Saturday, September 06, 2008

একটি অপরাধের কাহিনী

ঘটনাটি ছিল খুবই সাধারণ। ম্যাকডোনাল্ডসে খাবারের অর্ডার দেয়ার পরে ক্যাশ মেশিনে উঠল ৬.৪০ ইউরো। কয়েন খুঁজে পেতে দেরী হচ্ছে দেখে লাইনের পেছনের ছেলেটার চেহারায় দেখলাম অস্বস্তির ভাব। পাঁচ ইউরোর নোট, এক ইউরো ও পঞ্চাশ সেন্টের মাধ্যমে বিল পরিশোধ করার পরে ট্রেতে চেন্জ ও খাবার গুলো দিল ক্যাশের মেয়েটি। 'ডান্কে শোন' বলতে বলতেই শুনি সে পেছনের জনকে বলছে '..নেখস্টে বিটে'।

খালি যায়গা খুঁজে খেতে বসে খুঁচরোগুলো পকেটে পুরতে গিয়ে দেখি তিনটি ২০ সেন্টের কয়েন। বিলে লেখা আছে সেই ৬.৪০ ইউরো। তারপর বসে বসে ভাবলাম আমি কি তাকে ৭ ইউরো দিয়েছি? সে তো হবার নয় কারন অনেক খুঁজে পেতে কয়েনগুলো দিয়েছি। কাউন্টারে গিয়ে জিজ্ঞেস করার চিন্তা হলো কিন্তু বিশাল লাইন দেখে ভাবলাম 'কি দরকার'। এরপর থেকেই সমস্যাটি শুরু হল।

বাসায় ফিরে বার বার মাথায় ঘুরতে লাগল ব্যাপারটি - আমি কেন তাকে পয়সাটুকু ফেরত দিলাম না। কেন একে স্বাভাবিক মনে হল।

অথচ এই আমিই কিছুদিন আগে সাপ্তাহিক বাজার করার পর পার্কিং লটে এসে কি কারনে বিলের দিকে তাকিয়ে দেখি ১১ প্যাকেট দুধের বদলে ৬টির দাম রেখেছে। আবার গিয়ে লাইনে দাড়িয়ে বাকী পাঁচটির দামটুকু শোধ করে এসেছি।
আসলে আমাদের সবার ভেতরেই একটি দ্বৈত সত্তা কাজ করে। আমাদের সবারই একটি অপরাধপ্রবণতা রয়েছে যা মাঝে মধ্যে বের হয়ে পরে, অজান্তেই হয়ত। এবং আমারও হয়ত এমন আরও অপরাধবোধ রয়েছে যা হয়ত কোনদিন প্রকাশ করা হবে না।

কয়েক বছর আগে ঢাকার গুলশান এক নম্বরের এক এটিএম বুথে ঢুকেই দেখি আগের কেউ তার কার্ড ভেতরে রেখে চলে গেছে। স্ক্রীনে জ্বলজ্বল করছে "Would you like another transaction?" কয়েকটি বোতাম টিপলেই অন্যের বেশ কিছু টাকা হস্তগত হয়ে যেত। কিন্তু আমি কার্ডটি বের করে গার্ডের কাছে দিয়ে দেই কারন আমি জানতাম এটিএম এ ভিডিও ক্যামেরা থাকে এবং সেই অপকর্ম প্রকাশ হয়ে পরবে। ভিডিও ক্যামেরা যদি না থাকত তাহলে আমি কি সেই কার্ড ব্যবহার করে টাকা তুলতাম? খুবই ভেবে দেখার বিষয়।

মাঝে মাঝে নিজের অক্ষমতা নিয়ে খুবই হতাশ হই। হতে পারলাম না আদর্শ কোন মানুষ অথবা আদর্শ কোন ক্রিমিনাল যার অপরাধবোধ নেই।

প্রথম প্রকাশ: সচলায়তন

Thursday, August 14, 2008

উপমহাসাগরীয় অঞ্চলে আধুনিক দাসত্ব

অতি সম্প্রতি বাহরাইন ও কুয়েতে বাংলাদেশের শ্রমিকদের নিয়ে যেসব লন্কাকান্ড হয়ে গেল এসব নিয়ে আরব দেশগুলোর অবস্থান কিন্তু নমনীয় না। তাদের মনোভাব এমন যে এভাবে থাকতে হলে থাকো না হলে চলে যাও।

এনিয়ে আমরা পত্রপত্রিকাতে পরস্পর-বিরোধী অনেক কথা শুনেছি। কোনটিই কিন্তু এসম্পর্কে সঠিক পরিপ্রক্ষিত দেয় না। বর্তমানে সিটিজেন জার্নালিজম ও ব্লগের যুগে আমি আশা করব আমাদের এইসব নির্যাতিত ভাইবোনেরা ব্লগের মাধ্যমে তাদের দু:খকষ্টের কথা জানাবেন।

আরব দেশগুলোর সরকারী মনোভাব এমন হলেও সাধারণ লোকজন কি ভাবছে সেটা আমাদের জানার তেমন সুযোগ নেই। গ্লোবাল ভয়েসেস অনলাইনে কিছু আরব ব্লগারদের মতামত পড়ে মনে হয়েছে যে তাদের অনেকে হয়ত এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে।

বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী কর্তৃক বাংলাদেশী শ্রমিকদের জন্য কাজের অনুমতি দেয়াতে নিষেধাজ্ঞা জারির পর সে দেশী ব্লগার খালিদ বলেছেন :

সম্প্রতি, বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী একটা ডিক্রি জারি করেছেন বাংলাদেশীদের নতুন কাজের অনুমোদন না দেয়ার জন্য!! এটা একজন বাংলাদেশীর জঘন্য অপরাধ করার কারনে!! এখানে আমি জানতে চাই: এই আইন করার পেছনে মূল উদ্দেশ্য কি? এর আইনী দিক গুলো কি? একটা অপরাধ হলে, তদন্ত হবে আর বিচার ব্যবস্থাও আছে তার জন্য। তাহলে বাংলাদেশের লোকের উপর এই নিষেধাজ্ঞা কেন? আর এই পক্ষপাতিত্ব কেন? আর কোন আইনের আওতায় একজন বা একদলের অপরাধের জন্য একটা গোটা জাতিকে শাস্তি দেয়া হচ্ছে? আমরা আইনের দেশে আছি না? এই সিদ্ধান্ত কি ঠিক? অবশ্যই না আর এটা একটা গুরুতর ভুল। আজকে সবাই এমন ভাবে বলছে যেন সব বাংলাদেশী অপরাধী আর খুনী, যাদেরকে বের করে দেয়া উচিত।

