Tuesday, January 12, 2010

আল্লাহ তুমি কার!

"যেমন রক্তের মধ্যে জন্ম নেয় সোনালি অসুখ
তারপর ফুটে ওঠে ত্বকে মাংসে বীভৎস ক্ষত।
জাতির শরীরে আজ তেম্নি দ্যাখো দুরারোগ্য ব্যাধি
ধর্মান্ধ পিশাচ আর পরকাল ব্যবসায়ী রূপে
ক্রমশঃ উঠছে ফুটে ক্ষয়রোগ, রোগের প্রকোপ"

রাজনৈতিক ইসলামের স্বরূপ উন্মোচন করে রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এই কথাগুলো লিখেছিলেন কয়েক দশক আগে তার 'ধর্মান্ধের ধর্ম নেই' কবিতাটিতে। সেই কথাগুলো আজও প্রযোজ্য আমাদের দেশে এবং যেমন ধরুন মালয়েশিয়ায়। সেই দেশটি আমাদের দেশের মত ব্রিটিশ কলোনি ছিল এবং ১৯৬৩ সালে স্বাধীন হবার সময় ব্রিটিশ আইনকে উত্তরাধিকার হিসেবে পায়। মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠের এই দেশে মোল্লাদের প্রভাব ছিল শুধু মসজিদের ভেতরেই। এর প্রথমদিককার রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষ। সাথে সাথে মালয়েশিয়ায় প্রচুর চৈনিক এবং ভারতীয় শ্রমিক আসে কাজ করতে। সরকার তাদের ভোটাধিকার দেয় এবং তারাও ধর্মীয় রাজনৈতিক দলগুলোকে ক্ষমতায় আসতে বিরত রাখে। মালয়রা এমনিতে শান্তি প্রিয় জাতি, তাই বিভিন্ন ধর্মের সহাবস্থান ছিল এতদিন কোন বড় ঝামেলা ছাড়াই।

বর্তমান সমৃদ্ধ মালয়েশিয়ার রুপকার মাহাথির মোহাম্মাদ নিজে খুব আধুনিক হলেও মালয়েশিয়ার মুসলমান পরিচয়টি আগে বাড়িয়ে রেখেছিলেন এবং ইহুদী ও পশ্চিমা বিশ্বের প্রতি সমালোচনায় তিনি ছিলেন উচ্চকণ্ঠ। তবে সেটি কখনই বাড়াবাড়ি পর্যায়ে যায় নি এবং অনেকে বলে যে তার এই টোনটি ছিল বিরোধী দলকে মোকাবেলায় মুসলমান ভোট টানার চেষ্টার ফসল। তবে বিগত দশকে মুসলমান মালয়রা (৬০%) সবকিছুর মধ্যে বেশী পরিমাণে ধর্মীয় অনুশাষণকে টেনে এনেছে।
বাংলাদেশের মত মালয়েশিয়াও মুসলমানদের ফ্যামিলি কোর্টের ব্যাপারস্যাপারগুলো - বিয়ে, বিচ্ছেদ, শিশু অধিকার ইত্যাদি শরিয়া আইন দ্বারা নির্ধারণ করা হয়। তবে মালয়েশিয়ায় কিছু ফৌজদারী আইনও শরিয়া আইন দ্বারা নির্ধারিত - যেমন মদ্যপান, রোজা না রাখা, বিবাহ বহির্ভূত যৌনসম্পর্ক ইত্যাদি।

উদাহরণস্বরূপ মদ্যপানের শাস্তি জরিমানা বা সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে জেল বা বেত্রাঘাত। সেদেশে মদ বিক্রি করার সময় কিন্তু সাধারণত পরীক্ষা করা হয়না আসলেই ক্রেতা মুসলমান কিনা এবং এতদিন পর্যন্ত এটি ঢিলাঢালা ভাবেই ছিলি এবং সর্বোচ্চ জরিমানার কথা শোনা গেছে। তবে গত বছরে মালয়েশিয়ার এক মডেল খবরের হেডলাইনে চলে আসে কারণ তাকে বিয়ার পানরত অবস্থায় দেখা যাওয়ায় তার বিরুদ্ধে বেত্রাঘাত এর শাস্তি দেয়া হয়। মালয়েশিয়ার ইসলামী শাসন হার্ডলাইনে চলে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয় গত আগষ্টে ব্ল্যাক আইড পিজ এর কনসার্টে মুসলমানদের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে। সরকার কারণ দেখিয়েছে যে আইরিশ বিয়ার প্রস্তুতকারী গিনেস এর স্পনসর - তাই তারা এটি মুসলমানদের জন্যে নিষিদ্ধ করেছে।
উপরের যুক্তিটি কি আপনি মানতে পারছেন? দাঁড়ান, আপনার জন্যে আরও চমক অপেক্ষা করছে। তিন বছর আগে মালয়েশিয়ান সরকার অমুসলিমদের আল্লাহ কথাটি ব্যবহার নিষেধ করে দেয়। হেরাল্ড উইকলি নামক পত্রিকা অনেক দীর্ঘ আইনী লড়াই শেষে সম্প্রতি কোর্ট থেকে রায় পায় যে সে দেশের অমুসলিমরা আল্লাহ শব্দটি ব্যবহার করতে পারবে। কোর্ট যুক্তি দেখায় যে মালয়েশিয়ার সাবাহ এবং সারাওয়াক আদিবাসী খ্রীষ্টানরা বহু শতক ধরে আল্লাহ বলে আসছে। তবে প্রধানমন্ত্রী নাজিবের সরকার এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপীলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।



