Monday, July 13, 2009

স্টে ওকে এবং স্পীড জিকিং


(পূর্ববর্তী পর্বগুলো , )

'স্টে ওকে' হচ্ছে আমস্টার্ডামে আমাদের থাকার জায়গার নাম। বিকেলে ট্রেন থেকে সেন্ট্রাল স্টেশনে নেমে ট্রামে করে ঠিকানায় পৌঁছে দেখলাম এটি একটি ব্যাগপ্যাকার্স হোটেল। এটি অনেকটা ইয়থ হোস্টেলের মত তবে এখানে পুরুষ- নারী, যুবা ও বয়স্করা সবাই থাকতে পারে। কনফারেন্স এর লজিস্টিক্স এর দায়িত্বে রয়েছে আমেরিকান বিশালদেহী মাইক যার মুখে একটি চিরন্তন হাসি ঝুলে আছে, খুবই মাইডিয়ার টাইপের। তার কাছ থেকে (ইলেক্ট্রনিক) চাবি বুঝে নেবার সময় আমার হাতে একটি কাগজ ধরিয়ে বলল পড়। পড়ে দেখলাম একগাদা নিয়মকানুন। সে বলল, কিছু মনে করো না, এরা বড্ড কড়া। দয়া করে এগুলো মেনো না হলে ফাইন ২৫০ ইউরো। নিয়মগুলোর মধ্যে ছিল কোন রকম খাওয়াদাওয়া, ধুমপান, মদ্যপান, মাদক নেয়া ইত্যাদি করা যাবে না। আমি হেসে বললাম এমন ভাবে লিখেছে যেন মাদক ছেলে হাতের মোয়া। সে বলল জানো না এখানে হাশিস পাওয়া যায় কফি শপে; তাই বলে এখনই আবার তুমি কফি শপের উদ্দেশ্যে রওনা দিও না। ডিনার খেয়ে বের হয়ো।

আমার রুমে তিনটি বান্কার বেড, সাকুল্যে ছয়জন থাকা যায়। আমি নীচের এক বেড বেছে তার নীচে উঁকি দিলাম দেখি আরেকটি বেড রয়েছে বিছানা পাতার জন্যে। তার মানে কোন কিছুই চুড়ান্ত এমন ধারণা করা যাবে না। একটি টয়লেট, আলাদা বেসিন ও শাওয়ারের রুম। এক কোনায় স্যুটকেস রেখে ল্যাপটপের ব্যাগ সাথে নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম।
আমাদের ডিনারের সময় দেয়া হলো বিকেল ৬:৩০ এ। হোস্টেলের কিচেনের পাশে ডাইনিং এ লাইন দিলাম। বেশ মজাই লাগছিল, পাশের হট্টগোল করা ভেনেজুয়েলার একদল টিনএজারদের মত যেন বয়স অনেক কমে গেছে। আসলে পরিবেশ আমাদের চিন্তা চেতনার উপর ভালই প্রভাব রাখে।

সূর্য ডুবতে অনেক দেরী তাই নেপালের বসন্তের সাথে বেরিয়ে পরলাম খাওয়ার পরে। সে চালু ছেলে, রায়ান এয়ারের কিছু সস্তা প্লেন টিকেট কিনে ইউরোপ ভ্রমণের ব্যবস্থা পাকা করেছে। শুধু আমস্টারডাম-বার্লিনের টিকেট পায়নি। আমি ট্রেনে এসেছি শুনে ঠিক হলো তাকে বার্লিনের ট্রেনের টিকেট কিনে দিয়ে একটু বেড়াতে বের হব আমরা।

সেন্ট্রাল স্টেশনে যাওয়ার পর ট্রেনের টিকেট পাওয়া গেল। এরপর একটু ঘোরাঘুরি করে দাম স্কোয়্যারে আসলাম। বসন্ত সকালে এসেছে বলে ইতিমধ্যে একটি গাইডেড টুর দিয়ে ফেলেছে এই সব অঞ্চলে। সেখানে রাণীর প্রাসাদ দেখার পর হাটতে হাটতে বসন্ত আমাকে বলল আমার সাথে চল একটি জিনিষ দেখাব। আমি বিষ্ময়ের সাথে লক্ষ্য করলাম সে আমাকে নামকরা টুরিস্ট এট্রাকশন রেড লাইট এরিয়ার দিকে নিয়ে গেল। আমি তাকে বললাম তুমি এই যায়গা কেমনে চিনলা? সে বলে এতো গাইডেড ট্যুরের অংশ ছিল। সে আরও এলাকার ইতিহাস বলতে লাগল -দশ বছর আগে থেকে এখনকার কাচের বুথের পরিমান অর্ধেকে নেমে এসেছে। বিকিনি পরা কড়া মেকাপসহ পতিতাদের কাচের দেয়ালের ভেতর থেকে শরীর প্রদর্শন আমার কাছে মোটেই রুচিকর কিছু মনে হলনা। আমি দেখতে লাগলাম মানুষকে, কারন খালের দুধারের সরু রাস্তায় পুরো গিজ গিজ করছে ট্যুরিস্ট। টিন এজার থেকে শুরু করে বুড়ো বুড়ি সবাই অবাক বিষ্ময়ে হেটে হেটে দেখছে। এ যেন পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্য, আর তার উইন্ডো শপিং। ক্যানেলে স্পেশাল বোট রাইড - রেড লাইট ট্যুর। হল্যান্ডের সেরা ট্যুরিষ্ট আকর্ষণ।

পরের দিন কনফারেন্সে আলাপ হলো মধ্যবয়সী ডাচ অ্যাক্টিভিস্ট পেট্রার সাথে যিনি পতিতাদের অধিকার নিয়ে আন্দোলনের সাথেও যুক্ত। তার ল্যাপটপে স্টীকার লাগানো 'হোরস রক' এবং এ নিয়ে ভারতে এক কনফারেন্সে তাকে কি রকম বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়েছে সে নিয়েও গল্প করলেন তিনি। তার বক্তব্য হচ্ছে এই রেড লাইট এরিয়ার জন্যে আমস্টারডামে অনেক ট্যুরিস্ট আসে তাই তাদের রক্ষার জন্যে আরও সুযোগ সুবিধা দিতে হবে সরকারকে। সেখানে নাপিত দেয় ৬% ভ্যাট (নিত্য প্রয়োজনীয়) আর পতিতারা দেয় ‌১৯% (লাক্সারী) ভ্যাট। কাজেই এই হার কমাতে হবে। আমি ভাবলাম কোথায় এসে পরলাম বাবা!

ওপেন ট্রান্সলেশন টুলস কন্ফারেন্স ২০০৯

অবশেষে কনফারেন্স শুরু হলো। মডারেটর অ্যালেন গান (ডাক নাম গানার) বেশ মজার মানুষ। প্রথমে ছিল প্রায় ৭০ জন লোকের পরিচয়পর্ব। নাম ও ধামের সাথে তিনি জুড়ে দিলেন 'আজ আপনি কেমন বোধ করছেন' প্রশ্নটি। বেশ মজার মজার উত্তর বেড়িয়ে আসল এবং জড়তা ভাঙ্গল অনেকের। এর পরে ছিল ওপিনিয়ন স্পেক্টোগ্রাম - একটি খালি জায়গায় কাল্পনিক বিভক্তি ধরে দুটি বিপরীত মতামতের ক্ষেত্রে কার কি অবস্থান (দুই প্রান্তে, না মাঝামাঝি) তা বের করা হলো। সেগুলো ছবিতে তুলে রাখা হলো রেকর্ডের জন্যে। এরপর গানার গিয়ে কাউকে কাউকে জিজ্ঞেস করলেন কেন সে বা তারা তাদের অবস্থান নিয়েছে।

বর্তমান অনেক কনফারেন্সেই যেভাবে এজেন্ডা তৈরি করা হয়, সে পদ্ধতি অবলম্বন করা হলো এখানেও। সবাই স্টিকি নোটে কি জানতে চায় ও জানাতে চায় তা লেখা শুরু করল। তারপর সবগুলোকে বিষয় অনুযায়ী ভাগ করা হলো। উইকিতে তোলার পর সেগুলো এরকম দাড়ালো

