এখনতো এমন হয় কোন নতুন শহরে গেলে আগে পরিচিত ব্লগার খুঁজি। দুরের আত্মীয় স্বজনের সাথে দেখা হবার বদলে তাদের সাথে দেখা করাটাকেই গুরুত্ব দেই। কারণ মনে হয় যে বন্ধুত্বের জন্যে মনটি হাহাকার করে।

এখন ফেসবুকের কল্যাণে বন্ধু কথাটার মানে পাল্টে যাচ্ছে। ফেসবুকে বন্ধুর সংখ্যা এখন স্ট্যাটাস সিম্বলে পরিণত হয়েছে। আমরা সগর্বে ঘোষণা দেই আমাদের বন্ধু সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে এবং মুখিয়ে থাকি ওবামা, তসলিমার মত নামি দামীদের (আসল বা নকলের ধার ধারি না) বন্ধুর তালিকায় যোগ করতে। কারো সাথে এভাবে পরিচিত হতে যাই: জানেন আমি না আপনার ফেসবুক ফ্রেন্ড, আপনার ওই স্ট্যাটাসটা না চমৎকার! -ওহ! তাই নাকি (চূড়ান্ত বিস্ময়)!

বন্ধুত্ব একটি খুব সহজ কথা, সহজেই ব্যবহার করা যায়। প্রতিদিন আমরা হরে দরে এই শব্দটি ব্যবহার করি। তবে বন্ধুত্বের আসল মানে, আসল গভীরতা এই শব্দটিতে ধরা দেয় না। আমাদের জীবনে অনেকের সাথেই মেলামেশা হয়। কিন্তু আসল বন্ধু হয় কজন?

আরেকটি ব্যপার হল বন্ধুত্ব আসলে শিল্প বা দার্শনিকতার মত নির্দিষ্ট কোন বিষয় নয়। আপনি একে কোন সংজ্ঞায় ফেলতে পারবে না বা এর নেই কোন নির্দিষ্ট পরিমাপযোগ্য সার্থকতা। অথচ জীবনকে সার্থক করতে একটি ভাল বন্ধুত্বই যথেষ্ট। বন্ধুত্বের আসল পরীক্ষা হল যে বন্ধুত্বের কোন বাহ্যিক প্রদর্শন ছাড়া একসাথে থাকতে পারা - কারণ জীবনের ছোটখাট বিষয়ও তাদের সাথে উপভোগ করা যায়। আসল বন্ধুত্ব তড়িৎ যোগাযোগ বা স্বল্প পরিচয়ের কোন ব্যাপার নয়, একে অনেক চড়াই উৎরাই পার হয়ে পোক্ত হতে হয়। আমাদের পরিচিতদের মধ্যে থেকে অনেকের নামই আমরা স্মরণ করতে পারি না। আবার অনেকে আমাদের জীবনে গভীরভাবে দাগ কাটে - তাদের সাথে কথা বলতে - একসাথে থাকতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি - সেটাই বন্ধুত্ব।

ফেসবুক সম্পর্কে অনেকেই সন্দিহান হলেও আমি কিন্তু একে খুবই উপযোগী একটি টুল হিসেবে দেখি। ফেসবুকের কল্যাণে আমি আমার দুরে সরে যাওয়া অনেক বন্ধুদের সাথে পুন:যোগাযোগ করতে পেরেছি। আমার নিত্য যোগাযোগের যেই বন্ধুটির কথা আগে বললাম সে কম্পুকানা হওয়ায় অনেকদিন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার পর এখন সে আইফোনে ফেসবুকে ঢুকে - তাই প্রায়ই টুকটাক কথা হয়। ছবি দেখে মাপা হয় কার কত ভূরি বেড়েছে। ফেসবুক তোমাকে সালাম।

