Monday, December 11, 2023

যদি আমাকে মরতে হয়

ছবি আল জাজিরার সৌজন্যে।

গাজার ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক কবি রিফাত আলারির গত পহেলা নভেম্বর এক্স (টুইটার) প্লাটফর্মে তার একাউন্টে "যদি আমাকে মরতে হয়" নামে একটা কবিতা পোস্ট করেন যা হাজার হাজার শেয়ার হয়। 

গত ৬ই ডিসেম্বর এক ইজরায়েলি বোমা হামলায় তিনি তার ভাই, বোন ও তিন সন্তানসহ মৃত্যুবরন করেন। এই কবিতাটি এখন বিশ্বের অনেক ভাষায় লোকে অনুবাদ করছে (যার অনেকগুলো পাওয়া যাবে এই টুইটার থ্রেডে )।

নীচে আমার বাংলা অনুবাদের প্রয়াস। ভুলত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। 

যদি আমাকে মরতে হয় 
তোমাকে বাঁচতে হবে।
 
আমার জিনিষপত্র বেঁচে
এক টুকরো কাপড় কিনো
আর একটু সুতো
(লম্বা লেজের সাদা ঘুড়ি বানানোর জন্যে)
যাতে কোন শিশু, গাজার কোন মাঠে
স্বর্গের দিকে তাকিয়ে 
তার বাবার প্রতীক্ষা করে থাকে
যে চলে গেছে এক অগ্নিহল্কায়
কাউকে বিদায় না জানিয়ে
নিজের সন্তানদেরও না 
অথবা নিজেকে। 

সে যেন দেখে আকাশে সেই ঘুড়ি
আমার ঘুড়িটা, তোমার বানানো
আর এক মুহূর্ত হলেও যেন শিশুটি ভাবে
যে সেখানে এক দেবদূত আছে
স্বর্গ থেকে ফিরিয়ে আনছে ভালোবাসা

আমার মরণ যদি আসে
তা যেন আশা নিয়ে আসে
যেন গল্প নিয়ে আসে।

Thursday, April 18, 2019

বাংলাদেশের নদী

বাংলাদেশের নদী

নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশে রয়েছে শাখা-প্রশাখাসহ প্রায় ৭০০ নদ-নদী (তথ্যসূত্র : বাংলাপিডিয়া)। ছোট ছোট পাহাড়ি ছড়া, আঁকাবাঁকা মৌসুমি খাড়ি, কর্দমপূর্ণ খালবিল, যথার্থ দৃষ্টিনন্দন নদ-নদী ও এদের উপনদী এবং শাখানদী সমন্বয়ে বাংলাদেশে রয়েছে মোট প্রায় ২৪,১৪০ কিমি দৈর্ঘ্যের নদীব্যবস্থা। কিছু কিছু স্থানে যেমন, পটুয়াখালী, বরিশাল এবং সুন্দরবন অঞ্চলে নদীনালা এতো বেশি যে সে অঞ্চলে প্রকৃতই নদীজালিকার সৃষ্টি হয়েছে।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড বা "পাউবো" বাংলাদেশের নদীগুলোকে সংখ্যাবদ্ধ করেছে এবং প্রতিটি নদীর একটি পরিচিতি নম্বর দিয়েছে। তাদের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে নদীর সংখ্যা এখন ৪০৫টি। পাউবো কর্তৃক নির্ধারিত দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী (১০২টি) , উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের নদী (১১৫টি), উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদী (৮৭টি), উত্তর-কেন্দ্রীয় অঞ্চলের নদী (৬১টি), পূর্ব-পাহাড়ি অঞ্চলের নদী (১৬টি) এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের নদী (২৪টি) হিসেবে বিভাজন করে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

নদীমাতৃক বাংলাদেশে অসংখ্য নদনদীর মধ্যে অনেকগুলো আকার এবং গুরুত্বে বিশাল। এসব নদীকে বড় নদী হিসেবে উল্লেখ করা হয়। বৃহৎ নদী হিসেবে কয়েকটিকে উল্লেখ করা যায় এমন নদীসমূহ হচ্ছে: পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, কর্ণফুলি, শীতলক্ষ্যা, গোমতী ইত্যাদি।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী:

আঠারবাঁকি, আড়িয়াল খাঁ নদ, আতাই, আন্ধারমানিক, আফ্রা, অর্পণগাছিয়া, ইছামতি-কালিন্দি, কচা, কপোতাক্ষ নদ, কুমার নদ (চুয়াডাঙ্গা), কুমার নদী (ফরিদপুর-গোপালগঞ্জ), কুমার আপার নদী, কুমার লোয়ার নদী, কয়রা, করুলিয়া, কাকশিয়ালী, কাজীবাছা, কাটাখালী, কাটাখাল, কালীগঙ্গা (পিরোজপুর), কীর্তনখোলা, খায়রাবাদ, খোলপেটুয়া, গড়াই, গুনাখালি, গলঘেসিয়া, গুলিশাখালী, ঘাঘর, ঘাসিয়াখালী, চত্রা, চুনকুড়ি, চন্দনা-বারাশিয়া, চাটখালী, চিত্রা, ঝপঝপিয়া, টর্কি, টিয়াখালি, ঢাকি, তেঁতুলিয়া, তেলিগঙ্গা-ঘেংরাইল, দড়াটানা-পয়লাহারা, দাড়ির গাঙ, দেলুতি, নুন্দা-উত্রা, নবগঙ্গা, নড়িয়া, নেহালগঞ্জ-রঙমাটিয়া, পটুয়াখালী, পুটিমারি, পুরাতন পশুর, পশুর, পাণ্ডব, পানগুছি, পালং, ফটকি, বগী, বুড়িশ্বর-পায়রা, বলেশ্বর, বাদুড়গাছা, বিশখালী, বিশারকন্দা-বাগদা, বিষ্ণু-কুমারখালি, বেগবতী, বেতনা, বেলুয়া, ভদ্রা, ভুবনেশ্বর, ভৈরব নদ, ভৈরব নদী (বাগেরহাট), ভৈরব-কপোতাক্ষ নদ, ভোলা, মংলা, মুক্তেশ্বরী টেকা, মধুমতি, মরিচ্চাপ-লবঙ্গবতী, মাথাভাঙ্গা, মাদারগাঙ, মাদারীপুর বিলরুট, মালঞ্চ, মিনহাজ, রূপসা, রাবনাবাদ, রায়মঙ্গল, লোহালিয়া, শাকবাড়িয়া, শাতলা-হারতা-নাথারকান্দা, শালদহ, শিবসা, শোলমারি, সুগন্ধা, সন্ধ্যা, সয়া-হাড়িভাঙ্গা, সাপমারা-হাবড়া, সালতা, সিরাজপুর হাওর, হরি, হরিহর, হামকুড়া, হাড়িয়া, হাপরখালী, হাবরখালী, হিশনা-ঝাঞ্চা নদী।

উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের নদী:

আখিরা-মাচ্চা, আত্রাই, আত্রাই বা কাঁকড়া (দিনাজপুর), আত্রাই বা গুড় (নওগাঁ-নাটোর), আত্রাই (পাবনা), আলাই, আলাইকুমারী, ইছামতি (দিনাজপুর), ইছামতি (পাবনা), ইছামতি (বগুড়া), ইছামতি (বগুড়া-সিরাজগঞ্জ), ইরামতি, করতোয়া, করতোয়া (নীলফামারী), কাগেশ্বরী, কাটাখালী (গাইবান্ধা), কালা, কালাপানি, কালুদাহা, কুমলাল-নাউতারা, কুরুম, কুলিক, খড়খড়িয়া-তিলাই, খালসিডিঙ্গি, গদাই, গভেশ্বরী, পদ্মা, গাংনাই, গিদারী, গিরাই, গুকসী, গোবরা, গোহালা, ঘড়িয়া খাল, ঘাঘট, ঘিরনাই, ঘোড়ামারা, চাওয়াই, চিকনাই, চিকলী, চিরি, চিড়ি, চুঙ্গাভাঙ্গা, ছাতনাই, ছোট ঢেপা, ছোট যমুনা, ছোট সেনুয়া, টাঙ্গন, ডাহুক, ঢেপা, তালমা, তিস্তা, তিস্তা (পঞ্চগড়), তীরনই, তীরনই (পঞ্চগড়), তুলসীগঙ্গা, দুধকুমার, দেওনাই-চাড়ালকাটা-যমুনেশ্বরী, ধরলা, ধাইজান, ধুম, নর্ত, নলশীসা, নলেয়া, নাগর আপার নদী, নাগর লোয়ার নদী, নারোদ, পলিমারি, পাগলা, পাথরঘাটা, পাথরাজ, পুনর্ভবা, পেটকী, ফকিরনী, ফুলকুমার, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা, বড়াল আপার নদী, বড়াল লোয়ার নদী, বাঙালি, বাদাই, বার্নাই, বান্নী, বুরাইল, বুল্লাই, বুড়িখোড়া, বুড়ি তিস্তা, বেরং, বেলান, বেসানী, বোরকা, ভাদাই, ভুল্লী, ভেরসা, মহানন্দা আপার নদী, মহানন্দা লোয়ার নদী, মাইলা, মালদাহা, মুসাখান, মানস, যমুনা (পঞ্চগড়), রতনাই, রামচণ্ডি, রাক্ষসিনী-তেঁতুলিয়া, লেংগা, লোনা, শিব, সতী-স্বর্ণামতি-ভাটেশ্বরী, সিমলাজান, সিরামাখালী খাল, সিংগিমারী, সুই, সেনুয়া, সোজ, হারাবতী, হুড়াসাগর নদী ।

উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদী:

আত্রাখালি, আবুয়া নদী বা নান্দিয়া গাং, আমরি খাল, ইসদার খাল-বারভাঙ্গা নদী, উপদাখালী, উমিয়াম, কর্ণঝরা, কর্ণ-বালজা, করিস, কাঁচামাটিয়া, কাপনা, কামারখাল, কামারখালী, কালদাহার-কানিয়াকুল, কালনী, কালাপানিঝরা, কুশিয়ারা, কোরাঙ্গী, খাজাচিং, খাসিমারা, খেপা, খোয়াই, গুমাই, ঘাগটিয়া, ঘানুরা-বগালা, ঘোড়াউত্রা, চামতি, চিতলখালী, চেলা, জাফলং-ডাউকি, জালিয়া ছড়া, জালুখালি, জুরী, ডাউকা, ধলা, দুধদা, দোলতা, ধনু, ধলাই-বিসনাই, ধলাই, নকলা-সুন্দ্রাকাশি, নরসুন্দা, নলজুর, নয়াগাং, নয়া গাং, নিতাই, পাটনাই-পাইকারতলা, পাবিজুড়ি-কুশি গাঙ-কুশিয়া, পিয়াইন, পিয়াইন (সুনামগঞ্জ-নেত্রকোনা), পুরনো সুরমা, পোড়া খাল-খাইয়া, বটরখাল, বড় গাং, বাউলাই, বাথাইল, বালই, বিজনা-গুঙ্গাইজুরি, বিবিয়ানা, বেকরা, বেতৈর, বেদুরি, ভাবনা-বাঁশিয়া-বহিয়া, ভোগাই-কংস, মগড়া, মনু, মরা সুরমা, মহারশি, মহাসিং, মালিজি, মিরগী, জাদুকাটা-রক্তি, লংলা, লাইন, লাউরানজানি, লুভা, সাইদুলি-বারনি, সাতারখালী, সারি গোয়াইন, সিনাই, সিঙ্গুয়া, সুতাং, সুরমা, সোনাই-বরদাল, সোমেশ্বরী, সোমেশ্বরী (ধর্মপাশা), সোমেশ্বরী নদী (শ্রীবর্দী-ঝিনাইগাতি) ।

উত্তর-কেন্দ্রীয় অঞ্চলের নদী:

আইমান-আখিলা, আইমান-মোবারি, আড়িয়াল খাঁ, ইছামতি (মানিকগঞ্জ), ইছামতি (সিরাজদিখান), ইলিশমারী, এলংজানী, কাটাখালি, কালিগঙ্গা (মানিকগঞ্জ), খিরো (ত্রিশাল), খিরো (ভালুকা), গাংডুবি, গাজীখালী, গোল্লার, চাতাল, চাপাই, চিলাই, জয়পাড়া খাল, ঝারকাটা, জিঞ্জিরাম, ঝিনাই, টঙ্গী, টংকি, তালতলা, তুরাগ, তুলসীখালী, ধলেশ্বরী, নাগদা, নাঙ্গলা, নালজুরি, নাংলী, পদ্মা, পাগারিয়া-শিলা, পারুলি খাল, পাহাড়িয়া, পুরনো ধলেশ্বরী, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, পুংলী, বংশী, বংশী (সাভার), ব্রহ্মপুত্র (নরসিংদী-মুন্সীগঞ্জ), বাকসাতরা, বাজ্জা-মেধুয়া, বানার আপার নদী, বানার লোয়ার নদী, বালু, বুড়িগঙ্গা, বৈরান, বোশখালী, মরা জিঞ্জিরাম, মাহারি, মিনিখালী, লাবুন্ধা, লৌহজং, শীতলক্ষ্যা, সালদা, সুতী, সুতিয়া, সোনাখালী, হাই, হাড়িদোয়া নদী।

পূর্ব-পাহাড়ি অঞ্চলের নদী:

ইছামতি (রাঙ্গামাটি), ঈদগাও, কর্ণফুলি, কাসালং, চেঙ্গি, ডলু-টংকাবতী, নাফ, বুড়া মাতামুহুরী, বাঁকখালি, ভারুয়াখালি, ভোলাখাল, মাইনী, মাতামুহুরী, রাংখাইন, সাঙ্গু, হালদা নদী ।

দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের নদী:

আর্সি-নালিয়া, কাকড়ি, কাস্তি, গোমতী, ঘুংঘুর, ছোট ফেনী, ডাকাতিয়া, ডাসাডিয়া, তিতাস, পুরনো তিতাস, ধনাগোদা, ফেনী, বিজলি, বুড়ি, ভুলুয়া, মুহুরী, মেঘনা আপার নদী, মেঘনা লোয়ার নদী, লহর, লংগন বলভদ্রা, সালদা, সেলোনিয়া, সোনাই, হাওড়া নদী।

বাংলাদেশ-ভারত-মায়ানমার আন্তঃসীমান্ত নদীর তালিকা:

ভারত থেকে বাংলাদেশে আসা নদী- ৫৫টি, মায়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসা নদী- ৩টি। রায়মঙ্গল, ইছামতী-কালিন্দী, বেতনা-কোদালিয়া, ভৈরব-কপোতাক্ষ, মাথাভাঙ্গা, গঙ্গা, পাগলা, আত্রাই, পুনর্ভবা, তেতুলিয়া, টাংগন, কুলিক বা কোকিল, নাগর, মহানন্দা, ডাহুক, করতোয়া, তালমা, ঘোড়ামারা, দিওনাই-যমুনেশ্বরী, বুড়িতিস্তা, তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার, ব্রহ্মপুত্র, জিঞ্জিরাম, চিল্লাখালি, ভোগাই, সোমেশ্বরী, দামালিয়া/যালুখালী, নয়াগাঙ, উমিয়াম, যাদুকাটা, ধলা, পিয়াইন, শারি-গোয়াইন, সুরমা, কুশিয়ারা, সোনাই-বারদল, জুরি, মনু, ধলাই, লংলা, খোয়াই, সুতাং, সোনাই, হাওড়া, বিজনী, সালদা, গোমতী, কাকরাই-ডাকাতিয়া, সিলোনিয়া, মুহুরী, ফেনী, কর্ণফুলি, নিতাই, সাংগু, মাতামুহুরী, নাফ নদী।

অন্যান্য নদী:

আন্তঃসীমান্ত নদী এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবাহিত ৪০৫টি নদী ছাড়াও আরও প্রায় তিন শতাধিক নদী রয়েছে। যেমনঃ আউলিয়াখানা, আমনদামন, আস্তাইল, কম্পো, কাওরাইদ, কাজীপুর, কালিন্দী, খাড়িয়া, গন্দর, গুমানি, খোয়াথল্যাংতুইপুই, চিলাই (সুনামগঞ্জ), চোরখাই, জলঢাকা, তেতুলিয়া, তৈনগাঙ, থেগা, নাগেশ্বরী, ধানখালী, ধানসিঁড়ি, নীলগঞ্জ, পঞ্চবেণী, প্রাণসায়র, ফটিকছড়ি, বরাক, বান্দসা, বুড়ো গৌরাঙ্গ, ময়ুর, রহমত খালি, রায়ডাক, লঙ্গাই, শুক, সোয়াই, হরবাংছড়া, হরিণঘাটা, হাড়িয়াভাঙা, হেরাচামতি নদী ইত্যাদি।

এই নদীগুলো সম্পর্কে আরো জানতে রিভার্স অফ বাংলাদেশ নামের অ্যাপটি আপনার ফোনে ব্যবহার করতে পারেন।

বাংলাদেশের নদী সম্পর্কে আরও কিছু তথ্যঃ

১) বাংলাদেশের বৃহত্তম নদী সুরমা (৩৯৯কিমি)
২) বাংলাদেশের একমাত্র আন্তর্জাতিক নদী পদ্মা নদীর অপর নাম কীর্তিনাশা। পদ্মা নদীর উৎপত্তি স্থল গঙ্গোত্রী হিমবাহ। কুমির সদৃশ ঘড়িয়াল দেখা যায় কোথায় – পদ্মনদীতে। পদ্মা মেঘনার সাথে মিশেছে চাঁদপুরে।পদ্মার শাখা নদী হল ইছামতি, গড়াই, ভৈরব, কুমার, আড়িয়ার খাঁ।পদ্মার একমাত্র উপনদী মহানন্দা। ৩২৪ কিঃ মিঃ দৈর্ঘ্যের পদ্মা বাংলাদেশের সবচেয়ে নাব্য নদী।
৩) বাংলাদেশ থেকে ভারতে যাওয়া নদী- ১টি (কুলিখ)
৪) বাংলাদেশের সবচেয়ে ছোট নদী – গোবরা (তেঁতুলিয়া), ৪ কিমি।
৫) বাংলাদেশের সবচেয়ে খরস্রোতা নদী মেঘনা।
৬) বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রশস্ত নদী যমুনা।
৭) বাংলাদেশের সবচেয়ে র্দীঘতম নদী ব্রহ্মপুত্র।

ছবি এবং তথ্যের জন্যে কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ আমিনুল ইসলাম তুহিন।

Sunday, July 22, 2012

দোহাই মিডিয়া, থামলে ভাল লাগে

দেশে একসময় সবেধন নীলমণি ছিল সাহেব বিবির বাক্স বিটিভি। সে সময় সেটি মূলত: সরকারের কথা বললেও টিভি নাটক, ইংরেজী সিরিয়াল, ডকুমেন্টারি, কার্টুন ইত্যাদি কিছু বিষয়ে ছিল অপ্রতিদ্বন্দ্বী। এই উপমহাদেশে রাষ্ট্রীয় টিভি চ্যানেলের মনোপলি ঘুচায় স্যাটেলাইট টিভি। ৯০ এর দশকের প্রথম দিকে এমটিভিতে বাবা সায়গলের মিউজিক ভিডিও (ঠান্ডা ঠান্ডা পানি) এবং জি নিউজের অনুসন্ধিৎসু খবরের আয়োজন উপমহাদেশের দর্শকদের নতুন যুগের আস্বাদ দেয়। বাংলাদেশ যোগ দেয় একটু পরে। ১৯৯৭ সালে চ্যানেল আই ও এটিএন বাংলার পরীক্ষামূলক সম্প্রচার শুরু হয়। এর পরের ঘটনা তো ইতিহাস। বাংলাদেশে মনে হয় এখন গোটা বিশেক স্যাটেলাইট টিভির সম্প্রচার হয়।

দেশের স্যাটেলাইট টিভিগুলো একদিকে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যমগুলোর একঘেয়ে ও একপেশে অনুষ্ঠান এর বদলে দর্শকদের নিজেদের পছন্দের কিছু দেখার সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু এইসব চ্যানেলের অধিকাংশ নিয়ন্ত্রণ করে কিছু কর্পোরেট হাউজ এবং তাদের পেছনের কিছু রাজনৈতিক দর্শন ও মুনাফালোভী ব্যবসায়ী। বেশীরভাগ চ্যানেলেরই নিজস্ব কোন উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য নেই। এসব অনেক সময় চালানো হয় নিজের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি দেখানোর জন্যে, আর ব্যবসায়ীক প্রতিদ্বন্দ্বীদের টেক্কা দেবার জন্যে বা তাদের প্রতি কুৎসা রটনার জন্যে। আক্ষেপ হয় দেশে এখনও পৃথক কার্টুন, এডুকেশন বা স্পোর্টস চ্যানেল হল না।

