Monday, November 30, 2009

বার্লিন ওয়াল পতনের বিশ বছর পূর্তি: মনের দেয়াল ভাঙ্গাটাই আসল

আজকের খবরের চ্যানেলগুলোতে শুধু বার্লিন ওয়াল পতনের বিশ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানমালা - অনেকেই লাইভ দেখাচ্ছে। ১৯৮৯ সালে বার্লিন ওয়ালের এই পতন মধ্য ও পূর্ব ইউরোপব্যাপী সমাজতন্ত্র বিরোধী বিপ্লবেরই শক ওয়েভের ফসল হিসেবে ধরা হয়। তবে এটি আরও তাৎপর্য পূর্ণ। এটি হচ্ছে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া মায়ের পেটের দুই ভাইয়ের পুনর্মিলন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসীদের বিরুদ্ধে বিজয়ের পর সমন্বিত পরাশক্তিরা ১৯৪৫ সাল থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত জার্মানী দখল করে রাখে। ১৯৪৯ সালে আমেরিকা গ্রেট ব্রিটেন এবং ফ্রান্সের দখলে থাকা ১২টি স্টেটের সমন্বয়ে পশ্চিম জার্মানী গঠিত হয় এবং রাশিয়ার দখলে থাকা ৫টি স্টেট নিয়ে পূর্ব জার্মানী গঠিত হয়। প্রাক্তন রাজধানী বার্লিন শহরটি দুইভাগ হয়ে যায় এবং পশ্চিম জার্মানীর রাজধানী বন নির্ধারিত হয়। ১৯৫৫ সালে রাশিয়া পূর্ব জার্মানীকে পুরোপুরি স্বাধীন ঘোষণা করে, তবে রাশিয়ার সৈন্যরা পটস্ডাম চুক্তি অনুযায়ী সেখানে থেকে যায়, যেমন পশ্চিম জার্মানীতে আমেরিকা, ইউকে আর ফ্রান্স এর সৈন্যরা ছিল।

আলাদা হবার পরপরই ১৯৫০ এর দশকে পশ্চিম জার্মানী একটি অর্থনৈতিক বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে যায়। ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির অনেকটাই তারা কাটিয়ে উঠে। ঐদিকে পূর্ব জার্মানরা তেমন সৌভাগ্যবান ছিল না। সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রথম থেকেই তাদের উপর ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। তারা পোল্যান্ড আর চেকোস্লোভাকিয়া ছাড়া কোথাও যেতে পারত না (তাও বিশেষ অনুমতিক্রমে)। কিন্তু তবুও সীমিত আকারে আত্মীয় স্বজনের মধ্যে দেখা সাক্ষাৎ হত তখনও। তবে পশ্চিম জার্মানীতে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি থাকায় ১৯৫০ এর দশকে প্রায় ৩৫ লাখ পূর্ব জার্মানবাসী পশ্চিম জার্মানীতে চলে আসে। এই ঢল ঠেকাতে হঠাৎ করে ১৯৬১ সালে বার্লিনের মাঝামাঝি দেয়াল তুলে দেয়া হয় ও ডেথ জোন তৈরি করা হয় নো ম্যানস ল্যান্ডে। পরবর্তী বছরগুলোতে অনেকে এই ডেথ জোন পার হয়ে পালাতে গিয়ে মারা যায় পূর্ব জার্মান সৈন্যদের কাছে।

দুই জার্মানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে পূর্ব জার্মানীর সরকার খুব তৎপর ছিল। পশ্চিম জার্মান সরকারও মানবাধিকার ইস্যুগুলো খুঁচিয়ে একটি সংঘাতময় পরিস্থিতি বজায় রাখত। কিন্তু একই ভাষা, একই জাতি এবং একই পরিবারের মধ্যে টান কিন্তু ঘুঁচাতে পারে নি। ১৯৮৯ সালের অক্টোবর মাসে প্রায় ১৩০০০ পুর্ব জার্মানবাসী অষ্ট্রিয়া -হাঙ্গেরিয়ান সীমান্তে পালিয়ে আসে। চেকোস্লোভাকিয়ায় পশ্চিম জার্মান দুতাবাসে কয়েকশ পূর্ব জার্মান আশ্রয় নেয় এবং পরে তাদের বিশেষ ট্রেনে করে পশ্চিম জার্মানী নিয়ে আসা হয়। সে মাসেই এরিক হোনেকার পূর্ব জার্মানীর প্রিমিয়ার পদ থেকে সরে দারান।
ক্রমাগত রাজনৈতিক চাপে ১৯৮৯ সালের ৯ই নভেম্বর সরকার ঘোষণা দেয় যে তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে পূর্ব জার্মানদের উপর ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হবে। সেটা ছিল এক নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং তা নিয়ে কোন প্রস্তুতি ছিল না, এমনকি বর্ডার গার্ডরাও কিছু জানতেন না। তবে সেই ঘোষণা দেয়ার সময় এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন এই সিদ্ধান্ত কি কখন থেকে কার্যকর হবে? তখন মূখপাত্রটি আমতা আমতা করে বলেন আমিতো কোন সময় উল্লেখ দেখছি না - এখন থেকেই ধরতে পারেন। এটি সরাসরি টিভিতে দেখানো হচ্ছিল। তা শুনে দলে দলে লোক বার্লিনের বিভিন্ন চেকপোষ্টে চলে আসে। লোকের প্রচন্ড চাপে সীমান্তরক্ষীরা হাল ছেড়ে দেয় এবং সরে দাঁড়ায়। প্রায় বিশ হাজার লোক সেদিন দেয়াল ভেঙ্গে ও টপকে পশ্চিম জার্মানিতে চলে আসে। বার্লিন ওয়ালের পতন হয়।