এই ব্যাপারটি এখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু না। গত রবিবার থেকে মালয়েশিয়ার বেশ কয়েকটি চার্চে আক্রমণের খবর পাওয়া গেছে। আজ আলজাজিরায় ইনসাইড স্টোরী অনুষ্ঠানে এই নিয়ে বিভিন্ন জনের মতামত শুনছিলাম। মালয়েশিয়ার ইয়থ মুভমেন্টের একটি সুট পরা যুবক তোতা পাখির মত আউরে যাচ্ছে যে আল্লাহ শুধু মুসলমানদের, খ্রীষ্টানদের কোন অধিকার নেই আল্লাহ বলার। তার বক্তব্য খ্রিষ্টানরা আল্লাহ বলে মুসলমানদের বিভ্রান্ত করে দিতে চাইছে। ৯% খ্রিষ্টান ৬০% মুসলমানদের কিভাবে বিভ্রান্ত করবে জিজ্ঞাসা করা হলে কোন সদুত্তর পাওয়া যায় নি। আরেক বিশেষজ্ঞ বললেন এটি হচ্ছে রাজনৈতিক ইসলামের খেলা। ইচ্ছে করে মাঠ গরম করা হচ্ছে সরকারী দল দ্বারা নির্বাচনে বিরোধী দলকে রুখতে।

এই বিষয়টি নিয়ে লেখার একটি উদ্দেশ্য আছে আমার। মালয়েশিয়ার মত বহু ধর্মীয় গণতন্ত্রের দেশে (বর্তমানে অমুসলিম প্রায় ৪০%) যখন এই অবস্থা, আমাদের দেশে (প্রায় ৮৮% মুসলমান) পরিস্থিতি কেমন দাঁড়াতে পারে ভবিষ্যৎে? ভেবে দেখেছেন কি?

বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানের (১৯৭২) ৩৮ নম্বর অনুচ্ছেদে ছিল:

"কোনো সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক সংগঠন, ধর্মীয় নামযুক্ত বা ধর্মভিত্তিক কোনো সংগঠন করা যাবে না।"

এই কথাগুলো ১৯৭৭ সালে পঞ্চম সংশোধনী দ্বারা বাতিল করে দেয়া হলে বাংলাদেশে জামাতে ইসলামীর মত দলগুলো পুনরায় আত্মপ্রকাশের সুযোগ পায়। এর ফলশ্রুতি স্বরূপ আজকে আমাদের দেশেও ক্ষয়রোগের আভাস দেখা যাচ্ছে, যা দ্রতই সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়বে।

সম্প্রতি আদালত নির্দেশ দিয়েছে পঞ্চম সংশোধনীকে বাতিল করার। এটি সফল হলে আমরা এই ক্ষয়রোগ সারাতে পারব। না হলে আর বেশী দেরী নাই শরীরে পচন ধরার। তখন অঙ্গহানির মত মারাত্মক ঘটনাও ঘটতে পারে। সাধু সাবধান।

ছবি, দি ফাউন্ড্রির সৌজন্যে

Thursday, December 31, 2009

দেনা

"বন্ধু, তোমার হাতের উপর হাত রাখলেই আমি টের পাই তোমার বাজারে অনেক দেনা"
- উৎপলকুমার বসু

Monday, December 28, 2009

জাকার্তা বার্তা: প্রাকৃতিক সম্পদ ও দেশের অর্থনীতি


বেশ কয়েক মাস হয়ে গেল জাকার্তা শহরে। ইন্দোনেশিয়াকে একটু একটু করে ভাল লাগতে শুরু করেছে। কারণ দেশটির মূল সৌন্দর্য রাজধানীর বাইরে এবং ইতিমধ্যে জাকার্তার আশে পাশে বেশ কয়েকটি সুন্দর জায়গায় যাওয়া হয়েছে। সেইসব সম্পর্কে লেখা ও ছবি পরবর্তী পর্বের জন্যে তোলা রইল। আজ আরেকটি বিষয় নিয়ে লিখছি।
আগেই বলেছিলাম যে জাকার্তার সাথে বাংলাদেশের অনেক মিল। তবে ইন্দোনেশিয়ার অর্থনৈতিক অবস্থা বাংলাদেশ থেকে অনেক ভাল। এর একটি নমুনা হচ্ছে এ দেশে প্রচুর গাড়ি এবং মটর সাইকেল আর তাদের অধিকাংশই নিজেদের দেশে সংযোজন করা। ২০০৮ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী জাকার্তা শহরে (ঢাকা শহরের দ্বিগুণ আয়তন) প্রায় ৯৫ লাখ নিবন্ধিত যানবাহন আছে যার মধ্যে ২০ লাখ গাড়ি এবং ৬৬ লাখ মটর সাইকেল। শহরটিতে যানজটের কারণ হচ্ছে যানবাহনের সংখ্যা প্রতি বছর ১০% করে বাড়ছে এবং মাত্র ২% লোক পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে যে এত গাড়ি কেনার সামর্থ আছে কি না লোকের।

এখানে সরকারী গাড়ি আছে অনেক। সরকারের ছোট পদের কর্মচারীরাও গাড়ি/মটরসাইকেল পায়। বাংলাদেশের সাথে ইন্দোনেশিয়ার মূল পার্থক্য এটিই, সরকারের প্রচুর অর্থ আছে খরচ করার মত।

রাষ্ট্রপতি সুহার্তোর ৩০ বছরের সরকারের সাফল্য হচ্ছে পার ক্যাপিটা জিডিপির প্রভূত উন্নতি। ১৯৬৬ সালে জেনারেল সুহার্তোর ক্ষমতা নেবার সময় ইন্দোনেশিয়ার জনপ্রতি জিডিপি ছিল ৭০ ডলার যা ১৯৯৬ সালে বেড়ে ১০০০ ডলার হয় (বর্তমানে তা বেড়ে ৩৯০০ ডলার হয়েছে, বাংলাদেশের ১৫০০ ডলার)। এই ত্রিশ বছরের সাফল্যের মূলে রয়েছে দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ বিশেষ করে তেল ও গ্যাস রপ্তানি। ১৯৭৩ সালের দিকে যখন তেলের মূল্য বৃদ্ধি পায় তখন জিডিপি বেড়েছে বছরে ৫৪৫% করে প্রতি বছর। এই উদ্বৃত্ত টাকা দিয়ে প্রচুর দুর্নীতির মধ্যেও সরকার অর্জন করতে পেরেছে কিছু সাফল্য - যেমন চাল উৎপাদনে স্বয়ং সম্পূর্ণ হয়েছে ১৯৮০র দশকে। সব নাগরিকের জন্যে প্রাইমারী লেভেলে শিক্ষার ব্যবস্থা করা এবং সফল পরিবার পরিকল্পনা আন্দোলন। প্রচুর বিদেশী কোম্পানী এদেশে আসে উৎপাদনের ফ্যাক্টরি বসানোর জন্যে। তবে তবুও সুহার্তোর শাসনের শেষের দিকে প্রায় ৮০% ইন্দোনেশিয়ান প্রতিদিন প্রায় ১ ডলারের কিছু বেশী আয় করত। অর্থাৎ এই বিপুল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ধনীদের আরও ধনী করেছে আর গরীবরা গরীবই থেকেছে। সুহার্তো পরিবারের সম্পত্তি ১৫ বিলিয়ন ডলার এবং সে বিশ্বের অন্যতম দুর্নীতিগ্রস্ত নেতা