বিটিভির অনুষ্ঠান নিয়ে অনেকের অভিযোগ থাকলেও শাইখ সিরাজের 'মাটি ও মানুষ' কিংবা ফেরদৌসী রহমানের 'এসো গান শিখি' ছিল আপামর জনসাধারণের অনুষ্ঠান এবং খুবই জনপ্রিয়। স্যাটেলাইটের যুগে হাজারো অনুষ্ঠানের ভীড়ে সেরকম উল্লেখ করার মত অনুষ্ঠান খুবই কম। এখনকার অনুষ্ঠানের মধ্যে বেশীরভাগই মধ্যবিত্তদের উপদেশ দেয়ায় ব্যস্ত - কিভাবে গ্ল্যামারযুক্ত জীবন যাপন করবেন, কোথায় যাবেন, কি পড়বেন, কি শুনবেন, কি দেখবেন, ইত্যাদি। আর রয়েছে গান, মডেলিং ইত্যাদি বিভিন্ন প্রতিযোগিতা নিয়ে রমরমা বাণিজ্য। আমার এক আভিজ্ঞতা বলি - খাগড়াছড়িতে গিয়েছিলাম - সেখানে কোন এক টিভি চ্যানেলের গানের প্রতিযোগীতায় এক আদিবাসী বালিকার জন্যে এসএমএস ভোটের জন্যে যে পরিমাণ তদবির, ক্যাম্পেইন, মিছিল ইত্যাদির কথা শুনলাম তাতে মনে হল ব্যাপারটি অসুস্থতার পর্যায়ে গিয়েছে। সেই মেয়েটি জিতেছিল কিনা জানিনা - তবে মানুষের এই আবেগকে পুঁজি করে সেই চ্যানেল আর মোবাইল কোম্পানিগুলো কোটি কোটি টাকা কামিয়ে নিয়েছে নিশ্চয়ই - এই ব্যাপারগুলো কিন্তু সংবাদ হয় না।

আপনি খবরের কাগজ খুলে দেখুন, নানা চটকদার খবরের ভীড়ে গণ্ডগ্রামের সেই ক্ষুদ্রঋণের ভার সইতে না পারা কৃষকের আত্মহত্যার খবর আসে না। মিডিয়া এখন শ্রেণীতোষণে ব্যস্ত। তাদের বিজ্ঞাপনী আয়ের মোটা অংশ আসে মোবাইল কোম্পানী থেকে - কাজেই সেসব কোম্পানী নিয়ে সমালোচনামূলক লেখা কম। অমুক তারকা, তমুক বুদ্ধিজীবী কি বলেছেন, তারা ঈদের দিনে কি করবেন বা খাবেন সেটি নিয়ে ফিচার হয়।



ছবির জন্যে কৃতজ্ঞতা ব্ল্যান্ক নয়েজ

আমরা দেখছি এখন মিডিয়াতে তুচ্ছ সব বিষয়ের গ্ল্যামারাইজেশন, খবর সংগ্রহে অসুস্থ প্রতিযোগিতা। আসামের গৌহাটিতে একটি আদিবাসী মেয়ের উপর চড়াও হল গোটা বিশেক উশৃঙ্খল যুবক। এক টিভি ক্যামেরাম্যান ৩০ মিনিট ধরে ভিডিও ধারণ করল মেয়েটিকে সাহায্য না করে। বিডিআর বিদ্রোহের সময় দেখেছি মিডিয়া কি করে ভুল কবরের পেছনে ছুটেছে। সাগর রুনির হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশের আগে গিয়ে আলামত নষ্ট করেছে কারা?

বর্তমানে মিডিয়ার পুঁজি হচ্ছে হুমায়ূন আহমেদের প্রয়াণ। মানুষের আবেগের যায়গাগুলো ধরতে পারে তারা ঠিকই। মৃত্যুর সংবাদ পাবার আধাঘন্টার মধ্যেই কিছু লোক পৌঁছে যায় টিভি চ্যানেলে - টকশোতে নিজেদের তুলে ধরতে। প্রতিটি চ্যানেলে হুমায়ূনকে ভেজে খাওয়া হচ্ছে নানা ভাবে। কফিনের ভেতরের লাশের ছবি দেখাচ্ছে অনেকে। আমরা নাদান দর্শক সেগুলো গোগ্রাসে গিলছি আর হাপুস নয়নে কাঁদছি। হ্যা, আমাদের চোখের জলই, আমাদের আবেগই তাদের উপজীব্য। আমরা প্রশ্ন করছি না কেন এত বাড়াবাড়ি।

এই শেনসেশনালিজমের মূলে রয়েছে যে কোন মূল্যে খবর বেঁচা - মানুষকে আচ্ছন্ন করে রাখা। এ রিপোর্টিংয়ে খবরের বিষয়বস্তু সম্পর্কে কোন গভীর ধারনা থাকে না, এতে থাকে পক্ষপাতিত্ব, দুর্নীতি। এই রিপোর্টিংয়ে জরুরী খবর চাপা পড়ে - তুচ্ছ খবর লাইম লাইটে আসে। এ ধরনের রিপোর্টিংয়ে মানুষের প্রাইভেসি বা শোককে পুঁজি করে।

এ অবস্থা থেকে উন্নতির উপায় কি আমি জানি না। অনিন্দ্যের পোস্টে আকুতি ছিল - "দয়া করে হুমায়ূন আহমেদকে শান্তিতে মরতে দেন"। আমি বলছি মিডিয়াকে "থামলে ভাল লাগে"। অচিরেই না থামলে ভবিষ্যৎে দর্শকরা অন্য কোন বিকল্প খুঁজে নেবে।

প্রথম প্রকাশ সচলায়তন এ।

Thursday, April 05, 2012

বিবেকহীন বস্তি উচ্ছেদ ও নীরব দর্শক

গতকাল বুধবার সকালে বেদখলকৃত সরকারী জমি উদ্ধারে বনানী এলাকার করাইল বস্তি  উচ্ছেদ অভিযান চালায় ঢাকা জেলার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে মেটোপলিটন পুলিশের ৪ প্লাটুন মোতায়েন করা হয়। সরকারী ভাষ্যমতে বেদখলকৃত ১৭০ শতাংশ জমির মধ্যে ৮০ শতাংশ বিটিসিএলের মালিকানাধীন ও ৪৩ শতাংশ পিডব্লিইডি’র এবং বাকি জমি আইসিটির।

এক অসমর্থিত খবরে জানা গেছে যে বুলডোজারের নীচে শত শত বস্তি ধ্বংস হবার সময় ঘুমন্ত দুই শিশু মারা যায়। হ্যা তাদের জানানো হয়েছিল উচ্ছেদের কথা গত মঙ্গলবার বিকেলে - স্থানীয় ভাবে মাইকিং করে। কিন্তু এই দুই শিশুর পিতামাতা হয়ত আমলে নেয়নি। গত বছর ২০শে সেপ্টেম্বর রাজউক এরকম স্বল্প নোটিসে আরেকটি উচ্ছেদ অভিযান চালায় সেখানে। পুলিশ আর পাড়ার মাস্তানদের দ্বারা ১২০টিরও বেশী পরিবার উচ্ছেদ করা হলেও পরে তারা আবার এসে বাসা করে। গত ২০০৮ সালে প্রথম পিডাব্লিউডি উচ্ছেদের নোটিশ পাঠালে আইন ও শালিস কেন্দ্র পুনর্বাসন ছাড়া  উচ্ছেদ মানবাধিকার লঙ্ঘন এই বলে হাইকোর্টে একটি স্টে অর্ডার নেয়। সেই মামলার বিভিন্ন শুনানীতে পুনর্বাসনের কথা বলা হয় তবে গত জানুয়ারীতে হাইকোর্ট সরকারকে আদেশ দেয় দুই মাসের মধ্যে এই বেদখলকৃত জমি উদ্ধার করতে - তবে সেখানে পুনর্বাসনের কোন কথা বলা হয় নি।

করাইল এলাকার এইসব ভূমিহীন বস্তিবাসীর ৩০ ভাগ দিনমুজুর, ২০% রিক্সা-ভ্যান চালায়, ১৮% গার্মেন্টস কর্মী ও ১২% ছোট ব্যবসা করে। তাদের মাসিক আয় ২৫০০-৪৫০০ টাকা এবং স্থানীয় মান্তানদের ৮০ স্কয়ার ফিটের ঘর ভাড়া দিতে হয়  ৮০০-১২০০ টাকা।

হ্যা, আমাদেরও ঈদ হয়। ছবি ডেভিড হোয়াইটের সৌজন্যে


এই টাকায় তাদের কিভাবে চলে সে খেয়াল কি রাখে কেউ? জ্যাম এড়াতে আমি অনেক সময় রিক্সায় তেজগাঁয়ের রেললাইনের পাশের বস্তি ও ৪র্থ শ্রেণী কর্মচারীদের বাসস্থান এর পাশের রাস্তাটি দিয়ে আসি। বিজয় স্বরণী ও তেজগাওঁ এর ওভারব্রিজের নীচে এক অদ্ভুত বাজার বসে। কাছাকাছি কাওরান বাজারে যেসব শাক-সব্জি আসে সেসব ট্রাক থেকে নামানোর সময়টা কখনও দেখেছেন কি? কিছু বস্তির ছেলে চাপ খাওয়া, নষ্ট হওয়া শাক সব্জি সংগ্রহ করে সেখান থেকে, এবং অনেকসময় ভালগুলো চুরি করে - অবশ্যই  শারীরিক প্রহার এবং গালাগালির ঝুঁকি মাথায় নিয়ে। সেইসব শাকসব্জি এবং হয়ত সরাসরি আড়ত থেকে পঁচে যাওয়া শাক-সব্জি দিয়েই উল্লেখিত বাজারটি সাজানো। সারি করে বিছিয়ে রাখা পাকা করলা, থেৎলানো পটল, পঁচা শসা, কাল হয়ে যাওয়া আলু - এগুরো নিত্য নৈমিত্তিক চিত্র। এখানে বাজার করতে আসে বস্তির নিম্নবিত্তরা। হ্যা, আমাদের মত বেশী দামের ফ্রেস সব্জি কেনার সামর্থ না থাকতে পারে, কিন্তু তাদেরও তো বাঁচতে হয়।  বাজারের একটি মাত্র মাংসের দোকানে ঘন্টার পর ঘন্টা একটি মাংসের পিস ঝুলে প্রমান করে তারা - না তাদের জীবনেও বিশেষ অনুষ্ঠান থাকে যখন তারা মাংস খেতে পারে।

কিন্তু এই বস্তিবাসীদের  আবাসহীন করা ঠেকাতে তেমন কেউ নেই তাদের পক্ষে লড়ার। কিছু এনজিও প্রেসক্লাবে মানববন্ধন করেছে এবং অনেকে পত্রপত্রিকায় লিখছে।  কিন্তু আমাদের কার সময় আছে সেগুলোর প্রতি দৃষ্টি দেবার?

তত্বাবধায়ক সরকারের সময় মিরপুরে বস্তিবাসীদের জন্যে বাসস্থান করার কথা উঠল। সেটা আর এগোয় নি। কে করবে বলেন। তাদের জন্যে করে কার কি লাভ হবে?

আজকে বস্তিবাসীরা মহাখালীতে মানববন্ধন করছে। বনানী গুলশান এলাকায় ট্রাফিক ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে। সেখানে কোন রিক্সা চলছে না - ধর্মঘটে গেছে তারা। আমাদের সাধারণ প্রতিক্রিয়া কি হবে ভাবছি। অসহ্য গরমে ঘন্টার পর ঘন্টা ট্রাফিক জ্যামে থেকে সরকারের গুষ্টি উদ্ধার করব। তাতে পরিস্থিতির কোন পরিবর্তন হবে না। এসব ভূমিহীন মানুষ আবার বসতি গড়বে নতুন কোন করাইলে। আমরা আমাদের সমস্যাকে শুধু এড়ানোর চেষ্টা করব - ঢাকাকে তিলত্তোমা করার কথা বলব কিন্তু সমস্যা মিটবে না। এ জন্যে আমরা নীরব দর্শকরাও অনেকটা দায়ী।

(ছবির জন্যে কৃতজ্ঞতা দুস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্র)

Sunday, February 12, 2012

এ-কেমন মৃত্যু ?

আজ সকালে মেইল চেক করার সময় বন্ধু চ্যাটে এল ও জানালো আজকের দিনের বিভীষিকাময় খবরটি - সাংবাদিক সাগর সরোয়ার ও টিভি রিপোর্টার মেহেরুন রুনীর নৃশংস হত্যাকান্ড। সে বলছিল "গতকাল রাতেই সাগরকে একটি প্রেস রিলিজ পাঠিয়েছিলাম - আজকে সেটাই হাতে নিয়ে স্তব্ধ হয়ে বসে আছি।"

এইতো একদিন আগেও যারা ছিলেন সুখী দম্পতি, আজ শুধুই স্মৃতি আর ছবি। সারাদিন ফেসবুকে সাংবাদিক বন্ধুদের কাছ থেকে সাগর-রুনী নিয়ে শোকগাথা ও স্মৃতিচারণ, তাদের ছেলে মেঘকে নিয়ে নানা কথা পড়তে পড়তে ও ছবি দেখে আমরাও শোকাচ্ছন্ন ও ভারাক্রান্ত হই বইকি।

সাগরের ডয়েশে ভেলেতে চাকুরির সুবাদে দম্পতিটি জার্মানিতে প্রবাস জীবন কাটিয়ে গত বছর ফিরে এসেছেন। অন্য অনেকের মত বিদেশে থেকে জাননি। হয়ত দেশকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল। কিন্তু ভাগ্যে রইল বিভীষিকাময় মৃত্যু।

অনেকের মনেই নানা প্রশ্ন - এটা কি ডাকাতি না প্রতিহিংসামূলক খুন। তারা দুজন কি তাদের রিপোর্টিং এর জন্যেই কোন শক্র তৈরি করেছিলেন? নাকি এটি কোন পারিবারিক বিরোধ? সেসব হয়ত জানা যাবে অথবা যাবে না। তবে আমাদের সমাজ যে অমানবিক ও কলুষিত হয়ে গেছে তা বোঝা যায় ঘাতকদের আচরণে। পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ীঃ "সাগরের দেহে ১৯টি বড় ধরনের আঘাতের চিহ্ন ছিল। এছাড়া ছোটখাটো আরো ২০-২৫টি কাটা দাগ পাওয়া গেছে। বুকের বাম পাশে একটা ছুরির ৮০ ভাগ গেঁথে ছিল।" হায়, এ পোড়ার দেশে খুনেও রহম নেই।

এ মৃত্যু আমাদের অনেককেই নাড়িয়ে দিয়েছে। এসব জেনে নির্লজ্জ স্বাভাবিক থাকা যায় না। তবে বাস্তবতা এই যে দেশে নানান নৃশংসতা অব্যহত রয়েছে ও থাকবে। কারন আমরা কখনও মূল নিয়ে ভাবি না। সমাজে বৈষম্য বাড়ছে। পাওয়া আর না পাওয়ার দলের মধ্যে একধরণের অবিশ্বাসের ব্যবধান তৈরি হচ্ছে। ফলে দেখা যায় খুব অল্প খরচ করেই মানুষ খুন করা যায়। আর নৃশংসতার ব্যাপারটিও সমাজসৃষ্ট। কোরবানীর সময় অভিভাবকরা অতি উৎসাহে সন্তানদের পশু জবাই করা দেখাব। পাকিস্তান ও গুটি কয়েক দেশ ব্যতিত পৃথিবীর কোথাও প্রকাশ্যে পশু জবাইয়ের চল নেই। ফলে লক্ষ্য করবেন এসব দেখে দেখে শেখার ফলে দেশে জবাই ও ছুরিকাঘাতে মৃত্যুর হার বেশী। কিন্তু এ নিয়ে রাষ্ট্র বা বুদ্ধিজীবীরা ভেবেছে কখনও?

আজ আরেক প্রবাসী বান্ধবীর সাথে কথা হচ্ছিল। সে দেশে ফেরার জন্যে চাকুরি খুঁজছে কিছুদিন ধরে। আজকের সংবাদে মুহ্যমান সে বলল এখন আমি ফেরার ব্যপারে নতুন করে ভাবব। এতদিন ফিরে আসার জন্যে উদ্বুদ্ধ করলেও আজ তাকে কোন কিছু বলতে পারিনি। এই মৃত্যু উপত্যকা থেকে আমার দেশকে ফিরে কেড়ে না আনলে আমি তার নিরাপদ ভবিষ্যৎের প্রতিশ্রুতি দেই কিভাবে?

Sunday, January 22, 2012

ভিআইপিতন্ত্র

ক্লাস টুতে স্কুলের বাংলা টিচার আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে বড় হলে কি হব। আমি উত্তর দিয়েছিলাম 'পুলিশ'। কারন পুলিশরা তখন আমার চোখে ছিল বীরত্ব-ক্ষমতার প্রতীক। এখন যদি আমাকে একই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা হয়, তাহলে চোখ বুঁজে অবশ্যই বলব ভিআইপি।

ভিআইপির সঠিক কোন সংজ্ঞা নেই, স্বার্থ আর ক্ষমতাই তাদের নিয়ন্ত্রক। ভিআইপি হতে লাগে না কোন যোগ্যতা, ন্যুনতম মনুষ্যত্ব বা পড়াশোনা। 'লেখাপড়া করে যে গাড়ি-ঘোড়া চড়ে সে' ধরণের তত্ব এক্ষেত্রে অচল। বাংলাদেশের শতাধিক এমপির শিক্ষাগত যোগ্যতা "স্বশিক্ষিত"। সেই স্বশিক্ষিতদের হাতে আমার শৈশবের হিরো পুলিশকে অনায়াসেই চড় খেয়েও তা হজম করতে হয়। বহু বিচারকের একটি করে অন্তত থার্ড ডিভিশন রয়েছে। তারপরও আপনি যদি ভুলে যান যে তারা সাধারণ মানুষ নয়, বিচারপতি, তাহলে হয়ত আপনাকে হাইকোর্টে হাজির হয়ে হাত জোড় করে ক্ষমা চাইতে হবে।

এই ভিআইপি সংস্কৃতি কি করে বাঙ্গালীদের গ্রাস করল? মুগল সম্রাটেরা তাদের আর্থ-রাজনৈতিক স্বার্থ পূরণের জন্য বংশানুক্রমিক উত্তরাধিকারসূত্রে জমির মালিক ভূঁইয়া বা ভূপতিদের নিয়ে জমিদারতন্ত্র চালু করেন। মুগল আমলে জমি ছিল মর্যাদার প্রতীক এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তির একটি উৎস - কারন জমিদারকে পুলিশ, বিচার বিভাগ ও সামরিক বাহিনীর কিছু দায়িত্ব পালন করতে হতো। উচ্চাভিলাসী জমিদাররা শাসকশ্রেণীকে তুষ্ট করার বিনিময়ে সার্বভৌম ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতেন। ঔপনিবেশিক আমলেও জমিদাররা ছিলেন বহাল তবিয়তেই তবে তাদের খাজনা আদায় ছাড়া অন্যান্য ক্ষমতা হ্রাস পায়। ১৯৫১ সালে জমিদারি ব্যবস্থার আনুষ্ঠানিক বিলোপ হলেও জমিদার বাহাদুররা ঠিকই রয়ে গেছেন অন্য চেহারায়। আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে জমিদারতন্ত্রের মীথ প্রথিত। ফলে অর্থের প্রাচুর্য বা ক্ষমতাধর হলে সেই জমিদারী মানসিকতা জেগে ওঠে। তারা এবং তাদের আশেপাশের লোকেরা ভিআইপি স্ট্যাটাসের সুবিধা ভোগে তৎপর হয়ে ওঠে। এমনকি প্রভাবশালী নেতার মুরগীরও ভিআইপি স্ট্যাটাস পাবার নজির দেখা গেছে।

আপনার দৈনন্দিন জীবনে নানা সমস্যার মধ্যে আপনারা ভিআইপির উপস্থিতি টের পাবেন। এই দেশটি স্পষ্টতই ভিআইপিদের দেশ হয়ে উঠেছে। আপনি ভিআইপি হলেন তো বিনা ঘুষে, বিনা পুলিশী ঝামেলায় আপনার জীবন চলবে। আপনার ট্রাফিক জ্যামে পড়তে হবে না, কারন বিশেষ পুলিশি ব্যবস্থায় আপনার চলাচল। আপনি বিদেশের ভিসা সহজে পাবেন। ভিআইপিদের মধ্যে কি কেউ বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডে মারা গেছে?