এই ঘটনা পরবর্তী বছরে দুই জার্মান একীভূত করাকে তরান্বিত করে। 'আমরা এক জাতি - এই স্লোগানে আকাশ প্রকম্পিত হয়ে ওঠে।

আমাদের পূর্ব ও পশ্চিম বাংলাও এক সময় আলাদা হয়েছিল। জার্মানদের ক্ষেত্রে সেটি ছিল দেশ ভাগ এবং ভাবধারার ভিন্নতা। আমাদের ক্ষেত্রে সেটি ছিল ধর্মীয় ভাগ। একই ভাষা, একই সংস্কৃতি, একই জাতীয়তা। অথচ ধর্মের ভিন্নতা আমাদের দুরে ঠেলে দিল।

দুই জার্মানীকে আলাদা রাখার জন্যে সরকার অনেক চেষ্টা করেছে। পূর্ব জার্মানীতে টিভিতে একটি নির্দিষ্ট সময় ব্যয় করা হত পশ্চিম জার্মানীর বিরুদ্ধে খুনসুটি করার জন্যে। বাইরে দেয়াল থাকলেও কিন্তু লোকজনের মনে দেয়াল ছিল না। তাই দুই জার্মানীর আবার এক হওয়া সম্ভব হয়েছে।

কিন্তু আমাদের দুই বঙ্গের কি অবস্থা? ধর্ম-সাম্প্রদায়িকতার বিষ বাষ্প এখনও ছড়ায়। পশ্চিম বঙ্গে বাংলা ভাষার কদর কমে যাচ্ছে। নেই সেখানে বাংলাদেশী টিভি চ্যানেলের প্রবেশাধিকার। সাংস্কৃতিক বিনিময় আগের চাইতে অনেক কম। পশ্চিম বঙ্গে বাংলাদেশের ক'জন লেখকের বই বিক্রি হয়? পূর্ব বঙ্গ তথা বাংলাদেশে ভারত বিদ্বেষ এখন রাজনৈতিক এজেন্ডা- এটি কিছু মানুষের রুটি রুজির ব্যাপার। বাঙ্গালী সংস্কৃতিকে তারা হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি বলতে ব্যস্ত। আমরা না চাইলেও দুরত্বটা বেড়ে যাচ্ছে দিন দিন।

সব মিলে দুই বঙ্গের কারও কি ইচ্ছে হয় আবার কাঁটাতারের বেড়া ভেঙ্গে এক সাথে মেলার? জানি বর্তমান বাস্তবতায় হয়ত একত্রীকরণ বেশীই চাওয়া হবে। তবে নিদেনপক্ষে ভিসা বিহীন যাতায়াত, ইইউর মত ইকনমিক জোন?
কিন্তু সেটা সম্ভব করার আগে আমাদের মনের দেয়াল ভাঙ্গতে হবে।

প্রথম  প্রকাশ: সচলায়তন

Sunday, November 01, 2009

বাংলাদেশের বাক স্বাধীনতায় চীনের হস্তক্ষেপ



দৃক বাংলাদেশ এবং স্টুডেন্টস ফর এ ফ্রি তিবেত সংস্থার বাংলাদেশ শাখা সম্প্রতি তিব্বতের উপর এক আলোকচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করে। এই প্রদর্শনীটি গতকাল শুরু হয়ে নভেম্বরের ৭ তারিখ পর্যন্ত হবার কথা ছিল।

গত বৃহস্পতিবার ঢাকার চীন দুতাবাসের সাংস্কৃতিক এটাশে এবং কাউন্সেলর দৃক গ্যালারীতে এসে এর ম্যানেজিং ডাইরেক্টর ড: শহীদুল আলমের সাথে দেখা করেন এবং প্রদর্শনীটি বন্ধ করতে বলেন। তারা কিছু উপঢৌকনও নিয়ে এসেছিলেন। তাদের বক্তব্য হচ্ছে তিব্বৎ চীনের অন্তর্গত এবং এই প্রদর্শনী বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যেকার সম্পর্কে প্রভাব ফেলবে। ড: আলম বলেন যে দৃক একটি স্বাধীন গ্যালারী এবং চীনা দুতাবাস চাইলে তাদের বক্তব্য উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের দিনে পেশ করতে পারেন। এমনকি চীন চাইলে তাদের প্রদর্শনীও এখানে করতে পারবে। তারা গ্যালারী দেখে প্রস্থান করে।

কিন্তু এরপর নানা হুমকি আসতে থাকে দৃক এর উপর। ওদিকে স্টুডেন্টস ফর এ ফ্রি তিবেত এর সদস্যদের বাড়ীর আসে পাশে গোয়েন্দা হানা দেয়া শুরু করে। ফোন আসে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে: "চায়না আমাদের বন্ধু। দালাই লামার ছবি দেখিও না।" "না না, আমরা সেন্সরশীপের কথা বলছি না। তবে জানেনই তো..." এর পর এক নামকরা তারকার কাছ থেকে ফোন আসে। জাসদের এমপি হাসানুল হক ইনু ফোন করেন এবং স্মরণ করিয়ে দেন বাংলাদেশের এক চীন নীতির কথা এবং এই প্রদর্শনী বাংলাদেশের জনগণের জন্যে কি প্রভাব বয়ে আনবে তা। চারিদিক থেকেই চাপ আসতে থাকে এবং শেষে তা পুলিশী ধমকিতে পরিণত হয়।