এই বিষয়গুলো নিয়েই কনফারেন্সের এজেন্ডাকে ঢেলে সাজানো হলো। সবচেয়ে মজার ব্যাপার ছিল যে মূলত: দুটি ভাবে কার্যক্রম সাজানো হয়েছিল। ৮-১০টি বিষয় বাছা হতো একেক সেশনে এবং ইচ্ছে অনুযায়ী বিষয়ভিত্তিক আলোচনায় যোগ দেয়ার সুযোগ ছিল। ফলে সবাই তার সবচেয়ে আগ্রহের আলোচনায় যোগ দিয়েছে এবং আরও আলোচনায় যোগ না দিতে পারায় আক্ষেপ করেছে। ফলে অন্যান্য কনফারেন্সের মত নিজের জন্যে অপ্রাসঙ্গিক বা বোরিং জিনিষ শুনতে হয়নি। শুধু শেষে সব কটি আলোচনার সামারী একেকটি দল পড়ে শুনিয়েছে যাতে অন্যেরা বুঝতে পারে কি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।


আরেকটি মজার জিনিষ ছিল - স্পিড-জিকিং - অনেকটা স্পিড ডেটিংয়ের মত। দৈবচয়নের মাধ্যমে নাম্বার দিয়ে পুরো গ্রুপকে ৮টি আলাদা দলে ভাগ করা হল। আটজন জিক (বা প্রযুক্তিবিদ) তাদের কোম্পানী বা কার্যক্রম সম্পর্কে বর্ণনা করতে লাগল ৪ মিনিটের মধ্যে এককটি গ্রুপের কাছে। ৪ মিনিট শেষ হতেই এক টেবিল থেকে আরেকট টেবিলে চলে গেল দলটি। এতে সুবিধা হলো কারও কোন কিছু শুনতে পছন্দ না হলে সেই টেবিল থেকে সরে গেলেই হলো বা ৪ মিনিটের বেশী বোরড হওয়া লাগল না। এভাবেই সারা দিন শেষেও সবাই ছিল পুরোপুরি ইনভল্ভড।

কনফারেন্সের আলোচনার যে অংশগুলো গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে তা নিয়ে আলাপ করব পরবর্তী পর্বে।

প্রথম প্রকাশ: সচলায়তন

Monday, July 06, 2009

আমস্টার্ডামের পথে


সকালে রওনা হয়েছি বার্লিন হপ্টবানহফের (প্রধান রেল স্টেশন) দিকে। গাড়ীতে যাব তাই সেইভাবে সময় হিসেব করেই বেরিয়েছি। কিন্তু পথিমধ্যে দেখলাম শার্লোটেনবার্গের চারিদিকে ব্যারিকেড দিয়ে অনেক রাস্তা বন্ধ, একটি সাইকেলের রেস হবে। পুলিশকে অনুরোধ করলাম সাইকেলের বহর আসতে তো মনে হয় সময় লাগবে, মোড়ের পথটুকু ছেড়ে দিলেই আমি গন্তব্যস্থলে যেতে পারি, নতুবা আমি ট্রেন মিস করব। কিন্তু বুঝলাম বৃথা চেষ্টা, রোবটের মত নিয়মের বাইরে আর কোন কিছু বিবেচনা করাটা তাদের রক্তে নেই। আমাকে বলে কিনা এটি তো আমরা আগেই জানিয়েছি তুমি দেখোনি তাই তোমার দোষ। গাড়ীতে ঘুরে যেতে অনেক সময় লাগবে, আর কোথায় কোথায় রাস্তা বন্ধ আছে তাও জানা নেই। কি করে দ্রুত স্টেশনে পৌছানো যায় তাই ভাবছি। হঠাৎ করে মনে হলো সিটি ট্রেন (এস বান) তো আর আটকাতে পারবেনা। তাই দ্রুত নিকটস্থ এস বান স্টেশনে গিয়ে গাড়ী ছেড়ে দিয়ে শেষ পর্যন্ত হপ্টবানহফে সময় মত পৌঁছুতে পারলাম।

আমস্টারডাম এর আগেও গিয়েছি, তবে স্বল্প সময়ের জন্যে। এবারের যাত্রাটি ভিন্ন -ওপেন ট্রান্সলেশন টুলস ২০০৯ কনফারেন্সে যোগদান করতে যাচ্ছি। সাথে গ্লোবাল ভয়েসেসের কিছু বন্ধুরও দেখা হবে ভেবেই পুলকিত হচ্ছি।
ইন্টারসিটি এক্সপ্রেসের দুটি ট্রেন একসাথে লাগানো। কাধে হাত দিয়ে ঝমাঝম করে গিয়ে মাঝপথে দুজনের পথ আলাদা হয়ে যাবে। না রুপকটা ঠিক হলো না। ঝমাঝম করবে কি, ট্রেনের লাইনে কোন কাটা নেই কাজেই ঝমাঝম বা ঝক্করঝক বলুন কোন শব্দই হয় না। এত বোরিং!!

স্টেশনের প্লাটফর্মের নোটিশ বোর্ডে ট্রেনের একটি ড্রয়িং আছে যেখান থেকে বোঝায় কোন বগী প্লাটফর্মের কোন জোনে থামবে। সেটি আগে থেকে দেখে রাখায় সঠিক ট্রেনে ও সঠিক বগীতেই উঠলাম। সাধারণত: ট্রেন থামে দুই মিনিটের জন্যে কাজেই ভুল হবার অবকাশ নেই। আইসিইতে ভ্রমণের একটি আরাম আছে, অনেক লেগ স্পেস, বিমানের চেয়েও আরামদায়ক সীট, কয়েক চ্যানেলে গান, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ, মোবাইল জোন আর চলে সর্বোচ্চ ২৫০ মাইল গতিতে। আমার বুকিং নির্দেশ করা জানালার পাশের সীটে বসলাম। কামরায় অনেক সিট বুকিং না করা যাত্রীও আছে তারা ফাঁকা সীটে বসতে পারে। তবে আমার পাশের সীট ফাঁকা রইল অনেকক্ষণ। আমি এটি মাঝে মাঝে খুব এনজয় করি। আমি এক কালো ভিনদেশী বলে মাঝে মধ্যে কিছু শেতাঙ্গ আমাকে সম্মান করে পাশের সীট ছেড়ে দিয়ে দুরে কোথাও বসে। এই বাড়তি স্পেসটুকুর সুযোগ মুফতে কোথায় পাওয়া যায় বলুন!

আমি পাসকাল মার্সিয়েরের বেস্টসেলার বই নাইট ট্রেন টু লিসাবন খুলে বসলাম, তবে কতক্ষণ পড়েই হোঁচট খেলাম। বুঝতে পারছিলাম না কেন পড়া দ্রুত আগাচ্ছে না। আসলে এটি বার্বারা হারসভ কর্তৃক মূল জার্মান থেকে ইংরেজীতে অনুবাদ। ভাবতে লাগলাম অনুবাদক কি ইচ্ছে করেই কিছু অংশ দুর্বোধ্য করেছেন না মূল সংস্করণের দিকে বেশী নজর রেখেছেন লেখার মসৃণতার দিকে খেয়াল না রেখে। এ বিষয় নিয়েও আলাপ হবে ওপেন ট্রান্সলেশন টুলস কনফারেন্সে।
এবার কানে হেডফোন দিয়ে সঙ্গীতে মনোনিবেশ করলাম। হঠাৎ করে মনোযোগে ছেদ হলো। হানোভার থেকে উঠা এক তরুণী আমার পাশে এসে বসল। তার স্যুটকেসটি পায়ের সামনে রাখলো, তাই লেগস্পেস অনেক কমে যাওয়ায় অস্বস্তি বোধ করতে লাগল। আমি ইংরেজীতে বললাম যে মাথার উপরে স্যুটকেসটি রাখতে পারেন। সে বলল আমি তো তুলতে পারব না এটা। আমি বললাম নো প্রবলেম আমি তুলে দিচ্ছি। এরপর আবার সঙ্গীতে ডুবে গেলাম এবং ভাবতে লাগলাম কোন দেশী হতে পারে মেয়েটি। টার্কিশ? নাকী ভারতীয় উপমহাদেশের? একসময় আলাপ হলো মেয়েটির সাথে। নিউ দিল্লী থেকে এসেছে ম্যাক্স প্লান্ক ইন্সটিটিউটে ভাইভা দিতে। মাইক্রোবায়োলজিতে মাস্টার্স করেছে, এখন পিএইচডি করার ইচ্ছা। জিজ্ঞেস করলাম যে ভাইভা দিতে এতদুর এসেছে কেন। বলল যে শর্ট লিস্টে থাকা অ্যাপ্লিকান্টদের আসা যাওয়া থাকার খরচ ম্যাক্স প্লান্ক ইন্সটিটিউটই দিচ্ছে চুড়ান্তভাবে নির্বাচিত হোক বা না হোক। ভাল ছাত্রছাত্রী নির্বাচনে তাদের এই পরিমাণ উদ্যোগ দেখে অবাক হওয়ারই কথা। ডুসেলডর্ফ এয়ারপোর্টে সে নামবে দিল্লির প্লেন ধরবে তাই। আমি নেমে গেলাম ডুইসবুর্গে, ট্রেন চেন্জ করতে। আধা ঘন্টা সময় ছিল তার মধ্যেই পিজ্জা দিয়ে লান্চ সাড়া হলো।

