Saturday, April 11, 2009

সেইসব বীরঙ্গণা এবং যুদ্ধশিশুর কথা

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ ছিল যেন এক মৃত্যুপুরী, শয়তানের লকলকে জিভে চাটা এক নড়ক। লক্ষ লক্ষ মানুষ জীবন দিয়েছে, গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। ২ লাখেরও বেশী নারীর সম্ভ্রম কেড়ে নেয়া হয়েছে।



সুজান ব্রাউন মিলার তার Against Our Will: Men, Women and Rape বইটিতে লিখেছেন যে ধর্ষণকৃত নারীদের সৌন্দর্য দেখে বাছা হত এমন নয়। আট বছর বয়সী মেয়েশিশু থেকে ৭৫ বছরের বুড়ী পর্যন্ত পাক বর্বর হায়েনা থেকে রেহাই পায়নি। কোন কোন নারীকে সারা রাত ধরে গণ ধর্ষণ করা হয়েছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইস্টার্ন কন্টিজেন্টের চীফ জে. একে নিয়াজী দম্ভ নিয়ে বলেছিলেন "আপনারা কি ভাবে আশা করেন একজন সৈন্য পূর্ব পাকিস্তানে থাকবে যুদ্ধ করবে আর মারা যাবে এবং সেক্স করবে ঝিলমে গিয়ে?" (ইস্ট পাকিস্তান, দ্য এন্ড গেম - ব্রীগেডিয়ার এ আর সিদ্দিক )। এসব সেনাদের হাতে নারীদের তুলে দিত রাজাকার আলবদরেরা।

যুদ্ধ শেষ হবার পরে এই সব ধর্ষিতা নারী এবং তাদের গর্ভের অগণিত যুদ্ধ শিশুদের নিয়ে এক অবর্ণনীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বঙ্গবন্ধু তাদের সম্মান দিয়ে বলেন তারা আমার মেয়ে। তাদের বীরঙ্গণা ইত্যাদি নামে ডাকা হয়। কিন্তু তাদের অবস্থা ছিল অবর্ণনীয়। অনেকে সামাজিক গন্জনা সইতে না পেরে আত্মহত্যা করে।

এনবিসি নিউজ আর্কাইভে সেই সময়কার পরিস্থিতি নিয়ে একটি রিপোর্ট আছে।


আমেরিকা থেকে ডাক্তাররা আসে গর্ভপাত করাতে।



এই রিপোর্টে বলা হয়েছে ১৫০০০০ থেকে ১৭০০০০ বীরঙ্গনাকে গর্ভপাত করানো হয়েছে সরকারী মাতৃসদনে ও সনাতনী দাই ইত্যাদি দ্বারা।

এর পরেও অনেক যুদ্ধশিশু জন্মেছে। মাদার তেরেসা ১৯৭২ সালে এসে বেশ কিছু শিশুকে দত্তকের মাধ্যমে কানাডা, ফ্রান্স, সুইডেন ইত্যাদি দেশে পাঠান। এর পেছনে সরকারী চাপও ছিল। বঙ্গবন্ধু নাকি বলেছিলেন পাকিস্তানী হায়েনাদের রক্ত আছে এমন শিশুদের আমরা দেশে থাকতে দেব না।

১৯৭২ সালের ২৯শে মে নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছে:

Bangladesh government, at instigation of US social workers, is setting up a legal machinery for international adoption of child victims of occupation and war, including unwanted offspring of women raped by Pakistani soldiers;

কত শিশু বাইরে গেছে এভাবে তার হিসেব নেই। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী ১৯৭৪ সালের দিকে এই যুদ্ধশিশুর ব্যাপারটি ধামাচাপা পড়ে যায়।

মাসুদা ভাট্টি ইউরোপে অবস্থানরত এক বীরঙ্গণার কথা লিখেছেন। সেটি পড়ে অনেক মন খারাপ হয়ে রয়েছে তাই এখানে কিয়দংশ তুলে দিচ্ছি :

কথা শুরু হয়েছিল ২৫শে মার্চের রাত নিয়ে, ২৬ মার্চের সকালে চলে গেলেন আনা।ট্রাকে করে আমাদের নিয়ে এলো ওরা। আমরা কয়েকজন, দু’একজন মুখ চেনা। কেউ কারো দিকে তাকাতে পারছিলাম না। কোথায় এলাম বুঝিনি, ঢাকার শহরতো ভালো করে চিনি না। একটা মেয়েকে দেখলাম হাতে করে কোরআন শরীফ নিয়ে এসেছে।থর থর করে কাঁপছে। কাঁদছে অঝোরে, শব্দহীন। আসলে আমরা সবাই কাঁদছিলাম, অথচ কেউই শব্দ করে নয়, আমরা মনে হয় শব্দ করতে ভুলে গিয়েছিলাম।

তারপর যেখানে এলাম, সেখানে লাইন ধরে অনেকগুলো রুম।আমাদের একই রুমে রাখা হলো। তখন দুপুর হবে মনে হয়, তখন ওরা এলো, একের পর এক। কিছু বলার সুযোগ দেয়নি, একের পর এক, আমরা মাত্র ছয় কি সাতজন। আর ওরা সংখ্যায় কতো ছিল এখন আর মনে করতে পারি না, তবে চাইও না।

“জানেন, আমরা প্রতিদিন কোরআন পড়তাম। ওরা তাও মানতো না। ছুঁড়ে ফেলে দিতো। পরে শুনেছি যে, ওরা নাকি মসজিদে ঢুকেও মানুষ হত্যা করেছে। জানেন, আমার আর কোনও আনুষ্ঠানিক ধর্মের প্রতি বিশ্বাস নেই। এরপর নিজেকে আমি ধর্ম থেকে সরিয়ে নিয়েছি”।

মাসুদা ভাট্টি লিখেছেন:

১৯৭১ সালে যেসব পাকিস্তানী সৈন্য বাংলাদেশে লুটতরাজ, ধর্ষণ ও নির্যাতন চালিয়েছে তারা তো কেউই ধর্মে অবিশ্বাসী ছিল না, বরং তারা সকলেই ছিল ধর্মপ্রান মুসলিম। ১৯৭১ সালের নয়মাস ধরে চলা যুদ্ধে একটি মাস ছিল রমজান মাস। সেই মাসেও কিন্তু পাকিস্তানী সৈন্যবাহিনী ধর্ষণের মতো গর্হিত কাজ করেছে, কি করেনি? তখন কিন্তু ধর্ম তাদের এই অনাচার থেকে রুখতে পারেনি। তার মানে তারা এ ব্যাপারে নিশ্চিত ছিল যে, তারা যা করছে তা আসলে ইসলামকে রক্ষায়। সেদিক দিয়ে বিচার করতে গেলে, ১৯৭১ আসলে আর কিছুই নয়, ধর্মের নামে নিরীহ মানুষকে হত্যা আর নারী ধর্ষণের চূড়ান্ত উদাহরণ।