এই কারনেই আমরা সবাই ভিআইপি হতে চাই। পরিচয়ের পর কয়েকটি বাক্যের মধ্যে আমরা উচ্চারণ করে ফেলি আমরা কোন ভিআইপির কত কাছের। ভাবি এতেই যদি শিকে ছিঁড়ে। সকলের জন্যে সমান অধিকার এই জিনিষটি আমরা মুখে বললেও তলে তলে লালায়িত থাকি একটু ভিআইপি সুখের।

এই ভিআইপিতন্ত্রের বুকে কিছুটা চির ধরিয়েছে প্রযুক্তিনির্ভর টুলস। ইন্টারনেট ও মোবাইল সহজলভ্য হবার সাথে সাথে যোগাযোগের নিমিত্ত এখন হাতের মুঠোয়। ব্লগে, ফেসবুকে সবাই আমাদের মনের ভাব প্রকাশ করতে পারি। এখন বুদ্ধিজীবীরা আগের মত আর বিবৃতি দিয়ে সুখ পান না- কারন আম জনতা তাদের চেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত কথা বলে ফেলে। বিশ্বের অনেক নামিদামী পত্রিকা বিদেশী সংবাদদাতা তুলে নিচ্ছে - কারন ব্লগ-টুইটারে ব্রেকিং নিউজ মিলে। ওপেনসোর্স, ক্রিয়েটিভ কমন্স, ক্রাউডসোর্সিং, কমিউনিটি, কোলাবরেশনের মাধ্যমে শেয়ার্ড নলেজ - উইকিপিডিয়া, ইউটিউব, ফ্লিকার, ফেসবুক, ব্লগ কমিউনিটি। ওয়েবের মাধ্যমে কোটি লোকের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সৃষ্টি সবার হাতের মুঠোয়। এইসব শত শত ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ২০০৬ সালের ম্যান অফ দা ইয়ার সম্মান দেয়।

১৯৯৯ সালে ন্যাপস্টার সবার নিজস্ব সঙ্গীত আর্কাইভ উন্মুক্ত করার মাধ্যমে একে অপরের মধ্যে গান আদান প্রদান সহজলভ্য করে দিল। সঙ্গীত ইন্ডাস্ট্রি প্রমাদ গুনল। অচিরেই তাদের নামে মামলা হল এবং ২০০১ সালে এটি বন্ধ হয়ে গেল। ন্যাপস্টারের দুর্বলতাগুলো জয় করে পরে র‌্যাপিডশেয়ার, মেগাআপলোড, ড্রপবক্স এর মত শেয়ারিং সাইট জন্ম নেয়। সম্প্রতি আবার এইসব শেয়ারিং সাইট ও কোলাবরেটিভ কন্টেন্ট এর বিরুদ্ধে আটঘাট বেঁধে লাগা হচ্ছে। বহুল আলোচিত সোপা ও পিপা আইন চালু হলে টুইটার বা ইউটিউবএর মত সাইটকে প্রতিটি পোস্ট পরীক্ষা করে পাবলিশ করতে হত (এখানে বিস্তারিত)- যা বাস্তবে সম্ভব নয়। ব্যপক প্রতিবাদের মুখে আইনগুলো পাশ করা থেকে বিরত রাখা গেছে, কিন্তু এরকম চাপ আরও আসবে মেধাস্বত্ত রক্ষার নামে।

মোগাআপলোডের বিরুদ্ধে কপিরাইট লংঘন আর ৫০০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশী ক্ষতিসাধনের অভিযোগ এসেছে এবং একে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মেগাআপলোড কোম্পানিটি হংকংএর এবং পাইরেসীর অভিযোগে অভিযুক্ত এর কিছু কন্টেন্ট আমেরিকার লিজড সার্ভারে রাখার কারনে ফেডারেল কোর্ট তাদের জুরিস্ডিকশন দাবী করে। আমেরিকার অনুরোধে নিউজিল্যান্ড থেকে এর তিনজন (জার্মান ও ডাচ) হর্তাকর্তাকে গ্রেফতার করা হয়। এর প্রতিবাদে বেনামী হ্যাকাররা আমেরিকার জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট, এফবিআই, কপিরাইট অফিস, ইউনিভার্সাল মিউজিক গ্রুপ ইত্যাদির ওয়েবসাইট হ্যাক করে।

এক স্বদেশীর বিরুদ্ধে বিদেশ থেকে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেবার জন্যে মামলা ঠোকা হয়েছে। ফেসবুক একটি ক্লোজড সাইট। কাজেই এখানে অসদাচরণ প্রদর্শনের (?) জন্যে বড়জোড় চাকুরিজীবির বিভাগীয় শাস্তি হতে পারে, মামলা নয় (জুরিস্ডিকশনের ব্যাপারটিও আছে), যেখানে সে ভুল স্বীকার করে স্ট্যাটাসটি মুছে দিয়েছে। তার অনুপস্থিতির কারনে আদালত অবমাননার শাস্তি প্রদান যেন ঝিকে মেরে বৌকে শেখান - খবরদার বাড়াবাড়ি করবে না। অথচ জামাত নেতা জনসভায় প্রকাশ্যে প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে হুমকি দেয়। তার বিরুদ্ধে মামলা হয় না - কারন সে রাজনৈতিক ভিআইপি।

এইভাবে বিশ্বজুড়ে সাধারণ অনলাইন ব্যবহারকারির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে সংবাদ বা তাদের মনের ভাব প্রকাশ করার জন্যে। ওদিকে অসাধু ভিআইপি রাজনীতিবিদরা তাদের বিশ্বব্যাপী গোপন ব্যান্ক অ্যাকাউন্ট থেকে লক্ষ কোটি টাকা আদান প্রদান করে অস্ত্র বা নিষিদ্ধ জিনিষ কিনছে -কারুরই মাথা ব্যাথা নেই।

গুয়াতেমালাতে আমেরিকার চাপে একটি বিশেষ কোর্ট এবং দুটি বিশেষ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে কপিরাইট আইনের জন্যে। দেড় কোটি মানুষের এই দেশে প্রতি বছর ৬০০০ লোক খুন হয় এবং খুনীদের বিচার হয় না। মাইকেল জ্যাকসনের পাইরেট গান ডাউনলোড করার জন্যে কারও পাঁচ বছরের সাজা হতে পারে - অথচ তাকে খুনের দায়ে ডাক্তারের সাজা হয়েছে একবছর।

ইন্টারনেটকে সাধারণ মানুষের হাত থেকে ভিআইপিদের কব্জায় নিয়ে আসার জন্যে তোড়জোড় হচ্ছে আমাদের দেশেও। কপিরাইট আর সাইবার আইনের পক্ষে সোচ্চার হচ্ছে কতিপয় গোষ্ঠি। প্রথমে একশ্রেণীর মিডিয়া কর্পোরেট ব্লগ চালু করে মতামত প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছে কিন্তু ব্যর্থ হওয়ায় নতুন নতুন ফন্দি আঁটছে। এটি করছে তাদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে। বিভিন্ন সভা সমিতির মাধ্যমে তারা ব্লগ ভিআইপি সাজার চেষ্টায় ব্যস্ত।

ইন্টারনেটকে ভয় ভীতির উর্ধ্বে রেখে সাধারণ মানুষের ব্যবহার্য না করতে পারলে এটি অন্য সব মাধ্যমের মতই ভিআইপি নিয়ন্ত্রিত হবে। মানুষের কণ্ঠ রোধ করতে পারলে কাদের লাভ হয় তা মানুষ চীন, উত্তর কোরিয়া, ইরান ইত্যাদি স্বৈরাচারী শাসকের দেশ থেকে অনুমেয়। আমাদের তাই ভাবতে হবে - আমরা আমাদের এবং সাধারণ মানুষের অধিকারের লক্ষ্যে লড়ব না ভিআইপি হবার ইঁদুর দৌড়ে যোগ দেব।

Saturday, November 05, 2011

জাগো বাংলাদেশ নিয়ে যত কথা

গতকাল অফিসে যাবার সময়ে শেরাটন হোটেলের সামনের মোড়ে দেখলাম হলুদ টিশার্ট পরা কয়েকজন ছেলেমেয়ে বিভিন্ন গাড়ির কাছে এসে কিছু জিজ্ঞেস করছে। গাড়ি সিগন্যালে থামতেই ১৪-১৫ বছর বয়সী এক কিশোরী এগিয়ে এল। স্যার বলে সম্ভাষণ করে তাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা শুরু করতেই গাড়ি আবার নড়ল। দ্রুত পকেটে হাত দিয়ে কিছু টাকা হস্তান্তর করতেই Primary Education For All লেখা একটি স্টিকার পেলাম। অন্য গাড়িতে দেখলাম ফুল দেয়া হচ্ছে।

এরপর অফিস যেতে যেতে ভাবছিলাম যে ওইখানে প্রায়ই পথশিশুরা ফুল নিয়ে দাড়িয়ে থাকে অথচ তাদের কাছ থেকে কালে ভদ্রে কিছু কেনা হয় না। তাহলে আমি ঐ হলুদ পোশাক পড়া কিশোরীকে কেন সাহায্য করলাম?
(ছবি: গতকাল সিলেটে ড: জাফর ইকবাল ভলান্টিয়ার ফর বাংলাদেশের হলুদ টি শার্ট পরা। সৌজন্যে জাগো বাংলাদেশ ও টিটিএল)

বিভিন্ন ব্লগে এই নিয়ে লেখালেখি হচ্ছে যার বেশীরভাগেই দেখলাম তথ্যের অভাবে গালগল্প, ব্র্যান্ডিং ও কাঁদা-ছোড়াছুড়ি চলছে। এইসব কিশোর-কিশোরী বা তাদের কে পাঠিয়েছে তা সম্পর্কে আমরা কতটুকু জানি? কালকের এই আয়োজনটি কিন্তু রীতিমত পাবলিক ক্যাম্পেইন করা একটি কর্পোরেট পৃষ্ঠপোষকতার উদ্যোগ। ডেইলি স্টারে এসেছে যে জাগো বাংলাদেশ নামক এনজিওর ভলান্টিয়ার্স ফর বাংলাদেশ শাখার প্রায় ৭০০০ স্বেচ্ছাসেবক যারা বিভিন্ন ইংরেজী ও বাংলা মাধ্যমের স্কুল এবং কলেজ ইউনিভার্সিটিতে পড়ে তারা দেশের দশটি শহরে রাস্তার মোড়ে মোড়ে দাড়িয়ে জাতিসংঘের উৎসাহে প্রবর্তিত ইউনিভার্সাল চিলড্রেনস ডে সম্পর্কে জানাবে এবং পথশিশুদের জন্যে অর্থ সংগ্রহ করবে ৩রা নভেম্বর ২০১১ তারিখে। একই দিনে তারা ১৮০০ পথশিশুকে বিভিন্ন খেলার যায়গায় নিয়ে যাবে, তাদের খাবার এবং চিকিৎসা দেবে। এর মূল স্পন্সর আমেরিকান দুতাবাস এবং সহায়তা করেছে এয়ারটেল, পিজ্জা হাট, কেএফসি, ফারইস্ট লি: ওয়ান্ডারল্যান্ড, টিটিএল এবং অন্যান্য সংস্থা। অনেক প্রতিথযশা যেমন জাফর ইকবাল স্যারও তাদের উৎসাহিত করেছেন ( এবং তার বিরুদ্ধে ফতোয়া দেবার ধৃষ্টতা পেয়েছে ছাগুরা)। জাগো বাংলাদেশ ২০০৭ সাল থেকেই ইউনিভার্সাল চিলড্রেনস ডে পালন করে আসছে।

 সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ২৫ বছর বয়সী বাংলাদেশী যুব্ক করভি রক্ষান্দ ধ্রুবের গল্প স্বপ্নের মতন, অন্তত দেশে বিদেশে সেভাবেই প্রচারিত। বিলেত থেকে ২১ বছর বয়সে আইনে স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফেরে ধ্রুব। কথা ছিল পারিবারিক ব্যবসা সামলাবে সে, কিন্তু মাথায় ভুত চাপল পথশিশুদের জন্যে স্কুল করবে সে। ২০০৭ সালের এপ্রিল মাসে রায়ের বাজারে বন্ধুদের সাহায্যে একটি রুম ভাড়া নেয় জাগো এবং একটি ছোট ইংরেজী স্কুল খোলে যেখানে ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডনের এডএক্সেল কারিকুলামে পড়ানো হয়। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পাশাপাশি মেলে খাবার ও চিকিৎসা। বাড়ি যাবার সময় আবার আধা কেজি চালও পায়। ধ্রুব করিৎকর্মা ছেলে, তার যোগাযোগ, সামাজিক মর্যাদা ইত্যাদি কাজে লাগিয়ে দেশী-বিদেশী সাহায্য যোগাড় করে স্কুলটি এগিয়ে নেয়। এর জন্যে আকর্ষনীয় প্রেজেন্টেশন, ভিডিও ও নানা ক্যাম্পেইনের উদ্যোগ নেয়।

বর্তমানে এই বিল্ডিং এর দুই তলা জুড়ে ৩৬০ জন করে দুই শিফটে ৭২০ জন পথশিশু শিক্ষা নেয়। তাদের ঢাকা, চট্টগ্রাম সহ অন্যান্য কয়েকটি শহরে আরও গুটি কয়েক ছোট স্কুল আছে। ইতিমধ্যে দেশী ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারও পেয়েছে ধ্রুব। এছাড়াও দ্যা ঢাকা প্রজেক্ট নামে আরেকটি স্কুল আছে যেখানে বিশেষ ভাবে এমিরেটস এর বিমানবালাদের অর্থায়নে বাংলা ও ইংরেজী মাধ্যমে পড়ানো হয়।

দুবছর আগে বাড়ি থেকে তাকে জানিয়ে দেয়া হয়, বেছে নাও - পারিবারিক ব্যবসা না তোমার খামখেয়ালি। ধ্রুব বাড়ি থেকে বের হয়ে স্কুলের একটি রুমে আশ্রয় নিয়ে বলে দিনের অধিকাংশ সময়তো এখানেই থাকি, নাহয় আরেকটু থাকলাম। জাগো বাংলাদেশে আরও বিভিন্ন সামাজিক কাজের সাথে জড়িত - তাদের ওয়েবসাইট অনুযায়ী।

ইউনিভার্সাল চিলড্রেনস ডের ২০১০ সালের অনুষ্ঠানে প্রায় ২০০০ স্বেচ্ছাসেবক অংশ নেয়। এইসব স্বেচ্ছসেবকদের আনুষ্ঠানিক কাঠামো দিতে অঙ্গসংস্থা ভলান্টিয়ার ফর বাংলাদেশ গঠিত হয় কাকরাইলে এবছর আমেরিকান দুতাবাসের সহযোগীতায়। উদ্দেশ্য আগামী ২ বছরের মধ্যে ২১টি স্বেচ্ছাসেবক দল তৈরি করা। তাদের চুড়ান্ত লক্ষ্য ৬৪টি জেলায় স্বেচ্ছাসেবক দল তৈরি করা। তাদের কার্যক্রমের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে সামাজিক মিডিয়ার ব্যবহার - আপনি যোগ দিতে চান? ফেসবুক লগিন ব্যবহার করে যোগ দিতে পারেন। ফেসবুকে তাদের স্বেচ্ছাসেবকের সংখ্যা ৬০০০ এর উপরে। এবারের ইউনিভার্সাল চিলড্রেনস ডে উপলক্ষ্যে ভলান্টিয়ার ফর বাংলাদেশ বেশ কটি ওয়ার্কশপের আয়োজন করে দেশজুড়ে -চট্টগ্রাম, ঢাকার আইএসডি, সেইন্ট যোসেফ ইত্যাদি নামকরা স্কুল ছাড়াও ওয়ান্ডারল্যান্ডে ছিল এইসব আয়োজন। নয়নকাড়া ভিডিও এবং ছবি ফেইসবুক ও ইউটিউবে শেয়ার করা হয়েছে এবং আরও ছাত্রছাত্রী উদ্বুদ্ধ হয়েছে। আমি কেন সেই কিশোরীকে সাহায্য করলাম সেটি এখন খোলাসা হল। এটি ছিল পূর্ব প্রস্তুতি নেয়া ইভেন্ট এবং এতে একটি স্টানিং ইফেক্ট ছিল। এতজনের স্বতস্ফুর্ত অংশগ্রহণের পেছনে সামাজিক মিডিয়ার অবদান অনস্বীকার্য। টুইটারের মাধ্যমে জানা যায় যে ঢাকার উত্তরাংশে পুলিশ গতকাল তাদের কার্যক্রমে বাধা দেয় এবং ধ্রুব গুলশান থানায় গিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়।

আজকে অরিত্রের লেখায় জাগো বাংলাদেশের পক্ষে বিপক্ষে অনেক কথা এসেছে। অনেকে স্বেচ্ছাসেবকদের পোষাক নিয়ে আপত্তি করেছেন (সাবিহ ওমর ভালো জবাব দিয়েছেন তাদের)। অনেকে কত টাকা উঠেছে তার হিসেব চা্চ্ছেন। অনেক স্বেচ্ছাসেবককে টিশার্ট পরিহিত অবস্থায় শিশা বারে দেখা গেছে সেসব ছবি এসেছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে এই সবই কিন্তু বিভিন্ন ব্লগে আসার সাথে সাথে তাদের ফেসবুক গ্রুপে পোস্ট হয়ে যাচ্ছে এবং জবাব চাচ্ছে অনেকে। আগ্রহীরা চাইলে ধ্রুব, জাগো ফাউন্ডেশন এবং ভলান্টিয়ার ফর বাংলাদেশ ফেসবুক পেইজে এইসব নিয়ে আলোচনা দেখতে পারেন। সামাজিক মিডিয়ার সুবিধাটা এইখানে - পত্রিকার মত একপেশে রিপোর্ট না। জবাবদিহীতার আশা করা যায়।

এইসব স্বেচ্ছাসেবক দেশের দুর্নীতিগ্রস্ত সমাজের অন্তর্গত - কাজেই গুটিকয়েকের ব্যক্তিগত দুর্নীতিকে জেনেরালাইজ করা হয়ত ঠিক হবে না। ২০১০ সালে ৬ ঘন্টায় তোলা হয়েছিল ২৪ লাখ টাকা, এবার শোনা যাচ্ছে ৩৮ লাখ টাকার কথা - জাগো বাংলাদেশ তাদের আয় ব্যয়ের রিপোর্ট প্রদানে স্বচ্ছ হবেন এ আশা রইল - না হলে সবাই যা বোঝার বুঝে যাবেন।

ধ্রুবর ফেইসবুক স্ট্যাটাস থেকে একটি অংশ তুলে ধরার লোভ সামলাতে পারছি না:
One parent of a volunteer complained: I can't find a parking lot at JAAGO School in Karail. Can you please find me a parking lot and please do make a school with parking lot next time?

Korvi Rakshand answered: The kids who comes to the JAAGO School don't have cars. Actually, they don't have 3 meals a day. Right now, JAAGO is trying to arrange education and food for them. Once they study, become rich and can buy cars, we will definitely relocate the school which will have a parking lot and most probably a Helipad also.
এই প্রশ্নোত্তর পর্ব দিয়ে বোঝা যায় যে জাগোকে অনেক প্রতিবন্ধকতার মোকাবেলা করতে হয়েছে বুদ্ধিমত্তা দিয়ে এতজন স্বেচ্ছাসেবকদের একত্রিত করতে। তবে তাদের জন্যেই দামী স্কুলের এইসব উচ্চবিত্ত ঘরের স্বেচ্ছাসেবকরা যাদের অনেকে আদর করে ফার্মের মুরগি বলে ডাকে তারা এই প্রথমবার অ্যাক্টিভিজমের স্বাদ পাচ্ছে। আমেরিকান দুতাবাসের পৃষ্ঠপোষকতায় অনুষ্ঠান বলে হয়ত তাদের পিতামাতা তাদের রাস্তায় ছেড়েছে। তারা ভবিষ্যৎে দেশের সংকটময় মুহূর্তগুলোতে এইভাবে নেমে আসবে কিনা এবং কর্পোরেট বেনিয়া গন্ধ ছাড়া উদ্যোগগুলোতে তাদের অংশগ্রহণ কেমন সেটা দেখার আকাঙ্খা রইল। তারাও দেশেরই অংশ এবং আমরা শ্রেণীভেদ করে তাদের যেন দুরে না ঠেলি। স্বেচ্ছাসেবকতা করা তাদেরও অধিকার এবং দেখা যাক তেল গ্যাস রক্ষার মত বা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এর মত জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতে তাদের ভূমিকা কেমন থাকে।

এখানে উল্লেখযোগ্য গতকালের আয়োজনে আলোকচিত্রে স্বেচ্ছাসেবা দিয়ে সহায়তা করেছে থ্রু দ্যা লেন্স (টিটিএল) নামক অ্যামেচার ফটোগ্রাফারদের সংগঠন (আমার কয়েক বন্ধুও আছে সেখানে)। জাতীয় অন্যান্য অ্যাক্টিভিজমে তাদের সচরাচর দেখা যায় না। ভবিষ্যৎে কি তাদের পাওয়া যাবে?