এর পরে আবার যাত্রা শুরু হলো। জানলা দিয়ে তাকিয়ে রইলাম কখন বর্ডার পার হব সেটি খেয়াল করার জন্যে। নাহ, এবারও ব্যর্থ হলাম। কখন নেদারল্যান্ডে ঢুকে গিয়েছি টের পাইনি। একটি শহরের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় রাস্তার সাইন দেখে টের পেলাম। শেনঘেন চুক্তির আওতায় যে সমস্ত ইউরোপীয় দেশ আছে তাদের বিপুল পরিমান কর্মঘন্টা প্রতিদিন বেচে যায় এই ভিসা/ইমিগ্রেশন উঠিয়ে দেবার কারনে। আর লোকজনেরও কত আরাম! অথচ ঢাকা থেকে কলকাতা যেতে কি হ্যাপা পোহাতে হয় আর কত ঘন্টা নষ্ট হয় ভিসি/ইমিগ্রেশনের কারনে সেটা ভাবলে কষ্ট হয়।

ওপেন ট্রান্সলেশন:

এই বিষয়ে বলতে গেলে ওপেন সোর্স আন্দোলনের কথা বলতে হয়। এটি আসলে ব্যাপক আলোচনার বিষয়, আমি শুধু সংক্ষেপে বলব। এখানে ওপেন মানে হচ্ছে রয়্যাল্টি বিহীন এবং সোর্স মানে হচ্ছে সোর্স কোড, অর্থাৎ যেই সোর্স কোড সবাই অ্যাক্সেস করতে পারে। এই টার্মটি প্রথম অফিশিয়ালি ব্যবহার করা হয় ১৯৯৮ সালে আয়োজিত "ফ্রিওয়্যার সামিটে"। পরবর্তীতে এই সামিটের নামকরণ করা হয় ওপেন সোর্স সামিট। সে বছরই ওপেন সোর্স ইনিশিয়েটিভ নামে একটি সংগঠন আত্মপ্রকাশ করে যা বিশ্বব্যাপী ওপেন সোর্স আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যে কাজ শুরু করে।
এসপায়ারেশনটেক হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি এনজিও যারা বিভিন্ন এনজিওর জন্যে ওপেন সোর্স সফ্টওয়্যার তৈরী, কমিউনিটি এবং নেটওয়ার্কিং সুবিধা দেয় এবং বিভিন্ন কর্মসূচী আয়োজন করে। তারা এ পর্যন্ত সারা বিশ্বে ৪৫টি বিভিন্ন ইভেন্টের আয়েোজন করেছে নানা ডোনরের সহযোগীতায়। তাদের আরেকটি সাফল্য বিভিন্ন এনজিওর জন্যে ওপেন সোর্স সফ্টওয়্যার টুলসের একটি পোর্টাল তৈরী করা যার নাম সোশ্যাল সোর্সেস কমন্স

২০০৭ সালে ক্রোয়েশিয়ার জাগরেবে তারা প্রথম ওপেন ট্রান্সলেশন টুলস কনফারেন্সের আয়োজন করে। সেখানে ওপেন সোর্স ট্রান্সলেশন টুলস এবং ওপেন কন্টেন্ট অনুবাদের ব্যাপারটি নথিভুক্ত করার প্রচেষ্টা নেয়া হয়।

আসলে ট্রান্সলেশন বা অনুবাদ সারা বিশ্বে একটি বিশাল ইন্ডাস্ট্রি। অনুবাদের চাহিদা রয়েছে সারা বিশ্ব জুড়ে এবং এর জন্যে কোটি কোটি ডলার খরচ করা হয়। উদাহরণস্বরুপ ইইউর প্রতিটি কার্যাবলী বা স্টেটমেন্ট যা প্রকাশিত হয় তা গঠনতন্ত্র অনুযায়ী এর ২৫টিরও বেশী সদস্যদেশের ভাষায় অনুদিত হতে হয়। মার্কিন সরকারের ডিফেন্স ডিপার্টমেন্ট মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার খরচ করে মধ্য প্রাচ্যের বিভিন্ন ভাষা (আরবী, ফার্সী) ইত্যাদিতে প্রকাশিত সংবাদ, ব্লগ, ওয়েবসাইট ইত্যাদি অনুবাদ করে মনিটর করার জন্যে। এইসব সংগঠনের প্রচেষ্টা মেশিন ট্রান্সলেশন সফ্টওয়্যার তৈরী যা তাদেরকে কম খরচে অনুবাদের সুবিধা দেবে। ওপেন সোর্সেও কিছু মেশিন ট্রান্সলেশন সুবিধা আছে যেমন গুগল ট্রান্সলেট। কিন্তু কোন মেশিন ট্রান্সলেশনই এখনও স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে নি। ভাল অনুবাদের জন্যে মানুষের দ্বারা অনুবাদের বিকল্প নেই। কিন্ত পেশাজীবি অনুবাদকের দ্বারা সেই কাজ করতে অনেক খরচ।

ওদিকে পাশাপাশি আরেক ধরনের কমিউনিটি বেইজড অনুবাদ আন্দোলন কিন্তু আমাদের অগোচরে এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা অনেক সফ্টওয়্যার এখন বাংলাতে পাই। যেমন ওপেন অফিস, গুগল, ওয়ার্ডপ্রেস। এইসব লোকালাইজেশন কিন্তু সম্ভব হয়েছে স্বেচ্ছাসেবী কমিউনিটি ট্রান্সলেশন দ্বারা। অনেকেই অনুবাদ করে নিজের চর্চার জন্যে বা শখের বসে। এতে টাকা পাওয়া যায়না বটে, কিন্তু স্বীকৃতি পাওয়া যায় এবং হয়ত নানামুখী অনেক সুযোগ গুগল ইন ইওর ল্যাঙ্গুয়েজ সেরকম একটি বড় প্রকল্প। সে তো হলো সফ্টওয়্যার। স্বেচ্ছাসেবী কমিউনিটি দ্বারা কন্টেন্ট অনুবাদের কয়েকটি উদাহরন হলো ডটসাব (বিভিন্ন ভাষায় ভিডিও সাবটাইটেল করা), গ্লোবাল ভয়েসেস লিঙ্গুয়া প্রকল্প (ব্লগ কন্টেন্ট বিশটির মত ভাষায় অনুবাদ), টেড ওপেন ট্রান্সলেশন প্রকল্প ইত্যাদি। এসবই ওপেন ট্রান্সলেশনের উদাহরণ।
(আগামী পর্বে থাকবে ওপেন ট্রান্সলেশন টুলস কন্ফারেন্স ২০০৯ এবং আমস্টার্ডামের গল্প)

প্রথম প্রকাশ: সচলায়তন

Sunday, July 05, 2009

বহুভাষী ওয়েব এবং উন্মুক্ত অনুবাদ


এমন এক সময় ছিল যখন তথ্য শুধু লাইব্রেরী, বা সরকারী তথ্যাগারে থাকত। মানুষের কাছে তা সহজলভ্য হতো বই বা সংবাদপত্রের মাধ্যমে। কিন্তু ইন্টারনেটের প্রথম বিপ্লব এই বাধাকে ঘুঁচিয়ে দিল। বিভিন্ন স্ট্যাটিক ওয়েব পেইজের মাধ্যমে এবং অনলাইন সংবাদপত্রের মাধ্যমে তথ্যের অবাধ প্রবাহ চলতে লাগল।

এরপর আসল ইন্টারনেটের দ্বিতীয় জাগরণ। এটি ভেঙ্গে দিল কারা তথ্য সৃষ্টি করবে তার মনোপলি। লক্ষ কোটি মানুষ ডিসকাশন ফোরাম, ব্লগ, ছবি, ভিডিও ইত্যাদির মাধ্যমে তথ্যের সৃষ্টি ও আদান প্রদান করতে লাগল বিশ্বব্যাপী পাঠক-শ্রোতাদের জন্যে।