আনার মতো এরকম অনেক মেয়ে, একাত্তরে যাদেরকে পাকিস্তানীরা “গণিমতের মাল” হিসেবে যথেচ্ছ ব্যবহার করেছে, স্বাধীন দেশে আমরা তাদেরকে নিয়ে বিব্রত বোধ করেছি। আমি নিশ্চিত ১৯৭১ যদি তখন না হয়ে এই ২০০৯ সালেও হতো আর একই ঘটনার শিকার হতো বাঙালি নারী, আমাদের মানসিকতার বিন্দুমাত্র পরিবর্তন আমরা দেখতে পেতাম না। আনার মতো বাংলার শেফালি, রত্না, চম্পা বা অন্য যে কাউকেই এরকম বিদেশে এসে নাম পরিবর্তন করতে হতো, নয়তো দেশেই আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হতো।

এইসব বীরদের এবং এই সব যুদ্ধশিশুদের সম্পর্কে কি আমাদের সচেতন হওয়া উচিৎ না?

আরও পড়ুন:
* একাত্তরে নারীরা
* বীরঙ্গণার গল্প
*বীরঙ্গণাদের কষ্ট
* তারা বীর, বীরঙ্গণা নয়

প্রথম প্রকাশ: সামহোয়্যার ইন

Friday, April 10, 2009

অর্ডনুঙ্গ - নিয়ম

বার্লিনের কাছে ওরানিয়েনবুর্গে সাক্সেনহাউজেন কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে যে কয়েকবার গিয়েছি সে কয়বারই প্রশ্নটি মাথায় এসেছিল যে এত বড় হত্যাযজ্ঞ -হলোকস্ট সংঘটন তো সম্মিলিত কর্ম। যে লাশ বহন করেছে বা প্রহরী ছিল তারা কখনও বেঁকে বসেনি? মানুষ খুন করতে অস্বীকৃতি জানায় নি? আমরা কিন্তু কম উদাহরণের কথাই জানি যেখানে দেখা যায় যে ইহুদীদের বাঁচানোর চেষ্টা করেছে কোন জার্মান নাগরিক। ব্যতিক্রম নিশ্চয়ই শিন্ডলার্স লিস্ট চলচ্চিত্র খ্যাত জার্মান ব্যবসায়ী অসকার শিন্ডলার যিনি বেশ কিছু ইহুদীকে তার কারখানায় কাজ দিয়ে বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন। তবে তিনিও বিতর্কের উর্ধে নন কারন নাজী পর্টির সদস্য হিসেবে তিনি তার দায়িত্ব এড়াতে পারেন না। তিনি নিজেই স্বীকার করেছিলেন যে সস্তা শ্রম পাবার জন্যে তিনি ইহুদীদের ব্যবহার করতেন।

সাম্প্রতিকালের দ্য রিডার ছবিতে হানা স্মিৎজ (কেইট উইনস্লেট যার জন্যে অস্কার পেয়েছে) এর বিচার যখন হচ্ছিল তখন তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে এস এস গার্ড হিসেবে তাদের কাছে ৩০০ জন বন্দী যখন বিমান থেকে ফেলা বোমার আগুণে পুড়ছিল তখন সে কেন দরজা খুলে দেয়নি। সে তখন বলেছিল যে "এরা আমার রেসপনসিবিলিটি ছিল তাই কি করে তাদের ছেড়ে দেই?"

ব্যাপারটি যতই বালখিল্য মনে হয় আসলে এটি কিন্তু জার্মান চারিত্রিক বৈশিষ্টের একটি অংশ। তারা নিয়ম পালনের ক্ষেত্রে এতটাই নির্মম এবং সাধারণত: একচুলও নড়ে না।

নিকোলাস কুলিশ দ্যা নিউইয়র্ক টাইমসে জার্মান চরিত্রের এই অংশ তুলে ধরেছেন। উনি উদাহরন দিয়েছেন যে রাস্তা ঘাটে কত নিয়ম আছে এবং সেগুলো কঠোরভাবে পালন করা হয়। অথচ মোড়ে মোড়ে পুলিশ নেই বা ভিডিও ক্যামেরা নেই তা পর্যবেক্ষনের জন্যে।

আমার নিজের অভিজ্ঞতাও তাই। দৈনন্দিন অনেক নিয়মকেই তাদেরকে চোখে চোখে রাখার দরকার হয় না। তারা নিজেরা তা মানে এবং অপরকে স্মরণ করিয়ে দেয় তা সঠিকভাবে পালনের জন্যে। এবং অনেকক্ষেত্রে এইটি খুব অনধিকার চর্চাও মনে হয়। এক অজপাড়াগায়ে একটি খালি পার্কিং লটে গাড়ী রেখে ম্যাপ দেখছি তখন এক বুড়ো এসে বলল এটি ইনভ্যালিড পার্কিং এখানে রাখতে পারবে না তুমি। আমি বললাম পাশে আরও যায়গা আছে ইনভ্যালিডদের জন্যে কাজেই আমি কারও সমস্যা করছি না, আমি একটু পরেই চলে যাব। কিন্তু সে নাছোড়বান্দা - বলল এখানে রাখা নিষিদ্ধ তোমাকে সরাতেই হবে। নিয়মের বাইরে কোন কিছু সে মানতে রাজী নয়। এভাবেই তারা ছোটকাল থেকে শিক্ষা লাভ করেছে। আমি আমল না দিয়ে ম্যাপের দিকে মনযোগ দেয়ায় বুড়ো গজগজ করতে বাড়ীর দিকে গেল। আমি অবশ্য কিছু পরেই সরে গেলাম কারন না হলে সে হয়ত পুলিশ ডাকত।