জাগো বাংলাদেশ আর ভলান্টিয়ার ফর বাংলাদেশের উদ্দেশ্য মহৎ হলেও আমেরিকান সরকারের ভূমিকা এখানে প্রশ্নবিদ্ধ। ৬৪টি জেলায় স্বেচ্ছাসেবক নেটওয়ার্ক হলে তাদের কি লাভ? বিষয়টা এতটা জটিল যে বলতে হয় খুব খেয়াল কৈরা।

Saturday, October 15, 2011

পার্বত্য চট্টগ্রাম ও পাহাড়িরা কি দূরে সরে যাচ্ছে?



ছুটি এলেই মনটা পালাই পালাই করে কিন্তু আলস্যের কারনে কোথাও যাওয়া হয়না। এবার পুজোর ছুটিতে আড়মোড়া ভেঙ্গে সপরিবারে খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটি বেরিয়ে এলাম। আমার জন্যে ব্যাপারটি ছিল উত্তেজনাকর, কারন হিল্লি দিল্লি করার সুযোগ হলেও দেখা হয়নি চক্ষু মেলিয়া দেশের ভেতরের এই সবুজ ও নীলের পাহাড়-হ্রদের মেলা।

এ অঞ্চলের সৌন্দর্য নিয়ে নতুন কিছু বলার নেই (ছবি দ্রষ্টব্য:  রাঙ্গামাটি , খাগড়াছড়ি, বান্দরবান )। আমাদের সফরসঙ্গী পরিবারের কর্তাটি বললেন দেখুন এইরকম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে মানুষ অনেক পয়সা খরচ করে বিদেশে যায়। তবে বাস্তব হচ্ছে যে পার্বত্য চট্টগ্রাম দিনে দিনে তার রুপ হারাচ্ছে। পর্যটন ও বসতি বাড়ার সাথে পাহাড় কেটে বানানো হচ্ছে বাড়িঘর, হোটেল-রিসোর্ট। বাশ ও সেগুন গাছের গুড়ি ভর্তি সারি সারি ট্রাক তো নিজ চোখেই দেখলাম রাস্তায়। পাহাড় থেকে খাদ্যাভাবে জনপদে নেমে আসে হাতির পাল এমন শুনেছি, কাপ্তাই লেকে আর আগের মত মাছ পাওয়া যায় না। হায় কে কার খবর রাখে।

সত্যিই এগুলো খবর হয় না। খবর হয় না যখন সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদীরা পাহাড়ি-বাঙ্গালী নির্বিশেষে চাঁদা তোলে বা অপহরণ করে, পাহাড়ি-বাঙ্গালী উভয়ের উপর হামলা করে। খবর হয়না যখন পাহাড়িদের জীবন, বসতি নিয়ে রাজনীতি করে জ্ঞানপাপী মানুষ আর তাদের এতটুকু মাথা গোঁজার ঠাই কেড়ে নেয়। খবর হয় না যখন আইন শৃঙ্খলা বাহিনী (বিশেষ করে পুলিশ) টাকার জন্যে নিপীড়িতের পাশে না এসে নির্যাতনকারীর পাশে এসে দাড়ায়। খবর হয় না যখন কল্পনা চাকমারা হারিয়ে যায়। খবর হয়না যখন খাগড়াছড়ির ১৯২টি কাজের বিনিময়ে খাদ্য প্রকল্পের শতভাগ টাকা মেরে দেয় রাজনৈতিক নেতারা যার মধ্যে অধিকাংশই পাহাড়ি। নিজেদের রক্ত নিজেরাই খেয়ে কুমীর বনে যায় (উদাহরণ: ইউনিপের নামে ৩০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে উদ্দীপন চাকমা )।

খবর হয় যখন দেয়ালে পিঠ ঠেকা মানুষ রুখে দাড়ায় এবং নিজের হাতে আইন তুলে নেয়। খবর হয় যখন শান্তিরক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত বাহিনী দুপক্ষের মধ্যে এসে দাড়ায় এবং লোক মারা যায়। খবর হয় যখন পাহাড়ি দুইপক্ষ নিজেদের রক্তে গা ভাসায় আর নিরীহ জনগনকে ত্রাসের রাজ্যে রাখে। খবর হয় যখন আদিবাসী নামকরণ নিয়ে সরকারের মনোভাব প্রতিষ্ঠায় অদ্ভুত সব যুক্তি দেখানো হয়।

এসবের মাঝে একটি জিনিষ আমরা ভুলে যাচ্ছি - তিন পার্বত্য জেলার ১৪টি উপজাতির মনে কি খেলা করছে। এই মূহুর্তে তারা আর বাঙ্গালী দের বিশ্বাস করছে না, এই মূহুর্তে তারা নিজেদের দেশের ভেতরে অবাঞ্ছিত ভাবছে। সংবিধানে আদিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে ডাকা বিক্ষোভে দুর্গম অঞ্চল থেকে চার ঘন্টা হেটে বর্ষীয়ান পাহাড়ি যোগ দিয়েছেন। তাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। এরপর হয়ত শান্তিচুক্তি রদ হয়ে আবার সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু হবে। কিন্তু এমন তো কথা ছিল না।

১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু পার্বত্য চট্টগ্রামে গিয়েছিলেন এবং মানবেন্দ্র লারমা স্বায়ত্তশাসন সহ বিভিন্ন উপজাতির দাবী তুলে ধরলে তিনি বলেন "তোরা সব বাঙ্গালী হইয়া যা"। ১৯৭৩ সালে সংসদের কাছে তার আহ্বানেও সাড়া দেওয়া হয় না। ফলশ্রুতিতে ১৯৭৪ সালে এম এন লারমা জনসংহতি সমিতির একটি সশস্ত্র গ্রুপ গঠন করেন, যা পরে শান্তিবাহিনী নামে পরিচিতি লাভ করে এবং পরে তারা অত্র অঞ্চলে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। ১৯৮১ সালে শান্তিবাহিনী দ্বিধাবিভক্ত হয় এবং ১৯৮৩ সালে বিপক্ষ দলের হাতে মানবেন্দ্র মারা যান। তবে তার অনুজ সন্তু লারমার নেতৃত্বে শান্তিবাহিনী গেরিলা যুদ্ধ অব্যহত রাখে। জিয়া এবং এরশাদ সরকারের আমলে শান্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযান চালায় সেনাবাহিনী এবং আশির দশকে উপজাতিদের উপর নির্লজ্জ্ব হত্যাকান্ড চালানো হয়। কোন সরকারের আমলেই এইসব হত্যাকান্ডের বিচার হয়নি। এছাড়া গ্রেপ্তার, নির্যাতন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, মানবাধিকার কর্মীদের হেনস্থা করা, যৌন নিপীড়ন প্রভৃতি মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে নিয়মিতই। সাথে সাথে শান্তিবাহিনীরও অনুরূপ মানবাধিকার লংঘনের মূল্য দিতে হয়েছে পাহাড়ি-বাঙ্গালি উভয়কেই।

এরশাদের আমলে ১৯৮২-৮৩ সালে ২৬ হাজারের ও বেশী ছিন্নমূল ও ভাঙ্গনের ফলে উদ্বাস্তু পরিবারকে চট্টগ্রামের তিন পার্বত্য জেলায় পুনর্বাসনের জন্যে নিয়ে আসা হয়। তাদের মধ্যে  প্রায় ২০ হাজারেরও বেশি পরিবারের স্থান হয় খাগড়াছড়িতে।  আশির দশকের শেষের দিকে তাদের উপর ‘শান্তিবাহিনী’র হামলার ঘটনা বাড়তে থাকলে সেখান থেকে লোকজনকে সেনাক্যাম্প সংলগ্ন ৮১টি গুচ্ছগ্রামে স্থানান্তর করা হয়।

১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর সম্পাদিত আওয়ামী লীগের শান্তিচুক্তি নিশ্চয়ই এই অবস্থা থেকে উত্তরণের একটি বলিষ্ঠ পদক্ষেপ। এ অবস্থায় আনতে কি পরিমান রাজনৈতিক গণসংযোগ করতে হয়েছে তা অনুমেয়। শান্তিচুক্তির পর তিন পর্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সেনা প্রত্যাহার করা হয়েছে। আশির দশকের তুলনায় বর্তমানে অর্ধেকের কম সেনাক্যাম্প পার্বত্য চট্টগ্রামে রয়েছে। বর্তমানে যা হচ্ছে তাতে উল্টোস্রোত দেখা যাচ্ছে আর সরকারেরও মাথা ব্যাথা নেই।

শান্তিচুক্তি অনুযায়ী ১৯৯৮ সালের ফেব্রুয়ারীতে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) এর প্রায় দুই হাজার সশস্ত্র সদস্য স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে। তবে প্রসিত বিকাশ খীসার নেতৃত্বে একটি দল চুক্তি মানতে অপারগতা প্রকাশ করে এবং পূর্ণ স্বায়ত্বশাসনের দাবীতে ১৯৯৮ সালে গঠন করে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। এই বিভাজন অবশ্য জেএসএসকে দমাতে পারেনি এবং তারা দাপটেই কার্যক্রম চালিয়েছে খাগড়াছড়ি অঞ্চল ছাড়া যেখানে বেশীরভাগ অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ ছিল ইউপিডিএফ এর। কিন্তু ২০০৬ সালের জরুরী সরকারের সময় সন্তু লারমার একক নেতৃত্ব থেকে দল বাঁচাতে সংস্কারের দাবীতে জনসংহতি থেকে বেরিয়ে গিয়ে নতুন আরেকটি রাজনৈতিক দল গঠন করে বেশ কিছু প্রতিবাদী নেতারা। এদের মধ্যে আছেন সন্তু লারমার ঘনিষ্ট সহকর্মী রূপায়ন দেওয়ান, তাতিন্দ্র লাল চাকমা পেলে, সুধাসিন্ধু খীসা, চন্দ্রশেখর চাকমা,শক্তিমান চাকমা প্রমূখ এবং তারা দলের নাম দেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এমএনলারমা)। এই বিভাজনে লাভ হয় ইউপিডিএফ এর যার নমুনা দেখা যাচ্ছে এবারকার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে - অনেক অঞ্চলে ইউপিডিএফ সমর্থিত প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছে।

বর্তমানে গতানুগতিক রাজনৈতিক দলগুলোর জনপ্রিয়তা একেবারে তলানীতে এসে ঠেকেছে। বিএনপি বরাবরই সেটেলার ভোটব্যাংক ভিত্তিক একটি দল, কাজেই ভবিষ্যতে তাদের ভোট পাবার চান্স কম। ভাড়াটে পাহাড়ী নেতা দিয়ে তারা এতদিন পার পেলেও যেহেতু তারা শান্তিচুক্তি ও সেনা প্রত্যাহারের বিরোধীতা (আওয়ামী লীগ একটি ব্রিগেড এবং ৩৫টি অস্থায়ী ক্যাম্প প্রত্যাহার করে ২০০৯ সালে এবং এর বিরুদ্ধে হাইকোর্টে পিটিশন করে তারা) করেছে সব সময়, তাদের আর গ্রহণযোগ্যতা নেই।

আওয়ামী লীগের গ্রহণযোগ্যতা এখন বিশ্বাস ঘাতকের পর্যায়ে। ২০০৮ ও ২০০৯ সালে পররাষ্ট্র মন্ত্রী দীপুমনি আদিবাসী দিবসে আদিবাসীদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে সংহতি প্রকাশ করেন। আর সেই তিনিই এবছর থেকে তিন পার্বত্য জেলার অধিবাসীদের আদিবাসী সম্বোধন করতে বারণ করেছেন এবং বলেছেন বাংলাদেশে কোন আদিবাসী নেই; বিভিন্ন উপজাতি আছে। তার এই অবস্থান পরিবর্তন বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের ফলশ্রুতিতে হয়েছে বলে রিপোর্টে বলা হয়েছে। আদিবাসী নিয়ে দেশী-বিদেশী যে বৃহত্তর রাজনীতি চলছে তা সামাল দিতেই যদি সরকারের এই পদক্ষেপ হয় তাহলে বলতে হয় এই পদক্ষেপটি চতুরতার সাথে নেয়া হয়নি। এই একটি ইস্যুকে পুজি করে পাহাড়ি বিচ্ছিন্নতাবাদীরা অনেককে তাদের চেতনায় সম্পৃক্ত করতে পেরেছে। পার্বত্য অঞ্চলে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ব্যর্থতা সম্পর্কে নতুন করে বলার নেই। জেলা-উপজেলা পর্যায়ের সকল নেতারাই ঠিকাদারিতে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। আগে উন্নয়ন কার্যক্রমের ৭০ ভাগ লোক পেত এখন পুরোটাই যায় তাদের পেটে। পাহাড়িরা তাদের কেন বিশ্বাস করবে?

পার্বত্য উপজেলাগুলোতে প্রাথমিক শিক্ষার হার ভাল। সরকারী স্কুল ছাড়াও ব্র্যাক ও অন্যান্য বেসরকারী স্কুল রয়েছে। আমি প্রচুর ছেলেমেয়েকে দেখেছি স্কুল ড্রেস পড়ে রাস্তায় হাটতে। কিন্তু উচ্চশিক্ষার হার কম - হাতে গোনা গুটিকয়েক কলেজ এবং কোন বিশ্ববিদ্যালয় নেই। এই অঞ্চলে নেই কোন বিশ্ববিদ্যালয় - প্রধানমন্ত্রী হাসিনা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘোষণা দিলেও পাহাড়িদের একপক্ষ এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। ফলে সেটি এখনও পরিকল্পনা পর্যায়েই আছে। পাহাড়িদের উচ্চশিক্ষার জন্যে তাই বাইরে যেতে হয়। আর উচ্চ শিক্ষিতদের চাকুরির উপায় কি? নেই কোন কলকারখানা, উল্লেখযোগ্য বেসরকারী বাণিজ্য। তাই একমাত্র কাজ মিলে এনজিও বা সাহায্য সংস্থার অফিসে।

এরপর রয়েছে সাহায্য সংস্থা/এনজিওর দৌরাত্ম্য। এই সব সংস্থায় উচ্চশিক্ষিত ইউপিডিএফ এর কর্মীরা অনায়াসে কাজ পাচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে ইএনডিপির ২০১৩ পর্যন্ত প্রকল্প রয়েছে হাজার কোটি টাকার। তাদের স্বাস্থ্য কর্মসূচি গুলো খুবই উপযোগী (এবং অকার্যকর সরকারী স্বাস্থ্য সেবার বিকল্প) কিন্তু উন্নয়ন কার্যক্রমের আওতায় বিভিন্ন কমিউনিটিকে তারা ৪ লাখ করে অনুদান দিচ্ছে যা রিপোর্ট মোতাবেক ইউপিডিএফ এর কর্মীরা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কাজে লাগাচ্ছে। ২০০৭ সাল থেকে ইউপিডিএফ সকল মাইক্রোক্রেডিট কার্যক্রম বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে ফলে কিছু পাহাড়ি কাজ কর্ম বাদ দিয়ে দানে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে এবং তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে লাগানো যাচ্ছে। 

অনেক এনজিওদের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ। মানবাধিকারের ইস্যুকে পুঁজি করে সব দোষ সরকারের ঘাড়ে, শান্তিচুক্তির উপর অথবা সুযোগ বুঝে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দিকে চাপিয়ে দিলেই কি সমস্যার সমাধান হয়ে যায়? পাহাড়ের সমস্যার শতভাগ বহিরাগত বা সেনাদের দ্বারা উদ্ভুত নয় আর পাহাড়ের রাজনীতিতেও বহিরাগতদের নিয়ন্ত্রণে নেই। সমীকরণটা ভিন্ন- দুর্নীতিতে পাহাড়ি নেতারাও পিছিয়ে নেই আর ইউপিডিএফ-জেএসএস এর সংঘাত অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতির অবনতি ঘটাচ্ছে। যেখানে ভূমি, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও শিক্ষার দিক থেকে বহিরাগতরা পিছিয়ে, সেখানে কিছুসংখ্যক ভূমি সন্ত্রাসীদের জন্যে এসব দরিদ্র মানুষকে ঢালাওভাবে রাজনৈতিক গিনিপিগ বানানো হচ্ছে। এটি হচ্ছে বিভাজনের রাজনীতি যা খেলছে সব পক্ষই।

এদেশ পাহাড়ি-বাঙ্গালি সবার। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিচ্ছিন্ন কোনো জনপদ নয় - একে গড়ে তুলতে হবে পাহাড়ি-বাঙ্গালি মিলেই। পাহাড়ি-বাঙ্গালি বা জাতি-উপজাতি কেন্দ্রিক বৈষম্য থাকা চলবে না। ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি করতে হবে, উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান, উন্নয়ন ইত্যাদি চালিয়ে যেতে হবে। পাহাড়িদের ন্যায়সঙ্গত দাবির প্রতি শ্রদ্ধা শান্তির নিশ্চয়তা দিতে পারে।  অথচ সেটা করার জন্যে একসাথে কাজ করার পূর্বশর্ত - পরস্পর বিশ্বাসটুকু হারিয়ে যাচ্ছে।

বর্তমান পরিস্থিতি খুবই নাজুক পরিস্থিতি। পাহাড়িরা শান্তি চুক্তিতে একটি ভুয়া প্রতিশ্রুতি ভাবছে। প্রতিনিয়তই নানা গুজব মানুষকে বিচলিত ও আতঙ্কিত করে। স্থানীয় সূত্রমতে আগামী যে কোন নির্বাচনে এলাকায় একচ্ছত্রভাবে পাহাড়িদের জয় হবে, ইতোমধ্যেই যার আলামত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে পাওয়া গিয়েছে। এখানে পুরো ১৯৭১ এর ফর্মুলার সাথে মিল পাওয়া যাচ্ছে। বহিরাগতদের অত্যাচার, মানবাধিকার লঙ্ঘন, পাহাড়িদের অধিকার আদায়ের লড়াই, আর নিজভূমে মেজরিটি (যেমন ১৯৭০ এর নির্বাচনে পশ্চিম পাকিস্তানী কোন দল জিততে পারেনি এ বঙ্গে) এই স্ক্রিপ্টটি মিলে যাচ্ছে। এর সমাধান বা তাদের আপন করার কোন পরিকল্পনা নেই সরকারের বা অন্যান্য রাজনৈতিক দলের। তারা আদিবাসী নামকরণ ইস্যুতে তাদের দুরে ঠেলে দিচ্ছে। তাদের ধারনা সেনাবাহিনীর বুলেটের নীচেই সব ঠিক থাকবে - এভাবে সেনাবাহিনীকেও সংঘর্ষের দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। এর পরিণতি কি হবে তা আমরা জানি।

ফলে পাহাড়িরা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের সাথে আমাদের দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। এই দূরত্ব ঘুচাতে এবং পাহাড়িদের অধিকার নিশ্চিত করতে আমরা সাধারণ মানুষেরা কি করতে পারি?

