Friday, October 31, 2008

বার্লিন: গল্পের শহর, অথবা শহরটা নিজেই গল্প - ২

ফেস্টিভ্যাল অফ লাইটস:

বিশ্বের অনেক স্থানেই আলোক উৎসব পালন করা হয় বিভিন্ন রুপে। ভারতে দিওয়ালী বা নেপালে দীপাবলী ধার্মিক উৎসব হিসেবে অনেকে দেখলেও এটি আসলে এখন সার্বজনীন সাংস্কৃতিক উৎসবেরই অংশ হয়ে গেছে। ইরানের নববর্ষের (নরোজ) সময়ও তারা আলোক উৎসব করে থাকে। এছাড়া অন্যান্য উল্লেখযোগ্য আলোক উৎসবের মধ্যে রয়েছে ইহুদিদের হানুকা উৎসব, ফরাসীদের ফেত দে লুমিয়েখ (যা প্লেগ থেকে বাঁচতে মা মেরীর উদ্দেশ্যে নিবেদিত) যেগুলো বছরের বিভিন্ন সময়ে উদযাপিত হয়।

জন্ডারমেনমার্কট 
জন্ডারমেনমার্কট

উপরের এই ভুমিকার কারন হচ্ছে আজকে বার্লিনের ফেস্টিভাল অফ লাইটসের কথা বলব। প্রতি বছর তারা অক্টোবরের দ্বিতীয় ভাগে এই আলোকসজ্জার আয়োজন করে। এর ঐতিহাসিক পটভুমি খুঁজে পেলাম না তবে আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি পর্যটন উদ্যোগ। যেমন তাদের এবারের পর্যটন স্লোগান "Be Berlin" এর যৌক্তিকতা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছে।

তবে যাই হোক জার্মানরা যা করে তা অনেক পারঙ্গমতার সাথেই করে এবং এই বৈশিষ্টই তাদের এগিয়ে যাবার কারন। আমি বেশ কিছুদিন ধরেই বাসার কাছাকাছি আকাশে মেঘের গায়ে দুর থেকে সার্চ লাইট পড়তে দেখেছি। ভাবছিলাম এ আবার কি। এই ফেস্টিভ্যালের কথা খেয়াল ছিল না তবে শেষ পর্যন্ত দেখতে যাওয়া হলো এক রাতে।

জিগেসজয়েলে-ভিক্টরি টাওয়ার 
জিগেসজয়েলে-ভিক্টরি টাওয়ার

শহরের সব পর্যটন আকর্ষণগুলো অপূর্ব আলোক সজ্জায় পূর্ন হয়ে গেছে। শহরের প্রধান রাস্তায় ক্রিসমাসের আলোকসজ্জা যেন এখনই শুরু হয়ে গেছে। কেন্দ্রের দিকে গিয়ে সার্চ লাইটের ব্যাপারটি খোলাসা হলো। ইউরোপা সেন্টারের কাছে এক উঁচু বাড়ী থেকে বিশাল সব সার্চ লাইচের আলো চারিদিকে দুরদুরান্তে ও আকাশে ফেলা হচ্ছে। সাথে সবুজ লেজার লাইট ও রয়েছে। আকাশে মেঘ ছিল বলে অপূর্ব দৃশ্য ছিল সেটি। আমার পয়েন্ট এন্ড শ্যুট ক্যামেরায় এই আলোকসজ্জাগুলোর কিয়দংশও আসে নি।

ফরাসী চার্চ 
ফরাসী চার্চ

সাথে সাথে আরেক মজার ব্যাপার দেখলাম। কাধে ট্রাইপড হাতে অসংখ হবি ফটোগ্রাফাররা ছুটেছে। পরে এক জার্মান ব্লগ থেকে কিছু লিন্ক পেলাম। সেখানে উল্লেখ করা ছিল যে আপনারা এই ফেস্টিভ্যালের ছবিগুলোতে যেমন দেখছেন তেমন সুন্দর আপনি কাছে থেকে কখনই দেখতে পাবেন না। সত্যিই তাই। কারন বার্লিন ডোম ও উন্টার ডেন লিন্ডেন ছিল লোকে লোকারণ্য। ওখান থেকে কোনকিছুই ভালভাবে দেখতে পারিনি যেমন এই ফ্লিকারে আপলোড করা ছবিগুলো দেখাচ্ছে:

ফ্লিকারে বার্লিন ফেস্টিভ্যাল অফ লাইটস

বিশ্বজুড়ে রাতের বেশ কিছূ অসাধারন ছবি

পাতা ঝরার দিন:

শীত চলে আসছে দ্রুত। বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে পাতা ঝরার খেলা দেখলাম। এ সময়টা সত্যিই খুব অন্যরকম লাগে। ঝিরিঝিরি বাতাস বয়ে যাচ্ছে আর নানা রকম ভাবে ঘুরে ঘুরে পাতাগুলো পড়ে যাচ্ছে গাছ থেকে। সবুজ, হলুদ, বাদামী ইত্যাদি রংয়ের মিশ্রনে অপূর্ব দৃশ্য। সাথে মৃদু পাতা ঝরার শব্দের দ্যোতনা। এমনিতে বোঝা যায়না। কিন্তু হঠাৎ করে খেয়াল করলে মুগ্ধ হয়ে কতক্ষণ দাড়িয়ে শুনি।

ঝরা পাতা 
ঝরা পাতা

আমার মেয়ের কিন্ডারগার্টেনের সামনে অনেকগুলো মেপল গাছ আছে। সেগুলো বিশাল বিশাল পাতা নীচে পড়ে এমন অবস্থা হয় যে রাস্তাঘাট সব ঢেকে যায়। প্রতিদিন তাই দেখি রাস্তার কোনায় পাতাগুলো জড়ো করে রাখা। জার্মানরা খুবই প্রযুক্তিপ্রেমী জাতি। তাই চিরাচরিত ঝাটার বদলে পাতা সরাতে তারা ব্যবহার করে শক্তিশালী ব্লোয়ার। এর পর মাঝে মাঝে বড় ট্রাক এসে সাকশন পাইপের মত আরেকটি ব্লোয়ার দিয়ে রাস্তার কোনা থেকে সেগুলো তুলে নেয়।