কিন্তু তথ্যের মনোপলি কি ভেঙ্গেছে? তথ্য আগেও উৎকৃষ্ট পণ্য ছিল, এখনও আছে। যেই তথ্যের চাহিদা বেশী, যোগান কম, তার মূল্য তত বেশী। বর্তমানে তথ্যের চাহিদা একই আছে (মানুষের তথ্য গ্রহণ করার ক্ষমতা অপরিবর্তিত আছে)। কিন্তু এখন তথ্যের যোগান অনেক। কিবোর্ড টিপলেই ডজনখানেক বাংলা পত্রিকা পড়া যায় আর ইংরেজীতো অগুণতি। তথ্যের এই বিস্ফোরণকে কেভিন কেলী বলেছেন দ্যা এক্সপানশন অফ ইগনোরেন্স। তিনি যুক্তি দেখাচ্ছেন যে যত বেশি তথ্য সহজলভ্য হচ্ছে তত আমাদের প্রশ্ন বেড়ে যাচ্ছে এবং উত্তরের চাহিদা বেড়ে যাচ্ছে। আমাদের উত্তরের যোগানের বিপরীতে প্রশ্নের হার বেড়ে যাওয়ায় আমাদের অজ্ঞানতা বাড়ছে। এটাকেই তিনি বলছেন দ্যা এক্সপানশন অফ ইগনোরেন্স।

তথ্যের প্রবাহ বাড়ার সাথে সাথে অপ্রক্রিয়াজাত তথ্যের মূল্য কমে যায় এবং মূল্য থাকে সেই সব তথ্যের যা আমাদের কাছে সংকলিত, অনুবাদিত, সহজবোধ্য; আমাদের বোধগম্য অবস্থায় যা পাওয়া যায়।

আপনি চিন্তা করুন দশ বছর আগের ইন্টারনেটের কথা। তখন বাংলা ইউনিকোড ছিল না। বাংলা ভাষায় কটি ডকুমেন্ট পাওয়া যেত? আজকে বাংলা উইকিপিডিয়ায় ২০০০০ এরও বেশী এন্ট্রি আছে। বাংলা ব্লগগুলোতে হাজার হাজার পোস্ট (যদিও যথার্থতা, মান নিয়ে প্রশ্ন আছে অনেকগুলোর)। কয়েক বছর আগের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী পাঁচ কোটি ব্লগের ৩৯% ইংরেজী ভাষায় ছিল। এর পরে ছিল জাপানী (৩৩%), চৈনিক (১৪%), স্প্যানিশ (৩%), ইটালিয়ান (৩%), রাশিয়ান (২%), ফ্রেন্চ (২%), পর্তুগীজ (১%), জার্মান (১%) ইত্যাদি। বর্তমানে এই পরিসংখ্যান নিশ্চয়ই অনেক বদলেছে, ইংরেজী ভাষার আধিপত্য কমে অন্যান্য ভাষার জাগরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কারন সবাই তার নিজের ভাষায় কথা বলতেই স্বাচ্ছন্দ বোধ করে।

তবে ইথান জুকারম্যান বলছেন যে আজকের ইন্টারনেট পরিমন্ডলে ভাষাগত বিচ্ছিন্নতার ভয় রয়েছে। আগের ইংরেজী ভাষার আধিপত্যের সময় পাঠকরা ভাষার বাধা ডিঙ্গিয়ে এক ভাষায় কথোপকথনের চেষ্টা চালাতো। বর্তমানে নিজের ভাষায় কথোপকথনের সুবিধার কারনে ইন্টারনেটে দেখা যাচ্ছে যে বিভিন্ন ভাষা ভাষাভাষীদের কমিউনিটিরা নিজেদের মধ্যে তথ্য আদানপ্রদানেই ব্যস্ত বেশী এবং অন্যান্য ভাষার কমিউনিটির সাথে যোগাযোগে আগ্রহী নয়। বা আগ্রহী নয় অন্যান্য ভাষায় পাওয়া যাওয়া বিষয়গুলো সম্পর্কে জানতে।

বিশ্বের অনেক কিছুই আমরা ভাষা জানি না বলে অন্যের দৃষ্টিতে দেখি। গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ এর বই বাংলায় অনুদিত হচ্ছে কি না বলে হা পিত্যেশ করে বসে থাকি, যাও হয়ত অনুবাদ করা হবে ইংরেজী অনুবাদ থেকে।
ভাষার বাধা তথ্য প্রবাহে মস্ত বড় বাধা। আমরা বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় পাওয়া যাওয়া ইন্টারনেট কন্টেন্টের কত অংশ বুঝতে পারি? এমন তথ্য নিশ্চয়ই আছে যা আমি জানতে চাই কিন্তু ফার্সী ভাষায় আছে বলে জানতে পাচ্ছি না। কিন্তু এই বাধা দুর করার উপায় কি?

বর্তমানে বেশ কিছু ভাষার জন্যে মেশিন ট্রান্সলেশন সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে। গুগল ৪২টি ভাষা সাপোর্ট করে, কিন্তু তার মধ্যে বাংলা নেই। আর মেশিন অনুবাদের মানও আশানুরুপ নয়। মেশিন ট্রান্সলেশন নিয়ে কাজ করছে এমন এক প্রযুক্তিবিদের সাথে আলাপ করে জানলাম যে আগামী দশ বছরেও পার্ফেক্ট অনুবাদ প্রযুক্তি আবিষ্কারের সম্ভাবনা কম। কারন অনুবাদের সাথে স্টাইল, প্রাসঙ্গিকতা, সাংস্কৃতিক পটভূমি ইত্যাদি জড়িত এবং এটি শিল্প বলেই একে লজিকের দ্বারা সম্পূর্ণ বাধা যায় না। মেশিন অনুবাদের দ্বারা খুঁটিনাটি ও খাপছাড়া কাজ চলবে কিন্তু রিসার্চ বা প্রচলিত অনুবাদের জন্যে মানুষ কর্তৃক অনুবাদের বিকল্প নেই।

সারা বিশ্বের লক্ষ কোটি মানুষ একের অধিক ভাষা জানে। যে বাংলা এবং হিন্দি জানে, সে সহজেই হিন্দি থেকে বাংলা ভাষায় অনুবাদ করতে পারে (যা মেশিন অনুবাদের মাধ্যমে সম্ভব নয়, এখনো)। অনেকেরই সময় আছে তা করার জন্যে। ওপেন সোর্সের মত ওপেন ট্রান্সলেশন ও একটি আন্দোলন যার মাধ্যমে ইতিমধ্যে বেশ অনেকগুলো সফল কাজ হয়েছে বিশ্বের অনেক ভাষায়ই। বাংলার ক্ষেত্রে কলাবরেটিভ ট্রান্সলেশন এবং লোকালাইজেশন এর উদাহরণস্বরুপ বাংলা উইকিপিডিয়া, গ্লোবাল ভয়েসেস বাংলা সংস্করণ, ওয়ার্ডপ্রেস বাংলা লোকাইলেজেশন প্রকল্প মেঘদুত ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

একটি বাংলা মেশিন ট্রান্সলেশন প্রকল্প - অনুবাদক কাজ করছে সেটিও ক্রাউডসোর্সিং (স্বেচ্ছাসেবীদের ইনপুট) এর মাধ্যমে এগিয়ে চলছে।

ইন্টারনেটকে আমাদের নিজস্ব ভাষায় সহজবোধ্য করার জন্যে দরকার বিভিন্ন টুল এবং আগ্রহী স্বেচ্ছাসেবী। যে যেই দ্বিতীয় ভাষা জানেন সেই ভাষার কন্টেন্ট যদি বাংলায় অনুবাদ করেন ও ইন্টারনেটে প্রকাশ করেন তাহলে বাংলা ভাষা ইন্টারনেটে প্রাণ পাবে। বেশী পরিমান লোক অনায়াসে তথ্য পাবে যা এখনও সহজলভ্য নয়।

ইথান জুকারম্যানের কথা দিয়েই শেষ করি:
"For the internet to reach its potential in bridging human differences, we need to make the problems of language and translation center to our conversations about the future of the internet."
অনুবাদের ভারটুকু আপনাদের উপরই ছেড়ে দিলাম।

বি: দ্র: গত মাসে আমস্টারডামে ওপেন ট্রান্সলেশন টুলস কনফারেন্সে অংশ নেয়ার পর তা নিয়ে লিখব লিখব করছিলাম। কিন্তু সুযোগ হয়ে উঠছিল না। এটি তার পটভূমি মাত্র। পরবর্তীতে বিস্তারিত আলোচনা করব।

(ছবির সূত্র)

 প্রথম প্রকাশ: সচলায়তন

Friday, July 03, 2009

অন্কেল আর টান্টে ক্লুটজকোভস্কি

ক্লুটজকোভস্কি দম্পত্তি
আশি বছর বয়সী এই জার্মান বুড়ো এবং তার স্ত্রীর সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক কি? তাদের সাথে দেখা হওয়ার আগে তা ঘুণাক্ষরেও অনুমান করার উপায় ছিল না।