(বিস্তারিত গ্লোবাল ভয়েসেস বাংলায় )

দুইশোরও বেশী বাংলাদেশী শ্রমিককে কুয়েত থেকে বহিস্কার প্রসঙে সৌদি ব্লগার আহমাদ লিখেছেন :

আমি নিশ্চিত শুধু কুয়েত নয় গাল্ফ অঞ্চলের আমরা সবাই এশিয়ার শ্রমিকদের নীচু করে দেখি। তাদের কোন ধরনের প্রশংসা বা সম্মান তো করিই না, পশুর মত ব্যবহার করি। আমাদের নাগরিকরা তাদের সাথে এমনভাবে ব্যবহার করে যেন তারা মানুষ নয়, আর কোম্পানিরাতো তাদের সাথে আরও খারাপ ব্যবহার করে, কম বেতন দেয়া থেকে শুরু করে। আমি জানি যে ১২০ আমেরিকান ডলার (৪৫০ রিয়াল) হয়ত বাংলাদেশে উঁচু মাসিক বেতন অনেকের জন্যে, কিন্তু এই বেতনে রিয়াদ, দুবাই বা কুয়েতে কোন শ্রমিক জীবনধারণ করতে পারবে না, কোন টাকা জমানো তো দুরে থাক। আমরা যদি দৈনিক তিন বেলা খাবারের কথা চিন্তা করি, শ্রমিকদের কমপক্ষে ১২ রিয়াল ব্যয় করতে হবে প্রতিদিন। এবং তার মানে তাদের ৩৬০ রিয়াল খাবারের পেছনেই ব্যয় হবে, কাপড়, যাতায়াত ও অন্যান্যর কথা বাদই দিলাম।

গাল্ফ অঞ্চলের শ্রম মন্ত্রণালয়রা দেশের নাগরিকদের কাজের ব্যাপারেই শুধু চিন্তা করে এবং এই দুর্বলতাকেই কাজে লাগায় বিভিন্ন কোম্পানি। তারা শ্রমিকদের উপর তাদের শয়তানি চাল চালে কম বেতন, অতিরিক্ত কাজ, নিকৃষ্ট বাসস্থান ইত্যাদি দিয়ে এবং সব ধরণের সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে। যদিও কাজের সময় নয় ঘন্টার বেশী হবার কথা নয় আমরা দেখছি যে নির্মানশিল্পে এমনকি রেস্টুরেন্টে সারাদিন ধরে শ্রমিকরা কাজ করছে। তারপরেও আমরা রেগে যাই যখন মানবাধিকার সংগঠনগুলো গাল্ফ অঞ্চলে দাসত্বের অভিযোগ তুললে।

সরকারী বড় বড় প্রকল্পের পাওনা যখন পরিশোধ করতে সরকার দেরী করে, অনেক কোম্পানিরাই শ্রমিকদের বেতন দেয়া বন্ধ রাখে। যখন শ্রমিকরা প্রতিবাদ শুরু করে এবং তাদের কণ্ঠ তাদের দেশের কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছে, ঐসব কোম্পানীরা তাদের কাছে বলে যে সরকারের কাছ থেকে টাকা পাচ্ছে না বলে তারা দিতে পারছে না। অথচ হয়ত তাদের প্রাপ্যের কিছু পরিমাণই বাকী আছে যা হয়ত সাত-আট মাস পরে পাওয়া যাবে। এর সাথে শ্রমিকদের কোন সম্পর্ক না থাকলেও তারা এ দিয়ে শ্রমিকদের জিম্মি করে রাখে। তাদের আট মাস ধরে বেতন দেয়া হয় না - তারপরেও আমরা রেগে যাই যখন তারা অপরাধ ও চুরি চামারী বেছে নেয়।

যখন আমি শ্রমিকদের দু:খ দুর্দশার আসল ঘটনাগুলো শুনি, আমার এটাই বুঝতে পারি যে তাদের দাসের মতই ব্যবহার করা হচ্ছে। কোন কোন কোম্পানি তাদের রেসিডেন্স পার্মিট নবায়নের জন্যে একমাসের বেতন কাটে, আরেক কোম্পানি শ্রমিকদের সাপ্তাহিক ছুটি থেকে বঞ্চিত করে। তাদের ছুটির জন্যে কোন ওজর শোনা হয় না, এমনকি অসুস্থ অবস্থায়ও তাদের কাজ করতে হয়। একজন শ্রমিক বলেছে যে সে তিন বছর ধরে সৌদি আরবে কাজ করছে কিন্তু একবারও হজ্জ্ব করতে পারেনি কারন তার কোম্পানি তাকে দুদিনেরও ছুটি দেয়নি।

এইসব খারাপ দিকগুলোর প্রভাব বাসার কাজেও পড়েছে। সমস্ত উপমহাসাগরীয় দেশগুলিতে বাসার কাজের লোক বা ড্রাইভার ১৮ ঘন্টা একনাগারে কাজ করে, এবং এদের অনেকেরই ঠিকমত শোয়ার যায়গা নেই। কারও কারও শোয়ার জায়গা মিলে রান্নাঘরে, ফ্রিজ এবং ওভেনের মাঝামাঝি যায়গায়। একদা আমার এক বন্ধু বলেছিল (গর্ব সহকারে) যে সে তার কাজের মেয়েকে উঠান ঝাড়ু দিতে দেয় না কারন সে হয়ত পড়শীর ড্রাইভারের ফোন নম্বর জেনে যেতে পারে। তাই সে কখনও বাড়ীর বাইরে যাবার সুযোগ পায় নি এবং হয়ত কোনদিন সুর্যরশ্মির স্পর্শ পায় নি ছাদে কাপড় শুকানোর সময় ছাড়া। আমার বন্ধুটি বলেছিল যে তাকে পরিবারের সাথে দোকান বা রেস্টুরেন্টেও যেতে বাধা দেয়া হয় অন্যান্য কাজের লোকের সাথে পরিচিত হবে এই ভয়ে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘সে কি জেলে বন্দী?' সে বলল, ‘কিন্তু এই কাজের মেয়ে তো সুখেই আছে!'