আমাদের সাংস্কৃতিক দলটির কাজের খবর পাই ইয়াহু মেইলিং লিস্ট থেকে। আমি দুরে থেকেও সব সংবাদ পাই বন্ধুদের - বিয়ে-সন্তান-মৃত্যু। প্রযুক্তি আমাদের সাহায্য করে সেই পুরোনো বন্ধুত্বের ছোঁয়া দিতে।

টিএসসি

সম্প্রতি দেশে গিয়েছিলাম এবং কিছু পুরোনো বন্ধুদের সাথে আবার অনেক অনেক দিন পরে দেখা হল টিএসসিতে। নব্বুই দশকের মাঝামাঝি সময়ে আমরা যখন টিএসসি দাপিয়ে বেড়াতাম সে সময়ের সাথে এখন কতটুকু পরিবর্তন এসেছে সেটি দেখার আগ্রহ ছিল সবার। এখন টিএসসির প্রবেশ পথে ল্যাপটপ নিয়ে বসে থাকে তরুণেরা (কারণ বিনামূল্যে ওয়াইফাই ইন্টারনেট) - তবে ভেতরে সেই চিরচেনা জড় হয়ে বসা আড্ডা - কারও সাংস্কৃতিক চর্চা। আমাদের জীবনে এতদিনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। আমাদের দুই বন্ধুর বিয়ে হয়ে বাচ্চা হবার পর তাদের ছাড়াছাড়িও হয়ে গেল। অনেকদিন পরে আবার তারা একসাথে একই আড্ডায়। ফিরে গিয়েছিলাম সেইসব দিনগুলোতে। চাকুরী- বিয়ে- বাচ্চা সহ নানা বিষয় নিয়ে আলাপের মধ্যে সেইসব দিনের স্মৃতি রোমন্থন - কিভাবে আমরা রোজার সময় রাত করে রিহার্সেল শেষ করে শাঁখারীবাজারে সোমদার বাসায় সারারাত কির্তন শুনে ভোরবেলায় হোটেলে সেহেরি খেয়েছিলাম। মাস্টারকার্ডের বিজ্ঞাপনের মত করে বলি - প্রাইসলেস।

প্রবাস জীবনে এই সুখ নেই। দেশে অনেকদিন থেকে যাদের জীবনের পরবর্তী সময় প্রবাসে কাটে, তাদের সেখানে অনেক চেনামুখ জোটে, বন্ধু জোটে না। বন্ধুদের জন্যেই ফিরে আসতে হয় স্বদেশ।

প্রথম প্রকাশ: আমরা বন্ধু

2 comments:

amarchithi said...

আমার কাছে তো পরিস্থিতি উল্টো মনে হচ্ছে.
আপনার লেখাটা পরে ভালো লাগলো, কিন্তু আমি কিছুটা যোগ করতে চাই.
আমরা যারা বাংলাদেশ এ আছি, একই শহরে বাস করেউ অনেকদিন বন্ধু দের সাথে দেখা নেই, প্রতিদিন দুইবেলা facebook এর মাঝেই সব সম্পর্ক যেন বন্দী হয়ে গেছে .
সংসার আর job করে যেটুকু সময় পাওয়া যায়, traffic jam এর ভয়ে সবাই বাসায় বসেই কাটিয়ে দেই. অথচ Facebook এ প্রবাসী বন্ধুদের ছবি দেখি. প্রতি weekend এ
তারা একসাথে হচ্ছে. আসলে বাইরে গেলে বুঝি টান টা আরো বেড়ে যায়. বন্ধু দের প্রতি টান বুঝি কিছুটা দেশের প্রতি টান এর খুদা টাউ মেটাই. :)

Boodhooram Ignoramus said...

কোল্কেতায় থাকি। আমারচিঠি , আম্মো একমত।
রেজওয়ান, আমি সহমত, বন্ধু - অনেক রুপ ও মান। অভিধানে সবটা লেখা থাক অসম্ভব মনে হয়। আর, এক জীবনে যা পেলাম, তার পরেও, আমার অদেখা , বন্ধুত্ব হয়তো সম্ভব।