হঠাৎ করেই এক দাওয়াতে পরিচয় তাদের সঙ্গে। উনি প্রথমেই উপস্থিত সবার কাছে ক্ষমা চাইলেন যে তার ইংরেজী জ্ঞান খুবই সীমিত। ওনার স্ত্রী একেবারেই পারেন না, তাই আমাদের কারও কারও কথা অনুবাদ করে দিতে হচ্ছিল। পাশে বসেছিলাম বলেই অনেক কথা বলার সুযোগ হলো এবং আস্তে আস্তে আমরা সত্তুরের দশকে চলে গেলাম। আশে-পাশের সব কিছুই তখন গৌণ মনে হতে লাগল।

১৯৩০ সালে জন্ম হর্সট ক্লুটজকোভস্কির। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকার অনেক অংশই চোখের সামনে দেখা। বাস তার বৃহত্তর বার্লিনের বুখ অঞ্চলে। ১৯৭২ সালে তিনি একটি ফিল্ম স্টুডিওতে কাজ করতেন। তিনি ছবি তুলতেন আর তার স্ত্রী সাহায্য করতেন তা প্রসেস করতে। হঠাৎ করেই তার কাছে খবর এল বাংলাদেশ থেকে কিছু আহত যোদ্ধা এসেছে বুখের সলিডারিটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে। বাংলাদেশ! তার স্ত্রী বলছিলেন যে সাধারণ: জার্মানদের কাছে ভারতীয় উপমহাদেশের সবাই হচ্ছে ইন্ডার (ভারতীয়)। ভারত সম্পর্কে নানা কল্পকাহিনী জানা থাকায় তাদের সম্পর্কে কৌতুহলও কম ছিল না। তাই তারা ছুটে গেলেন এই যোদ্ধাদের সম্পর্কে জানতে। প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল একটি ডকুমেন্টারী করার। সেটি করলেনও এবং তার থেকেও বেশী এই বাদামী কিছু মানুষের টান্টে (মাসী) আর অন্কেল (কাকা) হয়ে গেলেন চিরদিনের জন্যে।

পূর্ব জার্মানী হচ্ছে তৃতীয় দেশ যে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় (১১ই জানুয়ারী ১৯৭২)। এর পরেই ধাপে ধাপে বেশ কিছু আহত মুক্তিযোদ্ধাকে সেখানে পাঠানো হয় চিকিৎসার জন্যে। এদের প্রাথমিক সমস্যা ছিল ভাষা। অন্কেল হর্সট তার ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজী দিয়ে এদের সাহায্য করতে থাকেন।

টান্টে বলছিলেন যে নার্স খাবার নিয়ে এসেছে। মসলা ছাড়া আলু ভর্তা আর সব্জি দেখে আহত যোদ্ধা বলে চলে নো নো রাইস, রাইস। নার্স বুঝতে পারছে না কি করবে। তখন তিনি নার্সকে বলে সস বা ভাত যোগ করে কিছুটা খাবার উপযোগী করে দেন। একজনের কনুই থেকে দুই হাত কাটা পড়েছে। টান্টে প্রতিদিন চলে যেতেন তার কাছে। বাহু দুটো চুলকে দিলে কিছুটা আরাম পেতেন যোদ্ধা। পরম মমতাভরা তাদের এইসব সাহায্য বাঙালী যোদ্ধারা কৃতজ্ঞতা ভরে এখনও স্মরণ করে, তারা বললেন।

সে অনেক নাম; হারুন, হক, দৌলা, শেরু যাদের তারা শুশ্রূষা করেছেন। আমি অধিকাংশকেই চিনতে পারলাম না, চেনার কথাও না। এর পর ব্যাচের পর ব্যাচ আহত মুক্তিযোদ্ধারা সেখানে যেতে লাগল পরবর্তী কয়েক বছরে। তারা পূর্ব বার্লিনে নেমেই অন্কেল-টান্টের খোঁজ করতে লাগলেন। শেরুর (প্রাক্তন কুটনীতিক শমসের মবিন চৌধুরী) কথা বলতে থাকলেন যে শরীরটা বেশ খারাপ হয়েছিল কারন পায়ের হাড্ডি চূর্ণবিচুর্ণ হয়েছিল। ডাক্তাররা মনে করেছিলেন বাঁচাতে পারবে না। অপারেশনের দিন সারারাত টান্টে জেগে ছিলেন। তারপর ভালো হয়ে যাওয়ার পর পায়ের ব্যান্ডেজের জন্যে প্লেনে ফিরতে পারছিলেন না শেরু। বিশেষ কার্গো প্লেনের জন্যে অপেক্ষা করতে হলো তিন মাস। এ তিন মাস তিনি টান্টে-অন্কেলের কাছেই নিজের ছেলের মত ছিলেন এবং খুব ভালোভাবে জার্মান ভাষা শিখেছিলেন। এভাবেই নানাপ্রকারে এই দম্পতি বাঙ্গালীদের সাহায্য করেছেন।

তিনি শুনেছেন যোদ্ধাদের নিয়ে তৈরি তার ডকুমেন্টারিটি বাংলাদেশে প্রচারিত হয়েছিল নাকি ৭৩-৭৪ সালে। আমি জিজ্ঞেস করলাম জার্মানিতে প্রচারিত হয়নি? তিনি বললেন, "না" এবং আর কিছু বললেন না। আমি নাছোরবান্দা ভাবে জিজ্ঞেস করেতে লাগলাম ডিডিআর সরকারের ভূমিকা ছিল কত বাঙ্গালীদের সাহায্য করায়?

তিনি তখন বলা শুরু করলেন, "আমি যা করেছি ব্যাক্তিগত ভাবেই করেছি। আমি জানি যুদ্ধের বিভীষিকা কি। আমি যখন তাদের সাহায্য করা শুরু করি তখন নানা পক্ষ বিভিন্ন ভাবে ব্যাপারটি দেখে। বাংলাদেশ এম্ব্যাসী থেকেও আমার ডাক শুরু হয়, যেন আমার কাজই তাদের সাহায্য করার। আমার বাসায় কয়েকজন বাঙ্গালী থাকা অবস্থায় আমি লক্ষ্য করলাম আমার বাড়ীর সামনে পুলিশ পাহাড়া। আমি ভাবলাম ডিডিআর সরকার হয়ত তাদের সিকিউরিটির জন্যেই রেখেছে। কিন্তু ক্রমেই পরিস্কার হতে লাগলো আমি তাদের পূর্ণ নজরদারীতে। এম্ব্যাসীর সাথে যোগাযোগও তারা ভাল চোখে দেখে না। আমার বাড়ীতে যেসব গাড়ী আসে সেসবের নম্বর প্লেট তারা টুকে নেয়। দুই জার্মান একত্রীকরণের পরে পুরোনো স্টাসী রেকর্ডগুলো উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। সেখানে গিয়ে আমার ফাইলে দেখে এসেছি - আমার বিরুদ্ধে সন্দেহ করা হচ্ছিল যে আমি গোয়েন্দাবৃত্তি করে বাংলাদেশে তথ্য পাচার করছি।"

বাংলাদেশে কখনও জাননি? জিজ্ঞেস করতে তিনি বললেন "পূর্ব জার্মান সময়ে সেটা তো সম্ভবই ছিল না। শেরু ইতালীর দুতাবাসে কর্মরত থাকা অবস্থায় আমাকে রোমে নিয়ে যাবার জন্যে ডিডিআর এর মন্ত্রী পর্যায়ে যোগাযোগ করে। কিন্তু ছাড়পত্র মেলেনি। আর এখন তো বুড়ো হয়ে গেছি, আমার স্ত্রীর প্লেনে চড়া মানা।"

এতসব বাধা-বিপত্তি সত্বেও বাঙ্গালীদের প্রতি তাদের স্নেহ কখনো কমেনি। তিনি বললেন এখনও মাঝে মধ্যে তিনি ফোনকল পান "হাই অন্কেল, হাউ আর ইউ। আর ইউ স্টিল ড্রাইভিং ইওর কার? দেন ইউ আর স্টিল ইয়ং।" আর তাদের স্মৃতি রোমন্থন করে বুড়োবুড়ির দিন কাটে।

আমি বললাম আপনার কাছে এত গল্প এগুলোতো প্রকাশ করা উচিৎ। লিখেই ফেলুন না একটি বই। উনি বললেন "হ্যা আগে তো সম্ভব ছিল না। এখন তা করাই যায়।" কিন্তু কথা আর এগুলো না, কারন সবারই যাওয়ার পালা।

আমি ভাবতে লাগলাম আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে এই যে নানা গল্প রয়েছে সেগুলো হয়ত একসময় এমন মানুষের মৃত্যুর সাথে সাথে স্মৃতির অতলে তলিয়ে যাবে। অন্কেল-টান্টের মত এইসব সুহৃদরা কি অনুল্লেখিতই থেকে যাবে?