নিয়মের প্রতি বাধা থাকা এই চারিত্রিক বৈশিষ্টের কারনে এজন্যেই জার্মানদের বাহ্যিক দৃষ্টিতে বেশ রবোটিক মনে হয়। এবং কারো সাথে ভালভাবে না মিশলে ভেতরের মানবিক দিকগুলো জানা যায় না।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার তাদের নির্লিপ্ততার কারন কি নিয়ম মানার এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট ছিল কি না সেটা বিতর্কের বিষয়। জার্মানিতে নুরেমবুর্গ আইন (১৯৩৫) করে ইহুদীদের সমাজচ্যুত করা হয় এবং ইহুদীদের বিবাহ ইত্যাদি নিষিদ্ধ করা হয়। ইহুদীদের নিধনের ফাইনাল সল্যুশনও লিখিতভাবে প্রণীত হয়েছিল। কাজেই অনেকের যুক্তি হতে পারে যে সাধারণ লোক নির্দেশ মেনেছে শুধু।

জার্মানদের নিয়্ম সম্পর্কে সাধারণ ধারণা হচ্ছে যে মানুষের ভালোর জন্যেই তা তৈরি। তবে নিয়ম মানতে গিয়ে মানুষের ক্ষতি করা কি উচিৎ কিনা এবং এ নিয়ে তারা ভাবে কি না জানার আগ্রহ আছে।

প্রথম প্রকাশ: সচলায়তন

Monday, April 06, 2009

সুনিতা পালের সুলুক সন্ধানে

বর্তমান বাংলাদেশে, বিশেষ করে ট্যাবলয়েড পত্রিকার জগৎে সেনসেশনাল নাম হচ্ছে তথাকথিত সাংবাদিক সুনিতা পাল। উনি বাংলাদেশ সম্পর্কে তার একের পর এক জ্বালাময়ী লেখায় মতামতের ফুলঝুড়ি ছুটিয়ে যাচ্ছেন। এমনকি সাংবাদিকরাও বলছেন যে কোন সূত্র না উল্লেখ করেই যে উনি যেসব মনগড়া কথা লিখছেন তা কোনমতেই সাংবাদিকতার আওতায় পড়ে না।

সুপ্রিয় পাঠক, এখন আমরা জানার চেষ্টা করব আসলে তিনি কে? অ্যামেরিকান ক্রনিকল নামক অনলাইন ম্যাগাজিনে তিনি নিয়মিত লিখে থাকেন। সেই ওয়েবসাইটে দেয়া তার প্রোফাইল অনুযায়ী ১৯৫২ সালে ভারতের কোচিনে তার জন্ম।

কিন্তু একটি যায়গায় এসেই খটকা লাগে:



"Born as a deaf and dumb, Sunita Paul decided to use pen in expressing herself. "


কেমন যেন উপন্যাসের মত শোনায় না? আমাদের উপমহাদেশে একজন নারী বোবা কালা হয়ে জন্মালেন আর কলমের সাথে তার মত প্রকাশে ব্রতী হলেন। তিনি প্রতিবন্ধী হয়ে সমস্ত পলিটিকাল সায়েন্স আর সাংবাদিকতায় তার দুটি মাস্টার্স ডিগ্রি করেছেন আর দু:খের বিষয় হচ্ছে এই বিরল কৃতিত্বের সংবাদটি আমরা কোথাও খুঁজে পাইনা। তার লেখা বিশটিরও অধিক আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে নিয়মিত ছাপা হচ্ছে, অথচ তার নিজের সম্বন্ধে একটিও লেখা নেই।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল ২০০৫/২০০৬ এর আগে সুনিতা পালের খবর কেউ শোনেনি।

আব্দুল বাতেন লিখেছেন:



"তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন বিষয়ে প্রায় বিশেষজ্ঞ বলা যায়। বাংলাদেশ নিয়ে লিখেছেন অনেক। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন ওঠে, বাংলাদেশ বিষয়ে এহেন একজন বিশেষজ্ঞের কথা কেন আমরা এতদিন জানতাম না। হোন তিনি বাংলাদেশ বিরোধী একজন লেখক কিন্তু তারপরও বাংলাদেশ নিয়ে এত ধারণা যার তার বিষয়ে কিছু খোঁজখবর তো আমাদের কাছে থাকার কথা ছিল। "

বাংলাদেশ বিষয়ে এমন জানাশোনা যে ব্যক্তির বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে তার কিছু না কিছু যোগাযোগ তো থাকতেই হয়। স্বাভাবিক এই প্রশ্ন থেকেই আবার অনুসন্ধান চলে। যোগাযোগের সূত্রটি কিছুটা বের হয়ে আসে। বাংলাদেশের একটি পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লেখেন। ইংরেজি পত্রিকাটির নাম উইকলি ব্লিটজ।http://www.weeklyblitz.net/ ব্লিটজ পত্রিকাটির সম্পাদক সালাউদ্দিন শোয়েব চৌধুরী।

সুনীতা পাল এই শোয়েব চৌধুরীরর পত্রিকার নিয়মিত লেখেন। আরও মজার বিষয় শোয়েব চৌধুরীকে নিয়ে তিনি একাধিক লেখা লিখেছেন। আরও মজার বিষয় হলো, সুনীতা পাল যেসব পত্রিকায় লেখেন যেমন আমেরিকান ক্রনিকল বা গ্লোবাল পলিটিশিয়ান সেসব পত্রিকার নিয়মিত লেখকদের মধ্যে সালাউদ্দিন শোয়েব চৌধুরী অন্যতম। সুনীতা পাল ও সালউদ্দিন শোয়েব চৌধুরীর লেখার বিষয়, আগ্রহ প্রায় একই। সালাউদ্দিন শোয়েব চৌধুরী যেখানে বাংলাদেশ বিষয়ে নরম, সেখানেই সুনীতা পাল কঠোর। সালাউদ্দিন শোয়েব চৌধুরী ও সুনীতা পাল দুজনেই চান বাংলাদেশ ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিক এবং দেশটির সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করুক।