পড়ে থাকা আপেল 
পড়ে থাকা আপেল

এই সময়টা হচ্ছে আপেলের। এ মাসের প্রথমে জার্মানীর দক্ষিণে লেক কন্সট্যান্স এলাকায় গিয়েছিলাম এবং ওখানকার আপেল গাছের ছড়াছড়ি দেখে বিস্মিত হয়েছিলাম। রাস্তার ধারে বাড়ীর আঙ্গিনায় আপেল গাছে টসটসে আপেল ঝুলছে, কিছু পড়ে আছে। কিন্তু হয়ত পেড়ে খাবার লোক নেই। আমরা যেখানে থাকি সেই এপার্টমেন্ট কম্প্লেক্সের পেছনে তিনটি বিল্ডিংয়ের জন্যে অনেক গাছ গাছালীতে ঘেরা বাচ্চাদের জন্যে একটি খেলার জায়গা। এই তল্লাটে মনে হয় শিশুদের সংখ্যা কম তাই সেখানে লোকজন দেখা যায়না বললেই চলে। টেবল টেনিসের টেবলটায় ছাতা পড়ে আছে, পাশে শেওলা পড়া চেয়ার। বহুকাল কেউ মাড়ায় না এ পথ। আমার মেয়ে সুইংয়ে চড়বে বলে বায়না ধরে মাঝে মাঝে তাই ইদানীং সেখানে যাওয়া হয়। মাসখানেক আগে আবিস্কার করলাম প্লে গ্রাউন্ডের পাশে একটি গাছে ছোট ছোট এক ধরনের ফল হয়ে রয়েছে। পেড়ে পর্যবেক্ষণ করার ইচ্ছা থাকলেও সেটি নিষেধ করে আবার কোন নিয়ম আছে কিনা ভেবে করা হয়নি। সেদিন দেখি ফলগুলোর অনেকগুলোই পেঁকে বেশ কিছু মাটিতে পড়ে রয়েছে। বুঝলাম এটি ছোট সাইজের এক ধরনের আপেল। বাড়ীতে এনে খেয়ে দেখলাম টক টক কিন্তু খেতে মন্দ নয়। এই বোধহয় ধনী ও গরীব দেশের মধ্যে পার্থক্য। ওখানে লোকে খেতে পায়না। এখানে খাবার পড়ে নষ্ট হয়, খাবার লোক নেই।

প্রথম প্রকাশ: সচলায়তন

Saturday, October 25, 2008

বাংলাদেশের ভোট: পুরস্কারপ্রাপ্ত একটি ইগভার্নেন্স সাইট

বাংলাদেশের একটি এনজিও সুজন (সুশাসনের জন্যে নাগরিক) বেশ কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্যে উল্লেখযোগ্য কাজ করে চলেছে।

বেশ কয়েক বছর আগে তারা প্রথমে অনলাইনে তুলে ধরে ২০০০ সালের ভোটার তালিকা, যাতে লোকে সার্চ করে তাদের তথ্য সঠিক আছে কিনা নিশ্চিত করতে পারে।


সম্প্রতি হয়ে যাওয়া সিটি কর্পোরেশন এবং পৌরসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে এই সংস্থা একটি ব্যতিক্রমী ওয়েবসাইট তৈরি করে যার নাম বাংলাদেশের ভোট। এর উদ্দেশ্য ছিল নির্বাচনের প্রার্থী সম্পর্কে সেইসব বিষয় তুলে ধরা যা একজন ভোটারকে তাকে ভোট দেবার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করবে। বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল:

১) প্রার্থীর আয়কর রিটার্নের তথ্য , নির্বাচনের ব্যয়ের উৎস , এফিডেভিট
২) প্রত্যেক নির্বাচনী এলাকার প্রার্থীদের তথ্যাদির তুলনা
৩) একটি দুর্নীতির সংবাদের আর্কাইভ (জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সন্ত্রাস, দুর্নীতি ইত্যাদি সংক্রান্ত তথ্যের সংকলন) যাতে সার্চ পদ্ধতি যোগ করা আছে, কোন প্রার্থীর প্রতি দুর্নীতির অভিযোগ আছে কিনা তা বের করার জন্যে।
৪) একটি আলোচনার ফোরাম
৫) বিভিন্ন দলিল

এ ছাড়াও তারা ভোটাররা কিভাবে আদর্শ প্রার্থী নির্বাচন করবে তা নিয়ে একটি শিক্ষামূলক ভিডিও প্রকাশ করে:



ঝর্ণার গান ব্লগের আফরুজ জানাচ্ছেন যে উল্লিখিত এই Votebd.org সাইটটি সম্প্রতি দক্ষিণ এশিয়ার মন্থন পুরস্কার পেয়েছে ইগভার্নেন্স ক্যাটেগরীতে।


ছবিতে সামহোয়ারইনের ব্লগার রুবনকে দেখা যাচ্ছে (ছবির উৎস )

এই সাইটটির সাথে যারা জড়িত সবাইকে অভিনন্দন। আশা করব আসন্ন নির্বাচনে এই সাইটটি প্রার্থীদের সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করে বাংলাদেশের ভোটারদের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে।

প্রথম প্রকাশ: সামহোয়্যার ইন

Wednesday, October 08, 2008

এ যুগের ফতোয়া: বিচারপতি তোমার বিচার করবে কারা?