এসবির লোক আসে শহিদুল আলমের সাথে দেখা করতে। তারা উদ্যোক্তাদের সবার পরিচয় জানতে চান। শহিদুল অফিসিয়াল অর্ডারের কথা জানতে চান। উত্তর আসে "আপনি খামাখা জটিল করে ফেলছেন।" এবং তাকে শুনিয়েই উপরওয়ালার সাথে কথাবার্তা চলতে থাকে। " উনি সহযোগিতা করছেন না.. আমরা বুঝিয়েছি ওনাকে ব্যাপারটা.. না না এখনও কিছু করি নি। এর পরে তারা আবার আসে এবং ধমক দেয় সরকারকে সহযোগিতা না করলে ভবিষ্যতে দৃকের কপালে খারাবি আছে।

গতকাল (পহেলা নভেম্বর) বিকেলে পুলিশের ফোন আসে, "প্রদর্শনী বন্ধ করুণ না হলে ফোর্স পাঠাবো।" ফোর্স পাঠাতে হল তাদের এবং তালা মেরে দেয়া হলো প্রদর্শনী হল। কাউকে ঢুকতে দেয়া হলো না দৃকে। প্রধান অতিথি অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমেদ (ট্রান্সপারেন্সী ইন্টারন্যাশনাল) দু ঘন্টা পর প্রতীকী উদ্বোধন করলেন। তখনও প্রদর্শনী বন্ধ ছিল - পুলিশ নাকি চাবি হারিয়ে ফেলেছে।

চীন সরকারের অন্যান্য দেশের উপর খবরদারীর এই লক্ষণ খুবই খারাপ। আর তাদের এই আন্তর্জাতিক সেন্সরশীপ অবশ্য বাংলাদেশ, নেপালের মত দুর্বল দেশের উপর শুধু ভালভাবে প্রয়োগ করতে পারে।

দৃক নিউজ সাইটটি এখন একটি রিপোর্টেড অ্যাটাক সাইট । এই কাজটি চীনের নেট সৈনিকদেরই কাজ হতে পারে। তাদের সেন্সরশীপের পরিধি তারা যত দুর সম্ভব বাড়াতে চেষ্টা করে এভাবে - যেমন তারা গত জুলাইতে মেলবোর্ণ ফিল্ম ফেস্টিভালে উইঘুর দের নিয়ে রাবেয়া কাদিরের চলচ্চিত্রটি দেখানো রোধ করতে ফেস্টিভ্যালের সাইট হ্যাক করে চাইনিজ পতাকা ঝুলিয়ে দেয়।

এর কারণ আমাদের রাজনীতিবিদগন এবং রাষ্ট্রযন্ত্র যারা ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্যে চীনের পা চাটে। আমরা কোন দেশে বাস করছি? চীন না বাংলাদেশ? একটি প্রদর্শনী করার জন্যে কেন চীনের অনুমতি নেয়া লাগবে?

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় চীনের অবস্থান সবাই জানে। তারা বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় বঙ্গবন্ধু হত্যার পরে। নব্বুই এর দশক পর্যন্ত বাংলাদেশীরা তাইওয়ান যেতে পারত না। কারণ পাসপোর্টে লেখা থাকতে ইজরায়েল ও তাইওয়ান ব্যাতিত সকল দেশে ভ্রমণ করা যাবে। এর পেছনেও ছিল চীন তোষণ নীতি। অথচ তাইওয়ানের সাথে ব্যবসা কি থেমে থেকেছে? বর্তমানে কি চীনের চাপে আবার বাংলাদেশ এরূপ ব্যান আরোপ করার ক্ষমতা রাখে (যখন কম্পিউটারের অনেক যন্ত্রাংশ আসে তাইওয়ান থেকে)?

চীন আমাদের তাদের ঠুনকো সস্তা জিনিষ বিক্রি করা ছাড়া কি দেয়? তারা সেতু নির্মাণ ইত্যাদিতে যেসব সহায়তা দেয় তা উসুল করে নেয় নিজস্ব নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার ও নিজস্ব লোকবল লাগিয়ে। কেন কারণ ছাড়া চীনকে তোষণ করতে হবে?

চীন একটি একনায়কতন্ত্র আর বাংলাদেশ একটি গণতন্ত্র। এদেশে চীনের নীতি ফলানো গণতন্ত্রের উপর সরাসরি হস্তক্ষেপ। কি হতো প্রদর্শনীটি হতে দিলে? কয়েকশ লোক হয়ত তা দেখত, ব্যাস। এখন এটি বন্ধ করে বাংলাদেশ যে পরিমাণ প্রচার পেল তাতে বরঞ্চ দেশের ইমেজের ক্ষতি হল। আমাদের তোষণ ও মোসাহেবী স্বভাব যে কবে পাল্টাবে এবং আমরা ভিক্ষার থালা ফেলে দিয়ে মেরুদন্ড সোজা করে কোনদিন বাঁচতে পারব সে বলা মুস্কিল।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব জনগণের সাংবিধানিক অধিকার - বাক স্বাধীনতাকে সমুন্নত রাখা - চীনের অভ্যন্তরীণ সমস্যাকে জিইয়ে রাখার জন্যে তাদের মদদ করা নয়। এই ব্যাপারটি তারা যত দ্রুত অনুধাবন করবেন ততই মঙ্গল।

এ নিয়ে আরও পড়ুন:

* শহিদুল আলমের ব্লগটুইটার

* গ্লোবাল ভয়েসেস অনলাইন

* মাশুকুর রহমান

* সাদা কালো

* রব গডেন

* মিডিয়া হেল্পিং মিডিয়া

Thursday, October 15, 2009

বৃটেনে যুদ্ধাপরাধীদের দৌরাত্ম্য

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত বাংলাদেশী ছাত্র দেলোয়ার হোসেইন সম্প্রতি গার্জিয়ান পত্রিকার কমেন্ট ইজ ফ্রি সেকশনে বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং ব্রিটেন যে কিছু যুদ্ধাপরাধী আছে তা নিয়ে একটি তথ্য বহুল লেখা লেখেন গত ৭ই মার্চ। তার রিপোর্টটির মধ্যে ছিল যুদ্ধাপরাধী চৌধুরী মঈনুদ্দিনকে নিয়ে কয়েকটি প্যারা যা সেন্সর করার পর বর্তমানে এখানে দেখা যাবে
প্রতিবেদনটি প্রকাশের সপ্তাহখানেক পরে মঈনুদ্দিনের আইনজীবিদের কাছ থেকে উকিল নোটিশ পাবার পর গার্ডিয়ান পত্রিকা উক্ত প্যারাগুলো মুছে ফেলে একটি ডিসক্লেইমার ঝুলিয়ে দেয়:

• On 13 October this article was changed following a legal complaint.
এ প্রসঙ্গে হ্যারি'স প্লেস ব্লগ জানাচ্ছে যে জামাতে ইসলামী এখন বিলেতে ঘাঁটি গেড়ে বসেছে। তারা মুসলিম কাউন্সিল অফ ব্রিটেন আর লন্ডন মুসলিম সেন্টার (ইস্ট লন্ডন মসজিদ) পুরো নিয়ন্ত্রণ করে। যখনই কোন ব্লগ আর পত্রিকা তাদের উপর রিপোর্ট করে তখনই জামাতে ইসলামী আর মুসলিম ব্রাদারহুডের আইনজীবিরা আইনি হুমকি পাঠায়। ফলে অনেকেই তাদের ঘাঁটাতে সাহস করে না।
এই ব্লগ মন্তব্য করেছে:
আইনের হুমকিতে গার্ডিয়ান পত্রিকা সত্যি প্রকাশে পিছু হটেছে যা বাক স্বাধীনতার উপর বড় আঘাত। এটি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং বাংলাদেশের জনগণের ন্যায় বিচার লাভের প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে আরও বড় হুমকি।
মুক্তাঙ্গণ ব্লগে অবিশ্রুত লিখেছিলেন:

ব্রিটেন যে যুদ্ধাপরাধীদের ভূস্বর্গে পরিণত হয়েছে, এই ক্ষোভ এর আগেও প্রকাশ পেয়েছে অন্যান্য দেশের বিভিন্ন নাগরিকদের মন্তব্য থেকে। বাংলাদেশের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা যুদ্ধাপরাধ করেছে, তাদের কারও কারও নিরাপদ বাসস্থান এখন এই ব্রিটেন। এই ব্রিটেনে বসেই গোলাম আযম পরিচালনা করেছিলেন পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার আন্দোলন।
গার্ডিয়ানের সেন্সরশীপ নিয়ে সেই ব্লগের মন্তব্য:
বাংলাদেশ যখন প্রত্যাশা করছে, ২০০৮-এর জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত নতুন সরকার তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করবে, বিদেশে আশ্রয়গ্রহণকারী যুদ্ধাপরাধীদেরও দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করবে, ঠিক তখনই একটি ঘটনার মধ্যে দিয়ে যুদ্ধাপরাধী চক্র আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছে, এ-ধরণের বিচার প্রক্রিয়াকে ঠেকানোর জন্যে এবং বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধ সংক্রান্ত তথ্যায়ন প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করার জন্যে তারা যথেষ্ট সংঘবদ্ধ।
গার্ডিয়ানের এই কাপুরুষোচিত কার্যের তীব্র প্রতিবাদ জানাই। বাক স্বাধীনতা ও ন্যায় বিচারে বিশ্বাসী সবাইকে এই সকল যুদ্ধাপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবার আহ্বান জানাচ্ছি।


× বাংলাদেশ গণহত্যা আর্কাইভে চৌধুরী মঈনুদ্দিনের ফ্যাক্টশীট

প্রথম প্রকাশ: সচলায়তন

Thursday, October 08, 2009

সব সমস্যার সমাধান যদি জিন্জিরাতে তৈরি হত

মানুষের এই ছোট জীবনে শারীরিক সমস্যার অন্ত নেই। আমাদের বেশীরভাগই নিজস্বতা ছাপিয়ে অন্য কেউ হতে চাই, কোন রোল মডেলের মত। আমাদের কারও হয়ত রঙ ময়লা, কেউ খাটো (ছেলে হলে) বা কেউ লম্বা (মেয়ে হলে)। কারও নাক বোঁচা, কারও দাত উঁচু, কারও মাথায় টাক। কারও গলার স্বর চিকন, কারও মোটা। কেউ তালপাতার সেপাই আবার কেউ হাতির মত। কারও মুখে ব্রণের দাগ, কারও ত্বক তেলতেলে।