আমাদের সবচয়ে বড় সমস্যা ইসলাম ধর্ম নিয়ে নয়, অবশ্যই; আমরা আমাদের সংস্কৃতি এবং আমাদের ইসলামিক রীতি নিয়ে গর্ব করি কিন্তু সেগুলো পালন করি না। যে কোন দিন একটি নির্মান স্থানের সামনের ট্রাফিক লাইটে থেমে দেখবেন, কিভাবে ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস গরমে, শ্রমিকরা একটি যন্ত্রপাতির (অথবা ভেড়া বহনের) ট্রাকে গাদাগাদি করে আছে। কিন্তু কোম্পানির মালিকের লালসা বড়, তাদের বাসস্থান থেকে কার্যস্থলে আনা নেয়ার জন্যে বাস কেনে না, যা কিনতে হয়ত মাত্র ৪০,০০০ রিয়াল খরচ হত। যদি এই বিষয়টি আমার হাতে থাকত, ট্রাকে করে শ্রমিক বহনকারী কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা করতাম, এবং বিচারে রায় হত মালিককে এক সপ্তাহ এভাবে যাতায়াত করতে হবে। (শুধুই আমার স্বপ্নে!)

আপনারাই বলেন, কখন আপনি আপনার ড্রাইভার বা কাজের লোকের জন্যে রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার এনেছেন? এবং আপনি ড্রাইভারকে কি আপনার মোবাইল ফোন দেন তার পরিবারের সাথে কথা বলার জন্যে? আর আপনার কাজের মেয়ের বেলায় কি হয়? সে কি এখনও পরিবারকে চিঠি লিখে পোস্টে পাঠায়?

এটি যে দাসত্ব এ ব্যাপারে আপনার কোন সন্দেহ আছে?


(সূত্র গ্লোবাল ভয়েসেস বাংলা )

Monday, August 11, 2008

বাংলা ব্লগ ও ব্লগ পলিটিক্স

সেদিন এক সৃহৃদ বাংলা ব্লগারের সাথে কথা বলার সময় সে জানাল "আর বলেন না ব্লগ পলিটিক্স নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম"। এই কথাটি ইদানিং প্রায় শোনা যায় দেশী ব্লগারদের মধ্যে নানা ভাবে।

বাংলা ব্লগের উৎপত্তি ও স্বরুপ বিশ্লেষনে আমাদের একটু পেছনে যেতে হবে। ১৯৯৭ সালের ডিসেম্বরে জর্ন বার্জার প্রথম ওয়েব্লগ শব্দটি ব্যবহার করেন। ১৯৯৮ সালে আমেরিকায় ওপেন ডায়রি প্রথম ব্লগ প্লাটফর্ম হিসেবে জন্ম নেয়। পরের বছরই লাইভ জার্নাল, ডায়রিল্যান্ড ইত্যাদি চালু হয়। লক্ষণীয় যে এগুলো ছিল বর্তমান বাংলা ব্লগিং প্লাটফর্মগুলোর আদলে অর্থাৎ এদের (হয়ত কিছুটা ভিন্নভাবে) একটি এগ্রেগেটর বা প্রথম পাতা ছিল যেখানে সবার লেখা আসত। পরে এই ডিজাইনের বিবর্তন শুরু হয় এবং মনে হয় ব্লগার (ব্লগস্পট) প্লাটফর্ম থেকেই ব্লগগুলো স্বকীয়তা পাওয়া শুরু করে। পরবর্তী বছরগুলোতে প্রফেশনালরা নিজস্ব ডোমেইন ব্যবহার করা শুরু করে এবং মুভেবল টাইপ ও ওয়ার্ডপ্রেস ইত্যাদি ব্লগিং প্লাটফর্ম করে নিজেরাই একেকটি আইকন হয়ে যায়।

ইংরেজী ব্লগের বিস্ফোরণ শুরু হয় ২০০৩ সালে আমেরিকার ইরাক আক্রমণের সময়, ঘটনা চক্রে সে বছরই আমি ইংরেজীতে ব্লগিং শুরু করি। কিন্তু বাংলা ব্লগ তখনও ছিল দুর অস্ত। কারন বাংলা লেখার প্লাটফর্মের সমস্যা। ২০০৪ সালের এপ্রিল মাসে কলকাতার দেবাশীস ও সুকন্যা ব্লগস্পটে বাংলা ব্লগ শুরু করেন ও খুঁজে খুঁজে আগ্রহীদের আমন্ত্রণ জানান ও সাহায্য করেন শুরু করার জন্যে। আমার নিজের ইউনিকোড ও অন্যান্য বাংলা লিখন পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা ছিল না। আমার কম্পিউটারে তখন লেখো নামে একটি ইউনিকোড এডিটার ইনস্টল করে ব্লগে বাংলা লেখার চেষ্টা করলাম কিন্তু সেটি বেশ জটিল ছিল তাই আগানো সম্ভব হয় নি।

২০০৫ সালের ১৬ই ডিসেম্বর প্রথম বাংলা ব্লগিং প্লাটফর্ম বাঁধ ভাঙ্গার আওয়াজ (সামহোয়ার ইন) আত্মপ্রকাশ করলে বাংলা ব্লগিংয়ের ক্ষেত্রে নবদিগন্ত রচিত হয়। হাসিন ও এমরান বাংলার প্লাটফর্ম সমস্যার প্রথম বাঁধাটি ভাঙ্গে এমবেডেড এডিটর ব্যবহার করে। অনেকেই বাংলা টাইপিং জ্ঞান ও বাংলা কিবোর্ড ছাড়া ফোনেটিকে সহজে লিখতে সমর্থ হয়। ২০০৬ সালে ব্লগটি ইউনিকোড হলে পূর্ণতা পায়। এর সাথে সাথে কিন্তু ব্লগস্পট ও অন্যান্য প্লাটফর্মে অনেকে লেখা শুরু করে ইউনিকোডের মাধ্যমে।