সুনিতা পাল এও বলেছেন যে সালাহউদ্দিন শোয়েব চৌধুরীর নোবেল পুরস্কার পাওয়া উচিৎ

এখন দেখা যাক সালাহউদ্দিন শোয়েব চৌধুরী লোকটি কে।

তার বায়োডাটায় দেখা যায় ১৯৯৫-১৯৯৯ পর্যন্ত তিনি এ-২১ টিভি চ্যানেলের এমডি ছিলেন। সেই টিভিটি ছিল বর্তমানে পলাতক মাফিয়া ডন আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের। তিনি ইনকিলাব পত্রিকার সাংবাদিক ছিলেন ২০০১-২০০২ সালে। তিনি শাহরিয়ার কবিরকে মোসাদ এজেন্ট বলে গালিগালাজ করেন তখন। তার তখনকার আর্টিকেল গুলো পরলেই তার রাজনৈতিক মতাদর্শ বোঝা যায়। উনি তারপর ইনকিলাব টেলিভিশনের শেয়ার কিনে তার ডাইরেক্টর হন। কিন্তু তার পর টাকা পয়সা নিয়ে অন্যান্য ডাইরেক্টর, যারা তৎকালীন বিএনপি-জামাত সরকারের আস্থাভাজন ছিলেন, তাদের সাথে গোলমাল লাগে। তার বিরুদ্ধে মামলা হয় ও গ্রেফতারী পরওয়ানা জারী হয়।

এর পর ২০০৩ সালের নভেম্বরে তাকে বিমান বন্দরে গ্রেফতার করা হয় ইজরায়েলে যাওয়ার প্রাক্কালে । তার কাছে কাগজপত্র ছিল যে তিনি ওখানে একটি সেমিনারে অংশগ্রহণ করতে যাচ্ছেন। আপনার যদি বাংলাদেশী পাসপোর্ট থাকে তাহলে দেখবেন যে সীল মারা আছে যে একটি দেশে শুধু আপনি যেতে পারবেন না তা হলো ইজরায়েল। অর্থাৎ তাকে ওই ক্লজে গ্রেফতার করা হয়। যদিও আগেই প্রভাবশালী একটি মহল উপরোক্ত কারনে তার উপর ক্ষেপে ছিল। তাকে এরপর জরুরী ক্ষমতা আইনে গ্রেফতার দেখানো হয় ও রাষ্টদ্রোহীতার মামলা করা হয়।

এরপর আন্তর্জাতিক এক চক্র তার মু্ক্তির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয় যার অগ্রভাগে ছিলেন ড: রিচার্ড বেনকিন । এই আমেরিকান ইহুদী লবিইস্ট শোয়েবের মুক্তির ই্স্যুতে বিভিন্ন খানে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে লেখা শুরু করেন। মজার ব্যাপার হলো ২০০৬ সালে তাকে তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার লবিইস্ট হিসেবে নিয়োগ দান করে ।

সালাউদ্দিন শোয়েব বর্তমানে বিচারাধীন তবে মুক্ত। তার বিচারের প্রতিটি পদক্ষেপ সম্পর্কে বাংলাদেশী সংবাদপত্রগুলো মৌণ থাকলেও ইজরায়েলী সংবাদপত্রগুলোকে সরব দেখা যায়।

সাজ্জাদ জহির যুক্তি দেখিয়েছেন যে সুনিতা পাল সালাউদ্দিন শোয়েবেরই ছদ্মনাম । আবার অন্যেরা বলেন যে তিনি বেনকিনেরই একটি সৃষ্টি এবং সুনীল নামের এক ভারতীয় নিউইয়র্ক থেকে এই ছদ্মনামে লিখে যাচ্ছেন।

এখন আমরা আবার আসি সুনিতা পালের লেখা প্রসঙ্গে। তিনি তার লেখায় যুক্তি ছাড়াই অনেক মতামত (কোন উৎস উল্লেখপূর্বক) দিয়ে থাকেন যা সবাইকে বিস্মিত করে। একজন বোবা কালা মহিলা কিভাবে বাংলাদেশ সম্পর্কে এত তথ্য পাচ্ছেন দেশের বাইরে থেকে এবং নিয়মিত (প্রায় প্রতিদিন) তা নিয়ে লিখেছেন সেটি বিস্ময়ের ব্যাপার। তবে সম্প্রতি বাংলাদেশী আমেরিকান ব্লগার ম্যাশ প্রমাণ সহ দেখিয়েছেন যে সুনিতা পাল তার ব্লগের লেখা থেকে কিছু অংশ বেমালুম মেরে তার আর্টিকেলে তুলে দিয়েছেন ম্যাশের কোন উল্লেখ ছাড়া। এরকম কত যায়গা থেকে তার চৌর্যবৃত্তি চলেছে তা এখন গবেষণার বিষয়। ম্যাশ জানিয়েছেন যে এই নকল লেখা প্রায় ডজনখানেক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

সুনিতা পাল আরাফাত রহমানের অসুস্থাবস্থা নিয়ে ব্যাঙ্গ করেছেন, তারেক রহমান ও তার বন্ধু গিয়াসউদ্দিন আল মামুন সম্পর্কে অনেক মন গড়া কথা বলেছেন, জেনারেল মইনকে ছেড়ে কথা বলেননি এবং হাসিনা পূত্র জয়ের বিরুদ্ধে কোনরুপ প্রমাণ না দেখিয়ে মনগড়া সব অভিযোগ করে যাচ্ছেন ।

তার লেখায় রয়েছে সেনাবাহিনীকে উসকে দেয়া যাতে তারা সাম্প্রতিক সরকারের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়। আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের ইমেজ নষ্ট করা ও কাল্পনিক সব গল্প বানানো তার বৈশিষ্ট।

সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথেই (২৯ ডিসেম্বর ২০০৮) তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের পেছনে লাগেন এবং এখনও তার সেই প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে।

একটি বিষয় নিশ্চিত যে তার সব কর্মকান্ড প্রমাণ করে যে সে বাংলাদেশের গণতন্ত্র এবং স্বাধীনতা ও শান্তির বিপক্ষে।

একজন বোবা কালা মহিলার পক্ষে এতটুকু করা মনে হয়না সম্ভব। কাজেই তিনি সত্যিকারের হলেও তার নাম ভাঙ্গিয়ে একটি মহল বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে আসছে আর তাকে তুলে ধরছে বাংলাদেশের এক শ্রেণীর ট্যাবলয়েড পত্রিকা। সাধু সাবধান।
 প্রথম প্রকাশ: সামহোয়্যার ইন


Monday, March 30, 2009

ইতিমধ্যে দন্ডিত যুদ্ধাপরাধীদের এখনও বিচারের আওতায় আনা সম্ভব

১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনার ধারাবাহিকতায় আজ আলোচনা করব দন্ডিত যুদ্ধপরাধীদের নিয়ে।

১৯৭২ সালের ১ জানুয়ারী অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম তার মন্ত্রী পরিষদ নিয়ে এক বৈঠকে গনহত্যা তদন্ত কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত নেন। সে সময়ে ৩৭০০০ যুদ্ধাপরাধীদের একটি তালিকা তৈরি করা হয়।