সচলায়তনে প্রকাশিত

Wednesday, June 22, 2011

গুগল অনুবাদ, হাস্যকর নয় মোটেই

বিশ্বের ৬০ কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ২৭.৩% হচ্ছে ইংরেজী ভাষী (সূত্র) আর ২২.৬% হচ্ছে চৈনিক ভাষী। অন্যান্য ভাষাভাষীরা অনেক পিছিয়ে (স্প্যানিশ ৭.৮%, জাপানী ৫%, পর্তুগীজ ৪.৩%, জার্মান ৩.৮%, আরবী ৩.৩%) - বাংলা, হিন্দিভাষী বিশাল জনগোষ্ঠী ইন্টারনেটে তাদের ভাষায় কথা বলে তুলনামূলকভাবে কম। রয়েছে আরও অসামঞ্জস্যতা - ৩১৩ বিলিয়ন ওয়েবপেইজের ৬৮.৪% ইংরেজী ভাষায় তার পরে মাত্র ৫.৯% জাপানি ভাষায় আর ৫.৮% জার্মান ভাষায় (সূত্র)। ২২.৬% চৈনিক ভাষী ব্যবহারকারী ওয়েব কন্টেন্টের মাত্র ৩.৯% তৈরি করে।



এই সব পরিসংখ্যান একটি কথা বলে - আমরা বিশ্বকে জানি বা দেখি ইংরেজী ভাষীদের দৃষ্টিতে - হবেই না কেন বিশ্বের ৬২.৫৫% সংবাদপত্র/ম্যাগাজিন, ২২% বই, ৪৫% জার্নাল, ৩৫% ছবি ও ভিডিও ইংরেজী ভাষায়। কিন্তু এটি একে অপরকে বোঝার ক্ষেত্রে সমস্যার সৃষ্টি করছে নানা স্টেরিওটাইপ তৈরির মাধ্যমে। আমরা ব্রাজিলের কোন ব্লগারের বক্তব্য জানতে পারব না যদি না কেউ অনুবাদ করে দেয় তার ব্লগ। তেমনি বাংলা ব্লগারের লেখা  একজন ব্রাজিলিয় পড়তে পারে না।

বিশ্ব সমাজকে এগিয়ে নিতে গেলে তাই অনুবাদ একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। অনুবাদের কার্যকরী টুলটি সেক্ষেত্রে একটি জরুরী উদ্ভাবন। কিন্তু বাস্তবিক ক্ষেত্রে মেশিন ট্রান্সলেশন কি পর্যায়ে আছে? এক ক্লিকে অনুবাদের ব্যবস্থাটি এখনও নিখুঁত নয়। তার চেয়ে বড় কথা হল মেশিন সব অনুবাদ করে দেবে এই ধারনাটি কম্পিউটার কবিতা লিখবে এরই সমার্থক।

অনুবাদ একটি শিল্প। একজন অনুবাদকের দুই ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা থাকা লাগে, পাঠকদের কথা চিন্তা করতে হয় - তবেই সে সঠিক অর্থ ফুটিয়ে তুলতে পারে। আমাদের অনেকেরই জানা নেই যে অনুবাদ একটি ১৮-২০ বিলিয়ন ডলার ইন্ডাস্ট্রি। বিশ্বাস হচ্ছে না? ছবির সাবটাইটেল একটি বড় অনুবাদের জায়গা। এরপর ধরুন ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অনেক প্রকাশনা নিয়ম অনুযায়ী সদস্য দেশগুলোর ২৩টি ভাষায় অনূদিত হয়। অনেক পেশাদারী অনুবাদের প্রতিষ্ঠান রয়েছে এসব ক্ষেত্রে কর্মরত। তাদের কাজের সুবিধার জন্যে নানা সফট্ওয়্যারের উদ্ভব হয়েছে - যেমন প্রোপাইটরী সিসট্রান, ট্রাডোস ইত্যাদি - বা ওপেন সোর্স - যেমন লিঙ্গোটেক, লুসি সফটওয়্যার, আপেরিটিয়াম ইত্যাদি। এইসব সফট্ওয়্যারের মূল মন্ত্র হচ্ছে একই বাক্যের অনুবাদ যাতে দুইবার না করতে হয়। সেজন্যে তারা সাহায্য নেয় ট্রান্সলেশন মেমোরির। মেশিন অনুবাদে যেই ভাষায় সবচেয়ে বেশী কন্টেন্ট পাওয়া যায় সেই ভাষায় অনুবাদ সবচেয়ে বোধগম্যভাবে হয়। কিন্তু এইসব ট্রান্সলেশন মেমোরি বিনামূল্যের নয় - বাজারে বিক্রি হয়। তবে যেই সফ্টওয়্যার ব্যবহার করা হোক মানুষ কর্তৃক মান নিয়ন্ত্রণই সফল বাণিজ্যিক অনুবাদের চাবিকাঠী।

অনুবাদকে তার ব্যয়বহুল ইন্ডাস্ট্রির কবল থেকে মুক্ত করে সার্বজনীন করার লক্ষ্যে ওপেন ট্রান্সলেশন ধারনার উদ্ভব ঘটে। এখানে ক্রাউড সোর্সিং এবং স্বেচ্ছাসেবী অনুবাদের মাধ্যমে মেশিন ট্রান্সলেশন টুলস ব্যবহার করা হয়। গুগলের ট্রান্সলেটর টুলকিট এমন একটি ওপেন ট্রান্সলেশন টুল যেখানে স্বেচ্ছাসেবীরা নিত্য নতুন অনুবাদ সৃষ্টি করে চলেছে এবং সবার জন্যে উন্মুক্ত ট্রান্সলেশন মেমোরি রিপোজিটরি তৈরি করছে।

টেড তাদের ভিডিও অনুবাদের জন্যে অর্ধ মিলিয়ন ডলার খরচ করেছে। তাদের পেশাদারী সংস্থা দিয়ে করা কিছু বাংলা অনুবাদ দেখে যারপরনাই বিরক্ত হয়েছিলাম এবং তাদের একজনকে বলেছিলাম গ্লোবাল ভয়েসেস বাংলা সংস্করণে   স্বেচ্ছাসেবীদের দ্বারা এর থেকে অনেক উঁচু মানের কাজ হয়। তাদের সমস্যা ছিল কাজটি বুঝে নিয়েছিল অবাঙ্গালী কেউ - তাই যা ইচ্ছা বুঝিয়ে দিয়েছিল অনুবাদ সংস্থা। টেড এর পরে কমিউনিটি বেইজড ওপেন ট্রান্সলেশন মডেল চালু করে যা সাফল্য পায়।

বাংলা বা তামিলের মত বহু ব্যবহৃত ভাষার জন্যে কার্যকরী মেশিন ট্রান্সলেশন টুলস এতদিন তৈরি না হওয়ার পেছনে রয়েছে পর্যাপ্ত উদ্যোগ ও অর্থের অভাব - অনুবাদক ও অন্কুর এর মত গুটিকয়েক প্রকল্প বেশি দুর আগাতে পারেনি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে।  



এছাড়াও রয়েছে প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ - অনুবাদ কিন্তু শুধু শব্দের প্রতিস্থাপন নয় - রয়েছে ব্যাকরণ, বাক্যের গঠন, রুপক, বাগধারা ইত্যাদির প্রভাব। যেমন ধরুন দক্ষিণ এশীয় ভাষাগুলোতে বাক্যগুলো (subject-object-verb * আমি-ভাত-খাই) নিয়মে গঠিত হয় যেখানে ইংরেজীতে বাক্য গঠিত হয় (subject-verb-object * I eat rice) এই নিয়মে। এছাড়াও পর্যাপ্ত উন্মুক্ত কন্টেন্টের অভাব একটি বড় কারন ছিল। বিষয়টা ব্যাখ্যা করি। একটি মেশিন ট্রান্সলেশন টুলস তিনটি নিয়ম মেনে কাজ করতে পারে:

ক) রুলস বেইজড (ব্যাকরণের নিয়ম আর অভিধান)
খ) স্ট্যাটিস্টিকাল (দ্বিভাষী ট্রান্সলেশন মেমোরি বা করপাস নিয়ে কাজ করে) আর
গ) হাইব্রিড (উপরের দুয়ের সংমিশ্রণ)

গুগল প্রথম দিকে রুলস বেইজড প্রক্রিয়ায় অনুবাদ করলেও ২০০৭ সাল থেকে স্ট্যাটিসটিক্যাল মেথড চালু করে। এই প্রক্রিয়ায় বিশালাকার টেক্সট কর্পোরা এর দরকার হয়। এটি কার্যকরী করতে ন্যুনতম ২০ লাখ শব্দ নিয়ে কাজ করতে হয় এবং অনেক কম্পিউটিং শক্তি লাগে। এই প্রক্রিয়ার সুবিধা হল যে এটি অনুবাদকারীকে সুযোগ দেয় বেশ কিছু কাছাকাছি শব্দ থেকে বেছে নিতে।

[img]http://3.bp.blogspot.com/-aeV8jF52kRI/Tai2LKwMrEI/AAAAAAAAATk/2KLnTwuFBkE/s400/image00.png[/img]
  
এই পদ্ধতিতে আরেকটি সুযোগ আছে - ক্রমাগত অনুবাদের মান বৃদ্ধি করা। গুগল ব্লগ অনুযায়ী আপনি ভুল অনুবাদকে ঠিক করতে পারবেন অনায়াসেই এবং গুগল সেটি মনে রাখবে এবং পরবর্তী বার সঠিক অনুবাদ উপস্থাপন করবে।

কাজেই আমি মনে করি গুগল ট্রান্সলেইটে বাংলা ভাষাভাষীদের জন্যে একটি যুগান্তকারী টুল। এটি এযাবৎকালে পাওয়া যাওয়া একমাত্র টুল অনুবাদক অনলাইনের চেয়ে বহুগুণে সমৃদ্ধ। আর এখন বাংলা ভাষা থেকে বিশ্বের ৬২টি ভাষায় (ভুল হলেও) অনুবাদ সম্ভব - এর শক্তি নিশ্চয়ই অনুমেয়। আসুন ওপেন ট্রান্সলেশন ধারনা আপন করে গুগল ট্রান্সলেট এর ভুলগুলো নিজেরা শুদ্ধ করে দেই ভবিষ্যৎ কল্যাণের জন্যে অথবা  গুগল ট্রান্সলেটর টুলকিট ব্যবহার করে গুগলের ট্রান্সলেশন মেমরিকে সমৃদ্ধ করি।

ছবির জন্য কৃতজ্ঞতা: অনুবাদক, ইন্টারনেট ওয়ার্ল্ড স্ট্যাটস, গুগল ট্রান্সলেট।

বিবিধ রেফারেন্স:

*  ওপেন ট্রান্সলেশন টুলস ম্যানুয়াল
*  গুগল ট্রান্সলেট পাঁচটি উপমহাদেশীয় ভাষা যোগ করেছে
*  ওপেন ট্রান্সলেশন দিয়ে বিশ্বে পরিবর্তন আনা
*  Development of A Morphological analyser for Bengali
*  Bootstrapping of a rule based English-Bangla machine translation system using work done for a sister language - BRAC University Institutional Repository

সচলায়তনে প্রকাশিত

Tuesday, May 24, 2011

স্বাস্থ্যই সকল ব্যবসার মূল

ঢাকায় সচলায়তনের প্রাণভোমরা নজরুল দম্পতির সৌজন্যেই বেশীর ভাগ সচলাড্ডা হয়। এই প্রথা ভাঙ্গতেই সিদ্ধান্ত নিলাম ৯ই মে আমার বাসায় একটি ছোটখাট আড্ডা জমাব সচলদের নিয়ে। সব প্রস্তুতি শেষ করতে করতে পারিবারিক এক অসুস্থতা বাগড়া বসাল। আমার শাশুড়ি সপ্তাহ দুই ধরে খাবারে রুচি হচ্ছিল না বলে খুব দুর্বল হয়ে পড়ায় বিভিন্ন ডাক্তার দেখানোর পর শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হল যে ওনাকে স্কয়্যার হাসপাতালে এক পাকস্থলীর চিকিৎসকের তত্বাবধানে ভর্তি করা হবে। সেই মোতাবেক ৮ই মে সকালে তাকে ভর্তি করানোর জন্যে উদ্যোগ নিলে বলা হল বিকেল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে সিটের জন্যে। সেদিন সকালে ভর্তি হলে হয়ত গল্পটি অন্যরকম হত।

কিন্তু বিধাতা আমাদের জন্যে অনেক অভিজ্ঞতা জমা করে রেখেছিলেন।

সেদিনই তিনি গোসল করতে গিয়ে বাথরুমে পড়ে যান এবং তার পা ভাঙ্গে ও মাথা ফেটে যায়। এর পর গত দুই সপ্তাহেরও বেশী ধরে তিনটি হাসপাতাল ও গণ্ডা দুয়েক বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সাথে বোঝাপড়া করে যে অভিজ্ঞতা হল তাতে বাংলাদেশের ব্যক্তিমালিকানাধীন স্বাস্থ্য সেবার চিত্র সম্পর্কে একটি ধারনা পাওয়া যায়।

অ্যাম্বুলেন্স পর্ব:

আমরা প্রথমে বুঝতে পারিনি যে ওনার পা ভেঙ্গেছে - কিন্তু প্রচণ্ড ব্যাথায় উনি দাড়াতে পারছিলেন না বা পা ভাঁজ করতে পারছিলেন না। তাই অ্যাম্বুলেন্স ডাকার সিদ্ধান্ত হয়। স্কয়্যারের ইমার্জেন্সির নাম্বারটিতে অনেক চেষ্টা করেও না পাওয়ায় কয়েকশ গজ দুরের হোটেল থেকে রুপান্তরিত হাসপাতালটিতে গেলাম। সামনে গোটা চারেক অ্যাম্বুলেন্স দাড়িয়ে থাকতে দেখে উদ্বেগ কমল। অ্যাম্বুলেন্স চাইতেই বলল কোথা থেকে আসবেন।

: কাছেই বাসা - তবে আমরা স্কয়্যারে নিয়ে যাব।
: না আমাদের হাসপাতালে না আনলে আমরা অ্যাম্বুলেন্স দেব না।
: আমি তো ভাড়া দেব।
: এই অ্যাম্বুলেন্স আমাদের নিজস্ব ব্যবহারের জন্যে।

সময় চলে যাচ্ছে দেখে বাড়ি ফিরে একটি গাড়ির পেছনের সিটে লম্বা করে শুইয়ে ওনাকে নিয়ে গেলাম।

কেবিন পর্ব:

ওনাকে ইমার্জেন্সিতে নিয়ে যাবার পর জানা গেল যে কোমরের নীচ থেকে তার পা ভেঙ্গেছে - তবে মাথার আঘাতটি গুরুতর নয়। মাথায় চারটে সেলাই আর পায়ে ট্র্যাকশন ব্যান্ডেজ দিয়ে ছেড়ে দেবার আগে ইমার্জেন্সীর ডাক্তাররা বুদ্ধি দিলেন দ্রুত একটি সিট যোগাড় করতে - কারন ওনার পায়ের অপারেশন লাগবে আর অনেকদিন থাকতে হবে। তদবির কালচারে গা ভাসিয়ে ততক্ষণে আমরা বরাদ্দ পেলাম উচ্চমূল্যের একটি ডিলাক্স কেবিন। আমাদের সৌভাগ্য যে মাথা গোঁজার ঠাই পেয়েছিলাম কারন পরবর্তী কয়েক দিন অবস্থানের সময়ও আমাদের কাঙ্খিত সাধারণ কেবিনের দেখা মেলে নি।

নার্স পর্ব:

স্কয়্যার হাসপাতাল প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে উন্নত ও প্রফেশনাল একটি হাসপাতাল। কিন্তু বাঙ্গালীরা সেবা ক্ষেত্রে অতটা প্রফেশনাল না এটা প্রমাণ করতে সেরকম কিছু নার্স জুটল আমাদের কপালে।

১) : একটি বাটি দিন রুগী বমি করবে

: (রুগীর জন্যে আনা খাবারের ঢাকনা উপুর করে) এটাতেই করুন এখন - বমির বোল এই ফ্লোরে আর নাই।

২) :  রুগীর শরীর খারাপ লাগছে - একটু মাথাটা মুছিয়ে দিন না কাইন্ডলি।

:  আপনারাই মুছিয়ে দেন - আমার ডিউটি শেষ এখন।

৩) ইমার্জেন্সী বাটন টেপার পাঁচ মিনিট পরেও নার্সের দেখা না পেয়ে তাকে ডাকতে গেলে

: আপনারা এত দেরী করছেন কেন? রুগীর শ্বাস নিতে অসুবিধা হচ্ছে।

: এইটাতো কার্ডিয়াক ফ্লোর আর আমি শুধু একা আছি। আপনাদের অর্থপেডিক্সের ডিউটি ডাক্তারতো বারো তলায় আছে - ডেকে আনছি - অপেক্ষা করেন একটু।

ডাক্তারদের রোগ নির্ধারণ পর্ব:

মাকে ভর্তি করা হল এক বিশেষজ্ঞ হাড়ের ডাক্তারের তত্বাবধানে (যাকে আমরা চিনি না)। রুগীর অবস্থা সম্পর্কে আমাদের প্রাথমিক ধারণা দিলেন একজন ডিউটি ডাক্তার। তবে অনেক প্রশ্নের উত্তরই ছিল স্যার রাতে আসবেন উনিই বিস্তারিত জানাবেন। সেইদিন রাতে তিনি আসেননি। রাতে মার কাশি ও অনেক শ্বাস কষ্ট হয় কিন্তু সঠিক চিকিৎসা তিনি পান নি।

পরের দিন সকালে আমি এদের অফিসে গিয়ে খুব রাগারাগি করলাম। বললাম ডাক্তার না থাকলে বলেন আমরা অন্য হাসপাতালে যাই। দশটার দিকে জানানো হলো স্যার স্কয়্যারেই আউটডোরের রুগী দেখেন। সেখানে গিয়ে অনুরোধ করেন। সেখানে যেতেই জানলাম উনি রাউন্ডে বেরিয়েছেন। বো টাই লাগানো ফিটফাট ডাক্তারটি বললেন যে তার অপারেশন লাগবে হাড়ের - জটিল কিছু না তবে ইলেকট্রোলাইট ইম্ব্যালেন্স আছে শরীরে সেটা ঠিক করতে বেশ কয়েকদিন লাগবে। আর শরীরে রক্ত কম (মাথা কেটে অনেক রক্ত ঝড়েছিল) তাই রক্ত দেয়া লাগবে।

তিনি কিডনি, মেডিসিন ইত্যাদি বেশ কিছু কনসালট্যান্টকে রেফার করে বললেন ওনারা রুগীকে তৈরি করে দিলেই আমি অপারেশন করব। এরপর শুরু হল বিভিন্ন ডাক্তারের আগমন এবং আমাদের রোগের ইতিহাস বারংবার বর্ণনা করার নাটক।

১) : ওনার ডায়বেটিস কবে থেকে?
: ওনার তো ডায়াবেটিস নেই।
: কিন্তু ফাস্টিং গ্লুকোজ ১৪ কেন? শেষ কবে করিয়েছেন টেস্ট?
: এইতো মাস দুয়েক আগে। কেন বেশি সেতো আপনি ভাল বলতে পারবেন (ওনাকে গ্লুকোজ স্যালাইন দেয়া হয়েছিল)।

২) : ওনার কিডনির সমস্যার জন্যে কোন ঔষধ খাচ্ছেন কি?
: কিডনির সমস্যা?
: হ্যা জানেন না? ক্রিটেনিন লেভেল খুব হাই। কিডনির টেস্ট শেষ কবে করিয়েছিলেন?
: ওনার হাইপার টেনশন ছাড়া আর কোন বড় অসুখ নেই।

লক্ষ্য করা হল যে বেশীরভাগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তারই নির্দিষ্ট কোন নির্দেশনা দেয় না - মূল অর্থপেডিক্স এর ডাক্তারের কাছে উপদেশ হিসেবে পেশ করে। এরপর সেটার প্রতিফলন হয় উনি যখন পরদিন তার রাউন্ডে আসে তখন। ইতিমধ্যে ওনার শ্বাস নিতে অসুবিধাটি বাড়ে এবং অক্সিজেন দেয়া হয়। আমাদের ক্রনিক অর্গান ফেইলিউর ইত্যাদি গালভরা শব্দ দিয়ে ভয় ও দেখানো হয়। আমরা তখন এক চেনা অর্থোপেডিক্সের ডাক্তারের শরণাপন্ন হই যার পরামর্শে পপুলার হাসপাতালে ওনাকে স্থানান্তর করি।

রক্তদান পর্ব:

রক্তের জন্যে ফেসবুকে আবেদন করেছিলাম। কিছু সাড়াও পেয়েছি। পরে আত্মীয়ের মধ্যে থেকে দুইজন এগিয়ে আসেন। স্কয়্যার আবার দাতাদের (উচ্চমূল্যের) ১৮টি টেস্ট করে ম্যাচিং করিয়েই রক্ত দেয়া অনুমোদন করে - নাহলে তাদের ব্লাড ব্যাংক থেকে বিক্রি করে। আমাদের প্রথম রক্তদাতা ত্রিশ বছরের একজন যুবক - রক্তদানের পরের দিন তার হাতে লম্বা করে কালশিরা পরে গেল। আমরা যারপরনাই বিব্রত হলাম এবং জানলাম যে রক্ত ওরা নেয় একটি মেশিনের মাধ্যমে - যেটিতে অ্যালার্ম বাজার পরও কোন অ্যাটেন্ডেন্ট ছিল না বলে রক্ত ব্যাগ থেকে উপচে পুনরায় শরীরে গিয়ে এমন হতে পারে।