খেয়াল করে দেখেছেন? উপরের প্রত্যেকটি সমস্যাগুলো সমাধানে বাণিজ্যিক পণ্য পাওয়া যাবে। এক গায়ের রঙ ফর্সা করার পণ্যেরই তো বিশ্বব্যাপী বিলিয়ন ডলার ইন্ডাস্ট্রী। মানুষ নিজের খুঁতগুলোকে ঢাকার জন্যে অঢেল টাকা খরচ করতে রাজি। কারণ একজনের সমস্ত পৃথিবী আবর্তিত হয় তার নিজের স্বত্বা, তার চাওয়া পাওয়াকে কেন্দ্র করেই।
বিশ্বের নানা দেশে বিবিধ বাণিজ্যের প্রসার হয়েছে মানুষের এইসব চাহিদা মেটাতে। ভোগবাদের মূলমন্ত্র যে জিনিষ কেনার সাথে ব্যক্তিগত সন্তুষ্টি তা এসব পণ্যে বিদ্যমান। এই সমস্ত পণ্য প্রলোভন দেখানো বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিক্রি হয় (হোক দেশটি বাংলাদেশ, ভারত অথবা ইন্দোনেশিয়া)। মেয়ের রঙ ময়লা বলে সে চাকরি পাচ্ছে না, অথচ সংসারের আয় দরকার। বাবা তাকে ত্বক উজ্জ্বল করার ক্রিম কিনে দেয় আর সে এয়ার হোস্টেসের চাকুরি পায়, সংসার চালায় - কি সংবেদনশীল আবেগ। আরেক বিজ্ঞাপনে এক ছোট অভিনেতা ত্বক সাদা করার ক্রিম মেখে শ্যুটিংয়ের সময় নামকরা পরিচালকের নজরে পড়ে যায় ও নায়কের অভিনয়ের প্রস্তাব পায়। এইসব প্রচার ও আবেগের মাধ্যমে আমাদের সমাজের বর্ণবাদী মনোভাব আরও প্রতিষ্ঠা পায়।

শুধু এই নয়, ধর্মীয় অনুভূতিকে পুঁজি করেও অনেক পণ্য এসে গেছে বাজারে। ইসলামী ব্যান্কিং ব্যান্ক পরিমন্ডলে ভাল ব্যবসা করছে। নানা স্ন্যাক্সের সাথে হালাল শব্দটি জুড়ে দিলে বেশী বিক্রি হয়। শুদ্ধ ভেজিটারিয়ান পণ্যের কাটতি অনেক দেশেই। হিজাব পড়া বার্বি ডল বা ইসলামি সাতারের পোশাক জাতীয় পণ্য এখন হালের ফ্যাশন।

আর এসব পণ্য তৈরি ও বাণিজ্যে সেরা দেশ হচ্ছে চীনদেশ। আমাদের দেশে জিন্জিরায় ও তাদের মতই নানা পণ্য তৈরি হয় (পড়ুন নকল হয়) এবং সবচেয়ে ভাল দিক হচ্ছে তাদের পণ্য মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকে।

চীন দেশে বিএমডাব্লিউ এক্স ফাইভ জীপটির ডিজাইনে গাড়ি বিক্রি হয় চাইনিজ ব্র্যান্ড সহকারে। তবে শোরুমের বাইরেই বিএমডাব্লিউর লোগোটি পাওয়া যায় যা লাগিয়ে নিলে আপনার স্বপ্ন পূরণ হয়ে যাবে।


(কৃত্রিম সতীচ্ছদ কিট - ছবির জন্যে কৃতজ্ঞতা এনওয়াই ডেইলি নিউজ)

তাদের উদ্ভাবনী শক্তিরও তারিফ করতে হয়। এক চাইনিজ কোম্পানি বের করেছে আর্টিফিসিয়াল ভার্জিনিটি হাইমেন কিট (কৃত্রিম সতীচ্ছদ কিট) এবং মাত্র ৩০ ডলারে মেয়েদের হাতের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে এমন এক কবচ যা তাদের রক্ষা করবে সেই সব বিকারগ্রস্ত ছেলেদের কাছ থেকে যাদের বিবাহিত বধু হিসেবে শুধুমাত্র সতী মেয়েদেরই চায়। অবশ্য বিকারগ্রস্ত বলি কেন - এটি তো এখনও মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশেরই প্রথা - সাদা চাদরে রক্তে মেয়েদের স্বাক্ষর রেখে সতীত্বের প্রমাণ দিতে হয়। খেলাধুলা বা অন্য কারনে সতীচ্ছদ ছেঁড়ার কারণে যেসব মেয়েদের বিবাহিত জীবন/বিবাহ হুমকির মুখে তাদের জন্যে এই পণ্যটি জীবন রক্ষাকারীই বটে। তবে মেয়েদের সে স্বাধীনতা তো দেবে না সমাজ। মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুড (সংসদের ২০% আসন যাদের) আন্দোলন করছে এই ভার্জিনিটি কিট নিষিদ্ধ করার জন্যে। এটির বিক্রেতাদের উপর ফতোয়া জারী হয়ে গেছে।

আমি শুরু করেছিলাম মানুষের শারীরিক সমস্যা গুলো দিয়ে। কিন্তু আপাত দৃষ্টিতে দেখা যাচ্ছে যে এগুলোর অনেকগুলোই মানসিক সমস্যা যা আমাদের সমাজ লালন পালন করে থাকে। আমরাও এর বাইরে নই তাই আমরা ধরতে পারি না, সব স্বাভাবিক লাগে।

সেদিন এক ভারতীয় টিভি চ্যানেলে দেখলাম কাঁচ দিয়ে তৈরি চোখের আদলে লকেটের এক রক্ষা কবচ বের হয়েছে যা ইন্টারনেটে অর্ডার করা যাবে। আমাদের সফলতার দিকে যারা কুদৃষ্টি দেয় সেগুলো থেকে রক্ষা করবে এই কাঁচের চোখের রক্ষাকবচ। গ্রাফিক্সের মাধ্যমে মানুষের চোখ থেকে ঠিকরানো লাল কুদৃষ্টি কিভাবে ঠেকিয়ে দিচ্ছে কবচটি তা দেখানো হল। নিশ্চয়ই এর কাটতিও প্রচুর কারণ এই কুসংস্কারে ধর্ম-বর্ণ ভেদে অনেকেই বিশ্বাসী।