তাদের নিয়ে কোন লেখা বা তাদের ডকুমেন্টারিটি নিয়ে কোন রিপোর্ট চোখে পড়েনি। কেউ যদি কখনও খুঁজে পান জানালে বাঁধিত হব।

প্রথম প্রকাশ: সচলায়তন

Saturday, April 11, 2009

সেইসব বীরঙ্গণা এবং যুদ্ধশিশুর কথা

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ ছিল যেন এক মৃত্যুপুরী, শয়তানের লকলকে জিভে চাটা এক নড়ক। লক্ষ লক্ষ মানুষ জীবন দিয়েছে, গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। ২ লাখেরও বেশী নারীর সম্ভ্রম কেড়ে নেয়া হয়েছে।



সুজান ব্রাউন মিলার তার Against Our Will: Men, Women and Rape বইটিতে লিখেছেন যে ধর্ষণকৃত নারীদের সৌন্দর্য দেখে বাছা হত এমন নয়। আট বছর বয়সী মেয়েশিশু থেকে ৭৫ বছরের বুড়ী পর্যন্ত পাক বর্বর হায়েনা থেকে রেহাই পায়নি। কোন কোন নারীকে সারা রাত ধরে গণ ধর্ষণ করা হয়েছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইস্টার্ন কন্টিজেন্টের চীফ জে. একে নিয়াজী দম্ভ নিয়ে বলেছিলেন "আপনারা কি ভাবে আশা করেন একজন সৈন্য পূর্ব পাকিস্তানে থাকবে যুদ্ধ করবে আর মারা যাবে এবং সেক্স করবে ঝিলমে গিয়ে?" (ইস্ট পাকিস্তান, দ্য এন্ড গেম - ব্রীগেডিয়ার এ আর সিদ্দিক )। এসব সেনাদের হাতে নারীদের তুলে দিত রাজাকার আলবদরেরা।

যুদ্ধ শেষ হবার পরে এই সব ধর্ষিতা নারী এবং তাদের গর্ভের অগণিত যুদ্ধ শিশুদের নিয়ে এক অবর্ণনীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বঙ্গবন্ধু তাদের সম্মান দিয়ে বলেন তারা আমার মেয়ে। তাদের বীরঙ্গণা ইত্যাদি নামে ডাকা হয়। কিন্তু তাদের অবস্থা ছিল অবর্ণনীয়। অনেকে সামাজিক গন্জনা সইতে না পেরে আত্মহত্যা করে।

এনবিসি নিউজ আর্কাইভে সেই সময়কার পরিস্থিতি নিয়ে একটি রিপোর্ট আছে।


আমেরিকা থেকে ডাক্তাররা আসে গর্ভপাত করাতে।



এই রিপোর্টে বলা হয়েছে ১৫০০০০ থেকে ১৭০০০০ বীরঙ্গনাকে গর্ভপাত করানো হয়েছে সরকারী মাতৃসদনে ও সনাতনী দাই ইত্যাদি দ্বারা।

এর পরেও অনেক যুদ্ধশিশু জন্মেছে। মাদার তেরেসা ১৯৭২ সালে এসে বেশ কিছু শিশুকে দত্তকের মাধ্যমে কানাডা, ফ্রান্স, সুইডেন ইত্যাদি দেশে পাঠান। এর পেছনে সরকারী চাপও ছিল। বঙ্গবন্ধু নাকি বলেছিলেন পাকিস্তানী হায়েনাদের রক্ত আছে এমন শিশুদের আমরা দেশে থাকতে দেব না।

১৯৭২ সালের ২৯শে মে নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছে:

Bangladesh government, at instigation of US social workers, is setting up a legal machinery for international adoption of child victims of occupation and war, including unwanted offspring of women raped by Pakistani soldiers;

কত শিশু বাইরে গেছে এভাবে তার হিসেব নেই। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী ১৯৭৪ সালের দিকে এই যুদ্ধশিশুর ব্যাপারটি ধামাচাপা পড়ে যায়।

মাসুদা ভাট্টি ইউরোপে অবস্থানরত এক বীরঙ্গণার কথা লিখেছেন। সেটি পড়ে অনেক মন খারাপ হয়ে রয়েছে তাই এখানে কিয়দংশ তুলে দিচ্ছি :

কথা শুরু হয়েছিল ২৫শে মার্চের রাত নিয়ে, ২৬ মার্চের সকালে চলে গেলেন আনা।ট্রাকে করে আমাদের নিয়ে এলো ওরা। আমরা কয়েকজন, দু’একজন মুখ চেনা। কেউ কারো দিকে তাকাতে পারছিলাম না। কোথায় এলাম বুঝিনি, ঢাকার শহরতো ভালো করে চিনি না। একটা মেয়েকে দেখলাম হাতে করে কোরআন শরীফ নিয়ে এসেছে।থর থর করে কাঁপছে। কাঁদছে অঝোরে, শব্দহীন। আসলে আমরা সবাই কাঁদছিলাম, অথচ কেউই শব্দ করে নয়, আমরা মনে হয় শব্দ করতে ভুলে গিয়েছিলাম।

তারপর যেখানে এলাম, সেখানে লাইন ধরে অনেকগুলো রুম।আমাদের একই রুমে রাখা হলো। তখন দুপুর হবে মনে হয়, তখন ওরা এলো, একের পর এক। কিছু বলার সুযোগ দেয়নি, একের পর এক, আমরা মাত্র ছয় কি সাতজন। আর ওরা সংখ্যায় কতো ছিল এখন আর মনে করতে পারি না, তবে চাইও না।

“জানেন, আমরা প্রতিদিন কোরআন পড়তাম। ওরা তাও মানতো না। ছুঁড়ে ফেলে দিতো। পরে শুনেছি যে, ওরা নাকি মসজিদে ঢুকেও মানুষ হত্যা করেছে। জানেন, আমার আর কোনও আনুষ্ঠানিক ধর্মের প্রতি বিশ্বাস নেই। এরপর নিজেকে আমি ধর্ম থেকে সরিয়ে নিয়েছি”।

মাসুদা ভাট্টি লিখেছেন:

১৯৭১ সালে যেসব পাকিস্তানী সৈন্য বাংলাদেশে লুটতরাজ, ধর্ষণ ও নির্যাতন চালিয়েছে তারা তো কেউই ধর্মে অবিশ্বাসী ছিল না, বরং তারা সকলেই ছিল ধর্মপ্রান মুসলিম। ১৯৭১ সালের নয়মাস ধরে চলা যুদ্ধে একটি মাস ছিল রমজান মাস। সেই মাসেও কিন্তু পাকিস্তানী সৈন্যবাহিনী ধর্ষণের মতো গর্হিত কাজ করেছে, কি করেনি? তখন কিন্তু ধর্ম তাদের এই অনাচার থেকে রুখতে পারেনি। তার মানে তারা এ ব্যাপারে নিশ্চিত ছিল যে, তারা যা করছে তা আসলে ইসলামকে রক্ষায়। সেদিক দিয়ে বিচার করতে গেলে, ১৯৭১ আসলে আর কিছুই নয়, ধর্মের নামে নিরীহ মানুষকে হত্যা আর নারী ধর্ষণের চূড়ান্ত উদাহরণ।

আনার মতো এরকম অনেক মেয়ে, একাত্তরে যাদেরকে পাকিস্তানীরা “গণিমতের মাল” হিসেবে যথেচ্ছ ব্যবহার করেছে, স্বাধীন দেশে আমরা তাদেরকে নিয়ে বিব্রত বোধ করেছি। আমি নিশ্চিত ১৯৭১ যদি তখন না হয়ে এই ২০০৯ সালেও হতো আর একই ঘটনার শিকার হতো বাঙালি নারী, আমাদের মানসিকতার বিন্দুমাত্র পরিবর্তন আমরা দেখতে পেতাম না। আনার মতো বাংলার শেফালি, রত্না, চম্পা বা অন্য যে কাউকেই এরকম বিদেশে এসে নাম পরিবর্তন করতে হতো, নয়তো দেশেই আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হতো।

এইসব বীরদের এবং এই সব যুদ্ধশিশুদের সম্পর্কে কি আমাদের সচেতন হওয়া উচিৎ না?