 আইসিইউ পর্ব:

পপুলারে আসার পর দিন যানা যায় যে ওনার নিউমোনিয়া হয়েছে এবং খুব সম্ভবত এটি হসপিটাল অ্যাকোয়ার্ড নিউমোনিয়া - অর্থ্যাৎ স্কয়্যার থেকেই হয়েছে রুগীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বিপর্যস্ত থাকার কারনে (অথচ সেখানকার ডাক্তাররা সেটা ধরতে পারে নি)। ওনার শ্বাস কষ্ট বাড়লে তাকে ১৩ তারিখ আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে আবার একগাদা টেস্ট করা হয় এবং বলা হয় ওনার হয়েছে প্রাণঘাতি এআরডিএস (অ্যাকোয়ার্ড রেস্পিটরী ডিসট্রেস সিনড্রোম) যেটি বেশ কিছু কারনেই হতে পারে। রুগীর ইলেক্ট্রোলাইটের সমস্যা কেটে গিয়ে শরীরের অবস্থা কিছুটা ভাল হলেও ফুসফুসের অবস্থা ও অক্সিজেন ডিপেন্ডেন্সি অপরিবর্তিত থাকে। এই অবস্থায় অ্যানেস্থেসিস্ট অস্ত্রোপচারে রাজী না হলে ভাঙ্গা পায়ের চিকিৎসা আরও অনিশ্চিত হয়ে যায়।

১৫ তারিখে তার সিটি স্ক্যানের রিপোর্ট আসে এবং বলা হয় যে টিউমার জাতীয় কিছু দেখা গেছে তার ফুসফুসে এবং ক্যান্সার কিনা নিশ্চিত করার জন্যে বায়োপসী আর ব্রন্কোস্কপি করা লাগবে।

আমরা সবাই ভেঙ্গে পড়ি - এবং মনে হয় নির্দিষ্টভাবে রোগ নির্ধারণের আগে এরকম বলাটা মূল শোষক সিস্টেমেরই একটি অংশ। আমরা বিদেশে অবস্থানরত এক আত্মীয় ক্যান্সার বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হই। তিনি বলেন যে যদি তার ক্যান্সার হয়েও থাকে এখন এই শারীরিক অবস্থায় কোন চিকিৎসা দেয়া যাবে না। ডাক্তারদের উচিৎ তার ফুসফুসের সমস্যা নির্মূল করে আইসিইউ থেকে বের করে আনা এবং পরে ক্যান্সার নির্ধারনের পদক্ষেপ নেয়া।

 জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জাম পর্ব:

ইতিমধ্যে এক বিশেষজ্ঞ ডাক্তার মতামত দেন যে রুগীর সচেতনতা আছে বলে আইসিইউতে রাখা ঠিক হচ্ছে না - তাকে হাই কেয়ার বা সেরকম ইউনিটে রাখা উচিৎ। কারন আইসিউতে ঢোকা রুগীদের মধ্যে বাঁচার চান্স ৫০:৫০ এবং প্রতিদিনই কেউ না কেউ মারা যাচ্ছে। এটি রুগীর উপর প্রভাব ফেলে এবং সত্যিকার অর্থেই মাও হাল ছেড়ে দেয় এই সময়। তবুও তাকে ব্যয়বহুল আইসিইউতেই রাখা হয় এবং অবস্থা দিনে দিনে খারাপ হতে থাকে এবং শরীর থেকে পর্যাপ্ত কার্বন ডাই অক্সাইড বের করতে পারছিলেন না তিনি। বিশেষজ্ঞ ডাক্তার তখন লাইফ সাপোর্টের কথা বললেও পপুলারের ডিউটি ডাক্তাররা উপদেশ দেন যে বাইপ্যাপ মেশিন নামে একটি মেশিন আছে যেটির মাধ্যমে নল না ঢুকিয়ে এই অবস্থার উন্নতি ঘটানো সম্ভব। সেটি ভাড়ায় যোগাড় করা হত নাকি আগে। তবে আমাদের এই দরকারের সময়ে সেটি পাওয়া সম্ভব হয় না।

তখন আমাদের কাছে হাসপাতালের প্রশাসন থেকে অদ্ভুত এক উপদেশ আসে। যেহেতু হাসপাতাল যোগাড় করতে পারছে না - আমরা মেশিনটি কিনে দিতে পারি। মেশিনটির মূল্য ২লাখ থেকে আড়াই লাখের মধ্যে। আমার আর কোন অনুভূতি তখন কাজ করে না। আমাদের আত্মীয় ডাক্তারটি সুদুর বিদেশ থেকে চিৎকার করে বলে তোরা কোথায় গেছিস? বের হ ওখান থেকে - জীবনরক্ষাকারী যন্ত্রপাতি নেই আবার কোন মুখে রুগীকে কিনতে বলে। আমরা লজ্জা - আত্মসম্মানের মাথা খেয়ে হাসপাতালকে পুনরায় অনুরোধ করি কোথাও থেকে যোগাড় করতে -কারন রুগীকে এই অবস্থায় নড়াতে চাচ্ছিলাম না। পরদিন সন্ধ্যায় অবশেষে মেশিনটি আসে কিন্তু ততক্ষণে মার অবস্থা আরও অবনতির দিকে - তাকে লাইফ সাপোর্ট সিস্টেমে দিয়ে দেয়া হয়।

 ডাক্তারদের নৈতিকতা পর্ব:

ওনাকে লাইফ সাপোর্টে দেবার আগেই আমরা একটি মেডিকেল বোর্ড বসানোর কথা বলেছিলাম। আমরা দুজনের নাম প্রস্তাব করি এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও কয়েকজনের কথা বলে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় যে তাদের অধিকাংশই বোর্ডে আসতে রাজী হয় না। এদের একজনকে ব্যক্তিগত অনুরোধ করলে তিনি জানান যে তিনি বোর্ডে আসতে না পারলেও একবার এসে রোগী দেখে যাবেন। নিশ্চয়ই ৫ মিনিটে এক হাজার টাকা উপার্জন আর আধা ঘন্টায় দুই হাজার টাকা আয়ের মধ্যে ফারাক আছে।

অবশেষে মাকে ল্যাব এইডে নেয়া হয় - মূলত উন্নত যন্ত্রপাতি ও চিকিৎসার আশায়। সেখানে অবশেষে মেডিক্যাল বোর্ড আজ বসে এবং আমি ডাক্তার প্রতি ২ হাজার টাকা করে হাতে নিয়ে বাইরে দাড়িয়ে থাকি। এটা নাকি হাসপাতালের নিয়ম যে বাইরে থেকে ডাক্তার আসলে সেই বিল হাসপাতালের মূল বিলের সাথে যোগ হবে না - রুগী ক্যাশে আলাদা দেবে। এর সাথে আয়কর ফাঁকি বা অন্য কিছুর সম্পর্ক আছে কিনা জানি না তবে আমার বুদ্ধিতে কুলোয় না। আমি এই সিস্টেমের কাছে নিজেকে সঁপে দিয়েছি। এনারা সিদ্ধান্ত দিয়েছেন সিটি গা্ইডেড বায়োপসী আর ব্রন্কোস্কপী করা হবে কারন তারা বুঝতে পারছেন না রুগীর নিউমোনিয়া, যক্ষা না ক্যান্সার। সেই অনুযায়ী পরবর্তী চিকিৎসা হবে।

না মাসে পাঁচ লাখ টাকা বেতনের এইসব ডাক্তারের কাছে বাস্তব জগৎটি ধরা পরে না। চোখের সামনে দেখা অ্যাক্সিডেন্টের পর আইসিউতে লাইফ সাপোর্টে থাকা সিটি কর্পোরেশনের এক ময়লার ট্রাক ড্রাইভারের আত্মীয়দের কথোপকথন:

: রুগীর অবস্থা কিরকম?
: ভাল না, বাঁচার চান্স খুবই কম।
: ওনার গলার থিকা নল কবে খুলবেন?
: এটা খুললেতো উনি নিজে শ্বাস নিতে পারবেন না মারা যাবেন। রাখতে হবে।
: শুনছি যে অনেক খরচ।
: হ্যা লাইফ সাপোর্টে থাকলে ৪০০০০-৫০০০০ টাকা খরচ হয় প্রতিদিন।
: তাইলে তো পারুম না।
: এইটা আপনাদের সিদ্ধান্ত।

কয়েক ঘন্টা পরে:
: আমাদের রুগীকে ছাড়বেন কবে।
: এরকম করেন কেন? রুগী মরতেও তো সময় লাগে।

 প্রতিকার কোথায়:

সময় এসেছে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে ভাববার। জীবনের, স্বজনের প্রতি আমাদের ভালবাসা, দায়িত্ববোধ ও অনুরাগের সুযোগ নিয়ে মানুষের সারা জীবনের সঞ্চয় নিয়ে ছিনিমিনি খেলার জন্যে এক শ্রেণীর স্বাস্থ্য বেনিয়া তৎপর। সরকারী স্বাস্থ্য সেবা সেই শূন্যস্থান পুরণের মত অবস্থায় নেই। প্রতিবেশী ভারতে হেল্থ ইনস্যুরেন্সের চল বাড়ছে বিজ্ঞাপনে দেখলাম। আমাদের দেশে হেল্থ ইন্স্যুরেন্স কই?

আমার শাশুড়ীকে লাইফ সাপোর্টে দেবার পর উনি কথা বলতে পারেন না আর। কিন্তু ইশারায় অনেক বলেন। যেমন ল্যাব এইডে স্থানান্তর করার আগে উনি হাত জোড় করে কাকুতি মিনতি করছিলেন ওনাকে বাসায় নিয়ে যেতে। হাত গালে দিয়ে দেখালেন যে উনি একটু শুতে চান। ওনাকে আশ্বাস দিয়েছিলাম ওখান থেকে নিয়ে যাব। কিন্তু নিয়ে তুললাম মুদ্রার ওপিঠ আরেকটি হাসপাতালে। এখন তিনি অভিমানে ফ্যালফ্যাল করে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে থাকেন। আর অনুভুতি শুন্য আমরা আমাদের মাকে এইসব বেনিয়াদের হাতে ফেলে রেখে দায়িত্ব পালন করি। খাই দাই অফিস করি। ভেবেও দেখি না - ওই বেডে আমিও একদিন হয়ত থাকব এমনই ফ্যালফ্যালে দৃষ্টিতে তাকিয়ে।

সচলায়তনে প্রকাশিত

Thursday, December 23, 2010

আমাকে শুদ্ধ করতে চাও কে গো তোমরা?

পৃথিবীর যাবতীয় অনাচারের অধিকাংশ হয়েছে আত্মগরিমা ও নিজের মতবাদ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। অনেকে মনে করেছে তাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ কোন জাতি নেই তাই তাদেরই দেশ দখল করে বিশ্ব শাসন করা উচিত। আবার অনেকে মনে করেছে তাদের মত মানবতাবাদী (?) বিশ্বে বিরল তাই তারা তাদের মানবতাবাদ বিশ্বে প্রতিষ্ঠা করেই ছাড়বে। কেউ কেউ মনে করে তারাই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধর্মের ধারণকারী, কাজেই অন্যদের নীচু করে দেখে তাদের দাব ...পৃথিবীর যাবতীয় অনাচারের অধিকাংশ হয়েছে আত্মগরিমা ও নিজের মতবাদ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। অনেকে মনে করেছে তাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ কোন জাতি নেই তাই তাদেরই দেশ দখল করে বিশ্ব শাসন করা উচিত। আবার অনেকে মনে করেছে তাদের মত মানবতাবাদী (?) বিশ্বে বিরল তাই তারা তাদের মানবতাবাদ বিশ্বে প্রতিষ্ঠা করেই ছাড়বে। কেউ কেউ মনে করে তারাই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধর্মের ধারণকারী, কাজেই অন্যদের নীচু করে দেখে তাদের দাবিয়ে রাখাটাই জায়েজ। এদের রোষানলে পরে সব সময়ই নির্যাতিত হচ্ছে সংখ্যালঘুরা, নির্মম ভাবে।

এই ২০১০ সালে আমি বিশ্বের বুকে এমনই এক অনাচারের বিস্তার দেখে স্তম্ভিত। কারেক্টিভ রেপ বা শোধক ধর্ষণ নামে একটি প্রথা চালু হয়েছে একবিংশ শতকে যা দক্ষিণ আফ্রিকায় অনাচারের পাহাড় তৈরি করছে। সমকামী নারীদের ধর্ষণ করলেই তারা শুদ্ধ সম্ভোগের স্বাদ পাবে এবং পরিশুদ্ধ হয়ে সাধারণ যৌন জীবন যাপন করবে এমন ধারণা একদল লোকের। তাদের মতে এইসব সমকামীদের সত্যিকারের  আফ্রিকার নারী বানানোর এই সুযোগ।

এক  রিপোর্ট জানাচ্ছে যে ওয়েস্টার্ন কেপের ৮৬ ভাগ সমকামী নারী ধর্ষণের ভয়ে ভীত।  এই ধরণের আক্রমণের শিকার দক্ষিণ আফ্রিকার মহিলা ফুটবল দলের তারকা ইউডি যাকে ২০০৯ সালে গণধর্ষণের পর মেরে ফেলা হয়।

প্রতি বছর দক্ষিণ আফ্রিকায় ৫০০র ও বেশী সমকামী মহিলা শোধক ধর্ষণের শিকার হচ্ছে এবং ৩০ জনকে মেরে পর্যন্ত ফেলা হচ্ছে। সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকার বিচার ব্যবস্থা এই শোধক ধর্ষণকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে স্বীকার করে না। ফলে এইসব ধর্ষণকারী স্বল্প জরিমানা দিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে।

দক্ষিণ আফ্রিকায় ধর্ষণের জন্যে পুরুষদের এমন অজুহাতের কমতি নেই। নেলসন ম্যান্ডেলার দেশের কতিপয় লোকেরা জিম্বাবুয়ে থেকে পলায়নরত উদ্বাস্তুদের ধর্ষণ করতেও পিছপা হয় না। হায়, কে কাকে শোধরাতে আসে!

বুসিসিওয়ে সিগাসা নামে দক্ষিণ আফ্রিকার একজন কবি আর ব্লগার ধর্ষিত হওয়ার ছয় মাস পরে ২০০৬ সালের এপ্রিল মাসে জানতে পারেন যে তার দেহে এইচআইভি ভাইরাস ঢুকেছে।

এখানে রয়েছে তার দু:খের কাহিনীর কিয়দংশ, যা তিনি তার ব্লগ মাই রিয়ালিটিজ এ লিখেছেন:
 বেশী দিন হয়নি জানতে পারলাম যে আমি এইচআইভি তে আক্রান্ত। আমি অনেক বেশীবার আক্রান্ত আর ধর্ষিত হয়েছি যার ফলে এই ভাইরাসে আমি আক্রান্ত হয়েছি। কারণ হল যে আমি একজন নারী যে নিজেকে সমকামী বলি একজন মহিলার সাথে আমার সম্পর্কের কারনে। আমাকে আক্রমণকারী আর বিভিন্ন ধর্ষক পুরুষরা এমন করেছে আমাকে বোঝানোর জন্য যে নারী হওয়ার আসল মানে কি।
বুসি এই সুন্দর পৃথিবীতে বাঁচতে পারেন নি যেহেতু তিনি ২০০৭ সালের মার্চ মাসে রোগে ভুগে মারা যান । কিন্তু তার ব্লগ আর কবিতা তার জীবনের প্রতি এই অবিচারের শক্তিশালী প্রমাণ হিসেবে রয়ে গেছে।

জুলুমের শিকার এইসব নারীদের কথা  লিপিবদ্ধ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তাদের ছবি নিয়ে প্রদর্শনী হচ্ছে। আন্তর্জাতিকভাবে দক্ষিণ আফ্রিকার সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার জন্যে। আপনারা চাইলে চেন্জ.অর্গের এই পিটিশনটি সাইন করতে পারেন।

 বুসির ছবি জানেলে মুহলি আর এলেন আইজেনমানের সৌজন্যে

সচলায়তনে প্রকাশিত

Thursday, November 04, 2010

বাড়ি ফেরা

ঢাকায় ফিরেছি দুই সপ্তাহ আগে। বাবা-মার অসুস্থতার জন্যে দেশে ফেরার তাগিদ ছিল। গত জুনেই এ কারনে ঘুরে গেছি। এবারে একেবারেই ফিরেছি - তাই বেশ প্রশান্তি মনে। তার জন্যে সাহায্য করেছে নিয়তি। জুলাই মাসে আবেদন করেছিলাম ঢাকায় একটি চাকুরির জন্যে। সেটিই ত্বরান্বিত করল বাকি সবকিছু। প্রকল্পটি স্বল্প মেয়াদের কাজেই কয়েক মাস পরেই আবার চাকুরি অনিশ্চিত। কিন্তু সেটি কোন ব্যাপারই নয় আমার জন্যে। আমার দরকার ছিল একটি অজুহাত, ফেরার জন্যে।

এই ফেরাটা কেমন হল? বাড়ি ফেরার মধ্যে আলাদা একধরনের ভালোলাগা কাজ করে। কারও হয়ত প্রতিদিন বাড়ি ফিরতে ভাল লাগে। কারও হয়ত কয়েক মাস বা কয়েক বছর পর। আমি এত হিসাব কষি না। বাইরে থাকলে কখনই সেখানকার বসত বাড়িকে নিজের বাড়ি মনে হত না।

মানুষ একজীবনে সব অসম্পূর্ণতা ধুয়ে মুছে ফেলতে চায়। কিন্তু কালে সেই অসম্পূর্ণতাগুলো জীবনেরই অঙ্গ হয়ে যায়। বাড়ি ফেরা মানে হচ্ছে চেনা জীবনের সেই অসঙ্গতির মধ্যে ফিরে যাওয়া - সেই লোড শেডিং সেই ট্রাফিক। আর কিছু উপরি পাওনা আছে - মায়ের হাতের রান্না ঝোলের স্বাদ পুনরায় আয়েশ করে পাওয়া।

ঢাকা বদলেছে অনেক - লোক বেড়েছে - খাম্বায় তার বেড়েছে - অসহিষ্ণুতা বেড়েছে। আর বেড়েছে দ্রব্য মূল্য - রিক্সায় উঠেই দশ টাকা, সিএনজি একশ টাকা, ভিক্ষা পাঁচ টাকা। মানুষের বেতন কি বেড়েছে এই জ্যামিতিক হারে? চারিদিকে টাকা আয়ের জন্যে হাহাকার।

আমার বড় চাচার বড় ছেলে বিদ্যুৎ বিভাগের বিভাগীয় প্রকৌশলী, চাকুরির বয়স শেষ হল প্রায়। গেলবার হজ্ব করেছেন তাই দাড়ি রেখেছেন। তিনি ঘুষ খান না তাই তার শত্রু অনেক। এবার তার চাকুরি খাবার জোড় তদবির করছে সহকর্মীরা তিনি জামাতের লোক এই অপবাদ দিয়ে। প্রকারান্তরে জামাতের অবস্থানই মজবুত করছে এইসব স্বার্থান্বেষী অর্বাচীনরা।

প্রতিদিন অফিসে যাওয়ার সময় ঘন্টাখানেক সিএনজিতে জ্যামে বসে থাকি। মোবাইল ইন্টারনেটের কল্যানে ফেসবুক দেখি, এটা ওটা করি। আর ভাবি জাকার্তা/বার্লিনের মত যদি ওভারপাস আন্ডারপাস হত তাহলে ২০ মিনিটে অফিস পৌছানো যেত। বাস্তবতা এই যে এই অসঙ্গতি গুলো নিয়েই বেঁচে থাকতে হবে। তার পরেও বাড়ি ফেরার মধ্যে আনন্দ আছে।

সেই আনন্দ নিয়েই এখন ঘুমাতে যাচ্ছি। শুভরাত্রি।

ছবির জন্যে কৃতজ্ঞতা: ময়ান ব্রেন

সচলায়তনে প্রকাশিত

Thursday, September 16, 2010

যেই লোকটি মাইকেল রকেফেলারকে খেয়ে ফেলেছিল

হ্যা, আঁতকে ওঠার মতই এই শিরোনামটি। 'দ্যা ম্যান হু এইট মাইকেল রকেফেলার' হচ্ছে জেফ কোহেন পরিচালিত নিউ ইয়র্কের অফ ব্রডওয়ের সাম্প্রতিক মঞ্চায়িত একটি (সেপ্টেম্বর ১০ -অক্টোবর ৩, ২০১০) নাটকের নাম যা ক্রিস্টোফার স্টোকসের একই শিরোনামে একটি ছোট গল্প অবলম্বনে রচিত।