তেল এবং গ্যাস (দৈনিক দশ লাখ ব্যারেল উত্তোলন) ছাড়াও ইন্দোনেশিয়ার রফতানির তালিকায় রয়েছে তৈরি খনিজ, ইলেকট্রনিক্স, পোষাক, রাবার, প্লাইউড ইত্যাদি। আর তাদের রয়েছে গ্রাসবার্গ স্বর্ণখনির আয়।

বিশ্বের সর্ববৃহৎ স্বর্ণখনি এবং তৃতীয় সর্ববৃহৎ তামার খনি গ্রাসবার্গ ইন্দোনেশিয়ার পাপুয়া দ্বীপে অবস্থিত। এর বেশীর ভাগ শেয়ার রয়েছে আমেরিকার ফ্রিপোর্ট ম্যাকমোরানের (৬৭%) এবং বাকিটুকু ইন্দোনেশিয়ার সরকারের। এই মাইনে কাজ করে প্রায় বিশ হাজার লোক। বছরে এটি প্রায় ৫৮,৫০০ কিলোগ্রাম স্বর্ণ, ১৭৫,০০০ কেজি রুপা এবং ৬ লাখ টন তামা উৎপন্ন করে। এই খনি নিয়ে রয়েছে এক বিরাট ইতিহাস।

১৯৪৯ সালে ইন্দোনেশিয়া নেদারল্যান্ডস এর কাছ থেকে স্বাধীন হবার পরেও পাপুয়া দ্বীপটি (ইরিন জায়া/ পশ্চিম নিউ গিনি) ছিল মূলত: ডাচদের দখলে (কিছু অংশে জার্মান মালিকানা ছিল)। ১৯৬০ সালে ফ্রিপোর্টের একদল সার্ভেয়ার খনিটির সন্ধান পান ১৯৩৬ সালের ডাচ একটি রিপোর্টের সূত্র ধরে। ১৯৬১ সালে জাতিসংঘের মাধ্যমে পশ্চিম পাপুয়া দখল করতে ব্যর্থ হয়ে সামরিক অভিযান চালায় সুকর্ন সরকার। পরবর্তীতে আমেরিকার মধ্যস্ততায় জাতিসংঘ ইন্দোনেশিয়াকে শর্ত দেয় যে ১৯৬৯ সালের মধ্যে তাকে একটি গনভোটের আয়োজন করতে হবে পাপুয়ার জনগণের মতামত জানার জন্যে এবং তারপরে তারা পশ্চিম পাপুয়াকে সংযুক্ত করতে পারবে।

সুহার্তো ১৯৬৬ সালের একটি ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের জের ধরে ক্ষমতায় আসেন (যার ফলশ্রতিতে প্রায় ৫ লাখ কমিউনিষ্টকে মারা হয়) । সুহার্তো অর্থনীতিকে মুক্ত করে দেন এবং বিদেশী কোম্পানীকে বিনিয়োগের লাইসেন্স দেন (বলা হয় ঘুষের বিনিময়ে)। ১৯৬৭ সালে প্রথম কোম্পানী হিসেবে কন্ট্রাক্টটি পায় আমেরিকার ফ্রিপোর্ট সালফার - পাপুয়ায় স্বর্ণ ও তামা খনি প্রতিষ্ঠার জন্যে। কিন্তু তখনও খনিটি যেখানে অবস্থিত সেই পশ্চিম পাপুয়া স্বীকৃতভাবে ইন্দোনেশিয়ার করায়ত্ব ছিল না।

আমেরিকার অবমুক্ত সিকিউরিটি ফাইল অনুযায়ী ইন্দোনেশিয়ায় আমেরিকান রাষ্ট্রদুত ১৯৬৮ সালে একটি তারবার্তা পাঠায় যে দুর্নীতি এবং অন্যান্য অভিযোগের কারণে ইন্দোনেশিয়া সরকারের ভাবমূর্তি খারাপ - তাই তারা নির্বাচনে জিততে পারবে না। কমিউনিষ্টদের নিধনের কারনে ইন্দোনেশিয়া তখন আবার আমেরিকার গুড বুকে।

১৯৬৯ সালের জুন মাসে কিসিন্জার ও নিক্সন ইন্দোনেশিয়া সফর করেন যখন পাপুয়ার অ্যাক্ট অফ চয়েস ভোটাভুটি চলছিল। কিন্তু একজন এক ভোটের নীতি পাল্টিয়ে ৮ লাখ ভোটারের যায়গায় মাত্র ১০০০ আদিবাসী নেতাদের দিয়ে প্রহসনের ভোটটি ঘটায় ইন্দোনেশিয়ার সরকার। ওদিকে কিসিন্জার সুহার্তোকে বাহবা দিচ্ছিলেন 'মডার্ন মিলিটারি ম্যান বলে'। আমেরিকার সমর্থন থাকায় এই ভোট স্বীকৃতি পায় ও পশ্চিম পাপুয়া ইন্দোনেশিয়ার হয়।