আমাদের এই সব মানসিক সমস্যাগুলো সমাধানে ভার্জিনিটি কিট বা কুদৃষ্টি থেকে রক্ষার মত জিন্জিরার কোন একটি পণ্যের প্রতীক্ষায় আছি।

প্রথম প্রকাশ: সচলায়তন

Monday, September 28, 2009

শুভ বিজয়া

আজ (সেপ্টেম্বর ২৮) ছিল বিজয়া দশমী। বেলা বারোটার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের শারদীয় দুর্গা পুজা মন্ডপে গিয়ে দেখি বাইরে ট্রাক দাঁড়ানো - বিসর্জনের প্রস্তুতি চলছে। প্রবেশ পথটি মরিচা বাতি দিয়ে ছাওয়া। রাতে নিশ্চয়ই বেশ লাগে।

জগন্নাথ হলে পুজা মন্ডপ 
জগন্নাথ হলে পুজা মন্ডপ

প্রতিমার সামনে তেমন ভীড় দেখলাম না। ঢাক বেজে চলেছে এবং কিছু বাচ্চা নাচছে। অনেককেই দেখলাম প্রতিমাকে ব্যাকগ্রাউন্ডে নিয়ে নিজেদের ছবি তোলায় ব্যস্ত, ডিজিটাল ক্যামেরা, সাধারণ ফিল্ম ক্যামেরা ও মোবাইল ফোনের ক্যামেরার ছড়াছড়ি।

মা দুর্গা 
মা দুর্গা

মা দুর্গা দাঁড়িয়ে সব দেখছেন। আর দেখছেন চেয়ারে বসে অনেকে।

প্রতিমা 
প্রতিমা

বিকেলে বিসর্জনের সময় ঢাকায় ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি হল। মা দুর্গা পতি শিবের কাছে ফিরে যাবার সময় সমস্ত ঢাকাই কাঁদল।

সবাইকে শুভ বিজয়ার শুভেচ্ছা।

প্রথম প্রকাশ: সচলায়তন

Sunday, September 20, 2009

কোন এক বিকেলে ধানমন্ডিতে

সচলাড্ডায় যাব পণ করে রেখেছিলাম আগেই। কাল সকালে নজরুলকে ফোন করে বললাম আসছি। সে জানালো যে সাড়ে পাঁচটা থেকেই অনেকে থাকবে। আমার যেতে যেতে হল সাড়ে ছটা। বাবুর্চী রেঁস্তোরার দোতালা তিনতলা ঘুরেও কারও দেখা না পেয়ে আবার নজরুলকে ফোন দিলাম। সে পরিবারের সাথে তখনও রাস্তায় এবং তৎক্ষণাৎ খবর দিল উপস্থিত সচলদের। তিন তলার পাশে একটি বিশেষ জায়গায় ঠাই হয়েছে সচলদের। একে একে পরিচয় হল সবজান্তা, রণদীপম, জালাল ভাই, আনিস ভাই, সীমন, মামুন হক এবং আরও অনেকের সাথে।

খাবার ছিল মজাদার, এর বর্ণনা দিয়ে পেটে পিলে জন্মাবার ঝুঁকি নিতে চাচ্ছি না। তারপর সে তো অনেক গল্প, এক পোস্টে হবে না। তাই ছবিই কথা বলুক:

সচলায়তনের অফিসিয়াল মডেল 
সচলায়তনের অফিসিয়াল মডেল

সবজান্তা 
সবজান্তা
জালাল ভাই 
জালাল ভাই
রণদীপম বসু 
রণদীপম বসু
খাবারের কিয়দংশ 
খাবারের কিয়দংশ
'কথা কম কাজ বেশী' এই কথায় 'বিপ্লব' 
'কথা কম কাজ বেশী' এই কথায় 'বিপ্লব'
"কাবাব পরোটা ভাল হয়েছে, আর আছে কি?" - ভাস্কর 
"কাবাব পরোটা ভাল হয়েছে, আর আছে কি?" - ভাস্কর
মেয়ের সাথে আহমেদুর রশীদ 
মেয়ের সাথে আহমেদুর রশীদ
আনিস ভাই জুবায়ের ভাইয়ের স্মরণে জমায়েতের দাওয়াত দিচ্ছেন 
আনিস ভাই জুবায়ের ভাইয়ের স্মরণে জমায়েতের দাওয়াত দিচ্ছেন
এক ঝাক সচল 
এক ঝাক সচল
আরও এক ঝাক সচল 
আরও এক ঝাক সচল

Sunday, September 06, 2009

তবে কেন আমরা হব এক নম্বর?

ট্রান্সপারেন্সী ইন্টারন্যাশনালের ২০০৮ সালের দুর্নীতির সূচকে বাংলাদেশের অবস্থা ১০ম (১৪৭) আর ইন্দোনেশিয়ার অবস্থা ১৫তম (১২৬)। ২০০৫ সালে বাংলাদেশ ছিল যুগ্মভাবে প্রথম (১৫৮) আর ইন্দোনেশিয়া ষষ্ঠ (১৩৭)।