২৪ জানুয়ারি ‘বাংলাদেশ দালাল আইন ১৯৭২’ নামে (রাষ্ট্রপতি আদেশ নং ৮) একটি অধ্যাদেশ জারি হয়। শেখ মুজিবর রহমান সাক্ষরিত সেই অধ্যাদেশে যুদ্ধপরাধী এবং দালালের সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে এভাবে - "কোনো ব্যক্তি যদি একক বা দলগতভাবে বা কোনো সংস্থার হয়ে প্রত্যক্ষ্ বা পরোভাবে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গণহত্যা, লুটপাট, ধর্ষনে সহযোগিতা করে থাকে এবং স্বাধীন বাংলাদেশ বিরোধী কর্মকান্ডে এবং বাংলাদেশের বিপক্ষে যুদ্ধে জড়িত থাকে।" কমপক্ষে ২ মাস থেকে সর্বোচ্চ মৃত্যুদন্ডের শাস্তির বিধান রাখা হয়েছিল এই আইনে। অনেক ফাঁকফোকড় ছিল এ আইনে, যার ৭ম ধারায় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে সর্বময় কর্তৃত্ব দেওয়া হয়েছিল। ওসি যদি কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ না আনেন তাহলে সেটা গ্রহন করা হবে না, অন্য কোনো আদালতে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা যাবে না- এমন অনেক গলদে ভর্তি ছিল আইনটি। - -অমি রহমান পিয়াল

১৯৭৩ সালের ২০ জুলাই আন্তর্জাতিক আইনে যুদ্ধপরাধীদের সাজা দেওয়ার জন্য নতুন একটি আইন পাস হয়। ‘অ্যাক্ট নং-১৯, ১৯৭৩’ (লিংক-৩) নামের এই আইনে গনহত্যা, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, যুদ্ধাপরাধে অপরাধীদের গ্রেপ্তার, বিচার এবং সাজা দেওয়ার অধিকার রাখা হয়। এই আইনের উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানী ১৯৫ জন উচু পদমর্যাদার সেনা অফিসারের বিচার বাংলাদেশেই যাতে করা যায় এমন। কিন্তু আন্তুর্জাতিক চাপে ও পাকিস্তানের স্বীকৃতির আশায় ১৯৭৪ সালে ত্রিদেশীয় একটি চু্ক্তির আওতায় ওই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ছাড়া পাকিস্তানে ফেরত নেয়া হয়।


বলা হয়ে থাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান (দেশে অবস্থিত) যুদ্ধাপরাধী দালাল ও রাজাকারদের ক্ষমা করে দিয়েছেন। কথাটা পুরো সত্যি নয়। ১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বর থেকে কার্যকর সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার আওতায় প্রান্তিক পর্যায়ের দালাল ও রাজাকারদের ক্ষমা করা হয়েছে। হত্যা, লুটপাট, ধর্ষন এবং স্বাধীনতা বিরোধী ষড়যন্ত্রের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত এবং নেতৃস্থানীয় কোনো দালাল ও ঘাতককে এই ক্ষমা ঘোষণার আওতায় নেওয়া হয়নি। অধ্যাপক গোলাম আযম থেকে শুরু করে নুরুল আমিন, হামিদুল হক চৌধুরী, খান এ সবুর, মাহমুদ আলী, খাজা খয়েরুদ্দিন, রাজা ত্রিদিব রায়ের মতো নেতৃস্থানীয় স্বাধীনতাবিরোধীদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোক করে তাদের ফেরার ঘোষণা করা হয় (১০ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭২, দৈনিক বাংলা)। ক্ষমার আওতায় পড়েননি রাজাকার ও আলবদর বাহিনীর কোনো নেতা। তালিকা দেখলে দেখা যাবে ঠিক কারা এসব নেতৃত্বে ছিলেন। -অমি রহমান পিয়াল

১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বরের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণায় মুক্তি পায় প্রায় ২৬০০০ অভিযুক্ত। কিন্তু ৭৫২ অভিযুক্ত ও বিচারাধীন ১১০০০ অভিযুক্ত তখনও জেলে ছিল। ৩১শে ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাদাত সায়েম এবং চিফ মার্শাল ল এডমিনিষ্ট্রেটর জেনারেল জিয়াউর রহমান সংবিধানের তৃতীয় সংশোধনীর মাধ্যমে ‘বাংলাদেশ দালাল আইন ১৯৭২’ (রাষ্ট্রপতি আদেশ নং ৮) বাতিল করেন। এর ফলে ৭৫২ জন অভিযুক্ত ও বিচারাধীন সকলে ছাড়া পেয়ে যায়।

আজ প্রথম আলোতে মিজানুর রহমান খান বলেছেন :


যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রশ্নে যখন ট্রাইব্যুনাল গঠিত হতে যাচ্ছে, তখন একটি মিথ বা কল্পকথা ভেঙে দেওয়া দরকার। মিথটি হলো, বিচারপতি সায়েম ও জেনারেল জিয়াউর রহমান দালাল আইন বাতিল করার মাধ্যমে কারাগারে আটক ও দন্ডপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তি দিয়েছিলেন। কিন্তু কথাটি এভাবে সত্য নয়। এর আড়ালে মস্ত একটি সত্য চাপা পড়ে আছে।

সংবিধানের ৪৭(৩) অনুচ্ছেদ দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন ও ১৯৭২ সালের দালাল আইন রক্তস্নাত মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশ সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর চেয়ে বেশি কিছু।

দালাল আইন বাতিল অধ্যাদেশ পরবর্তীকালে সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে ‘বৈধতা’ পেলেও তা ছিল একটি এখতিয়ারবহির্ভুত পদক্ষেপ। আইনের সরল পাঠে এটা বলা যায় যে ৪৭ অনুচ্ছেদের ৩ উপদফায় ‘কখনো বাতিল বা বেআইনি হয়েছে বলে গণ্য হবে না’ কথাটির অর্থ এই যে, ওই আইনটি আজও বহাল রয়েছে। বিচারপতি সায়েমের অধ্যাদেশটি ভয়েড অ্যাবিনিশিও বা গোড়া থেকে বাতিল। এখন হয়তো কেবল একটি রিট দায়ের করলেই বিষয়টির নিষ্পত্তি হয়ে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে সংবিধানের অভিভাবকের দায়িত্ব পালনকারী উচ্চ আদালতের কাছ থেকে এ মর্মে একটি ঘোষণা আসা স্বাভাবিক প্রত্যাশা হতে পারে যে দালাল আইন বাতিল আইনের কখনো অস্তিত্ব ছিল না।