১৯৭২ সাল থেকে এর্টসবার্গ মাইন থেকে উত্তোলন শুরু করে ফ্রিপোর্ট। ১৯৮৮ সালে এই মাইনটি খালি হয়ে গেলে ৩ কিলোমিটার দুরে (৪০ বিলিয়ন ডলারে রিজার্ভের) গ্রাসবার্গ মাইন থেকে উত্তোলন শুরু করে। ২০০৫ সালে নিউইয়র্ক টাইমস রিপোর্ট করে যে ফ্রিপোর্ট ফ্রি পাপুয়া মুভমেন্টের আক্রমণ থেকে খনিকে বাঁচার জন্যে ইন্দোনেশিয়ার সেনাবাহিনীর সেবা (?) নেয় এবং ১৯৯৮ -২০০৪ সালে কোম্পানির খাতায় এই খাতে প্রায় ২০ মিলিয়ন ডলার খরচ দেখানো আছে (সামরিক বাহিনীর কোন কোন কর্মকর্তা ১৫০,০০০ ডলার পর্যন্ত পেয়েছে। দেশের আইন অনুযায়ী বিদেশী কোম্পানী থেকে সামরিক সদস্যের অর্থগ্রহণ দন্ডনীয় অপরাধ।

এই মাইনের বিক্রির অংশ ছাড়াও এর শুল্ক ইন্দোনেশিয়ার সরকারের এই খাতে সর্বোচ্চ রাজস্ব আয়।
পশ্চিম পাপুয়া দ্বীপের ধন সম্পদ নষ্ট করে আয় করার আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে ২০০৮ সালের সামার অলিম্পিক্সের জন্যে চীন ১ বিলিয়ন ডলারের কাঠের অর্ডার দেয় ইন্দোনেশিয়ার সরকারকে যা এই দ্বীপের ব্যাপক অংশের বন উজাড় করে মেটানো হয়।

আমি খালি চিন্তা করছি আমাদের দেশের যদি এরকম প্রাকৃতিক সম্পদ আর এত আয় থাকত তাহলে দেশটি কোথায় যেত। অবশ্য ইন্দোনেশিয়ার মত হয়ত কিছু লোকের কাছেই সব ধন যেত আর অধিকাংশ লোকেরই ভাগ্য পরিবর্তন হত না। কত বিচিত্র এই বিশ্ব।

(ছবি নাসার সৌজন্যে)

প্রথম প্রকাশ: সচলায়তন

Monday, November 30, 2009

বার্লিন ওয়াল পতনের বিশ বছর পূর্তি: মনের দেয়াল ভাঙ্গাটাই আসল

আজকের খবরের চ্যানেলগুলোতে শুধু বার্লিন ওয়াল পতনের বিশ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানমালা - অনেকেই লাইভ দেখাচ্ছে। ১৯৮৯ সালে বার্লিন ওয়ালের এই পতন মধ্য ও পূর্ব ইউরোপব্যাপী সমাজতন্ত্র বিরোধী বিপ্লবেরই শক ওয়েভের ফসল হিসেবে ধরা হয়। তবে এটি আরও তাৎপর্য পূর্ণ। এটি হচ্ছে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া মায়ের পেটের দুই ভাইয়ের পুনর্মিলন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসীদের বিরুদ্ধে বিজয়ের পর সমন্বিত পরাশক্তিরা ১৯৪৫ সাল থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত জার্মানী দখল করে রাখে। ১৯৪৯ সালে আমেরিকা গ্রেট ব্রিটেন এবং ফ্রান্সের দখলে থাকা ১২টি স্টেটের সমন্বয়ে পশ্চিম জার্মানী গঠিত হয় এবং রাশিয়ার দখলে থাকা ৫টি স্টেট নিয়ে পূর্ব জার্মানী গঠিত হয়। প্রাক্তন রাজধানী বার্লিন শহরটি দুইভাগ হয়ে যায় এবং পশ্চিম জার্মানীর রাজধানী বন নির্ধারিত হয়। ১৯৫৫ সালে রাশিয়া পূর্ব জার্মানীকে পুরোপুরি স্বাধীন ঘোষণা করে, তবে রাশিয়ার সৈন্যরা পটস্ডাম চুক্তি অনুযায়ী সেখানে থেকে যায়, যেমন পশ্চিম জার্মানীতে আমেরিকা, ইউকে আর ফ্রান্স এর সৈন্যরা ছিল।

আলাদা হবার পরপরই ১৯৫০ এর দশকে পশ্চিম জার্মানী একটি অর্থনৈতিক বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে যায়। ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির অনেকটাই তারা কাটিয়ে উঠে। ঐদিকে পূর্ব জার্মানরা তেমন সৌভাগ্যবান ছিল না। সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রথম থেকেই তাদের উপর ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। তারা পোল্যান্ড আর চেকোস্লোভাকিয়া ছাড়া কোথাও যেতে পারত না (তাও বিশেষ অনুমতিক্রমে)। কিন্তু তবুও সীমিত আকারে আত্মীয় স্বজনের মধ্যে দেখা সাক্ষাৎ হত তখনও। তবে পশ্চিম জার্মানীতে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি থাকায় ১৯৫০ এর দশকে প্রায় ৩৫ লাখ পূর্ব জার্মানবাসী পশ্চিম জার্মানীতে চলে আসে। এই ঢল ঠেকাতে হঠাৎ করে ১৯৬১ সালে বার্লিনের মাঝামাঝি দেয়াল তুলে দেয়া হয় ও ডেথ জোন তৈরি করা হয় নো ম্যানস ল্যান্ডে। পরবর্তী বছরগুলোতে অনেকে এই ডেথ জোন পার হয়ে পালাতে গিয়ে মারা যায় পূর্ব জার্মান সৈন্যদের কাছে।