সেসময় বাংলা ব্লগের লেখক সংখ্যা পাঁচশর মত থাকলেও ততদিনে পূরো ব্লগোস্ফিয়ারে বিপ্লব ঘটে গেছে। ২০০৬ এর আগস্টে ডেভিড সিফরি টেকনোরাতির (ব্লগ সার্চ ইন্জিন) এক জরীপে দেখান যে বিশ্বে পাঁচ কোটি ব্লগ রয়েছে।


সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে ব্লগগুলো কোন ভাষায় সেই পরিসংখ্যানটি। এই বিপুল পরিমাণ ব্লগের মধ্যে মাত্র ৩৯% ইংরেজী ভাষায়। জাপানী ভাষা ৩১% নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে এবং চাইনিজ ১২%। এই ভাষা বৈচিত্র দেখায় যে মানুষ তার মাতৃভাষাতে কথোপকথনে বেশী উৎসাহী। কিন্তু বিশ্বের পঞ্চম সবচেয়ে কথিত ভাষা বাংলায় তখন ব্লগ ছিল হাতে গণা।

আমাদের জনসংখ্যার দিকে তাকালে দেখব আমাদের দেশে ইন্টারনেট পেনিট্রেশন ১% এরও কম অথচ এশিয়ার গড়পড়তা পেনিট্রেশন ১৪% (সূত্র )। আমাদের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের তুলনায় আমাদের বাংলা ব্লগারদের সংখ্যা খুবই কম।

গত বছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ব্লগের সংখ্যা এগারো কোটিতে ঠেকেছিল এবং এবছরে নিশ্চয়ই বিশ কোটির কাছাকাছি হবে। কিন্তু বাংলা ব্লগ কি সেই পরিমানে বেড়েছে?

গত দুই বছরে বাংলা ব্লগ অনেক এগিয়েছে, বেশ কয়েকটি প্লাটফর্ম হয়েছে, ইউজার বাড়ছে এবং স্বাতন্ত্র্য গড়ে উঠেছে এদের মধ্যে। অভ্রের মত ওপেনসোর্স বাংলা ইনপুট সিস্টেমের কারনে বাংলা লেখা এখন অনেক সহজ। তবে কেউ কেউ আশন্কা প্রকাশ করছেন যে হারে বাংলা ব্লগ বাড়ছে তাহলে বাংলা ব্লগের পরিণতি কি হবে ভবিষ্যতে?

যারা এই প্রশ্নটি করছেন এবং যারা বাংলা ব্লগ প্লাটফর্মগুলোর মধ্যে এইসব পলিটিক্সে ব্যস্ত তারা আসলে এর বিশাল চিত্রটি দেখতে পাচ্ছেন না। সরকার ঘোষণা দিয়েছেন প্রতিটি স্কুলে পিসি ও ইন্টারনেট দেয়া হবে। যখন এই সব স্কুলের ছেলেরা ব্লগিং করা শুরু করবে তখন আমাদের আরও গোটা কুড়ি ব্লগিং প্লাটফর্ম লাগবে।

আর কে কোথায় ব্লগিং করবে সেটা তার নিজস্ব ব্যাপার। ব্লগিংয়ের ব্যাপারটিও বেশ সাম্প্রদায়িক এবং সামাজিক। আমরা ব্যাক্তি জীবনেও নিশ্চয়ই কিছু নির্দিষ্ট লোকের সাথে বন্ধুত্ব করি, কিছু পছন্দের পত্রিকা পড়ি। ব্লগের ক্ষেত্রেও এমনই, বিভিন্ন লোকের বিভিন্ন পছন্দ থাকতে পারে। কাজেই অমুক নাক উঁচু, অমুকের মডারেশন নাই ইত্যাদি অভিযোগের তেমন ভিত্তি নেই বলেই মনে করি। সবাইকে তাদের স্বকীয়তা নিয়ে থাকতে দেয়াই উত্তম।

অনেককেই দেখি অহেতুক অন্য প্লাটফর্মের বিরুদ্ধে লেগে থাকতে, এর ওর বদনাম করতে। মনে রাখতে হবে একটি দুটি প্লাটফর্মই বাংলা ব্লগের সবকিছু নয়। বেশ কটি প্রতিশ্রুতিমুলক প্লাটফর্ম চালু হয়েছে ভবিষ্যতে আরও হবে। অনেকে হয়ত ভবিষ্যতে স্বতন্ত্র ব্লগে লিখতে পছন্দ করবে। লোকে তাদের পছ্ন্দমতই তাদের কমিউনিটি ঠিক করবে। কয়েকদিন পরে ব্লগ এগ্রেগেটর ও বেস্ট অফ ব্লগস এর মত উদ্যোগ জনপ্রিয় হবে।

বাংলা ব্লগের রয়েছে অমিত সম্ভাবনা। এখন দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা পাঁচ লাখের মত। অদুর ভবিষ্যৎে যখন এই হার দশগুণ হবে তখন দেখবেন দেশে বাংলা কন্টেন্ট এর আকাল পড়বে। দেশের বাংলা সংবাদপত্রগুলোর অধিকাংশই ইউনিকোড না তাই গুগল সার্চ ইন্জিনে সেসব আসে না। আপনি যা এই ব্লগে লিখেছেন তার থেকে একটি বাক্য সার্চ দিয়ে দেখেন গুগলে আসে কি না। এটি আজ থেকে দশ বছর পরেও থাকবে (ব্লগ মুছে না ফেললে)। কাজেই কি অমিত শক্তি আপনার লেখায় রয়েছে কল্পনা করতে পারছেন?