পঁচাত্তরের পরে কার্যত দুটি ইনডেমনিটি আইন পাস করা হয়েছিল। এর একটি দিয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড এবং দ্বিতীয়টি দিয়ে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে যারা খুন, ধর্ষণ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছিল; তাদের ইনডেমনিটি বা দায়মুক্তি দেওয়া হয়। প্রথম ইনডেমনিটির বিরোধিতায় যাঁরা সোচ্চার হয়েছেন, সেভাবে তাঁরা দ্বিতীয় ইনডেমনিটির বিরুদ্ধাচরণ করেননি। এমনকি আজ যখন চারদিকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি উঠেছে, সংসদে প্রস্তাব পাস করা হয়েছে, আমরা ভাবছি এই বুঝি ১৯৭৩ সালের আইনে ট্রাইব্যুনাল গঠিত হতে যাচ্ছে; তখনও যাদের বিচার করা হয়েছিল তাদের কী হলো সেদিকে খেয়াল দেওয়া হচ্ছে না। ট্রাইব্যুনালকে তো বিচার করতে হবে। একটি বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই কোনো অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করে তাঁরা দন্ড বা খালাস দেবেন। কিন্তু যুদ্ধাপরাধের দায়ে যাদের দন্ড ইতিমধ্যে হয়ে গেছে তাদের কী হবে? এই দন্ডিত ব্যক্তিরা কোন জাদুমন্ত্রবলে কারাগার থেকে ছাড়া পেয়েছিল তা আমাদের জানতে হবে।

বিস্তারিত পড়ুন প্রথম আলোয়

প্রথম প্রকাশ: সামহোয়্যার ইন 

Sunday, March 29, 2009

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার রোধে আন্তর্জাতিক চাপ

স্বাধীন বাংলাদেশে কেন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হলো না, কেন পাকিস্তানে টিক্কা খানরা গণহত্যার প্রাইজ হিসেবে পরে মন্ত্রী হবার সুযোগ পেয়েছে এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন পেয়েছে সেসব প্রশ্নের উত্তর এখনও অনেকেরই অজানা।

২৪শে ডিসেম্বর ১৯৭১, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ. এইচ. এম. কামরুজ্জামান বলেন, "কোন যুদ্ধাপরাধী আইনের হাত থেকে রক্ষা পাবেনা। এমনকি গনহত্যা এবং অত্যাচারে জড়িত পাকিস্তানী সেনাসদস্যরাও বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।" শেখ মুজিবর রহমান এবং ইন্দিরা গান্ধীর এক সভা শেষে যৌথ বিবৃতিতে বলা হয় যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রে ভারত সকল সহয়তা প্রদান করবে। - (সূত্র)

তবে টু্করো টুকরো কিছু ঘটনা বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায় যে ভারতের তত্বাবধানে থাকা যুদ্ধবন্দীদের কেন তৎকালীন সরকার বিচার করতে পারেন নি। প্রথমত:

এর পেছনে আন্তর্জাতিক চাপ একটা বড় ভূমিকা পালন করে। কারণ ১৮ ডিসেম্বর ঢাকা স্টেডিয়ামের খোলা ময়দানে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রকাশ্যে ৫ জন অপরাধীর মৃত্যুদন্ড বাস্তবায়ন টিভি ও পত্রিকার কল্যাণে বিশ্বব্যাপী আলোড়ন তোলে। এই ঘটনাকে নিজেদের অনুকুলে কাজে লাগায় পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্র। যদিও ঘটনার হোতা কাদের সিদ্দিকী স্পষ্টই বলেছেন, যাদের হত্যা করা হয়েছে তাদের হাতেনাতে ধরা হয়েছিলো দুজন অবাঙালী কিশোরীকে অপহরণ করার সময়। এবং মৃত্যুদন্ড পাওয়ারা কেউই অবাঙালী নয়।

এসব যুদ্ধাপরাধীকে ভারতে নিয়ে যাওয়ার জন্য তড়িত উদ্যোগ নেওয়া হয়। নিয়াজী ও রাও ফরমান আলীর মতো মাথাগুলোকে ২১ ডিসেম্বর উড়িয়ে নেওয়া হয় কলকাতা। তিন সপ্তাহের এক বিশেষ ব্যবস্থাপনায় ৮০টি ট্রেন করে সমস্ত যুদ্ধবন্দীদের সীমান্তের ওপারে নিয়ে যাওয়া হয়।
- অমি রহমান পিয়াল

১৯৭২ সালের ২ জুলাই স্বাক্ষরিত সিমলা চুক্তিতে যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ে একটি লাইনও নেই। কোথাও বলা নেই যে যুদ্ধাপরাধীদের ছেড়ে দেওয়া হবে বা বিচার হবে না।

সে সময় ভারতের কাছে বন্দী ছিল ৯৩ হাজার যুদ্ধাপরাধী। এর মধ্যে ৮০ হাজার সামরিক এবং বাকিরা বেসামরিক ব্যক্তি।
সবাইকে পাকিস্তান নিজ দেশে নিয়ে যায়। কোনো চুক্তির আওতায় না বরং ভারত তাদের ছেড়ে দিয়েছিল সৌহার্দের নিদর্শন হিসাবে। ভারত যে পাকিস্তানের সঙ্গে ভাল সম্পর্ক চায় তারই নিদর্শন হিসাবে ভারত এই সৌহার্দ দেখায়।
- শওকত হোসেন মাসুম

"১৯৭৩ সালের ৫-৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্রপ্রধান বিশেষ করে মুসলিম দেশগুলির সাথে বাংলাদেশের একটি যোগাযোগ স্থাপিত হয়। .... মিশরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতের নেতৃত্বে সৌদি আরবের রাজা ফয়সাল, আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট বুমেডিয়েন এর সহযোগিতায় পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যকার বিদ্যমান সমস্যা সমাধানে একটি উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় । বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে সমস্যার মুলে ছিল ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধী যাদের বিচারে বাংলাদেশ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলো এবং এজন্য তখনো পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে নাই । আর পাকিস্তানের মিত্র হিসাবে চীন বাংলাদেশকে জাতিসংঘের সদস্য হিসাবে যোগদানে ভেটো প্রদান করছে । এর মধ্যে চীন পুনরায় জানিয়ে দেয় "After resolution of the war trials issue, Peking will recognise Dacca, and the way will be open for Bangladesh to be admitted to the United Nations" (১৮) ।