দুই জার্মানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে পূর্ব জার্মানীর সরকার খুব তৎপর ছিল। পশ্চিম জার্মান সরকারও মানবাধিকার ইস্যুগুলো খুঁচিয়ে একটি সংঘাতময় পরিস্থিতি বজায় রাখত। কিন্তু একই ভাষা, একই জাতি এবং একই পরিবারের মধ্যে টান কিন্তু ঘুঁচাতে পারে নি। ১৯৮৯ সালের অক্টোবর মাসে প্রায় ১৩০০০ পুর্ব জার্মানবাসী অষ্ট্রিয়া -হাঙ্গেরিয়ান সীমান্তে পালিয়ে আসে। চেকোস্লোভাকিয়ায় পশ্চিম জার্মান দুতাবাসে কয়েকশ পূর্ব জার্মান আশ্রয় নেয় এবং পরে তাদের বিশেষ ট্রেনে করে পশ্চিম জার্মানী নিয়ে আসা হয়। সে মাসেই এরিক হোনেকার পূর্ব জার্মানীর প্রিমিয়ার পদ থেকে সরে দারান।
ক্রমাগত রাজনৈতিক চাপে ১৯৮৯ সালের ৯ই নভেম্বর সরকার ঘোষণা দেয় যে তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে পূর্ব জার্মানদের উপর ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হবে। সেটা ছিল এক নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং তা নিয়ে কোন প্রস্তুতি ছিল না, এমনকি বর্ডার গার্ডরাও কিছু জানতেন না। তবে সেই ঘোষণা দেয়ার সময় এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন এই সিদ্ধান্ত কি কখন থেকে কার্যকর হবে? তখন মূখপাত্রটি আমতা আমতা করে বলেন আমিতো কোন সময় উল্লেখ দেখছি না - এখন থেকেই ধরতে পারেন। এটি সরাসরি টিভিতে দেখানো হচ্ছিল। তা শুনে দলে দলে লোক বার্লিনের বিভিন্ন চেকপোষ্টে চলে আসে। লোকের প্রচন্ড চাপে সীমান্তরক্ষীরা হাল ছেড়ে দেয় এবং সরে দাঁড়ায়। প্রায় বিশ হাজার লোক সেদিন দেয়াল ভেঙ্গে ও টপকে পশ্চিম জার্মানিতে চলে আসে। বার্লিন ওয়ালের পতন হয়।

এই ঘটনা পরবর্তী বছরে দুই জার্মান একীভূত করাকে তরান্বিত করে। 'আমরা এক জাতি - এই স্লোগানে আকাশ প্রকম্পিত হয়ে ওঠে।

আমাদের পূর্ব ও পশ্চিম বাংলাও এক সময় আলাদা হয়েছিল। জার্মানদের ক্ষেত্রে সেটি ছিল দেশ ভাগ এবং ভাবধারার ভিন্নতা। আমাদের ক্ষেত্রে সেটি ছিল ধর্মীয় ভাগ। একই ভাষা, একই সংস্কৃতি, একই জাতীয়তা। অথচ ধর্মের ভিন্নতা আমাদের দুরে ঠেলে দিল।

দুই জার্মানীকে আলাদা রাখার জন্যে সরকার অনেক চেষ্টা করেছে। পূর্ব জার্মানীতে টিভিতে একটি নির্দিষ্ট সময় ব্যয় করা হত পশ্চিম জার্মানীর বিরুদ্ধে খুনসুটি করার জন্যে। বাইরে দেয়াল থাকলেও কিন্তু লোকজনের মনে দেয়াল ছিল না। তাই দুই জার্মানীর আবার এক হওয়া সম্ভব হয়েছে।

কিন্তু আমাদের দুই বঙ্গের কি অবস্থা? ধর্ম-সাম্প্রদায়িকতার বিষ বাষ্প এখনও ছড়ায়। পশ্চিম বঙ্গে বাংলা ভাষার কদর কমে যাচ্ছে। নেই সেখানে বাংলাদেশী টিভি চ্যানেলের প্রবেশাধিকার। সাংস্কৃতিক বিনিময় আগের চাইতে অনেক কম। পশ্চিম বঙ্গে বাংলাদেশের ক'জন লেখকের বই বিক্রি হয়? পূর্ব বঙ্গ তথা বাংলাদেশে ভারত বিদ্বেষ এখন রাজনৈতিক এজেন্ডা- এটি কিছু মানুষের রুটি রুজির ব্যাপার। বাঙ্গালী সংস্কৃতিকে তারা হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি বলতে ব্যস্ত। আমরা না চাইলেও দুরত্বটা বেড়ে যাচ্ছে দিন দিন।

সব মিলে দুই বঙ্গের কারও কি ইচ্ছে হয় আবার কাঁটাতারের বেড়া ভেঙ্গে এক সাথে মেলার? জানি বর্তমান বাস্তবতায় হয়ত একত্রীকরণ বেশীই চাওয়া হবে। তবে নিদেনপক্ষে ভিসা বিহীন যাতায়াত, ইইউর মত ইকনমিক জোন?
কিন্তু সেটা সম্ভব করার আগে আমাদের মনের দেয়াল ভাঙ্গতে হবে।

প্রথম  প্রকাশ: সচলায়তন

Sunday, November 01, 2009

বাংলাদেশের বাক স্বাধীনতায় চীনের হস্তক্ষেপ



দৃক বাংলাদেশ এবং স্টুডেন্টস ফর এ ফ্রি তিবেত সংস্থার বাংলাদেশ শাখা সম্প্রতি তিব্বতের উপর এক আলোকচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করে। এই প্রদর্শনীটি গতকাল শুরু হয়ে নভেম্বরের ৭ তারিখ পর্যন্ত হবার কথা ছিল।

গত বৃহস্পতিবার ঢাকার চীন দুতাবাসের সাংস্কৃতিক এটাশে এবং কাউন্সেলর দৃক গ্যালারীতে এসে এর ম্যানেজিং ডাইরেক্টর ড: শহীদুল আলমের সাথে দেখা করেন এবং প্রদর্শনীটি বন্ধ করতে বলেন। তারা কিছু উপঢৌকনও নিয়ে এসেছিলেন। তাদের বক্তব্য হচ্ছে তিব্বৎ চীনের অন্তর্গত এবং এই প্রদর্শনী বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যেকার সম্পর্কে প্রভাব ফেলবে। ড: আলম বলেন যে দৃক একটি স্বাধীন গ্যালারী এবং চীনা দুতাবাস চাইলে তাদের বক্তব্য উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের দিনে পেশ করতে পারেন। এমনকি চীন চাইলে তাদের প্রদর্শনীও এখানে করতে পারবে। তারা গ্যালারী দেখে প্রস্থান করে।