কাজেই যে যে ব্লগেই লিখুন না কেন হাত খুলে লিখে যান, আপনার সুখদু:খের কথা, মজার অভিজ্ঞতা ভ্রমণ ইত্যাদি যা ভাল লাগে তাই।

গণতন্ত্রের মূল বিষয় হচ্ছে ব্যক্তি পছন্দ ও মতামত প্রকাশের অধিকার। একে অপরের সাথে কথোপকথনের মাধ্যমে এই মতামতকে জোড়ালো করে সবার কাছে ছড়িয়ে দেয়া যায় যা পরে মেজরিটিতে পরিণত হয়। ব্লগের মাধ্যমে সহজেই এটি করা সম্ভব।

বিদ্যমান ব্লগ পলিটিক্সে জড়ানোর দরকার নেই। আপনারা নিজেরাই নতুন ইতিহাস ও রাজনীতি তৈরি করুন।

গ্রাফ: সিফরি'জ এলার্টসের সৌজন্যে

প্রথম প্রকাশ: সামহোয়্যার ইন

Thursday, July 24, 2008

আমরাও পারি: গণহত্যা আর্কাইভের জন্যে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন

সুবিনয় মুস্তফী এবং নিঝুমের পোস্টের দ্বারা উজ্জীবিত হয়ে আপনাদের কাছে একটি আব্দার নিয়ে এসেছি। বাংলাদেশ গণহত্যা আর্কাইভ একটি অপ্রাতিষ্ঠানিক সম্মিলিত উদ্যোগ।

এই সাইটটিকে আরও তথ্যবহুল করার জন্যে আপনাদের সকলের সাহায্য প্রয়োজন। যে যে ক্ষেত্রে কাজ করা দরকার তা হলো:

× প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ যোগাড় করে লিপিবদ্ধ করা।
× বিভিন্ন পত্র পত্রিকা ও সাময়িকীতে মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত লেখার স্ক্যান্ড কপি বা (অনলাইনে হলে) লিন্ক যোগ করা।
× আরও ছবি যোগ করা, ফটোগ্রাফারদের পরিচয় সহ। ইতিমধ্যে প্রকাশিত ছবিগুলোর ফটোগ্রাফারদের পরিচয় জেনে তা যোগ করা।
× বিভিন্ন টিভিতে প্রচারিত ডকুমেন্টারির ভিডিও যোগ করা। চলচ্চিত্রের ট্রেইলার যোগ করা।
× বিভিন্ন তথ্যবহুল সাইটের লিন্ক আছে এতে। কিন্তু সাইটের মালিকদের সাথে অনেক ক্ষেত্রে যোগাযোগ করা যায় নি। আমরা চাই যে তাদের অনুমতি নিয়ে ঐসব সাইটে প্রকাশিত তথ্যগুলোর ব্যাকআপ রাখা যাতে ডোমেইন এক্সপায়ার হয়ে তাদের তথ্য হারিয়ে না যায়। পারলে এই সাইটে তাদের জন্যে হোস্টিংয়ের ব্যবস্থা করা। এ জন্যে সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করলে খুব উপকার হয়।
× আমাদের দরকার ইতিহাসবিদ, সমালোচক, যারা এই সাইটের কন্টেন্ট বিশ্লেষন করে ত্রুটিমুক্ত করবে এবং যে সব তথ্য অনুপস্থিত তা যোগ করবে।
× বিতর্কিত বিষয়গুলো সম্পর্কে আরও গবেষণা এবং বিভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে সত্য তথ্য উপস্থাপন।
× এর প্রচারের জন্যে আপনাদের সহায়তা দরকার। পত্রিকায় সংযোগ আছে যাদের তারা এটি নিয়ে আর্টিকেল ছাপাতে পারেন।

আপনারা হয়ত প্রশ্ন করতে পারেন এই আর্কাইভের কেন দরকার। আমাদের চারপাশে মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত প্রচুর ম্যাটেরিয়াল আছে, আছে বই, দলিলপত্র। কিন্তু সেগুলো কি সহজে আপনারা পান যখন আপনার দরকার? অনলাইনে তথ্য থাকার একটি সুবিধা হচ্ছে আপনি মুহূর্তেই কোন তথ্য সম্পর্কে জানতে পারেন। এই সাইটে আমরা শক্তিশালী সার্চ ফিচার এবং ট্যাগিং যোগ করেছি (এর প্রয়োগ পরবর্তীতে দেখতে পাবেন) যার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ তথ্য থেকে আকাঙ্খিত বিষয়টি খুঁজে পাওয়া যাবে।

এই সাইটটি যেন ভবিষ্যতের গবেষকদের, সত্যান্বেষীদের জন্যে একটি তথ্য ভান্ডার হয়ে উঠতে পারে সেটিই আমাদের লক্ষ্য। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এত বিতর্ক এত রাজনীতি সম্ভব হয় কারন একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডারের অভাবে যে কেউ নতুন নতুন তথ্য প্রচার করে সবাইকে বোকা বানাতে পারে। পরবর্তীতে কোন প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা পেলে ইচ্ছে আছে মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতা যুদ্ধে নিহতদের একটি সমৃদ্ধ ডাটাবেজ তৈরি করার।

আপনারা আপনাদের বক্তব্য ও উপদেশ মন্তব্যের স্থানে জানাতে পারেন। অথবা দয়া করে আমাকে ইমেইলে জানাতে পারেন। আমরা একটি গ্রুপমেইলের মাধ্যমে জানব ও আলোচনা করব এ সংক্রান্ত আপনার সাজেশন ও সবাই মিলে কি করে কাজগুলোকে এগিয়ে নেয়া যায় তা।

আমেরিকার রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী ওবামার জনপ্রিয় স্লোগানটি আমি ধার নিচ্ছি এই দৃঢ় আশা প্রকাশ করার জন্যে যে 'আমরাও পারব'। এই বিশ্বাসটিই আসল। আশা করছি আপনাদের সাথে পাব। ধন্যবাদ।

প্রথম প্রকাশ: সচলায়তন

Wednesday, July 23, 2008

ইন্টারনেট কি সুশীলদের দখলে?