এখন স্বভাবতই মনে প্রশ্ন জাগবে এই মাইকেল রকেফেলার কে। কোন সাধারণ মানুষ হলে এত মনোযোগ পেতেন না যতটুকু মাইকেল রকফেলার পেয়েছেন ১৯৬১ সালে তৎকালীন নিউ গিনিতে তার অন্তর্ধানের পরে। ১৯৩৮ সালে নিউ ইয়র্কে জন্ম নেয়া মাইকেল তৎকালীন নিউইয়র্কের মেয়র এবং পরবর্তী আমেরিকান ভাইস প্রেসিডেন্ট নেলসন অলড্রিচ রকেফেলারের  ছেলে।

আজকের দিনে যেমন  বিল গেটস বা আম্বানি পরিবারের সম্পদ ও সাম্রাজ্যের কথা আমাদের মুখে মুখে সেরকমই আমেরিকার রকেফেলার পরিবারের  নামের পরিচিতি উনবিংশ শতাব্দি শেষ ভাগ থেকে বিশ্বব্যাপী রয়েছে। জন ডি রকেফেলার অবশ্য দানেও সুপরিচিত ছিলেন –- শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় তারই অর্থে তৈরি এবং তিনি প্রায় ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার দান করছেন শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং শিশুদের কল্যাণে (১৯২৫ সালের ৫০০ মিলিয়ন মানে বর্তমানে ৫ বিলিয়ন ডলার)। তাদের পরিবারেরই সন্তান নেলসন ডি রকেফেলার ১৯৫৮ সালে নিউ ইয়র্কের গভর্নর হন। তিনি তিন বার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্যে দাড়িয়ে ১৯৭৪ সালে ভাইস প্রেসিডেন্ট হন।

ছবি: কলেজে মাইকেল

মাইকেলের বেড়ে ওঠা ছিল শান শওকতের মধ্যে - খেদমতে ছিল প্রচুর কাজের লোক। সেরা স্কুল, ইউরোপে ছুটি কাটাতে যাওয়া এবং আমেরিকা ও ল্যাটিন আমেরিকায় রকফেলার ম্যানসনগুলিতে ভ্রমণ - এগুলো তার জন্যে ছিল নস্যি। মাইকেলের গ্রাজুয়েশন হয় ১৯৬০ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজী সাহিত্যে এবং তার পরিবারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যোগ দেয়াই তার অবধারিত নিয়তি ছিল।

কিন্তু একটু পড়ুয়া টাইপের (তার চোখের চশমার জন্যে) মাইকেল বখে যান নি এবং তার ধনের গর্ব ছিল না। তিনি তার প্রচলিত জীবনধারার বাইরে অভিজ্ঞতা লাভের জন্যে পুয়ের্টোরিকোতে এক গ্রীষ্মের ছুটি কাটান মুদি দোকানে কাজ করেন এবং ভেনেজুয়েলাতে তাদের পরিবারের র‍্যান্চে রাখালের কাজ করেছেন। নতুন যায়গা, মানুষ ও বিষয়ের প্রতি তার আগ্রহ ছিল। এবং সেই আগ্রহ মেটাতে নিয়তির খেলায় মাত্র তেইশ বছর বয়সে নিউ গিনির জঙ্গলে তিনি অন্তর্ধান হন।


View Larger Map

আজও পর্যন্ত নিউ গিনিকে বেশ রহস্যভরা এলাকা হিসেবে সুবিদিত। গত শতাব্দী জুড়ে ইংরেজ এবং ওলন্দাজ মিশনারীরা সেখানকার জংলী আদিবাসীদের ভালভাবে বোঝার চেষ্টা করেছেন এবং সভ্য জগৎে ফিরে এসে তাদের ছিন্নমস্তক এবং মানুষের মাংস খাবার গল্প ছড়িয়ে বিশ্বব্যাপী মনযোগ আকর্ষণ করেছেন। এই সব জংলীরা বাস করতেন ঘন জঙ্গলে - মাইলের পর মাইল ভেতরে। ওখানে কম সভ্য লোকই যেতে পারত বলে তাদের এইসব মানুষখেকো আদিম আচার তখনও চলছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সেখানে নৃতত্ত্ববিদদের বেশ কটি অভিযান চালিত হয় এবং ঘটনাক্রমে মাইকেল ১৯৬১ সালে সেরকম একটি অভিযানে অংশ নিয়ে পাপুয়া নিউ গিনি আসে।

হার্ভার্ডের গ্রাজুয়েশন শেষে ৬ মাস বাধ্যতামূলক সামরিক ট্রেইনিং এর পরে বাবার ব্যাক্তিগত আর্টের সংগ্রহশালার জন্যে শিল্পকর্ম সংগ্রহ করার জন্যে তার দক্ষিণ আমেরিকার আন্দেজ অঞ্চলে যাবার কথা ছিল। কিন্তু তার রুমমেটের কাছে শুনতে পান যে রবার্ট গার্ডনার নামে হার্ভার্ডের একজন তরুণ প্রফেসর বিশ্ববিদ্যালয়ের জাদুঘরের হয়ে নিউ গিনিতে একটি নৃতাত্বিক অভিযানে যাবেন। ঠিক হল যে রকফেলার নিজ খরচে অভিযানে যোগ দেবেন এবং রবার্টের ডকুমেন্টারি দলে সাউন্ড রেকর্ডার এবং ফটোগ্রাফারের কাজ করবেন।

তারা তৎকালীন ডাচ নিয়ন্ত্রিত নিউ গিনিতে (বর্তমানে দ্বীপটির এক অংশ ইন্দোনেশিয়ার এবং আরেক অংশ স্বাধীন পাপুয়া নিউ গিনি) এসে বালিয়েম উপত্যকার এনদানি আদিবাসীদের উপর একটি ডকুমেন্টারি তৈরি করা শুরু করেন। এই অভিযানের ছবিতে দেখা যায় মুখভর্তি দাড়ি ও খাকি প্যান্ট পড়া মাইকেল আদিবাসীদের সাথে কথা বলছেন ও তাদের ছবি তুলছেন। এই অভিযানে মাইকেল আসমাত আদিবাসীদের (বর্তমানে ইন্দোনেশিয়ার অধীনে পাপুয়ার একদল জংলী)সম্পর্কে শোনেন এবং তাদের কাঠের কাজ, মস্তকের খুলিতে কাজ ইত্যাদি সংগ্রহ করতে আগ্রহী হন।

১৯৬১ সালের জুন মাসে তিনি মূল অভিযান থেকে আলাদা হয়ে আসমাতদের সন্ধানে যান। তিনি স্টিলের কুঠার আর সিগারেট এর বদলে এগুলোর কয়েকটি নমুনা যোগাড় করেন এবং বিস পোল (৩০ ফুট লম্বা কাঠের কারুকার্যখচিত পোল) এবং কাঠের ক্যানো (নৌকা) সংগ্রহ করতে মনস্থ করেন। রকফেলার তার ডায়রিতে লেখেন আসমাত আদিবাসী সম্পর্কে: “এইসব শিল্পের মতই আশ্চর্যজনক হচ্ছে তাদের আচার ও রীতি যা এখনও আদিম রয়ে গেছে। পাঁচ বছর আগেও এরা সবাই হেডহান্টিং(ছিন্নমস্তক সংগ্রহ) করত। কিছু গহীন এলাকায় এখনও তারা তা করে।” তবে উদ্ধত ও বিপদজনক আসমাতদের সাথে সমস্যা হওয়ায় তিনি আবার মূল অভিযানে ফিরে যান জুলাই মাসে। সেপ্টেম্বর মাসে তারা সবাই আমেরিকা ফিরে যান।

বাড়িতে ফিরে মাইকেল শোনেন যে তার বাবা-মার বিবাহ বিচ্ছেদ হচ্ছে এবং তার মন ভারাক্রান্ত হয়। তিনি আবার নিউ গিনি ফিরে যেতে মনস্থ করেন এবং সেই অভিযানের জন্যে যোগাড়-যন্তর শুরু করেন। এর জন্যে সরকারী অনুমোদনের দরকার ছিল – তবে তার পিতা ক্ষমতার জোরে সহজেই মার্কিন ও ডাচ সরকারের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় অনুমতি সংগ্রহ করে দেন। দু সপ্তাহ বাড়ি থেকেই তিনি সেপ্টেম্বরেই আবার পাপুয়া নিউ গিনি ফিরে যান।

তিনি প্রথমে থামেন উত্তরের উপকুলের হলান্ডিয়াতে (তখনকার ডাচ কলোনির রাজধানী) এবং ডাচ সরকারকে বলেন একজন গাইড জোগাড় করতে। ঠিক হয় ডাচ ব্যুরো অফ নেটিভ অ্যাফেয়ার্সের রেনে ওয়াসিন্ক যাবে তার সাথে। এটি একটি অবিবেচক সিদ্ধান্ত ছিল কারন রেনে একজন নৃতত্ববিদ ছিলেন – অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বুশম্যান নয়। তারা ৩০ ফুট লম্বা একটি মোটর চালিত ক্যানু (নৌকা) কেনেন এবং অক্টোবরের মাঝামাঝি আসমাতদের লোকালয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যান। তারা ডজনের ও বেশী আসমাত গ্রামে যান এবং ডাচ মিশনারীদের সহায়তায় তাদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেন। তিনি আরও আদিবাসী শিল্পকর্ম যোগাড় করেন এবং এবং ছিন্ন মস্তকের জন্যে ১০টি কুঠার দেবেন বলে ঘোষণা দেন যা পরে ডাচ সরকারী কর্মকর্তা কর্তৃক সমালোচিত হয় (কারণ এটি আদিবাসীদের মানুষ হত্যা করতে উদ্বুদ্ধ করবে)।

ছবিতে: রেনে ওয়াসিন্ক
এই অভিযানে তার খুব কষ্ট হলেও বিরল শিল্প কর্ম সংগ্রহের লক্ষ্যে তিনি তা চালিয়ে নিতে থাকেন। ১৯৬১ সালের নভেম্বরের ১৮ তারিখে তারা আইলান্ডেন নদী দিয়ে যাচ্ছিলেন যা আরাফুরা সাগরে এসে মিশেছে। সাগরের বিস্তীর্ণ মোহনায় এসে জোড়াল স্রোতের তোড়ে তাদের নৌকায় পানি ঢোকে ও তা উল্টিয়ে যায়। তাদের সাথের আদিবাসী দুই বালক পেট্রোলের জেরিকেনের তেল ফেলে সেটাকে লাইফবয় করে সাহায্যের জন্যে কুলের সন্ধানে ছুটে যায়। মাইকেল ও রেনে উল্টানো নৌকা ধরে ভাসতে থাকেন খরস্রোতা নদীর মোহনায়। স্রোত নৌকাটাকে এবং সাথে সাথে মাইকেল ও রেনেকেও সাগরের দিকে টেনে নিতে থাকে। তাদের আশা ছিল সাহায্য আসবে সহসাই – এবং এই আশায় একটি রাত ভেসে কাটায় তারা। ভোর পাঁচটার দিকে তারা তীরের দেখা পায় এবং আন্দাজ করে ৪ থেকে ৭ মাইল দুরে তা হবে। তারা নৌকার কাঠ ভেঙ্গে দাড় বাইতে চেষ্টা করে উল্টানো নৌকার দিক পরিবর্তনের জন্যে। কিন্তু ব্যর্থ হয়। তারা ক্রমশই সমুদ্রের দিকে ভেসে যাচ্ছে দেখে মাইকেল সাঁতরে কুলের দিকে যাবার সিদ্ধান্ত নেয়। রেনে তাকে বোঝাবার ব্যর্থ চেষ্টা করে এবং শেষে বলে “মাইকেল তুমি পাগল হয়ে গেছ”। রেনে সাঁতার ভাল মত পারেন না তাই বোটের কাছে থেকে গেলেন।

সেই আদিবাসী ছেলে দুটি পাঁচ ঘন্টা সাঁতরে তীরে পৌঁছে খবরটি দেয় যে মাইকেল ও রেনে বিপদে পড়েছে। পরদিন সকালে ডাচ সরকার ১২টি নৌকা ও সার্চ প্লেন সহকারে উদ্ধার টিম পাঠায়। নভেম্বরের ১৯ তারিখ বিকেলে রয়্যাল ডাচ নেভি রেনেকে সাগর থেকে উদ্ধার করে।

মাইকেলের বাবা তৎকালীন নিউ ইয়র্কের গভর্নর ও পরবর্তীকালে আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট নেলসন রকেফেলার
খবর পেয়ে গভর্নর নেলসন রকেফেলার পাপুয়া ছুটে আসেন। তার উদ্যোগে আরও দশদিন সার্চ অব্যাহত থাকে, কিন্তু মাইকেলের দেখা মেলে না।

রেনে মনে করেন যে মাইকেল ভাটার সময় সাঁতরে কুলে যেতে পারেন নি। তবে মাইকলের বাবার গুরুত্ব বিবেচনা করে এরপর সংবাদপত্র বিভিন্ন ধরনের চটকদার সংবাদ তৈরি করতে থাকে (হলুদ সাংবাদিকতা তখনও ছিল)। প্রথম দিকে চাউর হয় কোন কুমীর বা হাঙ্গর মাইকেলকে খেয়েছে তাই সে কুলে পৌঁছাতে পারে নি। এর পর বিভিন্ন সময় প্রত্যক্ষদর্শীর বরাত দিয়ে খবর এসেছে মাইকেলকে জঙ্গলিরা ধরে রেখেছে বা সে স্বেচ্ছায় তাদের সাথে আছে। এ জন্যে মাইকেলের পরিবার কখনই তার ফিরে আসার আশা ছাড়ে নি।

মাইকেলের এই ঘটনা নিয়ে বেশ কটি বই লেখা হয়েছে, টিভিতে ডকুমেন্টারি ও চলচ্চিত্রায়ন হয়েছে যাতে তার রহস্যময় অন্তর্ধানের বিভিন্ন ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

ছবি: সাংবাদিক মিল্ট মাখলিন
আট বছর পরে সাংবাদিক মিল্ট মাখলিন নিউ গিনিতে পৌছান মাইকেল রকেফেলারের অন্তর্ধান রহস্য তদন্ত করতে। তিনি আসমাতদের গ্রামে কাজ করা এক ডাচ মিশনারী উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন যে জঙ্গলিরা তাকে ধরে খেয়ে ফেলেছে। এই মিশনারী জানান যে মাইকেল যেখানে অদৃশ্য হয়েছে তার অনতিদুরেই পাঁচজন আসমাত লোককে ডাচ পুলিশ বছর দুই আগে হত্যা করে। তারা প্রতিশোধ নেবার জন্যে মুখিয়ে ছিল। পানিতে থাকা অবস্থায়ই জঙ্গলিরা তীর মেরে মাইকেলকে আহত করে। এর পর তাকে ডাঙ্গায় তোলা হয় এবং মাথা কেটে নেয়া হয়। তার শরীরের কিছু অংশ রেঁধে তারা খায় এবং বাকি অংশ মাটিতে পুঁতে ফেলে। দুজন আদিবাসী যোদ্ধা জানায় যে তারা একজন সাদা চামড়ার উইচ ডক্টরকে ধরে মাথা কেটে ফেলে এবং তার যাদু এখন তাদের কাছে। এদের একজন যাদু হিসেবে মাইকেলের চশমা দেখায়।

কেউ কেউ এমনও বলেছে যে ডাচ সরকার জঙ্গলি দ্বারা মাইকেলের মৃত্যুর ঘটনা লুকিয়েছে তখন কারণ এতে পর্যটক/অভিযান আসা বন্ধ হয়ে যেত।

১৯৭২ সালে প্রকাশিত মিল্ট মাখলিন এর 'দ্যা সার্চ ফর মাইকেল রকফেলার' বইটি অবলম্বনে একটি চলচ্চিত্র তৈরি হচ্ছে যা এ বছরই বের হবার কথা। ১৯৯৫ সালে ডিসকভারী চ্যানেলে মাইকেলের উপর একটি ডকুমেন্টারীতে তার পরিবারের লোকজনের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়।

পরিস্থিতি এখন অনেক বদলেছে - নিউ গিনির এক অংশ এখন ইন্দোনেশিয়ার পাপুয়া প্রদেশ এবং অপর অংশ স্বাধীন পাপুয়া নিউ গিনি। কিন্তু কিছু জিনিষ এখনও বদলায়নি। ২০০৫ সালে নিউ ইয়র্কার পত্রিকা ইন্দোনেশিয়ার পাপুয়ার ইরিন জায়াতে একটি অভিযাত্রার খবর ছাপায় যেখানে এক জঙ্গলী গোত্রের সাথে সভ্য জগৎের মানুষের প্রথম দেখা হয়। যা বোঝায় যে এই অঞ্চলের বহু এলাকা এখনও সভ্য মানুষের যোগাযোগের বাইরে।

মজার ব্যাপার হচ্ছে এই সাইটটি এ কে রকফেলারের নামে যাকে বলা হয় মাইকেল রকফেলারের মিশ্র সন্তান যে ইন্দোনেশিয়ার পাপুয়ার স্বাধীনতা আন্দোলনের সমর্থনে বিভিন্ন কর্মকান্ড করে যাচ্ছে।

মাইকেল রকেফেলারের সংগৃহীত অনেক শিল্পকর্ম এখন মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অফ আর্টস (মোমা) এর মাইকেল সি রকেফেলার কালেকশনে আছে (মাইকলের বাবা এই জাদুঘরের একজন ট্রাস্টি ছিলেন)।

ছবি এবং অন্যান্য গল্পের জন্যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি নিম্নলিখিত সাইটগুলির কাছে:

১) মাইকেল রকেফেলারের অন্তর্ধান - পাপুয়া হেরিটেজ সোসাইটি

২) মাইকেল রকেফেলার - ডেভিড ক্রাইচেক, ট্রুটিভি ক্রাইম লাইব্রেরী

আরও কিছু সহায়ক লিঙ্ক:

১) দ্যা সার্চ ফর মাইকেল রকেফেলার - আগামেমনন ফিল্মস

২) ইন্দোনেশিয়ার পাপুয়া রেইন ফরেস্টের আদিবাসীদের ছবি - যারা সভ্য জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন

৩) লিওনার্দ নিময়ের উপস্থাপনায় টিভি ডকুমেন্টারি ইউটিউবে দেখুন:

পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩

সচলায়তনে প্রকাশিত

Sunday, September 12, 2010

ফ্রি মানে মাগনা নয় - পর্ব তিন

পর্ব তিন:

ইন্টারনেটের জন্মই হয়েছিল একে অপরের সাথে তথ্য ভাগ (share) করার জন্যে। আমরা বিগত দশকে উইকিপিডিয়া, ফেসবুক, ফ্লিকার ইত্যাদি যে সব উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ দেখেছি সেগুলো কিন্তু সফল হয়েছে আমার আপনার স্বেচ্ছাসেবার ফলে বেশী পরিমাণে বিষয়বস্তু (content) তৈরীর মাধ্যমে। ইন্টারনেট সেইসব ব্যক্তির উপর ভরসা করে যারা স্বাধীন ভাবে আবেগ দিয়ে তাদের সময় এখানে ব্যয় করে। এইসব স্বেচ্ছাসেবীরা অধিকাংশই আপাত:দৃষ্টিতে বিনামূল্যে কাজ করলেও তাদের কিন্তু কিছুটা প্রাপ্তি আছে যা মূল্যে পরিমাপযোগ্য নয়। সে নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব আজকে।

ছবি ফ্লিকার থেকে লোটে গ্রোনকারের সৌজন্যে। সিসি বাই-এনসি-এসএ।

মানুষ কেন বিনামূল্যে কন্টেন্ট তৈরি করতে পছন্দ করে? এই পৃথিবীতে অনেকে আছে যারা নিজে থেকে অনেক কিছু করতে করতে চায় আপাতদৃষ্টিতে কোন লাভের আশা ছাড়াই। এটাও কিন্তু নতুন কিছু নয়। ধরুন অনেক বাঙ্গালী পছন্দ করে অন্যকে উপদেশ দিতে। ঔষধ, পথ্য থেকে শুরু করে এহেন কোন বিষয় নেই যা আমরা উপদেশ হিসেবে পাই। এগুলো কিন্তু উন্নত বিশ্বে মানুষ পেশাজীবীদের কাছ থেকে সাধারণত যোগাড় করে অথচ আমরা বিনামূল্যেই তা পাই।

বর্তমানে ইন্টারনেটের কল্যাণে পেশাজীবী উপদেশক, যেমন বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসক বা স্থপতি এদের সাথে পাল্লা দিয়ে অপেশাদার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মানুষও তাদের মতামত দিতে পারছে। ফলে বিশেষজ্ঞ অভিমতের মূল্য হঠাৎ করেই কমে গেছে। আগে রাজনীতি সম্পর্কে কলাম লিখতেন নামভারী রাজনীতিক/বুদ্ধিজীবীরা। বর্তমানে ব্লগে নাম না জানা সাধারণ নাগরিকের কাছ থেকে গভীর বিশ্লেষণ পাওয়া যায় তাও আবার বিনামূল্যে। এই সব অপেশাদারদের কি প্রণোদনা দেয় বিনে পয়সায় এই সেবা দেবার?