কিন্তু এরপর নানা হুমকি আসতে থাকে দৃক এর উপর। ওদিকে স্টুডেন্টস ফর এ ফ্রি তিবেত এর সদস্যদের বাড়ীর আসে পাশে গোয়েন্দা হানা দেয়া শুরু করে। ফোন আসে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে: "চায়না আমাদের বন্ধু। দালাই লামার ছবি দেখিও না।" "না না, আমরা সেন্সরশীপের কথা বলছি না। তবে জানেনই তো..." এর পর এক নামকরা তারকার কাছ থেকে ফোন আসে। জাসদের এমপি হাসানুল হক ইনু ফোন করেন এবং স্মরণ করিয়ে দেন বাংলাদেশের এক চীন নীতির কথা এবং এই প্রদর্শনী বাংলাদেশের জনগণের জন্যে কি প্রভাব বয়ে আনবে তা। চারিদিক থেকেই চাপ আসতে থাকে এবং শেষে তা পুলিশী ধমকিতে পরিণত হয়।

এসবির লোক আসে শহিদুল আলমের সাথে দেখা করতে। তারা উদ্যোক্তাদের সবার পরিচয় জানতে চান। শহিদুল অফিসিয়াল অর্ডারের কথা জানতে চান। উত্তর আসে "আপনি খামাখা জটিল করে ফেলছেন।" এবং তাকে শুনিয়েই উপরওয়ালার সাথে কথাবার্তা চলতে থাকে। " উনি সহযোগিতা করছেন না.. আমরা বুঝিয়েছি ওনাকে ব্যাপারটা.. না না এখনও কিছু করি নি। এর পরে তারা আবার আসে এবং ধমক দেয় সরকারকে সহযোগিতা না করলে ভবিষ্যতে দৃকের কপালে খারাবি আছে।

গতকাল (পহেলা নভেম্বর) বিকেলে পুলিশের ফোন আসে, "প্রদর্শনী বন্ধ করুণ না হলে ফোর্স পাঠাবো।" ফোর্স পাঠাতে হল তাদের এবং তালা মেরে দেয়া হলো প্রদর্শনী হল। কাউকে ঢুকতে দেয়া হলো না দৃকে। প্রধান অতিথি অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমেদ (ট্রান্সপারেন্সী ইন্টারন্যাশনাল) দু ঘন্টা পর প্রতীকী উদ্বোধন করলেন। তখনও প্রদর্শনী বন্ধ ছিল - পুলিশ নাকি চাবি হারিয়ে ফেলেছে।

চীন সরকারের অন্যান্য দেশের উপর খবরদারীর এই লক্ষণ খুবই খারাপ। আর তাদের এই আন্তর্জাতিক সেন্সরশীপ অবশ্য বাংলাদেশ, নেপালের মত দুর্বল দেশের উপর শুধু ভালভাবে প্রয়োগ করতে পারে।

দৃক নিউজ সাইটটি এখন একটি রিপোর্টেড অ্যাটাক সাইট । এই কাজটি চীনের নেট সৈনিকদেরই কাজ হতে পারে। তাদের সেন্সরশীপের পরিধি তারা যত দুর সম্ভব বাড়াতে চেষ্টা করে এভাবে - যেমন তারা গত জুলাইতে মেলবোর্ণ ফিল্ম ফেস্টিভালে উইঘুর দের নিয়ে রাবেয়া কাদিরের চলচ্চিত্রটি দেখানো রোধ করতে ফেস্টিভ্যালের সাইট হ্যাক করে চাইনিজ পতাকা ঝুলিয়ে দেয়।

এর কারণ আমাদের রাজনীতিবিদগন এবং রাষ্ট্রযন্ত্র যারা ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্যে চীনের পা চাটে। আমরা কোন দেশে বাস করছি? চীন না বাংলাদেশ? একটি প্রদর্শনী করার জন্যে কেন চীনের অনুমতি নেয়া লাগবে?

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় চীনের অবস্থান সবাই জানে। তারা বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় বঙ্গবন্ধু হত্যার পরে। নব্বুই এর দশক পর্যন্ত বাংলাদেশীরা তাইওয়ান যেতে পারত না। কারণ পাসপোর্টে লেখা থাকতে ইজরায়েল ও তাইওয়ান ব্যাতিত সকল দেশে ভ্রমণ করা যাবে। এর পেছনেও ছিল চীন তোষণ নীতি। অথচ তাইওয়ানের সাথে ব্যবসা কি থেমে থেকেছে? বর্তমানে কি চীনের চাপে আবার বাংলাদেশ এরূপ ব্যান আরোপ করার ক্ষমতা রাখে (যখন কম্পিউটারের অনেক যন্ত্রাংশ আসে তাইওয়ান থেকে)?

চীন আমাদের তাদের ঠুনকো সস্তা জিনিষ বিক্রি করা ছাড়া কি দেয়? তারা সেতু নির্মাণ ইত্যাদিতে যেসব সহায়তা দেয় তা উসুল করে নেয় নিজস্ব নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার ও নিজস্ব লোকবল লাগিয়ে। কেন কারণ ছাড়া চীনকে তোষণ করতে হবে?

চীন একটি একনায়কতন্ত্র আর বাংলাদেশ একটি গণতন্ত্র। এদেশে চীনের নীতি ফলানো গণতন্ত্রের উপর সরাসরি হস্তক্ষেপ। কি হতো প্রদর্শনীটি হতে দিলে? কয়েকশ লোক হয়ত তা দেখত, ব্যাস। এখন এটি বন্ধ করে বাংলাদেশ যে পরিমাণ প্রচার পেল তাতে বরঞ্চ দেশের ইমেজের ক্ষতি হল। আমাদের তোষণ ও মোসাহেবী স্বভাব যে কবে পাল্টাবে এবং আমরা ভিক্ষার থালা ফেলে দিয়ে মেরুদন্ড সোজা করে কোনদিন বাঁচতে পারব সে বলা মুস্কিল।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব জনগণের সাংবিধানিক অধিকার - বাক স্বাধীনতাকে সমুন্নত রাখা - চীনের অভ্যন্তরীণ সমস্যাকে জিইয়ে রাখার জন্যে তাদের মদদ করা নয়। এই ব্যাপারটি তারা যত দ্রুত অনুধাবন করবেন ততই মঙ্গল।