সৌদি আরবের সুপ্রীম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের প্রধান বিচারপতি সালেহ আল লুহাইদান এক রেডিও অনুষ্ঠানে ফতোয়া দিলেন যেহেতু টিভি চ্যানেলগুলোতে অনৈতিক অনুষ্ঠান দেখানো হয় তাই তাদের মালিকদের মেরে ফেলা জায়েজ আছে। ৭৯ বছরের এই বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ যিনি সৌদি আরবের বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠত তার মুখ থেকেই যখন এরকম হুমকি বেরিয়ে আসে তখন অশিক্ষিত মৌলবাদীরা কি করবে তা আল্লাহই মালুম। তিনি অবশ্য রেডিও অনুষ্ঠানের ব্যাপারে কিছু বলেন নি। নিজে রেডিও অনুষ্ঠানে ছিলেন বলেই কি?

এইখানেই শেষ নয়, সৌদি আরবের আরেক বিশিষ্ট আলেম শেখ মুহাম্মদ আল হাবাদান নতুন এক ফতোয়া দিয়েছেন। কালো নেকাব পরা মেয়েরা যেহেতু চোখে মেকাপ লাগায় তা অনেক পুরুষকে উত্তেজিত করে কুপথে নিয়ে যেতে পারে। তাই তিনি হুকুম দিয়েছেন এখন থেকে মহিলাদের নেকাবের পাশাপাশি এক চোখ ঢাকা থাকবে।

অবশ্য উনি বলেন নি যে কোন চোখ ঢাকা থাকবে, ডান না বাম। এতে একটি সমস্যা দেখা দেবে। কেউ চোখের পাতা ফেললে যেহেতু অপর চোখটি দেখা যাবে না তাই অনেকে মনে করতে পারে যে সে চোখের বিশেষ ভঙ্গী করে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। সেটি আরও কেলেন্কারীর জন্ম দিতে পারে। তাই মনে হয় পরবর্তী ফতোয়া আসবে যে মেয়েরা দুটি চোখই আবৃত থাকবে, কারন কোনক্রমেই মেয়েদের জন্যে পুরুষদের উত্তেজিত হতে দেয়া চলবে না।

বাহরাইনের ব্লগার এস্রা শেখের ফতোয়ার জবাব দিয়েছে :

"আলেমদের এই প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে আমার একটি প্রস্তাব আছে। আপনারা যদি মহিলাদের চোখ দেখে উত্তেজিত হয়ে পরেন তাহলে আপনারা আপনাদের চোখ দুটি উপড়ে ফেলুন, তাহলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। মেয়েরা আপনাদের বিকৃত মানসিকতার জন্যে আর কত মূল্য দেবে?"



প্যালেস্টাইনি ব্লগার হাইতাম সাব্বাহ এক চোখ খোলা বোরখায় মহিলাদের কেমন দেখা যাবে তা চিত্রে প্রকাশ করে বোঝার চেষ্টা করছেন শেখ মুহাম্মদ কি বোঝাতে চাইছেন।

সৌদি আরব একটি পরিপূর্ণ ইসলামী শাষনভিত্তিক দেশ। সে দেশে এরকম নাটক সার্কাস হচ্ছে। অথচ এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হবে না।

বাংলাদেশে এখন ফতোয়া নিষিদ্ধ করা আছে যদিও অনেকে জানেনা বা মানে না। এখন আপনারাই বলেন আমাদের দেশে কি পরিপূর্ণ ইসলামী শাষনভিত্তিক প্রথা এরপরও লোকজন চাইবে?

প্রথম প্রকাশ: সামহোয়্যার ইন

Sunday, September 07, 2008

বার্লিন: গল্পের শহর, অথবা শহরটা নিজেই গল্প

বার্লিন শহরে কিছু যায়গা আছে, যেগুলো অনেকের কাছে এত পরিচিত যে তারা শুধু দর্শনীয় স্থান হিসেবে নয় আরও বিশাল পরিসরে উপস্থাপিত। এদের কোনটি ইতিহাসের পর ইতিহাসের সাক্ষী, কোনটি সিনেমার লোকেশন, কোনটি মিউজিয়াম, কোনটি বা ঐতিহ্যগত বা আধুনিক স্থাপনার নিদর্শন হিসেবে লোকের মুখে মুখে ফিরে। এসব জায়গায় শহরটি নিজেই একেকটি গল্প হয়ে যায়। পর্যটকরা এই স্থানগুলিকে জানেন: ব্রান্ডেনবুর্গার গেট, উন্টার ডেন লিন্ডেন, রাইখসটাগ, পটসডামার প্লাৎস, আলেক্জান্ডার প্লাৎস ইত্যাদি। কিন্তু গল্পগুলো পুরোপুরি তাদের জানা নেই। এ শহরের বাসিন্দাদের কাছে এ স্থানগুলোর গল্পগুলো পরিচিত, অথবা নিজেরাই হয়ে যায় গল্পের একেকটি চরিত্র, নতুন নতুন গল্পের জন্ম দেয়।

বেবেলপ্লাৎসের গল্প

ব্রান্ডেনবুর্গ গেট থেকে পূবের দিকে নামকরা রাস্তা 'উন্টার ডেন লিন্ডেন' ধরে ৫০০ মিটারের মত গেলে হামবোল্ডট বিশ্ববিদ্যালয়ের উল্টোদিকে পড়বে বেবেলপ্লাৎস, একটি বিশাল চত্বর। একে ঘিরে রয়েছে পুরনো লাইব্রেরী, একটি ক্যাথেড্রাল ও স্টেট অপেরা যা আসলে একটি প্রাসাদ যা ১৭৪৩ সালে প্রুসিয়ার হোহেনজোলার্ন রাজবংশের রাজা দ্বিতীয় ফ্রেডেরিক কর্তৃক নির্মিত হয়েছিল। এটি ওপার্ন প্লাৎস নামে পরিচিত ছিল এবং ১৯৪৭ সালে সোস্যাল ডেমোক্র্যাট নেতা অগাস্ট বেবেলের নামে এর বর্তমান নামকরণ করা হয়।