(১৫ ই ডিসেম্বর ১৯৭৩) আন্তর্জাতিক আদালত থেকে পাকিস্তানের মামলাটি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত আরব লীগ নেতৃবৃন্দের একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য বলে বিবেচিত হয়। এবার আরব লীগ নেতৃবৃন্দ পাকিস্তানের উপর চাপ প্রয়োগ করেন বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দান করার জন্য । এর জবাবে জুলফিকার আলী ভূট্টো জানান যে বাংলাদেশ ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রত্যাহার করলেই কেবলমাত্র পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেবে।

মিশরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত, সৌদি রাজা ফয়সাল এবং জর্ডানের রাজা হুসেইন এর উদ্যোগে সাতটি মুসলিম দেশের প্রতিনিধি ঢাকা সফর করেন ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীর বিচারের উদ্যোগ থেকে সরে আসার জন্য শেখ মুজিবুর রহমানকে রাজী করাতে । কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান প্রাথমিকভাবে কোন শর্তসাপেক্ষে পাকিস্তানের স্বীকৃতি গ্রহণে অস্বীকার করেন এবং এই বিষয়ে আরো আলোচনা প্রয়োজন বলে অভিমত দেন। - মিরাজ

এর পরে ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের ১৯৪৪ সালের পর দ্বিতীয় প্রাণহারী দুর্ভিক্ষের কবলে পরে। ১৯৭৪ সালের জুলাই থেকে ১৯৭৫ সালের জানুয়ারী পর্যন্ত এই দুর্ভিক্ষের কারন হিসেবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ (সাইক্লোন, খরা ও বন্যা) এর কথা বলা হলেও আসলে এর পেছনে ছিল যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য সাহায্যের রাজনীতি। তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার সমাজতন্ত্রের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল এবং পাকিস্তানের থেকে আমেরিকার উপর চাপ ছিল যুদ্ধপরাধী ইস্যু ধামাচাপা দেয়ার জন্যে। তাই বাংলাদেশ সরকারকে চাপ দেয়ার জন্যে যুক্তরাষ্ট্র খাদ্য সাহায্যের জাহাজ ঘুরিয়ে দিয়ে লাখ লাখ লোক খাদ্যের অভাবে মারা যায়।

তৎকালীন সরকারের তথ্য অনুযায়ী ২৬০০০ লোক মৃত্যুবরন করলেও আসলে মারা গেছেন লাখ লাখ।অস্ট্রেলিয়ান (ধন্যবাদ ফাহমিদুল শুধরে দেবার জন্যে) সাংবাদিক জন পিলগার একটি ডকুমেন্টারীতে দেখিয়েছেন কিভাবে নিক্সনের পলিটিক্স লাখ লাখ বাঙালীর মৃত্যুর কারন হয়।






গ্লোবাল হাঙ্গার এলায়েন্সের দ্বেবিন্দর শর্মা বলেছেন :

নবীন বাংলাদেশের দুর্ভিক্ষের দুর্গতির সময় যুক্তরাষ্ট্র ২.২ মিলিয়ন টন খাদ্য সাহায্য পাঠানো বন্ধ করে দেয় পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করে দেয়ার জন্যে।

প্রথম প্রকাশ: সামহোয়্যার ইন

Friday, March 27, 2009

মসজিদে নামাজ পড়ারতদের বোমা দিয়ে উড়িয়ে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার বাসনা

 
পাকিস্তানে আজ আত্মঘাতী বোমা পড়েছে মসজিদে নামাজ পড়ারত অবস্থায় প্রায় ২৫০ লোকের উপর। প্রাথমিক ভাবে ৫০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, হতাহত অগণিত। খাইবার প্রদেশের নমরুদ শহরে এই হামলা চালানো হয়। (বিবিসি সংবাদে বিস্তারিত )

পাকিস্তানের উত্তর পশ্চিমে তালিবানরা ইসলামী শাসন ও শরিয়া আইন প্রতিষ্ঠার দাবী করে আসছে। তার সাথে রয়েছে শিয়া-সুন্নী বিরোধ। সাম্প্রতিক কালে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে চড়াও হয়েছে। সে জন্যেই সাম্প্রতিক কালে পাকিস্তানে বিভিন্ন জঙ্গীবাদী আক্রমণ বেড়ে গেছে এবং সাধারণ মানুষই তাদের শিকার।

যে কোন আত্মঘাতী আক্রমণই নিন্দনীয়। তবে মসজিদে নামাজ পড়া লোকদের উপর আক্রমণ কোন শত্রুও করবে না। তাই এই আক্রমণের নিন্দা করার ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না।

ইসলামী জঙ্গীবাদ কোন মনুষ্যত্ব বিহীন। তাদের দ্বারা যে কোন যুক্তিই খাড়া করা সম্ভব। তার হয়ত বলবে ইসলামী আইন প্রতিষ্ঠার জন্যে যে কোন কিছু যায়েজ।

বর্তমানে বাংলাদেশেও জঙ্গীবাদের শেকড় আছে। এদের মূলোৎপাটন না করতে পারলে অচিরেই বাংলাদেশে পাকিস্তানের মত অরাজকতা সৃষ্টি হবে এবং সাধারণ মানুষেরা তার মূল্য দেবে।

প্রথম প্রকাশ: সামহোয়্যার ইন

Tuesday, March 24, 2009

সিলভিয়া প্লাথের কবিতার অনুবাদ

সিলভিয়া প্লাথ ছেলে নিকোলাস হিউজের সাথে(ছবিতে সিলভিয়া প্লাথ ছেলে নিকোলাস হিউজের সাথে)
 
কবি সিলভিয়া প্লাথ সম্প্রতি আবার সংবাদে এসেছেন তার ৪৬ বছর বয়সী ছেলের আত্মহত্যার খবরের সাথে। এই অভিমানী কবিও ১৯৬৩ সালে ৩০ বছর বয়সে আত্মহত্যা করেছিলেন। তার স্বামী ছিলেন ব্রিটিশ কবি টেড হিউজ।