এ নিয়ে আরও পড়ুন:

* শহিদুল আলমের ব্লগটুইটার

* গ্লোবাল ভয়েসেস অনলাইন

* মাশুকুর রহমান

* সাদা কালো

* রব গডেন

* মিডিয়া হেল্পিং মিডিয়া

Thursday, October 15, 2009

বৃটেনে যুদ্ধাপরাধীদের দৌরাত্ম্য

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত বাংলাদেশী ছাত্র দেলোয়ার হোসেইন সম্প্রতি গার্জিয়ান পত্রিকার কমেন্ট ইজ ফ্রি সেকশনে বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং ব্রিটেন যে কিছু যুদ্ধাপরাধী আছে তা নিয়ে একটি তথ্য বহুল লেখা লেখেন গত ৭ই মার্চ। তার রিপোর্টটির মধ্যে ছিল যুদ্ধাপরাধী চৌধুরী মঈনুদ্দিনকে নিয়ে কয়েকটি প্যারা যা সেন্সর করার পর বর্তমানে এখানে দেখা যাবে
প্রতিবেদনটি প্রকাশের সপ্তাহখানেক পরে মঈনুদ্দিনের আইনজীবিদের কাছ থেকে উকিল নোটিশ পাবার পর গার্ডিয়ান পত্রিকা উক্ত প্যারাগুলো মুছে ফেলে একটি ডিসক্লেইমার ঝুলিয়ে দেয়:

• On 13 October this article was changed following a legal complaint.
এ প্রসঙ্গে হ্যারি'স প্লেস ব্লগ জানাচ্ছে যে জামাতে ইসলামী এখন বিলেতে ঘাঁটি গেড়ে বসেছে। তারা মুসলিম কাউন্সিল অফ ব্রিটেন আর লন্ডন মুসলিম সেন্টার (ইস্ট লন্ডন মসজিদ) পুরো নিয়ন্ত্রণ করে। যখনই কোন ব্লগ আর পত্রিকা তাদের উপর রিপোর্ট করে তখনই জামাতে ইসলামী আর মুসলিম ব্রাদারহুডের আইনজীবিরা আইনি হুমকি পাঠায়। ফলে অনেকেই তাদের ঘাঁটাতে সাহস করে না।
এই ব্লগ মন্তব্য করেছে:
আইনের হুমকিতে গার্ডিয়ান পত্রিকা সত্যি প্রকাশে পিছু হটেছে যা বাক স্বাধীনতার উপর বড় আঘাত। এটি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং বাংলাদেশের জনগণের ন্যায় বিচার লাভের প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে আরও বড় হুমকি।
মুক্তাঙ্গণ ব্লগে অবিশ্রুত লিখেছিলেন:

ব্রিটেন যে যুদ্ধাপরাধীদের ভূস্বর্গে পরিণত হয়েছে, এই ক্ষোভ এর আগেও প্রকাশ পেয়েছে অন্যান্য দেশের বিভিন্ন নাগরিকদের মন্তব্য থেকে। বাংলাদেশের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা যুদ্ধাপরাধ করেছে, তাদের কারও কারও নিরাপদ বাসস্থান এখন এই ব্রিটেন। এই ব্রিটেনে বসেই গোলাম আযম পরিচালনা করেছিলেন পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার আন্দোলন।
গার্ডিয়ানের সেন্সরশীপ নিয়ে সেই ব্লগের মন্তব্য:
বাংলাদেশ যখন প্রত্যাশা করছে, ২০০৮-এর জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত নতুন সরকার তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করবে, বিদেশে আশ্রয়গ্রহণকারী যুদ্ধাপরাধীদেরও দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করবে, ঠিক তখনই একটি ঘটনার মধ্যে দিয়ে যুদ্ধাপরাধী চক্র আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছে, এ-ধরণের বিচার প্রক্রিয়াকে ঠেকানোর জন্যে এবং বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধ সংক্রান্ত তথ্যায়ন প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করার জন্যে তারা যথেষ্ট সংঘবদ্ধ।
গার্ডিয়ানের এই কাপুরুষোচিত কার্যের তীব্র প্রতিবাদ জানাই। বাক স্বাধীনতা ও ন্যায় বিচারে বিশ্বাসী সবাইকে এই সকল যুদ্ধাপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবার আহ্বান জানাচ্ছি।


× বাংলাদেশ গণহত্যা আর্কাইভে চৌধুরী মঈনুদ্দিনের ফ্যাক্টশীট

প্রথম প্রকাশ: সচলায়তন

Thursday, October 08, 2009

সব সমস্যার সমাধান যদি জিন্জিরাতে তৈরি হত

মানুষের এই ছোট জীবনে শারীরিক সমস্যার অন্ত নেই। আমাদের বেশীরভাগই নিজস্বতা ছাপিয়ে অন্য কেউ হতে চাই, কোন রোল মডেলের মত। আমাদের কারও হয়ত রঙ ময়লা, কেউ খাটো (ছেলে হলে) বা কেউ লম্বা (মেয়ে হলে)। কারও নাক বোঁচা, কারও দাত উঁচু, কারও মাথায় টাক। কারও গলার স্বর চিকন, কারও মোটা। কেউ তালপাতার সেপাই আবার কেউ হাতির মত। কারও মুখে ব্রণের দাগ, কারও ত্বক তেলতেলে।