এখানে নামকরা আন্তর্জাতিক এক্সিবিশন ও অনুষ্ঠান হয়ে থাকে।

বেবেল প্লাৎস 
বেবেল প্লাৎস    ছবি: উইকি পিডিয়ার সৌজন্যে

এখানে প্যানোরামাতে বেবেল প্লাৎসকে দেখতে পাবেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই বিল্ডিংগুলো ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। যা দেখছেন তা পরে সংস্কার করা।

বেবেলপ্লাৎসের একটি কলন্কময় ইতিহাস আছে। ১৯৩৩ সালের দশই মে হিটলারের ছাত্র-ছাত্রীদের এসোসিয়েসন (এস এ) এবং নাৎসী ইয়থ গ্রুপের সদস্যরা এখানে প্রপাগান্ডা মন্ত্রী গোবেলস এর উস্কানীতে মূলত ইহুদী লেখক, দার্শনিক, বিজ্ঞানীদের প্রায় ২০,০০০ বই পুরিয়ে দেয়। তাদের ঘোষিত অজার্মান চেতনার বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযানের মূল মন্ত্র ছিল ইহুদী বুদ্ধিজীবিদের হাত থেকে জার্মান ভাষা ও সংস্কৃতিকে রক্ষা করা। কার্ল মার্কস, সিগমন্ড ফ্রয়েড, ম্যাক্সিম গোর্কি, হাইনরিশ হাইনে প্রভৃতি ইহুদী লেখকের বই তার মধ্যে ছিল এবং অন্যান্য ধর্মীয় জার্মান নাগরিক যেমন থমাস মান, এরিক মারিয়া রেমার্ক এবং বিদেশী (আমেরিকান) লেখক আর্নেষ্ট হেমিংওয়ে এবং হেলেন কেলারের বইও বাদ যায়নি। সেখানে এখন বেদবাক্যের মত হাইনরিশ হাইনের একটি উক্তি (১৮২০ সালে করা) বাঁধানো আছে “তারা যেখানে বই পোড়ায়, শেষে তারা মানুষও পোড়াবে”

হামবোল্ট বিশ্ববিদ্যালয় 
হামবোল্ট বিশ্ববিদ্যালয়

রাস্তার অপরপাশে হামবোল্ডট বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পুরোন বই নিয়ে বসে থাকে লোকে বিক্রি করার জন্যে। এই অঞ্চলে এই বই পোড়ানো বিভিন্ন ভাবে স্মরণ করা হয়।

আধুনিক বই প্রকাশনা 
আধুনিক বই প্রকাশনা

আমার ক্যামেরায় বেবেলপ্লাৎসের সামনে আধুনিক বই প্রকাশনার চিন্তাধারার রুপকার গুটেনবার্গের স্মরণে স্কাল্পচার (২০০৬ সালের বিশ্বকাপের সময় তোলা)

বই পোড়ানোর ৭৫ বছর পরের বেবেল প্লাৎস: আমার গল্প

বিএমডাব্লিউ কোম্পানির পৃষ্ঠপোষকতায় বেবেল প্লাটসে উন্মুক্ত ক্লাসিকাল সঙ্গীত পরিবেশিত হবে শুনে ৩০শে আগস্ট বিকেল পাঁচটার দিকে সেখানে গিয়ে হাজির হলাম। স্টেজের মাইক্রোফোন ঠিক করা হচ্ছে আর গুটিকয়েক দর্শক দেখে ভাবনায় পরে গেলাম। সামনের এক খাবার দোকানে জিজ্ঞেস করতেই জানলাম ৭টায় অনুষ্ঠান শুরু হবে। সাথে এক সিনিয়র ভাই যিনি আবার পাশ্চাত্য সঙ্গীতে তেমন আগ্রহী নন তবে আমাকে ভালই সঙ্গ দিচ্ছেন। তাকে নিয়ে হাটতে হাটতে 'উন্টার যেন লিন্ডেন' ধরে মিউজিয়াম আইল্যান্ডের পাশ দিয়ে হাকেশার মার্কট চত্বরে চলে গেলাম সময় কাটানোর জন্যে।

লঙ নাইট অফ মিউজিয়ামসের জন্যে মানুষের ঢল 
লং নাইট অফ মিউজিয়ামসের জন্যে মানুষের ঢল

সেদিন আবার লং নাইট অফ মিউজিয়ামস শুরু হয়েছে তাই সেই অঞ্চলে লোকে গিজগিজ করছে। বছরের একটি দিন সন্ধ্যা ছটা থেকে রাত দুটো পর্যন্ত মিউজিয়াম খোলা থাকে। এক টিকেটে প্রায় ১০০টি যাদুঘর, আর্কাইভ, মেমোরিয়াল, রাজপ্রাসাদ ইত্যাদি দর্শনীয় স্থান দেখার ব্যবস্থা আছে। আলাদা এক বাসের বহর চালু করা হয়েছে দর্শনার্থীদের এক স্থান থেকে আরেক স্থানে পৌঁছানোর জন্যে। ৮ ঘন্টায় আর মানুষ কত দেখবে যেখানে একটি যাদুঘরেই ঘন্টার পর ঘন্টা কাটানো যায়।

আমরা ফিরে এলাম বেবেল প্লাৎসে পৌঁনে সাতটায়। চত্বরে ঢোকার আগে স্টেট অপেরার সামনে ভিড় দেখে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছিলাম। গাড়ীতে করে কেউ এসেছে এবং তাকে ঘিরে প্লেন ক্লথের সিকিউরিটি দেখে ভাবলাম কোন শিল্পী হয়ত। পরে গাড়ীর নম্বর দেখলাম ০-১ অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট এসেছেন। উনি কনসার্ট দেখতে এসেছেন বউ সাথে নিয়ে। সবাইকে হাত নাড়িয়ে অপেরা হাউজে ঢুকে গেলেন। এত কম সিকিউরিটি দেখে বিস্মিত হলাম।