বুদাপেস্টে গ্লোবাল ভয়েসেস সামিটের একটি সেশনে তুলে ধরা হয়েছিল যে ব্লগিং কিভাবে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পরছে। সেখানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল রাইজিং ভয়েসেসের কার্যক্রম যা বিশ্বব্যাপী প্রান্তীক ও দরিদ্র-সুযোগবিহীন সমাজকে ওয়েব ২.০ (ব্লগিং, চিত্র, ভিডিও, পডকাস্ট) ইত্যাদির মাধ্যমে তাদের সুখ-দু:খের কাহিনী প্রকাশ করার কাজে রত বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ক্ষূদ্র অনুদান ও প্রশিক্ষন ইত্যাদি সাহায্য প্রদান করে।

গ্লোবাল ভয়েসেসের মূল লক্ষ্য ছিল বিশ্বের প্রত্যন্ত অঞ্চলের (পশ্চিমা দেশগুলো বাদ দিয়ে) ব্লগারদের কন্ঠ ও তাদের মতামত তুলে ধরা যা প্রচলিত প্রচার মাধ্যম ছাড়া আরেকটি পরিপ্রক্ষিত দেবে ঐসব অঞ্চল সম্পর্কে জানার জন্যে। কিন্তু কিছূ দিন পরে দেখা গেল যে উন্নয়নশীল বিশ্বে সুবিধাপ্রাপ্ত উচ্চমধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্তরাই বেশী ব্লগিং করে। ফলে বিশ্ব যেন তাদের কন্ঠই বেশী শুনতে পায়। বিপুল পরিমাণ যে সুবিধাহীন জনগোষ্ঠী রয়েছে তাদের প্রতিনিধিত্ব ছাড়া এইসব কথপোকথন অর্থহীন। সে অবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্যেই রাইজিং ভয়েসেস গত এক বছর ধরে কাজ করছে এবং ইতিমধ্যে এর ১৬টি প্রকল্প সফল ভাবে কাজ করছে।

এই প্রকল্পগুলোর এক একটি বিষয় বৈচিত্রে অভূতপূর্ব। নেইবারহুড ডায়রিজ কলকাতার বউবাজার অঞ্চলের (পতিতাপল্লীর) শিশূদের সিটিজেন জার্নালিস্ট হওয়া শেখাচ্ছে। বাংলাদেশের নারী জীবন ঢাকার কর্মজীবি নারীদের কারিগরী প্রশিক্ষনের পাশাপাশি ব্লগিংও শেখাচ্ছে এবং তারা আজ গল্প, কবিতা, রিপোর্টের মাধ্যমে তাদের অব্যক্ত কথাগুলো, তাদের ভাললাগাগুলো প্রকাশ করতে পারছে।

এই বাংলাদেশী নারীরা ব্লগে লিখেন। আপনি কি তাদের লেখা পড়েন?

জামাইকার প্রিজন ডায়রিজ জেলের কয়েদিদের ব্লগিংয় শেখাচ্ছে ও তাদের কথা প্রকাশ করতে সাহায্য করছে - কোন পরিস্থিতিতে তারা এখানে আসলো, কেন অপরাধ করল, ভবিষ্যতে কি করবে ইত্যাদি। কেনিয়ার রিপ্যাক্টেড অগাস্তো বোয়ালের ইনভিজিবল থিয়েটার বা থিয়েটার অফ দ্যা অপ্রেসড এর আদলে অংশগ্রহণমূলক ম্যাগনেট থিয়েটার এবং আইসিটি ব্যবহার করে স্থানীয় ক্যাম্পের তরুণ-তরুণীদের বিহেভিয়ার চেন্জ সংক্রান্ত কাজ করছে।

এরকম প্রতিটি প্রকল্পই স্বমহিমায় উদ্ভাসিত। এই প্রকল্পগুলো নিয়ে বানানো একটি ভিডিও ট্রেইলার দেখুন।

সামিটে রাইজিং ভয়েসেসের প্রকল্পগুলো থেকে যে কয়েকজন এসেছিল (বাংলাদেশ থেকে আমন্ত্রিত নারী জীবনের তসলিমা ভিসা জটিলতার জন্যে আসতে পারে নি) তার মধ্যে একজনের কথাই বলব, ক্রিস্টিনা কিসবার্ট বলিভিয়ার প্রত্যন্ত অন্চলে থাকা একজন আদিবাসী মেয়ে যার নিকটবর্তী এল আল্টো শহরে যেতে ৫ ঘন্টা লাগে। সে তার ব্লগের মাধ্যমে আদিবাসী সমাজের সুখ, দু:খ ও সমস্যার কথা তুলে ধরছে। বলিভিয়ার প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী প্রায় ত্রিশটি আদীবাসী সমাজ নিয়ে গঠিত অথচ সেদেশের প্রচার মাধ্যম তাদের গুরুত্ব দেয়না - কারন প্রচার মাধ্যম তো শিক্ষিত এলিটদের।

এই পরিস্থিতি আমাদের দেশেও বিদ্যমান আমাদের দেশেও অনেক আদিবাসী আছে, আছে অনেক গরীব লোক। তাদের সম্পর্কে আমাদের জানতে হচ্ছে বড়লোকদের, রাজনীতির মুখপাত্র প্রচার মাধ্যমের মাধ্যমে। তাদের বলার কোন প্লাটফর্ম আমরা দিচ্ছি না।

সামহোয়্যার ইন ব্লগে আমি গুটিকয়েক আদিবাসী ব্লগার দেখেছিলাম যাদের একজন মার্মা ভাষায় কবিতা প্রকাশের জন্যে কটুক্তির শিকার হয়েছিল। সেও ব্লগ পলিটিক্সেরই স্বীকার। হ্যা শব্দটি ইদানিং বেশ শোনা যাচ্ছে। আমরা রাস্তার সস্তা পলিটিক্সকেও ব্লগে টেনে আনছি।

যে কোন গণতান্ত্রিক পরিবেশের মূল বিষয়টি যেটি দরকার সেটি হচ্ছে সমাজের প্রতিটি মানুষের বাক স্বাধীনতার অধিকার। যে কোন কিছূতে একমত হবার জন্যে দরকার মুক্ত আলোচনা ও উন্মুক্ত তথ্য প্রবাহ. দরকার ভিন্নমতকে সম্মান করা। সেটি যত্ক্ষণ না করতে পারছি ততক্ষণ আমরা সুষ্ঠু গণতন্ত্র পাব না।