খেয়াল করে দেখেছেন? উপরের প্রত্যেকটি সমস্যাগুলো সমাধানে বাণিজ্যিক পণ্য পাওয়া যাবে। এক গায়ের রঙ ফর্সা করার পণ্যেরই তো বিশ্বব্যাপী বিলিয়ন ডলার ইন্ডাস্ট্রী। মানুষ নিজের খুঁতগুলোকে ঢাকার জন্যে অঢেল টাকা খরচ করতে রাজি। কারণ একজনের সমস্ত পৃথিবী আবর্তিত হয় তার নিজের স্বত্বা, তার চাওয়া পাওয়াকে কেন্দ্র করেই।
বিশ্বের নানা দেশে বিবিধ বাণিজ্যের প্রসার হয়েছে মানুষের এইসব চাহিদা মেটাতে। ভোগবাদের মূলমন্ত্র যে জিনিষ কেনার সাথে ব্যক্তিগত সন্তুষ্টি তা এসব পণ্যে বিদ্যমান। এই সমস্ত পণ্য প্রলোভন দেখানো বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিক্রি হয় (হোক দেশটি বাংলাদেশ, ভারত অথবা ইন্দোনেশিয়া)। মেয়ের রঙ ময়লা বলে সে চাকরি পাচ্ছে না, অথচ সংসারের আয় দরকার। বাবা তাকে ত্বক উজ্জ্বল করার ক্রিম কিনে দেয় আর সে এয়ার হোস্টেসের চাকুরি পায়, সংসার চালায় - কি সংবেদনশীল আবেগ। আরেক বিজ্ঞাপনে এক ছোট অভিনেতা ত্বক সাদা করার ক্রিম মেখে শ্যুটিংয়ের সময় নামকরা পরিচালকের নজরে পড়ে যায় ও নায়কের অভিনয়ের প্রস্তাব পায়। এইসব প্রচার ও আবেগের মাধ্যমে আমাদের সমাজের বর্ণবাদী মনোভাব আরও প্রতিষ্ঠা পায়।

শুধু এই নয়, ধর্মীয় অনুভূতিকে পুঁজি করেও অনেক পণ্য এসে গেছে বাজারে। ইসলামী ব্যান্কিং ব্যান্ক পরিমন্ডলে ভাল ব্যবসা করছে। নানা স্ন্যাক্সের সাথে হালাল শব্দটি জুড়ে দিলে বেশী বিক্রি হয়। শুদ্ধ ভেজিটারিয়ান পণ্যের কাটতি অনেক দেশেই। হিজাব পড়া বার্বি ডল বা ইসলামি সাতারের পোশাক জাতীয় পণ্য এখন হালের ফ্যাশন।

আর এসব পণ্য তৈরি ও বাণিজ্যে সেরা দেশ হচ্ছে চীনদেশ। আমাদের দেশে জিন্জিরায় ও তাদের মতই নানা পণ্য তৈরি হয় (পড়ুন নকল হয়) এবং সবচেয়ে ভাল দিক হচ্ছে তাদের পণ্য মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকে।

চীন দেশে বিএমডাব্লিউ এক্স ফাইভ জীপটির ডিজাইনে গাড়ি বিক্রি হয় চাইনিজ ব্র্যান্ড সহকারে। তবে শোরুমের বাইরেই বিএমডাব্লিউর লোগোটি পাওয়া যায় যা লাগিয়ে নিলে আপনার স্বপ্ন পূরণ হয়ে যাবে।


(কৃত্রিম সতীচ্ছদ কিট - ছবির জন্যে কৃতজ্ঞতা এনওয়াই ডেইলি নিউজ)

তাদের উদ্ভাবনী শক্তিরও তারিফ করতে হয়। এক চাইনিজ কোম্পানি বের করেছে আর্টিফিসিয়াল ভার্জিনিটি হাইমেন কিট (কৃত্রিম সতীচ্ছদ কিট) এবং মাত্র ৩০ ডলারে মেয়েদের হাতের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে এমন এক কবচ যা তাদের রক্ষা করবে সেই সব বিকারগ্রস্ত ছেলেদের কাছ থেকে যাদের বিবাহিত বধু হিসেবে শুধুমাত্র সতী মেয়েদেরই চায়। অবশ্য বিকারগ্রস্ত বলি কেন - এটি তো এখনও মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশেরই প্রথা - সাদা চাদরে রক্তে মেয়েদের স্বাক্ষর রেখে সতীত্বের প্রমাণ দিতে হয়। খেলাধুলা বা অন্য কারনে সতীচ্ছদ ছেঁড়ার কারণে যেসব মেয়েদের বিবাহিত জীবন/বিবাহ হুমকির মুখে তাদের জন্যে এই পণ্যটি জীবন রক্ষাকারীই বটে। তবে মেয়েদের সে স্বাধীনতা তো দেবে না সমাজ। মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুড (সংসদের ২০% আসন যাদের) আন্দোলন করছে এই ভার্জিনিটি কিট নিষিদ্ধ করার জন্যে। এটির বিক্রেতাদের উপর ফতোয়া জারী হয়ে গেছে।

আমি শুরু করেছিলাম মানুষের শারীরিক সমস্যা গুলো দিয়ে। কিন্তু আপাত দৃষ্টিতে দেখা যাচ্ছে যে এগুলোর অনেকগুলোই মানসিক সমস্যা যা আমাদের সমাজ লালন পালন করে থাকে। আমরাও এর বাইরে নই তাই আমরা ধরতে পারি না, সব স্বাভাবিক লাগে।

সেদিন এক ভারতীয় টিভি চ্যানেলে দেখলাম কাঁচ দিয়ে তৈরি চোখের আদলে লকেটের এক রক্ষা কবচ বের হয়েছে যা ইন্টারনেটে অর্ডার করা যাবে। আমাদের সফলতার দিকে যারা কুদৃষ্টি দেয় সেগুলো থেকে রক্ষা করবে এই কাঁচের চোখের রক্ষাকবচ। গ্রাফিক্সের মাধ্যমে মানুষের চোখ থেকে ঠিকরানো লাল কুদৃষ্টি কিভাবে ঠেকিয়ে দিচ্ছে কবচটি তা দেখানো হল। নিশ্চয়ই এর কাটতিও প্রচুর কারণ এই কুসংস্কারে ধর্ম-বর্ণ ভেদে অনেকেই বিশ্বাসী।

আমাদের এই সব মানসিক সমস্যাগুলো সমাধানে ভার্জিনিটি কিট বা কুদৃষ্টি থেকে রক্ষার মত জিন্জিরার কোন একটি পণ্যের প্রতীক্ষায় আছি।

প্রথম প্রকাশ: সচলায়তন