জার্মান প্রেসিডেন্ট এসেছেন অপেরা দেখতে 
জার্মান প্রেসিডেন্ট এসেছেন অপেরা দেখতে

জায়গা পাওয়া নিয়ে যার পরনাই সমস্যা হল। চেয়ারের ব্যবস্থা নেই। সবাই নিজের মত বাসা থেকে টুল নিয়ে এসেছে অথবা চাদর বিছিয়ে বসেছে। কেউ কেউ আরাম করে গ্লাসে শ্যাম্পেন হাতে নিয়ে বসেছে। ক্লাসিকাল সঙ্গীত এখানে খুবই উচ্চ মার্গের একটি ব্যাপার। আমরা কোনার একদিকে একটু দাড়ানোর জায়গা পেলাম। আমার সঙ্গীটি জায়গা না পেয়ে বেশ বিরক্ত তাই ভাবলাম বেশীক্ষণ থাকা যাবে না।

সাতটার সময় বার্লিনের গে মেয়র আর বিএমডাব্লিউর প্রধান অনুষ্ঠান উদ্বোধন করলেন মঞ্চে। তবে মন খারাপ হয়ে গেল যখন ঘোষনা হল যে আজকের পরিবেশনা হবে স্টেট অপেরার ভেতরে (আমন্ত্রিত দর্শকদের সামনে) এবং বিশাল টিভি স্ক্রিনে বেবেল প্লাৎসের দর্শকরা দেখবেন। আগামী কাল হবে বেথোফেনের নাইন্থ সিম্ফোনী সেটা মঞ্চে লাইভ হবে বিনামূল্যের দর্শকদের জন্যে।

মঞ্চ, বিশাল স্ক্রীন ও দর্শক শ্রোতা 
মঞ্চ, বিশাল স্ক্রীন ও দর্শক শ্রোতা

প্রায় ১০০০০ লোক উপভোগ করলেন স্টেট অপেরার নামকরা মিউজিক ডিরেক্টর ডানিয়েল বারেনবইম (একজন ইহুদি) এর পরিচালনায় বেথোফেনের অপেরা ফিডেলিও। পিন পতন নিস্তব্ধতা না হলেও কম লোকেই ফিসফিস করে কথা বলছিল আর সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনছিল। আমার অবশ্যি বেশীক্ষণ থাকা হলো না সঙ্গীর কথা ভেবে।

ড্যানিয়েল বারেনবইম 
ড্যানিয়েল বারেনবইম

৭৫ বছর আগে জার্মান জাতীয়তাবাদের যে পন্কিল অধ্যায় এখানে রচিত হয়েছিল তার ফল অনেক আগেই তারা ভোগ করেছে। আজ যেন একটি 'পোয়েটিক জাস্টিস' হলো এক ইহুদী সঙ্গীতজ্ঞ এখানে ১০০০০ জার্মান নাগরিককে বিমোহিত করার মাধ্যমে।

প্রথম প্রকাশ: সচলায়তন

বাংলা ব্লগের বিবর্তন ও সম্ভাবনা

অনেকের হয়ত চোখে পরে নি আজকে ডেইলি স্টার ক্যাম্পাসের একটি আর্টিকেলে বাংলা ব্লগকে উদীয়মান মিডিয়া বলে আখ্যা দিয়েছে । 'বাঁধ ভাঙ্গার আওয়াজ' এই রিপোর্টে ভাল ভাবেই উপস্থাপিত হয়েছে এবং ব্লগ যে ঐতিহ্যবাহী মিডিয়ার বিকল্প নয় বরং সহায়ক তা উল্লেখ করা হয়েছে। এই ব্লগে প্রতি ছয় মিনিটে একটি নতুন পোস্ট এবং প্রতি ২০ সেকেন্ডে একটি কমেন্ট দেয়া হয় কাজেই এর জনপ্রিয়তা ও শক্তি নিয়ে কারও প্রশ্ন থাকার কথা নয়।

এখন এই শক্তির কিভাবে সুব্যবহার করা যায়? আমরা ইতোমধ্যে ব্লগে বেশ কিছু মানবিক সাহায্যের প্রয়াস দেখেছি যা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে বেশীরভাগ মানুষই সমাজে ভাল কিছু অবদান রাখতে দ্বিধা করে না। দরকার শুধু তাদের কাছে বিষয়টুকু তুলে ধরা ও সেই প্রক্রিয়াটাকে চালু করে দেয়া ও তার সুব্যবস্থাপনা। আমরা দেখেছি শুধু সাহায্য সংগ্রহ করাই নয় পাহাড় ধসের পর ব্লগাররা চট্টগ্রামে গিয়ে নিজের শ্রমও দিয়ে এসেছেন।

এগুলো তো অব্যাহত থাকবেই আমি সেটাই আশা করি। এছাড়াও বিশ্বব্যাপী ব্লগ কেমনভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে তা জানলে হয়ত আরও কিছু ভাবনার খোরাক পাবেন 'বাঁধ ভাঙ্গার আওয়াজ' কমিউনিটি।

১) উশাহিদি: ২০০৬ সালের শেষের দিকে কেনিয়াতে প্রচার মাধ্যমের কণ্ঠরোধ করার পর মোবাইল ফোনে পাঠানো সংবাদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ২০০৭ সালের শুরুতে নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতা কভার করার জন্যে মোবাইল ফোনের এস এম এসের মাধ্যমে প্রাপ্ত সংবাদ ইন্টারএক্টিভ ওয়েবসাইট বা ব্লগ ব্যবহার করে উশাহিদি বিশ্বকে সংঘাতের সঠিক চিত্র জানাতে সক্ষম হয়। বিস্তারিত এখানে। বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনে এরকম মোবাইল ফোন ও ব্লগের সমন্বয়ে উদ্যোগ নিতে পারে ব্লগাররা।