অর্থাৎ ট্রান্সপারেন্সী ইন্টারন্যাশনালের সার্টিফিকেট অনুযায়ী ইন্দোনেশিয়ার দুর্নীতির অবস্থা বাংলাদেশ থেকে অনেক ভাল। এখন আপনাদের আমার কিছু প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা বলি। ইন্দোনেশিয়ায় আসার পর আমার কিছু টার্গেট ছিল: প্রথমত: একটি ব্যান্ক একাউন্ট খোলা, ভিসা বাড়িয়ে থাকার অনুমতি যোগাড় করা, আর জার্মানী থেকে পাঠানো সংসারের কিছু সামগ্রী পোর্ট থেকে ছাড়ানো। প্রায় দুমাস হতে চলল এর একটি মাত্র করতে পেরেছি, অর্থাৎ থাকার অনুমতিটুকু (একটি বছর মেয়াদী ভিসা মাত্র), আর বাকী সব এখনও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকা পড়েছে। মাল এসে পোর্টে রয়েছে - ডেমারেজ বাড়ছে, আর আমরা কোন এক সরকারী কর্মকর্তার একটি সীল ও সইয়ের জন্যে বসে আছি।

বাংলাদেশই দুর্নীতির আখড়া এই বিশ্বাস যাদের আছে তাদের জন্যে আমার গল্প বলি। স্বল্প মেয়াদী থাকার অনুমতি পত্র (কিতাস) এর ফর্ম ফিল আপ করে প্রয়োজনীয় কাগজ পত্রাদি ও ছবি সহ জমা দেবার পরে সেটা আবার ফেরত আসল। কারণ নতুন ফর্ম এসেছে। তো আমাদের কেন পুরোনো ফর্ম দেয়া হল আগে? জানা গেল ওটি ঠিক জায়গা থেকে আনা হয় নি। কিছু অসাধু লোক পুরোনোটি বিক্রি করে তাই দুর্নীতি দমনের জন্যে নতুন ফর্ম ছাপানো হয়েছে যা দেয়া হচ্ছে বিনা পয়সায়। এরপর তা জমা দেবার পর ফেরত এল কারণ ছবি নাকি ঠিক হয় নি, লাল ব্যাকগ্রাউন্ড লাগবে (আগেরবার জমা দেবার সময় বললেই পারত)। আবার ছবি তৈরি করে দিয়ে আসা হল, এভাবে এক সপ্তাহ পা্র হয়ে গেল। তার পর সব চুপচাপ। মেসেন্জারকে পাঠানো হয় খোঁজ নিতে আর বলে তারা নাকি জানাবে। কিন্তু সেই পাথর তো আর নড়ে না। এবার শরণাপন্ন হলাম স্থানীয় প্রবাসী বাঙ্গালীদের কাছে। তারা বলল পয়সা ছাড়া তো কিছু হবে না।
এখানে কোন কাজ করানোর জন্যে ইন্দোনেশীয়ার ভাষা জানা খুবই জরুরী - কারন অনেকেই ইংরেজী জানে না। তাই ইন্দোনেশিয়ান মেসেন্জারকেই টাকা দিয়ে পাঠালাম। সে এরপর দিনে দিনে ফিরিস্তি দেয় কিভাবে এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে ফাইল নড়ে। প্রথমে আপনি একটি ফাইল কিনে এক টেবিলে জমা দেবেন। সাথে থাকবে একটা সাদা খামে গিফ্ট। তারপর হুজুরের মর্জি হলে (আর ক্রমাগত ফলোআপের পরে) সে আপনার কাগজের উপর কাজ করে পাশের টেবিলে স্থানান্তরের জন্যে একটি চিঠি দেবে। সেটি টাইপ করতে নিশ্চয়ই অনেক কাজ কারণ মেসেন্জার তা করানোর জন্যে সারাদিন সেখানেই বসে থাকে। তারপর সেই চিঠি পাশের টেবিলে না গিয়ে মেসেন্জারের কাছে আসে। সে এনে আমাদের দেখায় যে কাজ হচ্ছে। পরের দিন আবার পাশের টেবিলে নতুন ফাইল কিনে খামসহ কাগজপত্র জমা পরে। এভাবেই কাজ আগাতে থাকে ইন্দোনেশিয়ার নিজস্ব গতিতে। সবশেষে প্রায় মাসখানেক পার করে সেই মাহেন্দ্র ক্ষণ আসল যখন একজন পরিচিতজন সেই অফিসে কি কাজে গিয়েছিলেন - তিনি জায়গা মত কিছু টাকা দিয়ে বের করে নিয়ে আসলেন ভিসাটুকু। তার বক্তব্য আমাদের মেসেন্জার নিশ্চয়ই পর্যাপ্ত টাকা দেয় নি, কিছু পকেটে পুরেছে, না হলে এত সময় লাগার কথা নয়।

ইন্দোনেশিয়ার দুর্নীতির ব্যাপারটি বুঝতে হলে একটু পেছনের ইতিহাস ঘাঁটতে হবে। দেশটিতে এতকাল শাসন করে গেছে ঔপনিবেশিক শাসকদের হাতের পুতুল, সামরিক নেতা ও কিছু স্বৈরশাসক, এবং তাদের সর্ব শেষজন, সুহার্তো যিনি ১৯৬৭ সাল থেকে ১৯৯৮ পর্যন্ত শাসন করে গেছেন। সুহার্তোকে ধরা হয় বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে দুর্নীতিবাজ নেতা হিসেবে।

দেশটিতে পাবলিক সার্ভিসের কোন ধারণাই ছিল না এত দিন এবং গণতান্ত্রিক দেশ এবং জনগণই সর্ব ক্ষমতার উৎস এই সংস্কৃতি এখনও লোকজনের রক্তে গেড়ে বসে নি। দেশটিতে সরকারী চাকুরি মানে হচ্ছে খুবই মর্যাদার ব্যাপার এবং এর সাথে অনেক সুবিধা আপনা আপনি আসে। এই সব সুবিধার মধ্যে আছে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর লোকদের কাছ থেকে উপঢৌকন (মনে রাখবেন ঘুষ কিন্তু ওরা কখনও বলে না, বলে গিফ্ট), এবং সরকারী সম্পদ নয়ছয় করার অব্যক্ত অধিকার।