বাংলাদেশের গরিব লোকেরা ব্লগিং করে মনের ভাব প্রকাশ করবে এমনটি এখনও সায়েন্স ফিকশন শোনালেও নিশ্চয়ই ফকিরের হাতে মোবাইল থাকবে এটি দশ বছর আগে এমনই শোনাত। ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রমে আমাদের বিপুল সংখক এনজিও ব্যাস্ত ও এ নিয়ে নাম নিজেরাই কামাচ্ছে। তবে যাদের জন্যে এ উদ্যোগ তারা কেমন আছে, তাদের ফিডব্যাক কি এসব কিন্তু গণমাধ্যমে আসে না (আসে হয়ত শেষ পর্যায়ে তারা সর্বসান্ত হলে বা সাফল্যমন্ডিত হলে)। তাদেরওকি মুক্তভাবে মতামত প্রকাশের সুযোগ করে দিতে পারে না এইসব এনজিওগুলো ব্লগিং বা অন্য কোন ভাবে?

কিন্তু এই অপাংতেয়দের দাবিয়ে রাখতে পারলেই তো সুশীল সমাজের লাভ। আমরাতো এমনই দেখে আসছি। এ অবস্থার পরিবর্তন কি হবে?

প্রথম প্রকাশ: সচলায়তন

Tuesday, July 22, 2008

দানিয়ুবের মুক্তো, ব্লগারদের সম্মিলন এবং ই-বুক

দানিয়ুবের পারে বুদাপেস্ট

বুদাপেস্টে হাজির হয়েছিলাম গ্লোবাল ভয়েসেস সম্মিলনে অংশ নিতে। এয়ারপোর্ট শাটল (মাইক্রোবাস) এ চেপে হোটেলে পৌঁছে মাল পত্র রেখে ভর দুপুরে ঘুরতে বের হলাম। মনে হলো এতো ধুসর গোধুলি, হিমু, সুবিনয়দের দেশ। চারিদিকে লোকেরা স্বল্প বসনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। প্রাকৃতিক নিয়ম অনুযায়ী ক্ষীনকায় সুন্দরী ললনারাই তার মধ্যে বেশ চোখে পরছে। তাপমাত্রা তখন ত্রিশ ডিগ্রি - তাদের জন্যে তালপাকা গরম। সেটিও কারন হতে পারে তাদের এমন খোলামেলা পোশাকের জন্যে। ইউরো কাপের খেলা দেখে ম্যারাথন আড্ডা জমিয়ে দল বেধে রাত বারটার দিকে হোটেল ফিরতে গিয়ে দেখি বুদাপেস্টের রাস্তাঘাট তখনও ভরা হাট। তরুণ-তরুণীরা তখনও পার্টি মেজাজে। ভেনেজুয়েলার ব্লগার হুলিয়ানা রিন্কন মন্তব্য করল আগে জানতাম আমাদের ল্যাটিন সংস্কৃতি বেশ খোলামেলা, তবে এদের কাছে তা নস্যি।

বুদাপেস্টে কারা যায়বুদাপেস্টে কারা যায়

সম্মিলনে অংশ নিতে এসেছিল বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে গ্লোবাল ভয়েসেসের প্রায় একশ কর্মী, স্বেচ্ছাসেবী লেখক, অনুবাদক, শুভানুধ্যায়ী ও বন্ধূরা এবং এদের সবার মধ্যে একটিই মিল আছে সেটি হচ্ছে সবাই ব্লগার। সম্মিলনে আরও এসেছিল বিভিন্ন প্যানেল আলোচক, ইন্টারনেট জগতের পরিচিত কিছু তারকা, সাংবাদিক যারা আরও প্রায় শ খানেক হবে। নানা দেশের লোক মিলে বেশ কলকাকলী মুখর একটি ব্যাপার হলো।

সামিটে অংশগ্রহণকারীসামিটে অংশগ্রহণকারী

সম্মিলনের প্রথম তিনদিনের সূচীপত্রে ইন্টারনেট সিকিউরিটি, ব্লগারদের নিরাপত্তার মত গুরুগম্ভীর ব্যাপার থাকলেও (সে নিয়ে পরে আলাপ করব) পরবর্তী দুই দিন গ্লোবাল ভয়েসেস নিজস্ব মিটিঙে নানানরকম সংস্কৃতি বিনিময় আর অনানুষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা বিনিময় সবাইকে মাতিয়ে রেখেছে। দক্ষিণ এশিয়ার সম্পাদক নেহা খুবই মজার মেয়ে। সে সবাইকে দিয়ে বলিউডের নাচ নাচিয়ে ছাড়ল এক সেসনে।

গ্লোবাল পানীয়গ্লোবাল পানীয়

আরেকটি পর্ব ছিল পানীয় বিনিময়। বলা হয়েছিল সবাই যার যার দেশ থেকে একটি করে পানীয় নিয়ে আসবে। কেনিয়ার ব্লগার দাউদি ফ্লাইট আগে ছিল তাই চলে গিয়েছিল দুই বোতল হাতে ধরিয়ে এই বলে যে এগুলো কেনিয়ানরা জেলে গেলে খায়। বলাই বাহুল্য সবাই তাদের কড়া জিনিষ নিয়ে এসেছিল এবং সমাপনী পার্টিতে ওগুলো খোলা হলো। লেবাননের মুসা আর রাজানের পাল্লায় পরে ওদের পানীয় কিছুটা গলধ:করন করলাম। পানি দেয়ার সাথে সাথে ওটি কেমন সাদা হয়ে গেল। পান করার পরে বুঝলাম কি জিনিষ। কতক্ষন বসে ছিলাম। গায়ে আরবী লেখা দেখে বুঝতে পারিনি। পরে ভাল করে ছোট অক্ষরের লেবেল পড়ে দেখি আরাক - ৫৩% এলকোহল। এরকম ল্যাটিন আমেরিকা, পূর্ব এশিয়া, ইউরোপীয়ান অনেক নাম না জানা (স্ট্রঙ!) পানীয় ছিল সেখানে।