২) সানলাইট ফাউন্ডেশন : আমেরিকান কংগ্রেসের দুর্নীতি উন্মোচন করতে একটি উদ্যোগ হচ্ছে সানলাইট ফাউন্ডেশন । এটি কাজ করেছে শতাধিক ব্লগারের সহায়তায় যারা নিজেরা মাঠ পর্যায়ে তদন্ত কংগ্রেসম্যানদের দুর্নীতি উন্মোচন করেছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দুর্নীতি বা অন্য কোন অপরাধের বিরুদ্ধে সমষ্টিগতভাবে যে যার মত সহায়তা করে ব্লগাররা কার্যকরী অনেক কিছুই করতে পারে।

৩) উন্নত বিশ্বের এনজিওদের জন্যে তো ব্লগ এবং সোশ্যাল মিডিয়া একটি গুরুত্বপূর্ন টুল । অবকাঠামোর অভাব এবং ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের সংখ্যা কম বলে বাংলাদেশে এ সংস্কৃতি এখনও গেড়ে বসেনি। অথচ ফান্ড রেইজিং এর মত অনেক কাজ কিন্তু এর সাহয্যে সহজেই করা সম্ভব।

চিন্তা করে দেখেন যখন বাংলাদেশের এনজিওদের জন্যে ব্লগিং এবং সোশাল মিডিয়া টুলগুলোর প্রয়োগ অবশ্য পালনীয় হয়ে যাবে তখন তাদের প্রচুর পরিমানে ব্লগিংএ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন লোক দরকার হবে এবং এই উদীয়মান ব্লগাররাই সেই চাহিদা পূরণ করবে।

৪) ফেসবুকের জনপ্রিয়তা: প্রায় লাখেরও বেশী বাংলাদেশী ফেসবুকের সদস্য। আপনার ব্লগের লেখা বা অন্য কোন ভাল লেখা সম্পর্কে অন্যকে জানাতে চান? ফেসবুক ব্যবহার করেন।

৫) আরএসএস ফিড ব্যবহার করুন: আপনি এত পোস্টের ভীড়ে ভাল লেখা খুঁজে পাচ্ছেন না? সামহোয়ারইন আরএসএস ফিড সাপোর্ট করে। আপনার পছন্দের ব্লগগুলো যখনই নতুন পোস্ট করবে তখন তা আরএসএস ফিড রিডারে চলে আসবে। আপনার বার বার তাদের পেজে গিয়ে দেখতে হবে না যে তারা নতুন কিছু লিখেছে কি না।

প্রথম প্রকাশ: সামহোয়্যার ইন

Saturday, September 06, 2008

একটি অপরাধের কাহিনী

ঘটনাটি ছিল খুবই সাধারণ। ম্যাকডোনাল্ডসে খাবারের অর্ডার দেয়ার পরে ক্যাশ মেশিনে উঠল ৬.৪০ ইউরো। কয়েন খুঁজে পেতে দেরী হচ্ছে দেখে লাইনের পেছনের ছেলেটার চেহারায় দেখলাম অস্বস্তির ভাব। পাঁচ ইউরোর নোট, এক ইউরো ও পঞ্চাশ সেন্টের মাধ্যমে বিল পরিশোধ করার পরে ট্রেতে চেন্জ ও খাবার গুলো দিল ক্যাশের মেয়েটি। 'ডান্কে শোন' বলতে বলতেই শুনি সে পেছনের জনকে বলছে '..নেখস্টে বিটে'।

খালি যায়গা খুঁজে খেতে বসে খুঁচরোগুলো পকেটে পুরতে গিয়ে দেখি তিনটি ২০ সেন্টের কয়েন। বিলে লেখা আছে সেই ৬.৪০ ইউরো। তারপর বসে বসে ভাবলাম আমি কি তাকে ৭ ইউরো দিয়েছি? সে তো হবার নয় কারন অনেক খুঁজে পেতে কয়েনগুলো দিয়েছি। কাউন্টারে গিয়ে জিজ্ঞেস করার চিন্তা হলো কিন্তু বিশাল লাইন দেখে ভাবলাম 'কি দরকার'। এরপর থেকেই সমস্যাটি শুরু হল।

বাসায় ফিরে বার বার মাথায় ঘুরতে লাগল ব্যাপারটি - আমি কেন তাকে পয়সাটুকু ফেরত দিলাম না। কেন একে স্বাভাবিক মনে হল।

অথচ এই আমিই কিছুদিন আগে সাপ্তাহিক বাজার করার পর পার্কিং লটে এসে কি কারনে বিলের দিকে তাকিয়ে দেখি ১১ প্যাকেট দুধের বদলে ৬টির দাম রেখেছে। আবার গিয়ে লাইনে দাড়িয়ে বাকী পাঁচটির দামটুকু শোধ করে এসেছি।
আসলে আমাদের সবার ভেতরেই একটি দ্বৈত সত্তা কাজ করে। আমাদের সবারই একটি অপরাধপ্রবণতা রয়েছে যা মাঝে মধ্যে বের হয়ে পরে, অজান্তেই হয়ত। এবং আমারও হয়ত এমন আরও অপরাধবোধ রয়েছে যা হয়ত কোনদিন প্রকাশ করা হবে না।