এই সব কাজ কিন্তু আসলে আল্ট্রু্ইজম (নি;স্বার্থ ত্যাগ) বা সাহায্য নয়। অ্যাডাম স্মিথ বলেছেন ”আলোকপ্রাপ্ত ব্যাক্তিগত ইচ্ছা মানব জীবনের সবচেয়ে শক্তিশালী সম্পদ”। আলোকপ্রাপ্ত বা সংস্কারমুক্ত ব্যাক্তিগত ইচ্ছা' বা এনলাইটেন্ড সেল্ফ ইন্টারেস্ট' নৈতিকতার নীতিবিদ্যার একটি দর্শন যা বলে যে যেসব ব্যক্তি অন্যের লাভের জন্যে কাজ করে বা অন্যকে সহায়তা করে, আদতে তার নিজের ব্যাক্তিগত ইচ্ছাই পূরণ করে। এখানে খেয়াল রাখতে হবে যে এই ব্যাক্তিগত ইচ্ছা যদি সংস্কারমুক্ত না হয় বা কুটকৌশল সমৃদ্ধ হয় তাহলে এই দর্শন কার্যকরী হবে না এবং হিতে বিপরীত হতে পারে।
মানুষ অনেক কিছুই বিনামূল্যে করে দেয় তার নিজস্ব কারণে - অনেকে মজা করার জন্যে করে, কারণ তাদের ভাল লাগে - কারণ তারা তাদের প্রতি অন্যের দৃষ্টি ফেরাতে চায় – তাদের মতামতগুলো প্রচার করতে চায় এবং চায় অন্যরা তাদের সমর্থন করুক – এছাড়াও অনেক ব্যাক্তিগত কারণ থাকে তাদের।

লেখক ক্রিস অ্যান্ডারসন তার ফ্রি বইতে এই ব্যাপারটিকে সরলীকরণ করেছেন: "মানুষের শারীরিক চাহিদা গুলো যখন মিটে যায় মানুষের জন্যে কাঙ্খিত পণ্য হয় সামাজিক মূলধন" (Social Capital) - অর্থাৎ, আমাদের পারিপার্শিক সমাজে আমাদের সুনাম, প্রভাব, প্রতিপত্তি ইত্যাদি।

২০০৭ সালে ওরাইলি মিডিয়ার লেখক অ্যান্ডি ওরাম একটি গবেষণা করেন ইন্টারনেটে ছড়িয়ে থাকা অপেশাদার কন্টেন্টগুলো নিয়ে যেগুলো বিশ্বব্যাপী ব্যাবহারকারীরা তৈরি করেছে কোন অর্থনৈতিক সুবিধা ছাড়াই। তিনি এর পরিমাণ ও উন্নত মান দেখে অবাক হন - গেমস, হার্ডওয়ার ও সফ্টওয়ারের ইনস্ট্রাকশন ম্যানুয়াল, পণ্যের রিভিউ যা বাণিজ্যিক বিক্রেতাদের সেবার সংস্করণ থেকে অনেকগুণ সমৃদ্ধ। তিনি এরপর দীর্ঘমেয়াদী একটি জরিপ করেন জানার জন্যে যে কি মানুষকে প্রণোদনা দেয় এইসব বিনামূল্যে করে দেবার।

ছবি ফ্লিকার থেকে পিট ফ্লেচ এর সৌজন্যে। সিসি বাই-এনসি-এনডি।

জরিপের ফলাফলের তালিকায় প্রথম ছিল কমিউনিটি - মানুষ এগুলো করে কমিউনিটি(তার পারিপার্শিক সমাজ) দ্বারা প্রণোদিত হয়ে, দ্বিতীয়টি হচ্ছে ব্যাক্তিগত উন্নয়ন, অর্থাৎ অনুশীলন মানুষকে উন্নত কিছু তৈরি করতে সহায়তা করে। তৃতীয় বিষয়টি হচ্ছে জ্ঞান ভাগ করে নেয়া - অনেকেরই কিছু অর্জিত জ্ঞান থাকে যা প্রয়োগের সুযোগ হয় না - তাই ইন্টারনেটের কল্যাণে তারা উপযুক্ত কমিউনিটি খুঁজে সেগুলো দ্বারা অপরকে সহায়তা করতে সচেষ্ট হয় কোনরূপ প্রতিদানের আশা না করেই। মজার বিষয় হচ্ছে - সুনাম বা খ্যাতির আকাঙ্খা এই তালিকার নীচের দিকে ছিল। আর মানুষ কিভাবে সময় পায় এগুলো করার অন্য কোন কিছু করা বাদ দিয়ে যা তাকে সেরকম সামাজিক বা মানসিক প্রশান্তি এনে দেবে না? আমার নিজের কথাই ধরুন - এক জীবনে রকের আড্ডায় অনেক সময় অহেতুক ব্যয় করেছি - এখন হয়ত ফুরসত পেলে করণীয় বেছে নিতে হলে ব্লগিংকেই বেছে নেব দুটোর মধ্যে।

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে কর্মস্থল ও অন্যান্য স্থানে আমরা যেসব কাজ করে থাকি তাতে কিন্তু আমাদের জ্ঞান ও শক্তি বা ইচ্ছার কিছু অংশ অলস ভাবে থেকে যায় – সেগুলো সম্পূর্ণ ব্যবহার করার সুযোগ হয় না। সমাজবিজ্ঞানীরা একে বলেন কগনিটিভ সারপ্লাস। আমরা সেসব ক্ষেত্র আমাদের শ্রম বিনামূল্যে দিতে পছন্দ করি যা আমাদের বলার সুযোগ, সম্মান লাভ, অন্যের মনযোগ ও পাঠকশ্রেণী এনে দিতে সাহায্য করে। সংক্ষেপে বলতে হয় এসব কাজ বিনামূল্যে করলেও আমরা এর থেকে অর্থের বিনিময়ে চাকুরির থেকে বেশী পরিমান সন্তুষ্টি লাভ করি।

আমরা ইন্টারনেটের বৃদ্ধির সাথে এই ব্যাপারটি মিলিয়ে দেখতে পারি। বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি মানুষ নতুন কিছু তৈরি করে চলেছে ইন্টারনেটে যার বদলে বেশী বা কম পরিচিতি পাচ্ছে যা হয়ত তার পূর্বের জীবন যাত্রার মাধ্যমে সম্ভব হত না। এভাবেই ফ্রি কন্টেন্টের জোয়ার বইছে।

ইন্টারনেটে স্বেচ্ছাসেবা এবং দানের অর্থনীতি (gift economy):

অনেক সময় আপনি অনেক বিনামূল্যের জিনিষ ব্যবহার করেন এবং হয়ত জানতেও পারেন না যে কিভাবে এর জন্যে আপনাকে মূল্য দিতে হচ্ছে। যেমন ধরুন বিনে পয়সার একটি ম্যাগাজিন পেলেন সেটা আসলে বিজ্ঞাপনদাতাদের কর্তৃক ভর্তুকি দেয়ার ফলে আপনি বিনামূল্যে পেয়েছেন। এই খরচটি ঐ নির্দিষ্ট পণ্যের বাজেটে ধরা আছে এবং আপনি বা অন্য কেউ যখন সেই পণ্যটি বেশী মূল্যে কিনছেন তখন ম্যাগাজিনটির দাম পরিশোধিত হয়ে যাচ্ছে। এটি একটি ত্রিমুখী মডেল যেখানে ম্যাগাজিন কোম্পানি বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে পাঠকদের বিক্রি করছে তাদের পণ্যের সম্ভাব্য ক্রেতা হিসেবে।

গিফ্ট ইকোনমি বা দানের অর্থনীতিতে এই ভর্তুকির পরিমাণ আরও সুক্ষ্ণ। আপনারা যে সচলায়তনে ব্লগ করেন -– যদিও ধরুন এখানে বিজ্ঞাপনের কারবার নেই, এর মানে এই নয় যে পাঠক আপনার ব্লগ পড়লে কোন মূল্যের স্থানান্তর হয় না। প্রতিটি পাঠক তার সময় ব্যয় করে আপনার ব্লগ পড়লে আপনার জনপ্রিয়তা বাড়ে - এবং এর পরিমাপযোগ্য অর্থনৈতিক মূল্য না থাকলেও অবশ্যই ধনাত্মক (বা ঋণাত্মক) মূল্য আছে। সচল লিলেনদার ফেসবুক স্ট্যাটাসে প্রচুর বন্ধু লাইক মারলেন এবং পরবর্তী বইমেলায় তিনি এই জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে ফেসবুক স্ট্যাটাস নিয়ে একটি বই বের করার সাহস পেলেন। তিনি অবশ্যই ব্যতিক্রম - কারণ অনেকেরই জনপ্রিয়তা ও অর্থ উপার্জন করা হয় না - এটি অবশ্য সিস্টেমের ব্যর্থতা নয়, তারা হয়ত চান না বা পারেন না।

পাওলো কোয়েলহো, ছবি উইকিমিডিয়া কমন্সের সৌজন্যে

ব্রাজিলের লেখক পাওলো কোয়েলহো তার উপন্যাস ও অন্যান্য লেখা ইন্টারনেট ব্যবহার করে বিনামূল্যে পাঠকদের দেবার পক্ষপাতি। তার অনেক উপন্যাসের পুরোটা বা কিছু অধ্যায় তিনি তার ব্লগে নিয়মিত তুলে দেন এবং পাঠকদের সাথে সে নিয়ে আলোচনায় মত্ত হন। কপিরাইটের সাধারণ ধারণা যে পাইরেসী লেখকের আয় কমায় - তার ক্ষেত্রে খাটে নি। তার একটি উপন্যাসের রাশিয়ান সংস্করণ একজন পাঠক ইন্টারনেটে তুলে দেয়। সেই উপন্যাস জনপ্রিয় হওয়ায় পরবর্তী ৩ বছরে তার সেই উপন্যাসের বিভিন্ন ভাষার সংস্করণ ১০ লাখের বেশি বিক্রি হয়। অর্থাৎ এইখানে বিনামূল্যের অর্থনীতির নতুন এক মাত্রা তৈরি হচ্ছে।

দানের অর্থনীতির আরেকটি উদাহরণ - আপনি গুগলে যখনই কোন কিছু সার্চ করেন আপনি তাদের বিজ্ঞাপন নিশানা করার মডেলকে উন্নত করার কাজে লাগেন, অর্থাৎ আপনার নিজের দরকারের একটি সার্চকে গুগুল তার লাভের জন্যে কাজে লাগায়। ফলে বিজ্ঞাপনদাতারা আরও আকর্ষিত হয় গুগলে বিজ্ঞাপন দিতে। আপনি হয়ত জানেনও না যে আপনি একটি বিনে পয়সার সেবা ব্যবহার করলেন আসলে আপনারই শ্রমের বিনিময়ে।

ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট ফ্রেড উইলসনের নামকরণকৃত ফ্রিমিয়াম মডেলটি ব্যবহার করা হয় সফ্টওয়্যারের ক্ষেত্রে। ফ্লিকারের প্রিমিয়াম ভার্সনের মূল্য বছরে ২৫ ডলার। দেখা গেছে একটি গতানুগতিক অনলাইন সাইটের ক্ষেত্রে শতকরা ৫% প্রিমিয়াম ভোক্তা বাকী ৯৫% বিনামূল্যের ভোক্তার খরচকে বহন করে। এখানে তারা সেটা পারে কারণ এই ৯৫% ভোক্তাকে সেবা দেওয়ার প্রান্তিক খরচ খুবই কম – প্রায় শুণ্যের কাছাকাছি - কারন তাদের পরিকাঠামো মূলত প্রিমিয়াম ভোক্তাদের সেবার জন্যে নিবেদিত ,– অন্যান্যরা বাই প্রডাক্ট। ফ্লিকার সব ভোক্তাদের উপর ফি ধার্য করে না - কারণ তাহলে নতুন কেউ আসবে না এই সেবা নিতে। ফলে তাদের মধ্য থেকে প্রিমিয়াম গ্রাহক হবার সম্ভাবনা কমে যাবে। এ ছাড়াও তাদের নানা রকম আয়ের উৎস আছে যার মাধ্যমে অনলাইন প্রতিষ্ঠানগুলো চলতে পারে ও লাভের মুখ দেখে।


ছবি ফ্লিকার থেকে ডেভিড এরিকসন এর সৌজন্যে, সিসি বাই-এনসি লাইসেন্সের আওতায় ব্যবহৃত 

আমরা এতক্ষণ পর্যন্ত দুটি মডেলের কথা আলোচনা করলাম –বিনে পয়সার পণ্যের – কিছু অর্থমূল্য বা শূণ্য অর্থমূল্য। কিন্তু তৃতীয় আরেকটি মডেল আছে - তা হচ্ছে ঋণাত্মক মূল্য – বা পণ্য ব্যবহারের জন্যে টাকা পাওয়া। ক্যাশব্যাক বা গিফট ভাউচার এরকম মডেলের উদাহরণ। যদিও এগুলো আসলে এক ধরণের মূল্য ছাড়, ভোক্তাদের বোঝানো হয় যে তারা টাকা সত্যিই ফেরত পাচ্ছে।

এখন আসা যাক ফ্রি পণ্যের অসুবিধার কথা। মাগনা পাইলে মানুষ আলকাতরাও খায় এই প্রবাদবাক্য সবক্ষেত্রেই খাটে। তবে আসল কথা হচ্ছে বিনামূল্যের পণ্যের প্রতি মানুষের সাধারণত: অবজ্ঞা থাকে। আমি ম্যাট্রিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে পাশ করার পর আমাকে একটি সাইকেল কিনে দেয়া হয়েছিল। কষ্টের প্রতিদান হিসেবে প্রাপ্ত বলে সেই সাইকেল আমি খুব যত্নের সাথে চালাতাম। অথচ আমার ছোট ভাই নটরডেমে ভর্তি হবার পর কলেজে সেটি বেখেয়ালে হারিয়ে ফেলে - কারণ তার সেই টান ছিল না সাইকেলটির প্রতি। কাজেই কোন পণ্যের যদি খুব সামান্য মূল্যও থাকে বা ব্যবহারের কঠিন শর্ত থাকে তাহলে তা ব্যবহারে দায়িত্বশীলতার পরিচয় পাওয়া যায়।

গুগলের ফ্রি পণ্যের সাম্রাজ্য

গুগলের সাম্রাজ্য অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক ফ্রি পণ্যের ক্ষেত্রে। বর্তমানে গুগলের রয়েছে ১০০টিরও বেশী পণ্য এবং তাদের বেশীরভাগই ফ্রি - সত্যিই কোন লুকানো খরচ নেই। এবং এই দিয়েই তাদের সাম্রাজ্য গড়া হয়েছে। তারা তাদের সার্চ ইঞ্জিন আর কিছু সাইটে বিজ্ঞাপন দিয়ে এত পয়সা আয় করে যে তারা সত্যিই অন্য সব সেবা বিনামূল্যে দিতে পারে যেগুলো বিশ্বব্যাপী ভোক্তাদের আকর্ষণ করে রাখে। এবং ভোক্তা বাড়ার সাথে সাথে তাদের আয় এবং সেবার মানও বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে নতুন নতুন ধারণা বাজারে ছাড়া এটা না ভেবেই যে সেটা কি বাণিজ্যিকভাবে সফল হবে কি না। গুগলের সাফল্যের ধারাবাহিকতা এখানে দেখা যাক:

১৯৯৯-২০০১ - সার্চ ইঞ্জিনকে আরও কার্যকরী করায় সক্ষম
২০০১-২০০৩ - এডসেন্সের মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দাতাদের পছন্দ মত বিজ্ঞাপন তৈরি ও স্থাপনার সুযোগ করে দেয়া এবং সবচেয়ে ভাল যায়গার জন্যে একে অপরের মধ্যে প্রতিযোগিতা করা।
২০০৩ - বর্তমান পর্যন্ত - অনেক ধরণের সেবা তৈরি করা

ছবি ফ্লিকার থেকে অ্যালাঁ বাখেলিয়ের এর সৌজন্যে। সিসি বাই-এনসি-এনডি।

১০ বছরের মাথায় আজকে গুগল ২০ বিলিয়ন ডলার কোম্পানি এবং এর সবকিছু ফ্রি পণ্যের উপর ভিত্তি করে তৈরি। গুগল কিন্তু থেমে নেই - তারা মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার খরচ করে ডাটা সেন্টার তৈরি করছে তাদের সেবার গতি বাড়ানোর জন্যে ও মান উন্নয়নের জন্যে। তাদের পঞ্চাশটির কাছাকাছি ডাটা সেন্টারে এখন আছে ৫ লাখেরও বেশী সার্ভার - যা একসময় তাদের অন্য প্রতিযোগীর কাছ থেকে অনেক তফাৎ তৈরি করবে। এতে যা হচ্ছে তা হচ্ছে নতুন নতুন ব্যবহারকারী বাড়ছে এবং মাথাপ্রতি সেবার খরচ কমে যাচ্ছে। ফলে তারা আরও বেশী বিনামূল্যের সেবা দিতে পারছে।

গুগলের ডাইরেক্টরি সার্ভিস গুগ ৪১১ এর কথাই ধরুন। যেখানে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী এওএল এই সেবার জন্যে টাকা নেয় গুগল তা দেয় বিনে পয়সায়। কিভাবে? প্রতিবার যখন ভোক্তারা তথ্য চেয়ে গুগ ৪১১কে ফোন করে তারা রেখে যায় গুরুত্বপূর্ণ কন্টেন্ট - তাদের কণ্ঠ - যা বিভিন্ন অ্যাক্সেন্টের ও গতির। এই তথ্য কাজে লাগিয়ে গুগল তাদের ভয়েস রেকগনিশন সার্চ ইঞ্জিন সফটওয়্যার উন্নত করার চেষ্টায় রত আছে। বিনামূল্যে এই সেবা না দিলে এইসব রিসার্চ কন্টেন্ট তাদের পয়সা দিয়ে কিনতে হত।

গুগলের সুবিধা হচ্ছে এর বিভিন্ন নতুন ধারণা যদি সফল নাও হয় এর ক্ষতি নেই। ব্যর্থ উদ্যোগ যেমন গুগল ওয়েভ, অর্কুট ইত্যাদির ও লক্ষ লক্ষ ব্যবহারকারী আছে। তাই নতুন পণ্য বাজারে ছাড়ার আগে এরা প্রচুর ব্যবহারকারীকে বেটা টেস্টিংয়ের জন্যে নিয়োগ করতে পারে (বিনে পয়সায়) এবং ফল আশানুরুপ না হলে সেটি বাদ দিয়ে নতুন কোন উদ্যোগ শুরু করতে পারে।

দ্যা বিগ সুইচের লেখক নিকোলাস কার বলেছেন “গুগল চায় তথ্য প্রবাহ হোক বিনামূল্যে। কারণ যখন তথ্য পাবার মূল্য কমে যাবে এটি আরও বেশী পরিমানে আয়ের উৎস হবে তাদের জন্যে”।

ওয়ালমার্ট এবং এইচএনএমের মত ডিসকাউন্ট স্টোরের চাপে পিষ্ট ছোট ছোট স্টাইল বুটিকগুলো বর্তমানে নতুন নতুন উদ্ভাবনী শক্তি এবং অনেক ক্ষেত্রে ইন্টারনেট ব্যবহার করে টিকে থাকার চেষ্টা করছে। ভবিষ্যৎে গুগল সাম্রাজ্যের ফ্রির এই যথেচ্ছাচার মনোপলি ঠেকাতে সেরকম শৈল্পিক বুটিক বা ছোট নতুন ধারণার ইন্টারনেটভিত্তিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান যায়গা করে নিতে পারবে কি না সেটি দেখার বিষয়।

পরবর্তী পর্বে থাকবে ফ্রি সংস্কৃতি এবং উদ্ভাবকদের কাজের মূল্য নিশ্চিত করা (ওপেন সোর্স, কপিরাইট/কপিলেফ্ট) ইত্যাদি

প্রথম প্রকাশ: সচলায়তন