সুহার্তোর সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার হচ্ছে এই দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়া। না দিয়েও উপায় ছিল না। তার শাসনামলে তার নিকট আত্মীয় থেকে দুরতম আত্মীয় পর্যন্ত সবাইকে সরকারের বিভিন্ন উচ্চ পদে বসানো হয়েছিল । বিভিন্ন বেদরকারী মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সরকারী অনুমোদনের আওতায় এনে তিনি তার আত্মীয় স্বজনকে প্রভূত অর্থ কামানোর সুযোগ করে দেন। সুহার্তো পুত্রের যে সব দুর্নীতির কথা এবং তার বিদেশে থকা সম্পদের কথা শুনেছি সে তুলনায় আমাদের দেশের রাজকুমারেরা ছিঁচকে চোর।

১৯৯০ সালে তার ঘোষিত নিউ অর্ডার এর বৈশিষ্ট্য ছিল সিভিল সোসাইটির প্রভাব কমানো, রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আমলাতন্ত্রের ভেতরে ঢুকানো ইত্যাদি। আর ঐতিহ্যগতভাবে দেশটিতে আমলাদের সাধারণ মনোভাব হচ্ছে দেশের অন্যান্য লোকদের চেয়ে তারা বেশী মর্যাদাপূর্ণ। যত উঁচু আমলা তত বেশী মর্যাদার, তত বেশী ধরা ছোঁয়ার বাইরে। তার কাছে কোন সেবা চাওয়া তার কাছে ভিক্ষা চাওয়ার মত এবং অবশ্যই তার কাছে সেই অনুরোধের সাথে আপনার সামাজিক অবস্থান অনুযায়ী একটি গিফ্ট কাম্য (একটি খামভর্তি টাকা সেই গিফটের সাধারণ ধরণ)। আপনি যদি কোন উপঢৌকনের প্রস্তাব না করেন তাহলে সেটি অবমাননাকর হিসেবে ধরা হবে এবং আপনার কাজে প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে সেই প্রতিক্রিয়া প্রতিফলিত হবে।

আমাদের দেশের মতই এদেশেও দাড়ি টুপীর ছড়াছড়ি না থাকলেও অনেকেই ধর্মীয় আচারে রত (নামাজ রোজা) এবং প্রচুর মসজিদ। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম রোজার সময় হয়তো ওরা ঘুষ নেবে না, তাহলে কি এ মাসে কোন কাজ হবে না। উত্তর মিলেছে আরে ঘুষ কেন বলেন? এটি তো ওদের কাছে গিফ্ট মাত্র, আপনি খুশী হয়ে আপনার কাজের জন্যে দিচ্ছেন, ওরা তো চাচ্ছে না! এটিতে ধর্মে কি বাঁধা(??) ?

সবচেয়ে দু:খজনক ব্যাপারটি হচ্ছে ইন্দোনেশিয়ার সাধারণ জনগণ ঐতিহ্যগতভাবে এই উপঢৌকনের সংস্কৃতিকে মেনে নেয়। একজন সরকারী কর্মচারীকে একটি রুটিন কাজের জন্যে উপঢৌকন না দেয়াকে তাকে অসম্মান করা মনে করে। আমার এখনও জানা হয় নি ওদের সরকারী কর্মকর্তাদের মূল বেতন কি স্ট্যান্ডার্ডের। কিন্তু এদেশে অনেকেরই লাইফস্টাইল দেখে মনে হয় বেতনভোগী কর্মচারীরা এই জীবনযাত্রা কোনদিনই পোষাতে পারবে না। এখানে ১০ টাকার নুডলস খেয়ে কারও একবেলা কাটে আর কেউ ফ্রেস জ্যুস খায় ১৫০ টাকা দিয়ে।

ইন্দোনেশিয়াতে এখনও পুলিশের চাকুরী পাওয়ার যোগ্যতা নির্ভর করে বাবা-মার সচ্ছলতার উপর (অবশ্য এটি ভাল ইনভেস্টমেন্ট, দ্রুতই টাকা উঠে আসে)।

তবে আশার ব্যাপার হচ্ছে যে দুর্নীতি দমনের প্রাণান্ত চেষ্টা করে যাচ্ছে সুহার্তো পরবর্তী সরকারগুলো। ২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত দুর্নীতি দমন কমিশন (কেপিকে) বেশ কিছু উচ্চপদস্থ আমলার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছিল। কিন্তু এর পরিচালককে এক মার্ডার কেসে ফাঁসিয়ে দেয়া হয়েছে প্রতিশোধ হিসেবে।

এখানে বৈদ্যুতিক মিটার রিডিং নেয়া হয় ডিজিটাল ক্যামেরায় ছবি তুলে। বেশ কিছু সরকারী অফিসে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা লাগানো আছে উপঢৌকন সংস্কৃতি রোধের জন্যে (যদিও শুনেছি সেসব স্থানে কাজ দ্রুত আদায় হয় বাড়ীতে উপঢৌকন পৌঁছানোর মাধ্যমে)।

আমাদের দেশেও দুর্নীতি আছে কিন্তু সেটি কি এই লেভেলে? কিন্তু ট্রান্সপ্যারেন্সী ইন্টারন্যাশনালের মতে গত দশকে বাংলাদেশ বারংবার দুর্নীতিতে ১ নম্বর হয়েছে। আমার কিন্তু তাদের স্ট্যাটিস্টিক্সে একদম ভরসা উঠে গেছে।

প্রথম প্রকাশ: সচলায়তন