কয়েক বছর আগে ঢাকার গুলশান এক নম্বরের এক এটিএম বুথে ঢুকেই দেখি আগের কেউ তার কার্ড ভেতরে রেখে চলে গেছে। স্ক্রীনে জ্বলজ্বল করছে "Would you like another transaction?" কয়েকটি বোতাম টিপলেই অন্যের বেশ কিছু টাকা হস্তগত হয়ে যেত। কিন্তু আমি কার্ডটি বের করে গার্ডের কাছে দিয়ে দেই কারন আমি জানতাম এটিএম এ ভিডিও ক্যামেরা থাকে এবং সেই অপকর্ম প্রকাশ হয়ে পরবে। ভিডিও ক্যামেরা যদি না থাকত তাহলে আমি কি সেই কার্ড ব্যবহার করে টাকা তুলতাম? খুবই ভেবে দেখার বিষয়।

মাঝে মাঝে নিজের অক্ষমতা নিয়ে খুবই হতাশ হই। হতে পারলাম না আদর্শ কোন মানুষ অথবা আদর্শ কোন ক্রিমিনাল যার অপরাধবোধ নেই।

প্রথম প্রকাশ: সচলায়তন

Thursday, August 14, 2008

উপমহাসাগরীয় অঞ্চলে আধুনিক দাসত্ব

অতি সম্প্রতি বাহরাইন ও কুয়েতে বাংলাদেশের শ্রমিকদের নিয়ে যেসব লন্কাকান্ড হয়ে গেল এসব নিয়ে আরব দেশগুলোর অবস্থান কিন্তু নমনীয় না। তাদের মনোভাব এমন যে এভাবে থাকতে হলে থাকো না হলে চলে যাও।

এনিয়ে আমরা পত্রপত্রিকাতে পরস্পর-বিরোধী অনেক কথা শুনেছি। কোনটিই কিন্তু এসম্পর্কে সঠিক পরিপ্রক্ষিত দেয় না। বর্তমানে সিটিজেন জার্নালিজম ও ব্লগের যুগে আমি আশা করব আমাদের এইসব নির্যাতিত ভাইবোনেরা ব্লগের মাধ্যমে তাদের দু:খকষ্টের কথা জানাবেন।

আরব দেশগুলোর সরকারী মনোভাব এমন হলেও সাধারণ লোকজন কি ভাবছে সেটা আমাদের জানার তেমন সুযোগ নেই। গ্লোবাল ভয়েসেস অনলাইনে কিছু আরব ব্লগারদের মতামত পড়ে মনে হয়েছে যে তাদের অনেকে হয়ত এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে।

বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী কর্তৃক বাংলাদেশী শ্রমিকদের জন্য কাজের অনুমতি দেয়াতে নিষেধাজ্ঞা জারির পর সে দেশী ব্লগার খালিদ বলেছেন :

সম্প্রতি, বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী একটা ডিক্রি জারি করেছেন বাংলাদেশীদের নতুন কাজের অনুমোদন না দেয়ার জন্য!! এটা একজন বাংলাদেশীর জঘন্য অপরাধ করার কারনে!! এখানে আমি জানতে চাই: এই আইন করার পেছনে মূল উদ্দেশ্য কি? এর আইনী দিক গুলো কি? একটা অপরাধ হলে, তদন্ত হবে আর বিচার ব্যবস্থাও আছে তার জন্য। তাহলে বাংলাদেশের লোকের উপর এই নিষেধাজ্ঞা কেন? আর এই পক্ষপাতিত্ব কেন? আর কোন আইনের আওতায় একজন বা একদলের অপরাধের জন্য একটা গোটা জাতিকে শাস্তি দেয়া হচ্ছে? আমরা আইনের দেশে আছি না? এই সিদ্ধান্ত কি ঠিক? অবশ্যই না আর এটা একটা গুরুতর ভুল। আজকে সবাই এমন ভাবে বলছে যেন সব বাংলাদেশী অপরাধী আর খুনী, যাদেরকে বের করে দেয়া উচিত।

(বিস্তারিত গ্লোবাল ভয়েসেস বাংলায় )

দুইশোরও বেশী বাংলাদেশী শ্রমিককে কুয়েত থেকে বহিস্কার প্রসঙে সৌদি ব্লগার আহমাদ লিখেছেন :

আমি নিশ্চিত শুধু কুয়েত নয় গাল্ফ অঞ্চলের আমরা সবাই এশিয়ার শ্রমিকদের নীচু করে দেখি। তাদের কোন ধরনের প্রশংসা বা সম্মান তো করিই না, পশুর মত ব্যবহার করি। আমাদের নাগরিকরা তাদের সাথে এমনভাবে ব্যবহার করে যেন তারা মানুষ নয়, আর কোম্পানিরাতো তাদের সাথে আরও খারাপ ব্যবহার করে, কম বেতন দেয়া থেকে শুরু করে। আমি জানি যে ১২০ আমেরিকান ডলার (৪৫০ রিয়াল) হয়ত বাংলাদেশে উঁচু মাসিক বেতন অনেকের জন্যে, কিন্তু এই বেতনে রিয়াদ, দুবাই বা কুয়েতে কোন শ্রমিক জীবনধারণ করতে পারবে না, কোন টাকা জমানো তো দুরে থাক। আমরা যদি দৈনিক তিন বেলা খাবারের কথা চিন্তা করি, শ্রমিকদের কমপক্ষে ১২ রিয়াল ব্যয় করতে হবে প্রতিদিন। এবং তার মানে তাদের ৩৬০ রিয়াল খাবারের পেছনেই ব্যয় হবে, কাপড়, যাতায়াত ও অন্যান্যর কথা বাদই দিলাম।