আরও পড়ুন:
* একাত্তরে নারীরা
* বীরঙ্গণার গল্প
*বীরঙ্গণাদের কষ্ট
* তারা বীর, বীরঙ্গণা নয়

প্রথম প্রকাশ: সামহোয়্যার ইন

Friday, April 10, 2009

অর্ডনুঙ্গ - নিয়ম

বার্লিনের কাছে ওরানিয়েনবুর্গে সাক্সেনহাউজেন কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে যে কয়েকবার গিয়েছি সে কয়বারই প্রশ্নটি মাথায় এসেছিল যে এত বড় হত্যাযজ্ঞ -হলোকস্ট সংঘটন তো সম্মিলিত কর্ম। যে লাশ বহন করেছে বা প্রহরী ছিল তারা কখনও বেঁকে বসেনি? মানুষ খুন করতে অস্বীকৃতি জানায় নি? আমরা কিন্তু কম উদাহরণের কথাই জানি যেখানে দেখা যায় যে ইহুদীদের বাঁচানোর চেষ্টা করেছে কোন জার্মান নাগরিক। ব্যতিক্রম নিশ্চয়ই শিন্ডলার্স লিস্ট চলচ্চিত্র খ্যাত জার্মান ব্যবসায়ী অসকার শিন্ডলার যিনি বেশ কিছু ইহুদীকে তার কারখানায় কাজ দিয়ে বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন। তবে তিনিও বিতর্কের উর্ধে নন কারন নাজী পর্টির সদস্য হিসেবে তিনি তার দায়িত্ব এড়াতে পারেন না। তিনি নিজেই স্বীকার করেছিলেন যে সস্তা শ্রম পাবার জন্যে তিনি ইহুদীদের ব্যবহার করতেন।

সাম্প্রতিকালের দ্য রিডার ছবিতে হানা স্মিৎজ (কেইট উইনস্লেট যার জন্যে অস্কার পেয়েছে) এর বিচার যখন হচ্ছিল তখন তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে এস এস গার্ড হিসেবে তাদের কাছে ৩০০ জন বন্দী যখন বিমান থেকে ফেলা বোমার আগুণে পুড়ছিল তখন সে কেন দরজা খুলে দেয়নি। সে তখন বলেছিল যে "এরা আমার রেসপনসিবিলিটি ছিল তাই কি করে তাদের ছেড়ে দেই?"

ব্যাপারটি যতই বালখিল্য মনে হয় আসলে এটি কিন্তু জার্মান চারিত্রিক বৈশিষ্টের একটি অংশ। তারা নিয়ম পালনের ক্ষেত্রে এতটাই নির্মম এবং সাধারণত: একচুলও নড়ে না।

নিকোলাস কুলিশ দ্যা নিউইয়র্ক টাইমসে জার্মান চরিত্রের এই অংশ তুলে ধরেছেন। উনি উদাহরন দিয়েছেন যে রাস্তা ঘাটে কত নিয়ম আছে এবং সেগুলো কঠোরভাবে পালন করা হয়। অথচ মোড়ে মোড়ে পুলিশ নেই বা ভিডিও ক্যামেরা নেই তা পর্যবেক্ষনের জন্যে।

আমার নিজের অভিজ্ঞতাও তাই। দৈনন্দিন অনেক নিয়মকেই তাদেরকে চোখে চোখে রাখার দরকার হয় না। তারা নিজেরা তা মানে এবং অপরকে স্মরণ করিয়ে দেয় তা সঠিকভাবে পালনের জন্যে। এবং অনেকক্ষেত্রে এইটি খুব অনধিকার চর্চাও মনে হয়। এক অজপাড়াগায়ে একটি খালি পার্কিং লটে গাড়ী রেখে ম্যাপ দেখছি তখন এক বুড়ো এসে বলল এটি ইনভ্যালিড পার্কিং এখানে রাখতে পারবে না তুমি। আমি বললাম পাশে আরও যায়গা আছে ইনভ্যালিডদের জন্যে কাজেই আমি কারও সমস্যা করছি না, আমি একটু পরেই চলে যাব। কিন্তু সে নাছোড়বান্দা - বলল এখানে রাখা নিষিদ্ধ তোমাকে সরাতেই হবে। নিয়মের বাইরে কোন কিছু সে মানতে রাজী নয়। এভাবেই তারা ছোটকাল থেকে শিক্ষা লাভ করেছে। আমি আমল না দিয়ে ম্যাপের দিকে মনযোগ দেয়ায় বুড়ো গজগজ করতে বাড়ীর দিকে গেল। আমি অবশ্য কিছু পরেই সরে গেলাম কারন না হলে সে হয়ত পুলিশ ডাকত।

নিয়মের প্রতি বাধা থাকা এই চারিত্রিক বৈশিষ্টের কারনে এজন্যেই জার্মানদের বাহ্যিক দৃষ্টিতে বেশ রবোটিক মনে হয়। এবং কারো সাথে ভালভাবে না মিশলে ভেতরের মানবিক দিকগুলো জানা যায় না।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার তাদের নির্লিপ্ততার কারন কি নিয়ম মানার এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট ছিল কি না সেটা বিতর্কের বিষয়। জার্মানিতে নুরেমবুর্গ আইন (১৯৩৫) করে ইহুদীদের সমাজচ্যুত করা হয় এবং ইহুদীদের বিবাহ ইত্যাদি নিষিদ্ধ করা হয়। ইহুদীদের নিধনের ফাইনাল সল্যুশনও লিখিতভাবে প্রণীত হয়েছিল। কাজেই অনেকের যুক্তি হতে পারে যে সাধারণ লোক নির্দেশ মেনেছে শুধু।

জার্মানদের নিয়্ম সম্পর্কে সাধারণ ধারণা হচ্ছে যে মানুষের ভালোর জন্যেই তা তৈরি। তবে নিয়ম মানতে গিয়ে মানুষের ক্ষতি করা কি উচিৎ কিনা এবং এ নিয়ে তারা ভাবে কি না জানার আগ্রহ আছে।

প্রথম প্রকাশ: সচলায়তন

Monday, April 06, 2009

সুনিতা পালের সুলুক সন্ধানে

বর্তমান বাংলাদেশে, বিশেষ করে ট্যাবলয়েড পত্রিকার জগৎে সেনসেশনাল নাম হচ্ছে তথাকথিত সাংবাদিক সুনিতা পাল। উনি বাংলাদেশ সম্পর্কে তার একের পর এক জ্বালাময়ী লেখায় মতামতের ফুলঝুড়ি ছুটিয়ে যাচ্ছেন। এমনকি সাংবাদিকরাও বলছেন যে কোন সূত্র না উল্লেখ করেই যে উনি যেসব মনগড়া কথা লিখছেন তা কোনমতেই সাংবাদিকতার আওতায় পড়ে না।

সুপ্রিয় পাঠক, এখন আমরা জানার চেষ্টা করব আসলে তিনি কে? অ্যামেরিকান ক্রনিকল নামক অনলাইন ম্যাগাজিনে তিনি নিয়মিত লিখে থাকেন। সেই ওয়েবসাইটে দেয়া তার প্রোফাইল অনুযায়ী ১৯৫২ সালে ভারতের কোচিনে তার জন্ম।

কিন্তু একটি যায়গায় এসেই খটকা লাগে:



"Born as a deaf and dumb, Sunita Paul decided to use pen in expressing herself. "


কেমন যেন উপন্যাসের মত শোনায় না? আমাদের উপমহাদেশে একজন নারী বোবা কালা হয়ে জন্মালেন আর কলমের সাথে তার মত প্রকাশে ব্রতী হলেন। তিনি প্রতিবন্ধী হয়ে সমস্ত পলিটিকাল সায়েন্স আর সাংবাদিকতায় তার দুটি মাস্টার্স ডিগ্রি করেছেন আর দু:খের বিষয় হচ্ছে এই বিরল কৃতিত্বের সংবাদটি আমরা কোথাও খুঁজে পাইনা। তার লেখা বিশটিরও অধিক আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে নিয়মিত ছাপা হচ্ছে, অথচ তার নিজের সম্বন্ধে একটিও লেখা নেই।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল ২০০৫/২০০৬ এর আগে সুনিতা পালের খবর কেউ শোনেনি।

আব্দুল বাতেন লিখেছেন:



"তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন বিষয়ে প্রায় বিশেষজ্ঞ বলা যায়। বাংলাদেশ নিয়ে লিখেছেন অনেক। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন ওঠে, বাংলাদেশ বিষয়ে এহেন একজন বিশেষজ্ঞের কথা কেন আমরা এতদিন জানতাম না। হোন তিনি বাংলাদেশ বিরোধী একজন লেখক কিন্তু তারপরও বাংলাদেশ নিয়ে এত ধারণা যার তার বিষয়ে কিছু খোঁজখবর তো আমাদের কাছে থাকার কথা ছিল। "

বাংলাদেশ বিষয়ে এমন জানাশোনা যে ব্যক্তির বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে তার কিছু না কিছু যোগাযোগ তো থাকতেই হয়। স্বাভাবিক এই প্রশ্ন থেকেই আবার অনুসন্ধান চলে। যোগাযোগের সূত্রটি কিছুটা বের হয়ে আসে। বাংলাদেশের একটি পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লেখেন। ইংরেজি পত্রিকাটির নাম উইকলি ব্লিটজ।http://www.weeklyblitz.net/ ব্লিটজ পত্রিকাটির সম্পাদক সালাউদ্দিন শোয়েব চৌধুরী।

সুনীতা পাল এই শোয়েব চৌধুরীরর পত্রিকার নিয়মিত লেখেন। আরও মজার বিষয় শোয়েব চৌধুরীকে নিয়ে তিনি একাধিক লেখা লিখেছেন। আরও মজার বিষয় হলো, সুনীতা পাল যেসব পত্রিকায় লেখেন যেমন আমেরিকান ক্রনিকল বা গ্লোবাল পলিটিশিয়ান সেসব পত্রিকার নিয়মিত লেখকদের মধ্যে সালাউদ্দিন শোয়েব চৌধুরী অন্যতম। সুনীতা পাল ও সালউদ্দিন শোয়েব চৌধুরীর লেখার বিষয়, আগ্রহ প্রায় একই। সালাউদ্দিন শোয়েব চৌধুরী যেখানে বাংলাদেশ বিষয়ে নরম, সেখানেই সুনীতা পাল কঠোর। সালাউদ্দিন শোয়েব চৌধুরী ও সুনীতা পাল দুজনেই চান বাংলাদেশ ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিক এবং দেশটির সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করুক।


সুনিতা পাল এও বলেছেন যে সালাহউদ্দিন শোয়েব চৌধুরীর নোবেল পুরস্কার পাওয়া উচিৎ

এখন দেখা যাক সালাহউদ্দিন শোয়েব চৌধুরী লোকটি কে।

তার বায়োডাটায় দেখা যায় ১৯৯৫-১৯৯৯ পর্যন্ত তিনি এ-২১ টিভি চ্যানেলের এমডি ছিলেন। সেই টিভিটি ছিল বর্তমানে পলাতক মাফিয়া ডন আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের। তিনি ইনকিলাব পত্রিকার সাংবাদিক ছিলেন ২০০১-২০০২ সালে। তিনি শাহরিয়ার কবিরকে মোসাদ এজেন্ট বলে গালিগালাজ করেন তখন। তার তখনকার আর্টিকেল গুলো পরলেই তার রাজনৈতিক মতাদর্শ বোঝা যায়। উনি তারপর ইনকিলাব টেলিভিশনের শেয়ার কিনে তার ডাইরেক্টর হন। কিন্তু তার পর টাকা পয়সা নিয়ে অন্যান্য ডাইরেক্টর, যারা তৎকালীন বিএনপি-জামাত সরকারের আস্থাভাজন ছিলেন, তাদের সাথে গোলমাল লাগে। তার বিরুদ্ধে মামলা হয় ও গ্রেফতারী পরওয়ানা জারী হয়।

এর পর ২০০৩ সালের নভেম্বরে তাকে বিমান বন্দরে গ্রেফতার করা হয় ইজরায়েলে যাওয়ার প্রাক্কালে । তার কাছে কাগজপত্র ছিল যে তিনি ওখানে একটি সেমিনারে অংশগ্রহণ করতে যাচ্ছেন। আপনার যদি বাংলাদেশী পাসপোর্ট থাকে তাহলে দেখবেন যে সীল মারা আছে যে একটি দেশে শুধু আপনি যেতে পারবেন না তা হলো ইজরায়েল। অর্থাৎ তাকে ওই ক্লজে গ্রেফতার করা হয়। যদিও আগেই প্রভাবশালী একটি মহল উপরোক্ত কারনে তার উপর ক্ষেপে ছিল। তাকে এরপর জরুরী ক্ষমতা আইনে গ্রেফতার দেখানো হয় ও রাষ্টদ্রোহীতার মামলা করা হয়।

এরপর আন্তর্জাতিক এক চক্র তার মু্ক্তির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয় যার অগ্রভাগে ছিলেন ড: রিচার্ড বেনকিন । এই আমেরিকান ইহুদী লবিইস্ট শোয়েবের মুক্তির ই্স্যুতে বিভিন্ন খানে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে লেখা শুরু করেন। মজার ব্যাপার হলো ২০০৬ সালে তাকে তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার লবিইস্ট হিসেবে নিয়োগ দান করে

সালাউদ্দিন শোয়েব বর্তমানে বিচারাধীন তবে মুক্ত। তার বিচারের প্রতিটি পদক্ষেপ সম্পর্কে বাংলাদেশী সংবাদপত্রগুলো মৌণ থাকলেও ইজরায়েলী সংবাদপত্রগুলোকে সরব দেখা যায়।

সাজ্জাদ জহির যুক্তি দেখিয়েছেন যে সুনিতা পাল সালাউদ্দিন শোয়েবেরই ছদ্মনাম । আবার অন্যেরা বলেন যে তিনি বেনকিনেরই একটি সৃষ্টি এবং সুনীল নামের এক ভারতীয় নিউইয়র্ক থেকে এই ছদ্মনামে লিখে যাচ্ছেন।

এখন আমরা আবার আসি সুনিতা পালের লেখা প্রসঙ্গে। তিনি তার লেখায় যুক্তি ছাড়াই অনেক মতামত (কোন উৎস উল্লেখপূর্বক) দিয়ে থাকেন যা সবাইকে বিস্মিত করে। একজন বোবা কালা মহিলা কিভাবে বাংলাদেশ সম্পর্কে এত তথ্য পাচ্ছেন দেশের বাইরে থেকে এবং নিয়মিত (প্রায় প্রতিদিন) তা নিয়ে লিখেছেন সেটি বিস্ময়ের ব্যাপার। তবে সম্প্রতি বাংলাদেশী আমেরিকান ব্লগার ম্যাশ প্রমাণ সহ দেখিয়েছেন যে সুনিতা পাল তার ব্লগের লেখা থেকে কিছু অংশ বেমালুম মেরে তার আর্টিকেলে তুলে দিয়েছেন ম্যাশের কোন উল্লেখ ছাড়া। এরকম কত যায়গা থেকে তার চৌর্যবৃত্তি চলেছে তা এখন গবেষণার বিষয়। ম্যাশ জানিয়েছেন যে এই নকল লেখা প্রায় ডজনখানেক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

সুনিতা পাল আরাফাত রহমানের অসুস্থাবস্থা নিয়ে ব্যাঙ্গ করেছেন, তারেক রহমান ও তার বন্ধু গিয়াসউদ্দিন আল মামুন সম্পর্কে অনেক মন গড়া কথা বলেছেন, জেনারেল মইনকে ছেড়ে কথা বলেননি এবং হাসিনা পূত্র জয়ের বিরুদ্ধে কোনরুপ প্রমাণ না দেখিয়ে মনগড়া সব অভিযোগ করে যাচ্ছেন

তার লেখায় রয়েছে সেনাবাহিনীকে উসকে দেয়া যাতে তারা সাম্প্রতিক সরকারের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়। আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের ইমেজ নষ্ট করা ও কাল্পনিক সব গল্প বানানো তার বৈশিষ্ট।

সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথেই (২৯ ডিসেম্বর ২০০৮) তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের পেছনে লাগেন এবং এখনও তার সেই প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে।

একটি বিষয় নিশ্চিত যে তার সব কর্মকান্ড প্রমাণ করে যে সে বাংলাদেশের গণতন্ত্র এবং স্বাধীনতা ও শান্তির বিপক্ষে।

একজন বোবা কালা মহিলার পক্ষে এতটুকু করা মনে হয়না সম্ভব। কাজেই তিনি সত্যিকারের হলেও তার নাম ভাঙ্গিয়ে একটি মহল বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে আসছে আর তাকে তুলে ধরছে বাংলাদেশের এক শ্রেণীর ট্যাবলয়েড পত্রিকা। সাধু সাবধান।
 প্রথম প্রকাশ: সামহোয়্যার ইন