উপহার বিনিময়ও হলো। বলিভিয়া থেকে এডি আভিলা তৈরি করে এনেছে স্থানীয় আদিবাসীদের তৈরি কাপড় দিয়ে বানানো ল্যাপটপ ব্যাগ। আর পেরু থেকে হুয়ান আরেলানো এনেছে বিশালাকার সামুদ্রিক মাছের আঁশের উপর পেইন্টিং করা চাবির রিং।

দানিয়ুবের পারে বুদাপেস্টদানিয়ুবের পারে বুদাপেস্ট

এবার আসি দানিয়ুবের মুক্তো নামে অভিহিত বুদাপেস্ট শহরের পরিচয় পর্বে। দানিউব যে চারটি দেশের রাজধানী ( ভিয়েনা, ব্রাতিস্লাভা, বুদাপেস্ট আর বেলগ্রেড) দিয়ে গেছে সেগুলোর সংস্কৃতিগত ঐতিহ্য খুবই উল্লেখযোগ্য। দানিয়ুবের এক পাড়ে বুদা ও ওবুদা (ওল্ড বুদা) এবং অপর পারে পেস্ট শহর। এ তিন মিলেই ১৮৭৩ সাল থেকে হাঙেরীর রাজধানী বুদাপেস্ট। এখানে ভাষা নিয়ে পর্যটকদের খুব সমস্যা হয়- ইংরেজী অনেকে জানে না। তবে দেখা গেল জার্মান বললে কিছূটা কাজ হয়। কারন হয়ত হাঙেরী কিছু সময় অস্ট্রিয়ার নিয়ন্ত্রনে ছিল যা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অবসান হয়। আরেকটি কারন হতে পারে যে অনেক জার্মান পর্যটক এখানে বেড়াতে আসে।

নতুন বুদাপেস্টনতুন বুদাপেস্ট

লম্বা সামিট শুরু হওয়া পর অবসর সময় কম ছিল বলে সামিটের সেশন ফাঁকি দিয়েও কিছু পর্যটন হলো। তবে অতৃপ্তি থেকেই গেল। আসলে দানিয়ুবের পারে বসে দিনের পর দিন কাটিয়ে দেয়া যায়।

ভেনেজুয়েলার আরেক ব্লগার লরা ভিদাল সাহিত্যের ছাত্রী। অরুন্ধতী রায়ের উপর একটি ডিসার্টেশন জমা দিতে হয়েছে বলে সে ভারত উপমহাদেশের উপর বেশ পড়াশোনা করেছে। আমাদের সাহিত্য সংস্কৃতি সম্পর্কে সে জানতে খুবই আগ্রহী। কিন্তু (রবীন্দ্রনাথ ছাড়া) সে বাংলা কোন সাহিত্যই পড়ে নি। আমাকে পেয়ে তার প্রশ্নবাণ শুরু হলো। আমি তাকে বাংলাদেশের ব্লগিংয়ের সাম্প্রতিক অবস্থা সম্পর্কে বললাম। সে খুবই অবাক এবং সাথে সাথে আনন্দিতও হলো যে আমাদের অনলাইন রাইটার্স ফোরাম রয়েছে এবং (সচলায়তনে) নিয়মিত সাহিত্যের উপর ইবুক প্রকাশিত হয়। সে আক্ষেপ প্রকাশ করল যে তাদের সাহিত্য সংক্রান্ত বিচ্ছিন্ন ব্লগ থাকলেও এমন উদ্যোগ তাদের বিশাল ব্লগোস্ফিয়ারে কেউ নেয় নি।

সচলায়তনের বছর পূর্তি উপলক্ষে এর পেছনের সৃহৃদদের অভিনন্দন জানিয়ে বলছি যে আপনাদের কষ্ট বৃথা যায় নি। অবশ্যই বলে বেড়ানোর মতো কিছু অর্জন হয়েছে।



প্রথম প্রকাশ: সচলায়তন

Monday, July 14, 2008

বাংলা গানের বিশ্বজয়

পলবাশা সিদ্দিক হচ্ছে ১৭ বছরের এক বাংলাদেশী তরুণী এবং আমেরিকার মিনিয়াপলিস সাউথওয়েস্ট হাই স্কুলে পড়ে। তার ডাক পড়ল ভিডিও গেইম মেকার ম্যাট হার্ডিংয়ের একটি ভিডিও "ড্যান্সিং ২০০৮" বা "হোয়্যার দ্যা হেল ইজ ম্যাট " এর ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকে কন্ঠ দেবার জন্যে। সে আধুনিক স্টাইলে একটি রবীন্দ্রসংগীত গাইল এবং তার পর তো ইতিহাস। তার মায়াবী কন্ঠ ও ভিডিওটির অভিনবত্বের কারনে এটি একটি সফল ইন্টারনেট ভিডিও হিসেবে সবার দ্বারা সমাদৃত হয়েছে।

গত ২০শে জুন এটি প্রকাশের পরে প্রথম দুদিনেই এটি ১ মিলিয়ন হিট পেল। সবাই এত পছন্দ করল যে এটিকে ফেসবুক, মাইস্পেস বা ইমেইলের মাধ্যমে বন্ধুদের কাছে পাঠাতে লাগল। এই ড্যান্সিং ভিডিওটি ইতিমধ্যে ৪ মিলিয়নবার দেখা হয়েছে বিশ্বজুড়ে।

সাড়ে চার মিনিটের এই ভিডিওটি ১৪ মাস ধরে বিশ্বের ৪২টি দেশে শুট করা হয়েছে হাজারেরও অধিক কাস্ট নিয়ে। এই ভিডিওটি সংক্রান্ত কিছু তথ্য পাবেন এখান থেকে । ভিডিওটি দেখুন ও গানটি শুনুন।



পলবাশার আরেকটি গান শুনুন এখানে ।

[ছবির জন্য কৃতজ্ঞতা: পলবাশা এবং মিনপোস্ট] 

প্রথম প্রকাশ: সামহোয়্যার ইন