ইমরুল হাসান সিলভিয়ার একটি সাক্ষাৎকার অনুবাদ করেছিলেন সচলায়তনে। তার নামকরা কবিতা "Daddy" এর অনুবাদ করেছি আমি যেটি নিচে দেয়া হল। মূল কবিতাটি পাবেন এখানে।

বাবা
তুমি আর, তুমি আর পরোনা
সেই কালো জুতা।
বাস করেছি আমি যার মধ্যে
তোমার পায়ের মতো করে,
রিক্ত, ম্লান হয়ে, ত্রিশ বছর ধরে।
সাহস পর্যন্ত হয়নি হাঁচার বা নিশ্বাস ফেলার।
বাবা, তোমাকে আমার মেরে ফেলতে হত।
কিন্তু চলে গেলে তুমি আমার সময়ের আগেই।
এক বস্তা ইশ্বর, মার্বেলের মত ভারী,
ভয়ানক মূর্তি এবং বিরাট ধুসর এক পা নিয়েই
এবং এক বিশাল মাথা খেয়ালী অতলান্তিকের দিকে,
যেখানে নীলের উপর সীমের মত সবুজ বর্ষিত হয়
সুন্দর নসেট সৈকতের পানিতে।
তোমা থেকে মুক্তির জন্যে আমি প্রার্থনা করতাম,
আহ, তুমি।
জার্মান ভাষায়, সেই পোলিশ শহরে যাকে
দুরমুজ দিয়ে সমান করে দেয়া হয়েছিল
কারন যুদ্ধ, যুদ্ধ আর যুদ্ধ।
সেই শহরের নামটি খুবই পরিচিত।
আমার পোলিশ বন্ধু
বলেছে এরকম আছে কয়েক ডজন।
তাই আমি বলতে পারব না কখনই
কোথায় তুমি পা মাড়িয়েছ,
কোথায় তোমার শেকড়।
পারিনি বলতে কথা তোমার সাথে কখনই,
জিহ্বা আটকে গেছে চোয়ালে,
আটকে গেছে কাঁটা তারের ফাঁদে।
আমি, আমি, আমি, আমি
কথাই বলতে পারতাম না।
আমার মনে হত প্রতিটি জার্মানই তুমি
এবং অশ্রাব্য তোমার ভাষা,
একটি ইন্জিন, একটি ইন্জিন যেন
আমাকে বিরক্ত করছে ইহুদীদের মত,
একজন ইহুদী, দাখাউ, আউসভিৎজ, বেলসেনে
আমি কথা বলা শুরু করলাম ইহুদীদের মত,
আমার মনে হয় আমি হয়ত ইহুদী।
টিরল অঞ্চলের তুষারপাত, কিংবা ভিয়েনার স্বচ্ছ বিয়ার
সত্যি নয়, খাঁটি নয়, বনেদী নয় তোমার কাছে
আমার যাযাবর পূর্বপুরুষ এবং আমার অদ্ভুত ভাগ্য
এবং আমার নকল ব্যাগ, আমার সাধারণ ব্যাগ
আমি হয়ত কিঞ্চিত পরিমাণে ইহুদী।
আমি তোমাকে সবসময়ই ভয় পেতাম
তোমার যুদ্ধবিমান, তোমার গোয়েবলীয় প্রচার
তোমার পরিপাটি গোঁফ
তোমার আর্য চোখ, উজ্জ্বল নীল
পান্জার ম্যান, পান্জার ম্যান, ওহ তুমি।
ইশ্বর নয়, কিন্তু একটি সোয়াস্তিকা চিহ্ন
নিকষ কালো, কোন আলো তা ভেদ করতে পারে না।
প্রতিটি নারীই একজন ফ্যাসিবাদীকে পুজা করে,
মুখ মাড়ানো সেই জুতাকে, সেই নিষ্ঠুরকে
নিষ্ঠুর হৃদয় তোমার মত এক পশুকে।
তুমি ব্লাকবোর্ডের সামনে দাড়িয়ে বাবা,
যে ছবিটি আমার কাছে আছে সেখানে।
তোমার থুতনিতে একটি খাঁজ আছে যেখানে
তোমার জুতা থাকার কথা ছিল।
কিন্তু কম শয়তান মনে হচ্ছে না তার জন্যে।
না, সেই কৃষ্ণাঙ্গের চেয়েও কম না যে
আমার সুন্দর হৃদয় দুটুকরো করে দিয়েছিল।
আমার বয়স ছিল দশ যখন
ওরা তোমাকে কবর দিল।
বিশ বছর বয়সে আমি মরতে চেয়েছিলাম
এবং ফিরতে চেয়েছিলাম তোমার কাছে, কাছে।
আমার মনে হয়েছিল তোমার হাড় দিয়েও হবে।
কিন্তু তারা আমাকে থলে থেকে বের করে
এবং আমাকে আঁঠা দিয়ে জুড়ে দেয়।
তখন আমি জানি আমার কি করতে হবে,
আমি তোমার একটি মূর্তি বানাই।
একটি কৃষ্ণাঙ্গ মুর্তি মাইন কাম্ফের মত যার চেহারা।
এবং নিপীড়নের প্রতি ভালোবাসা জন্মালো
এবং আমি বলেছি আমি রাজী, আমি রাজী।
তাই বাবা, আমার অবশেষে মুক্তি হয়েছে
সেই কালো টেলিফোনটির তার উপড়ে ফেলা হয়েছে,
সেই কন্ঠ আর আমাকে বিরক্ত করবে না।
আমি যদি একজনকে খুন করে থাকি
তাহলে কিন্তু দুজনকেই শেষ করে দিয়েছি।
সেই রক্তচোষা যে তোমার প্রতিমূর্তি হয়ে এসেছিল
এবং বছরখানেক ধরে আমার রক্ত চুষেছিল,
সাত বছর ধরে, যদি তুমি জানতে চাও।
বাবা, তুমি এখন শুতে পার।
তোমার কালো হৃদয়ে এখন একটি লম্বা পেরেক।
গ্রামের লোকজন কখনই
দেখতে পারত না তোমাকে,
তারা এখন খুশীতে নাচছে এবং
পদাঘাত করছে তোমাকে।
তারা সবসময়ই জানত তুমিই...।
বাবা, বাবা, ওহ জালিম বাবা আমি মুক্তি পেয়েছি।
সিলভিয়ার নিজ কন্ঠে কবিতাটি শুনুন:



ছবি: টাইমস অনলাইন এর সৌজন্যে।

প্রথম প্রকাশ: সচলায়তন