গাল্ফ অঞ্চলের শ্রম মন্ত্রণালয়রা দেশের নাগরিকদের কাজের ব্যাপারেই শুধু চিন্তা করে এবং এই দুর্বলতাকেই কাজে লাগায় বিভিন্ন কোম্পানি। তারা শ্রমিকদের উপর তাদের শয়তানি চাল চালে কম বেতন, অতিরিক্ত কাজ, নিকৃষ্ট বাসস্থান ইত্যাদি দিয়ে এবং সব ধরণের সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে। যদিও কাজের সময় নয় ঘন্টার বেশী হবার কথা নয় আমরা দেখছি যে নির্মানশিল্পে এমনকি রেস্টুরেন্টে সারাদিন ধরে শ্রমিকরা কাজ করছে। তারপরেও আমরা রেগে যাই যখন মানবাধিকার সংগঠনগুলো গাল্ফ অঞ্চলে দাসত্বের অভিযোগ তুললে।

সরকারী বড় বড় প্রকল্পের পাওনা যখন পরিশোধ করতে সরকার দেরী করে, অনেক কোম্পানিরাই শ্রমিকদের বেতন দেয়া বন্ধ রাখে। যখন শ্রমিকরা প্রতিবাদ শুরু করে এবং তাদের কণ্ঠ তাদের দেশের কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছে, ঐসব কোম্পানীরা তাদের কাছে বলে যে সরকারের কাছ থেকে টাকা পাচ্ছে না বলে তারা দিতে পারছে না। অথচ হয়ত তাদের প্রাপ্যের কিছু পরিমাণই বাকী আছে যা হয়ত সাত-আট মাস পরে পাওয়া যাবে। এর সাথে শ্রমিকদের কোন সম্পর্ক না থাকলেও তারা এ দিয়ে শ্রমিকদের জিম্মি করে রাখে। তাদের আট মাস ধরে বেতন দেয়া হয় না - তারপরেও আমরা রেগে যাই যখন তারা অপরাধ ও চুরি চামারী বেছে নেয়।

যখন আমি শ্রমিকদের দু:খ দুর্দশার আসল ঘটনাগুলো শুনি, আমার এটাই বুঝতে পারি যে তাদের দাসের মতই ব্যবহার করা হচ্ছে। কোন কোন কোম্পানি তাদের রেসিডেন্স পার্মিট নবায়নের জন্যে একমাসের বেতন কাটে, আরেক কোম্পানি শ্রমিকদের সাপ্তাহিক ছুটি থেকে বঞ্চিত করে। তাদের ছুটির জন্যে কোন ওজর শোনা হয় না, এমনকি অসুস্থ অবস্থায়ও তাদের কাজ করতে হয়। একজন শ্রমিক বলেছে যে সে তিন বছর ধরে সৌদি আরবে কাজ করছে কিন্তু একবারও হজ্জ্ব করতে পারেনি কারন তার কোম্পানি তাকে দুদিনেরও ছুটি দেয়নি।

এইসব খারাপ দিকগুলোর প্রভাব বাসার কাজেও পড়েছে। সমস্ত উপমহাসাগরীয় দেশগুলিতে বাসার কাজের লোক বা ড্রাইভার ১৮ ঘন্টা একনাগারে কাজ করে, এবং এদের অনেকেরই ঠিকমত শোয়ার যায়গা নেই। কারও কারও শোয়ার জায়গা মিলে রান্নাঘরে, ফ্রিজ এবং ওভেনের মাঝামাঝি যায়গায়। একদা আমার এক বন্ধু বলেছিল (গর্ব সহকারে) যে সে তার কাজের মেয়েকে উঠান ঝাড়ু দিতে দেয় না কারন সে হয়ত পড়শীর ড্রাইভারের ফোন নম্বর জেনে যেতে পারে। তাই সে কখনও বাড়ীর বাইরে যাবার সুযোগ পায় নি এবং হয়ত কোনদিন সুর্যরশ্মির স্পর্শ পায় নি ছাদে কাপড় শুকানোর সময় ছাড়া। আমার বন্ধুটি বলেছিল যে তাকে পরিবারের সাথে দোকান বা রেস্টুরেন্টেও যেতে বাধা দেয়া হয় অন্যান্য কাজের লোকের সাথে পরিচিত হবে এই ভয়ে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘সে কি জেলে বন্দী?' সে বলল, ‘কিন্তু এই কাজের মেয়ে তো সুখেই আছে!'

আমাদের সবচয়ে বড় সমস্যা ইসলাম ধর্ম নিয়ে নয়, অবশ্যই; আমরা আমাদের সংস্কৃতি এবং আমাদের ইসলামিক রীতি নিয়ে গর্ব করি কিন্তু সেগুলো পালন করি না। যে কোন দিন একটি নির্মান স্থানের সামনের ট্রাফিক লাইটে থেমে দেখবেন, কিভাবে ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস গরমে, শ্রমিকরা একটি যন্ত্রপাতির (অথবা ভেড়া বহনের) ট্রাকে গাদাগাদি করে আছে। কিন্তু কোম্পানির মালিকের লালসা বড়, তাদের বাসস্থান থেকে কার্যস্থলে আনা নেয়ার জন্যে বাস কেনে না, যা কিনতে হয়ত মাত্র ৪০,০০০ রিয়াল খরচ হত। যদি এই বিষয়টি আমার হাতে থাকত, ট্রাকে করে শ্রমিক বহনকারী কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা করতাম, এবং বিচারে রায় হত মালিককে এক সপ্তাহ এভাবে যাতায়াত করতে হবে। (শুধুই আমার স্বপ্নে!)

আপনারাই বলেন, কখন আপনি আপনার ড্রাইভার বা কাজের লোকের জন্যে রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার এনেছেন? এবং আপনি ড্রাইভারকে কি আপনার মোবাইল ফোন দেন তার পরিবারের সাথে কথা বলার জন্যে? আর আপনার কাজের মেয়ের বেলায় কি হয়? সে কি এখনও পরিবারকে চিঠি লিখে পোস্টে পাঠায়?

এটি যে দাসত্ব এ ব্যাপারে আপনার কোন সন্দেহ আছে?


(সূত্র গ্লোবাল ভয়েসেস বাংলা )